‘হাফ কিউসেক’-এই হারিয়ে যাওয়া কিন্তু নিছকই একটা পর্যায়ে নয়, একটা গ্যালন গ্যালন

ধীমান ব্রহ্মচারী

আজকের কবিতার শিরোনাম একটু এভাবেই দিলাম। আমাদের সমসাময়িক এক কবি বন্ধু। পূর্ব প্রকাশিত কবিতার বই, ‘হাফ কিউসেক’। বইটার প্রকাশকাল প্রায় বছর দু’য়েক হবে। অথচ দু’বছর পরও কবিতার ভাষা বা ভাবনা কতটা প্রাসঙ্গিক। তাই মাঝেমধ্যেই কবিতার বই পড়তে ইচ্ছে হলে যেন বইয়ের তাক ঘেঁটে ঘেঁটে কিছু ভালো লাগার বই পড়ে ফেলি অনায়াসে।

কবিতার বইটা খুব বড় নয়। ছোট। তিন ফর্মার একটা ছোট্ট বইয়ে কবি নিজের দিনযাপন, প্রেমের আর্জি আর সমকালীন পরিস্থিতির একটু একটু করে যেন খণ্ডচিত্র নির্মাণ করেছেন।

আরও পড়ুন: পোকেমনের দুনিয়ায় আপনাকে স্বাগত

কবি পরিচিতির কভারটা বেশ অদ্ভুত। সাধারণত এরকম পরিচিতি অন্তত বাংলা কবিতার বইয়ে নেই তা নয়, তবে দুষ্কর। একটু উল্লেখ করে বইয়ের পেছনের কভারের পরিচিতি:

‘অর্কিড ফুলের চারাগাছটা তোমাকেই

উপহার দিলাম

ছোট্ট একটা কবিতার খাতা, তাও পড়ে রইল

তোমার বারান্দায়

যত্নে রাখা আমার প্রথম আঁকা ছবিটা সেটাও

রোদ্দুক নিক

সেই সরু রাস্তা ধরে আজও ফিরি আমার ছোট্ট

বাড়িটাতে

সেখানেই সুখ পাখিটা বন্দি আবেগ ঘন চার দেওয়ালে

এভাবেই ঘুম ঘুম চোখে তোমাকে জড়িয়েই বেঁচে আছি

আমি হাঁটছি আমি হাঁটছি আমি হাঁটছি কবিতার

কাছাকাছি।’

বইটার শেষের কভারে লেখক বা কবি পরিচিতির পরিবর্তে এই পুরো কবিতাটা তুলে দেওয়া হয়েছে। কি সুন্দর একটা অভিজ্ঞতা নিয়ে হাজির কবি অমিত। তাঁর এই পরিচিতির চেনা ছন্দেই যেন ওঁর নিজের সারাজীবনের চলার আনন্দ খুঁজে নিয়েছে। একজন সফল কবির হয়তো এটাই বড় পরিচয়। তাই তিনি নিজেই একটা চলমান শৈলীর ভাষা। নিজের ক্রমে ক্রমে এগিয়েছে। আমরা একটু একটু আনন্দ আর কবিতার রস সম্ভোগ উপভোগ করছি।

‘অর্কিড ফুলের’ কথা দিয়েই শুভ ও আশু প্রেমের নিবেদন করেছেন। আমাদের দেশীয় ফুল নয়। এই বিদেশি ফুল কোথাও যেন, সেই বিদেশিনীর কাছেই তাঁর নিবেদন। আসলে আমাদের ভাবনার প্রবাহ একটা বাসের মতো। মানে আমার তাই মনে হয়। একটা চলন্ত বাসে বসে আছি। খুব তাড়াতাড়ি পৌঁছতে হবে, এমন একটা সময়, মন থাকে অস্থির। আর সেই সময়ই কন্ডাক্টর সব স্টপ পারমিশন না দেওয়া স্টপেজে দাঁড়াতে দাঁড়াতে যাবে। বারে বারে বাসটা সিগনাল খাবে। অন্তত কলকাতা জীবন পর্বে আমার দারুণ অভিজ্ঞতা রয়েছে। যাক, কবিতায় ফিরি। এই পরিচিতিও তো একক কবির আত্মপ্রকাশ। কবি নিজেই যাপনের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে সময় উপেক্ষা করে। চারিদিকে এমন একটা পরিস্থিতি, একটু কবিরই ‘সাবওয়ে’ কবিতা থেকে বলি:

‘আমার স্বপ্ন আমাকে নিয়ে যাচ্ছে কোথায়

দেখতে দেখতে চলে এলাম সাবওয়েতে…’

এভাবেই তো নিমজ্জিত হন। আসলে একজন শিল্পীর বড় পরিচয় তাঁর স্বাভবিকটাই। তাঁর চেতনার প্রকাশে। তিনিও এই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কোথাও একটা যোগসূত্রে গেঁথে আছেন, নিস্তার নেই। তাই তাঁর এগিয়ে যাওয়া অনেকটা স্বতঃস্ফূর্ত। আর এই সাবওয়ে তো মানেই কোন শহরের নীচে থাকা একটা রাস্তা। এই রাস্তায় কোনো বাঁধা নেই। কোনো পারস্পরিক ধাক্কাধাক্কি নেই। আছে শুধুই পাশ হয়ে দ্রুত চলে যাওয়া। কবিও ঠিক যেন পাশ করে এগিয়ে যাচ্ছেন।

আরও পড়ুন: কবি অয়ন চৌধুরীর দেওয়া মহাবিষপানেই আমাদের মৃত্যুর প্রবাহ অপার অন্তরীক্ষে, ‘হে বিষ! হে অন্তরীক্ষ!’

কলকাতার ত্রিপুরা হিতসাধনী সভাগৃহ বই প্রকাশ

বইয়ের ৩৩ নম্বর পাতার একটা কবিতা টেস্টটিউব শিশু। একটু বলি:

‘ফ্রিজ ফ্রিজ শরীরের বারুদ শানানো নখ

বাবা-মা আর অণু-পরমাণু

হিসাব যন্ত্রের ব্যর্থতায় বোধগম্যের টান

বেলা শেষের বার্তা আর দেবদূত

কান পেতে থাকে বার বার

প্রাণসখা এবার নেমেছে রাস্তায়…’

বর্তমানের একটা উচ্চ মানের আধুনিক পদ্ধতিতে শিশু জন্মানোর একটা পক্রিয়া। নাম টেস্টটিউব। এই টিউবে কে আছেন? কারা আছেন? কীভাবে আছেন?— এসবই কিন্তু একটা দেখার সুন্দর অনুভূতি। সাধারণত এই পদ্ধতিতে বর্তমানে বন্ধ্যাত্বের একটা বিরাট কলঙ্কের হাত থেকে মেয়েরা মুক্তি পেয়েছে। আসলে কবির এই বিরামহীন চিন্তায় তাঁকে এই পর্যায়ে উন্নীত করেছে। বাবা ও মা এখানে একটা প্রেমের মূর্তি। এই দুইয়ের সম্পর্কই এখানে অনেক পবিত্রতা দান করেছে। আছে জন্ম, আছে মৃত্য— তারই সঙ্গে আছেন নিরন্তর একটা আত্মমগ্নতা, যে মগ্নতা একে অপরের থেকে খুব সহজেই রূপ নেয় এক প্রতীকী। সেই প্রতীকীই এখানে একটি নবজাতক।

আসলে সাধারণ জীবনের মধ্যেই লুকিয়ে আছে একটা মূর্ততা। যা কবি খুব কাছ থেকে দেখছেন। যেমন:

‘চৌরাস্তার ট্রাফিক পুলিশ রোজ দুবেলা তাকায়

তোমাকে দেখে কয়েক সেকেন্ড শান্তি খুঁজে’ …(বাসডিপো)

— কবিতার এই রূপকল্পই কবিকে নিয়ে যায় গ্রাম থেকে শহরে। সেখানে প্রতিদিনের পুলিশের কাজের রীতিনীতি তাঁর চোখে ছবির মতো উঠে আসে।

অথবা,

‘দেখুন উড়িয়ে দেয় আকাশে

জানালার ঘষা কাঁচ দিয়ে রোদ পড়ে বিছানায়

তবুও ঘুম আন্টি-রোমান্টিক

ডায়রিতে ডেট আসে বারবার’ (চাঁদ প্রেম)

আসলে এই কবিতা একটা অস্পষ্ট প্রেমের নির্যাস। এখানে প্রেমের যেন পরিপূর্ণতা নেই। একটা অ্যাবসার্ড কোথাও লক্ষ্য করা যায়। তাই প্রেম এখানে চাঁদ। মনে চাঁদের আলোর মতো। সাধারণত কোন কিছু চাঁদের সঙ্গে তুলনা মানেই, তার ক্ষীণতা নিয়ে একটা উপমা দেখানো বা সেই হালকা নির্যাস তুলে দেখানো। তাই কবির প্রেমও হয়তো সেইরকম একটা আবছা বা ক্ষীণ। এভাবেই কবিতার দিক, কবিতার একটা চরণের মতো কবি তৈরি করেছেন চলার পথ। সেখানে তিনি নিজেই সেই প্রেয়সী, সেই ফেলে আসা শহরের পথ-সাবওয়ে, সেই কোলাহল পূর্ণতা কোথাও যেন এক সুনিশ্চিত অন্ধকারে হারিয়ে যায়।

এই হারিয়ে যাওয়া কিন্তু নিছকই একটা পর্যায়ে নয়। একটা গ্যালন গ্যালন প্রবাহের মধ্যে দিয়ে। এই প্রবাদের চোরাস্রোতে কখন কবি নিজেই হারিয়ে যান। তাই তাঁর কবিতার নাম ও তার শব্দ চয়নের মাত্রা সাবলীল হলেও তা কোথাও একটা ভাবমধ্যস্থতার ব্যাখ্যা চোখে পড়ে। যায় পরিচয় কবিতাগুলো হল, ‘কতটা বড় হয়েছ তুমি’, ‘চিরকুট’, ‘খোলাচিঠি’ ইত্যাদি সজ্জিত কবিতাগুলো। যেগুলো পড়তে পড়তে আমরা একটা বাগানের মধ্যে কখন আপন খেয়ালে ঢুকে পড়ি। তারপর আর বেরোনোর পথ পাওয়া যায় না। শুধুই সেই বাগানের একটা চেয়ারে বসে বইয়ের পাতা উল্টে যেতে হয়।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *