হাতুড়ি

চন্দন চক্রবর্তী

মাঝেমাঝেই উদ্ভট ভাবনা আসে বৈকি। সেই উদ্ভট ভাবনা ভাবতে ভাবতে জীবনের বা সমাজের গভীর থেকে গভীরতম জায়গায় পৌঁছে যাই। বহু আগে একটা ভাবনা এসেছিল একজন ছাত্র থেকে বুড়ো বয়স পর্যন্ত কতবার গাঁট্টা খেতে পারে। গাট্টা কত রকমের ইত্যাদি। যাকগে প্রসঙ্গে আসি, এবার ভাষাদিবসে গিয়ে কবিতার সঙ্গে অনেক দেশভক্তির গান শুনলাম। হঠাৎ আমার তবলা এবং তবলচির দিকে চোখ গেল। দেখলাম, এক একজন গান গেয়ে যাচ্ছেন, আর তবলচি প্রত্যেকবার টাং-টাং করে হাতুড়ির আঘাত করছে তবলায়। তারপর একসময় হাতুড়ি মারা বন্ধ করে দু’টো হাত দিয়ে তিলতিল করে তাল তোলেন। হাতুড়ির ঝাড় খেয়ে ‘নো বেগড়বাই’। তবলা বেজেই চলে। তখনই মাথায় এলো একটা ডিগি তবলা কতবার হাতুড়ির আঘাত খায়? তার তাল-জীবনে। আরও পরিষ্কার করে বললে, তার ‘বে-তালকে তালে’ ফেরাতে কতবার হাতুড়ির আঘাত খেতে হয়।

আরও পড়ুন: মুর্শিদাবাদের গ্রাম থেকে কলকাতার পিজি-তে পৌঁছনো ডাক্তার শ্রীকান্ত চ্যাটার্জীর কাহিনি

হাতুড়ি বেশ কিছুদিন ধরে আমার মাথা হাতড়াচ্ছে। নর্স পুরাণে ‘থর’ হলেন এক হাতুড়িধারী দেবতা। তিনি একাধারে বজ্রবিদ্যুৎ আবার মানবজাতির আরোগ্য উর্বরতার দেবতা। থার্সডে (বৃহস্পতিবার) অর্থাৎ থর’স ডে বা থরের দিন বলে পরিচিত। সুতরাং ‘হাতুড়ি’ যে এক শক্তিশালী দেবতার অস্ত্র ছিল, সেটা জানা গেল। আমাদের বিশ্বকর্মাও তো দেবতা। তাঁর হাতেও হাতুড়ি দেখা যায়— কেমন মিলে যাচ্ছে। যাইহোক ক’দিন আগে দেখলাম এক ভদ্রলোক একটা ছোট্ট মিউজিয়াম মতো করেছেন। বহু জিনিস ঠাসা। পুরনো রেডিয়ো, টেপ ক্লিক থ্রি ক্যামেরা ঘড়ি, বহু পুরনো খালি মদের বোতল ছাড়াও পুরনো করাত ইত্যাদি শেষে ‘হাতুড়ি’। দু’রকম হাতুড়ি। একটা বড় সাইজের দু’মুখ সমান। আর একটি এক মুখ পেরেক তোলার মতো চেরা। অনেকটা ফিঙের লেজের মতো। মনে পড়ে গেল আমার কৈশোরের দেখা হাতুড়ি সব। মা কয়লা ভাঙতেন এক ঢগ ঢগে হাতল দেওয়া হাতুড়ি দিয়ে। সরস্বতী পুজোর কাপড়ের প্যান্ডেল করতাম। তখন বাবলুদা ওই কয়লাভাঙা হাতুড়ি দিয়ে বাঁশ বাখারিতে পেরেক ঠুকত। দিদিকে বিভূতি মাস্টারমশাই গান শেখাতে আসতেন। ডিগি তবলায় হাতুড়ি মারতেন।

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (২য় অংশ)

বাড়িতে রাজমিস্ত্রি একহাতে ইট অপর হাতে হাতুড়ি নিয়ে ইট নিয়ে ভাঙত। তারপরে একটা ডান্ডায় ছাতা বেঁধে রোদের মধ্যে বসে হাতুড়ি দিয়ে ঝামা ইট টুকরো করত। ছোট মনে হাতুড়ি সম্পর্কে একটা কৌতূহল তৈরি হল। তার মানে হাতুড়ি এমন একটি, বস্তু যা ভাঙা-গড়ার কাজে লাগে। অনেকটা নিরন্তন বয়ে যাওয়া নদীর ঢেউয়ের মতো। তখন কংগ্রেসের জোড়া বলদের বাজার। সেই ছোটবেলায় ভোট মানে কংগ্রেস এইটুকু জেনে এসেছি। কিন্তু আমাদের মাধবপুর গ্রামের বাড়িতে ঢুকে পড়ল একটা শব্দ ‘কমিউনিস্ট’, ওই শব্দটি মানে সাংঘাতিক কিছু। ভয় ভয় ব্যাপার। ঢোলা পাজামা, বাংলা সাদা পাঞ্জাবি চটি জুতো আর কাঁধে একটা ঝোলা ব্যাগ— ব্যস এই হল কমিউনিস্টদের পোশাক। কাউকে ওই পোশাক পরতে দেখলে ভয়ে ভয়ে ‘ভাবতাম উনি তাহলে কমিউনিস্ট’। ২৫ ডিসেম্বর ১৯২৫ সালে এই পার্টির জন্ম। পতাকার রং লালের মধ্যে কাস্তে ধানের শিষ। দেওয়ালে লেখা হত ‘ভোট দেবেন কীসে? কাস্তে ধানে শিষে’। মানে কৃষকের কথা বলা হল।

আরও পড়ুন: নেগেটিভ যখন পজেটিভ

তারপরে দেখি আমার বড় জামাইবাবু এলেন। দিদি ছিলেন স্কুল শিক্ষিকা। দেখি জামাইবাবুর পোশাকে ঢোলা পাজামা পাঞ্জাবি কাঁধে কাপড়ের কালো ঝোলা, দেখা দেখি আমার মেজদাও সেই একই পোশাকে। দু’জনকেই ভয় পেতাম। পার্টি মিটিং করে রাতে বাড়ি আসতেন। জামাইবাবু ভোটেও দাঁড়ালেন। পতাকার রং একই রইল। সিম্বলে এক কাস্তে হাতুড়ি। ৩১/১০/৬৪ থেকে ৭/১১/৬৪ পার্টি কংগ্রেসে কমিউনিস্টরা দু’ভাগে চলে গেলেন। হাতুড়ি কাস্তের সিপিএম পার্টি তৈরি হল। সাম্যবাদ মার্কসবাদ, লেনিনবাদ।

আরও পড়ুন: ‘উন্নয়নবিরোধী’ এক প্রকৃতিপ্রেমিক মানবদরদি সুন্দরলাল বহুগুনা

পাতাকাতে ধানের শিষ বাদ হয়ে গেল। কিন্তু সিপিআই হিসাবে রয়ে গেল। জামাইবাবু কাস্তে হাতুড়ির সিম্বলে ভোটেও দাঁড়ালেন। এবং হারলেন। সেই প্রথম আমি কাস্তে হাতুড়ির পাতাকাকে কাছ থেকে দেখেছিলাম। এই হাতুড়ি সেই জলের ঢেউয়ের মতো। শ্রমিক শ্রেণির হাতিয়ার। তারপরে কলকাতায় চলে এলাম। সেই কয়লাভাঙা হাতুড়ির হাতল বদলে চলে এলো কলকাতায়। বেশ চলছিল। কলপাড়ের এক কোণে কয়লাঘর। সেখানে হাতুড়ির শব্দ শোনা যেত। ষাটের দশকের শেষ দিক তখন। আশপাশে ছোটখাটো কারখানা, গ্রিল কোম্পানি লেদ-মেশিন কারখানা ছাড়াও তারাতলা রোড, হাইডরোডের দু’পাশে কত কারখানায় হাতুড়ির শব্দ পাওয়া যেত। সেও খাঁকি বা ডার্ক নীল পোশাক পরা শ্রমিক শ্রেণি টিফিন বাক্স খুলে গাছতলায় বসে খেত বা ক্যান্টিনে বসে সস্তায় মাছ ভাত। বেশ চলছিল আমার সেই নদী… ঢেউয়ের মতো হাতুড়ি চলল। তারপর শুরু হল এক সব্বনেশে আন্দোলন। নেতাদের নেতাগিরি। শ্রমিকদের হাত থেকে হাতুড়ি কেমন যেন ছবি হয়ে যেতে লাগল।

আরও পড়ুন: আম চাষ: ইতিহাস-বৃক্ষ ঘেঁটে

একটা সময় এলো যখন কারখানার সাইরেন, হাতুড়ির শব্দ হারিয়ে, হাইডরোড বা তারাতলা কারখানা অঞ্চল একটা নিঝুম নগরীতে পরিণত হল। এদিকে বাড়িতে কয়লার পরিবর্তে ‘ক্যালক’ ধোঁয়াহীন কেক চলে এলো। হাতুড়িটা কেমন যেন নিস্তব্ধ, নিথর হয়ে গেল। না হাতুড়ি একেবারে হারিয়ে গেল না। মোড়ে মোড়ে রিকশা স্ট্যান্ডে খুব ধুমধাম করে বিশ্বকর্মা পুজো হত। তাঁর হাতে যেমন ঘুঁড়ি থাকত তেমন ‘হাতুড়ি’। মনটা খুশি খুশি লাগত। আদালতেও জজ সাহেব হাতুড়ি ঠুকে ‘অর্ডার অর্ডার’ বলেন। যাইহোক ‘হাতুড়ি’ তো এখনও আছে।

আরও পড়ুন: ইসরাইল-প্যালেস্তাইন সংঘাত, একপেশে মিডিয়া

তাই বা রইল কোথায়? তিনচাকা রিকশা বা ভ্যান রিকশা কমতে শুরু করল। সেই মোড়ে মোড়ে রমরমা বিশ্বকর্মা পুজো কমতে লাগল। চলে এলো অটো-টোটো। তারাও পুজো করে। কিন্তু মোড়ে মোড়ে তো নয়। ঘরের বাইরে বেরোলেই হাতুড়ি দর্শন বন্ধ। লেদ বা গ্রিল কারখানাও চোখে দেখি না। হাতুড়ি-রাজ পড়তির দিকে। তার বদলে চলে এলো বিল গেটসের কম্পিউটার— আইটি সেক্টর। সেখানে বিশ্বকর্মা পুজো হয়। ধুপ ধুনো জ্বলে। ফুল বেলপাতায় গন্ধ পাওয়া যায়। মদ খাওয়ার আসরও বসে, কিন্তু বিশ্বকর্মার হাতে প্রকৃত অর্থে হাতুড়ি থাকে কি? উহু থাকে কম্পিউটারের মাউস… তবুও নদীর ঢেউ দেখলে এখনও কেন ভাঙা-গড়ার কারিগর হাতুড়িকে মনে পড়ে।

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

  • খুব ভালো লাগলো পত্রিকার সব গুলো লেখাই।
    শুভ কামনা জানাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *