হানাবাড়ির কথা

রাহুল দাশগুপ্ত

সবাই গোল হয়ে বসেছে। মধ্যমণি উপাসনা। মা দেবস্মিতার দিকে তাকিয়ে সে আবদার করল, আমাকে হানাবাড়ির গল্প বলো।

সবাই তাকাল দেবস্মিতার দিকে। সে বলল, হানাবাড়ি বলতেই আমার তো মনে পড়ে প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘হানাবাড়ি’র কথা! তখনও দেশভাগ হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। কলকাতার বাইরে মাইল দশ-বারো দূরে বড় রাস্তার ধারে একটি বিরাট পুরনো বাড়ি। হানাবাড়ি বলে বাড়িটার খুব দুর্নাম! জনমানবহীন সেই বাড়িতে কেউ গেলেই একটি বিকট অদ্ভুত প্রাণীর দ্বারা আক্রান্ত হয়। সেই প্রাণীটিকে দেখতে একেবারে গরিলার মতো। বর্মা থেকে যুদ্ধের সময়ে বিতাড়িত একটি পরিবার বাধ্য হয়ে সেই বাড়িতে এসে ওঠে। মামাবাবু আর তার দু’টি বাপ-মা হারা ভাগনি, ললিতা ও নমিতা। আর একজন পরিচারিকা। সবমিলিয়ে চারজন। আর তারপরই কাহিনি জমে ওঠে। কাহিনির নায়ক, জয়ন্ত চৌধুরী। আর তার দুই সঙ্গী, পুলিশ ইন্সপেক্টর মিঃ সোম আর বিখ্যাত ডিটেকটিভ মিঃ রুদ্র। কীভাবে তারা সবাই মিলে ভিলেন শ্রীমন্ত সরকারের কুকীর্তির রহস্য ফাঁস করলেন, সে-এক রোমহর্ষক কাহিনি। প্রেমেন্দ্র মিত্র নিজেই এই বইটি নিয়ে সিনেমা করেছিলেন। ছবিটিতে আগাগোড়া শোনা যায় সেই সংগীত, ‘হাওয়া নয়, ও তো হাওয়া নয়/ নিশুতি রাত বুঝি কথা কয়। আসলে শ্ৰীমন্ত ভেবেছিল ওই পোড়ো বাড়িতে গুপ্তধন লুকোনো আছে! তাই কুকীর্তির সঙ্গী বিরিঞ্চিকে নিয়ে সে ওই বাড়িটাকে হানাবাড়ি বলে দুর্নাম রটিয়ে দেয়। নিজে সে একজন শিল্পী সেজে বসে থাকে। আর দু’জনে মিলে মানুষকে ভয় দেখাতে শুরু করে। কিন্তু প্রথমে আকস্মিকভাবে জয়ন্ত আর তারপর ওই পরিবারটি এসে হাজির হওয়ায় তার সব পরিকল্পনা বানচাল হয়ে যায়!

আরও পড়ুন: ভূতেরা ফিরে আসে যে দিনগুলোয়

উপাসনা এবার তাকায় পিসি অপর্ণার দিকে। অপর্ণা বলে, আমার মনে পড়ছে, লীলা মজুমদারের ‘হানাবাড়ি’। এই হানাবাড়িটি আবার দোতলা। বর্ষায় ব্যবসায় ভাগ্যের দোষে সমস্ত খুইয়ে এই বাড়িতে এসে আশ্রয় নেন পঞ্চান্ন বছরের পরেশবাবু। পঁয়ত্রিশ বছর ধরে খালি পড়ে ছিল সেই হানাবাড়ি, এমনই ভূতের উপদ্রব! কেউ বাস করতে তো রাজি নয়ই, সন্ধের পর ওদিকে যেতেও চায় না। তারপর সে কত কাণ্ড!

আরও পড়ুন: ৭৮ বছর পরেও আলোচনার বৃত্তে নেই রানি অফ ঝাঁসি ব্রিগেড

উপাসনা জ্যাঠা অভ্রের দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি কোনও হানাবাড়ির কথা জানো?

অভ্র বলল, আমার তো দারুণ একটা গল্পের কথা মনে পড়ছে। শিবরাম চক্রবর্তীর, ‘দশ নম্বর বাড়ির রহস্য’। সেই হানাবাড়িটা ছিল আলিপুরে। আর সেখানেই ছিল একটা ভূতুড়ে বিড়াল। আমার মনে আছে সেই বর্ণনা, তারপর কী বলব মশাই, বসেছিল বিড়ালটা আমাদের সবার চোখের সামনেই। চোখের ওপরেই সেটা কেমন ছায়ার মতো ঘোলাটে হয়ে যেতে লাগল। দেখতে দেখতে সেই ছায়ামূর্তি ঝাপসা হয়ে মিলিয়ে গেল। একেবারে!

উপাসনা এবার আরেক পিসি অনন্যার দিকে তাকাল। তারপর বলল, এবার তুমি একটা হানাবাড়ির কথা বলো।

অনন্যা বলল, আমার তো অনেক আগের একটা কাহিনি মনে পড়ছে। স্বয়ং ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের লেখা। নাম, ‘ভূতের বাড়ি’। সে বাড়ি ছিল একেবারে লণ্ডন নগরে। সেই বাড়িতে বিকট শব্দ হয়। দেওয়ালে। টাঙানো ঘড়ি নিজের থেকে অদৃশ্য হয়ে যায়। শুধু তাই নয়, একসময়, ‘তালগাছ প্রমাণ কৃষ্ণবর্ণ একটি মানুষের আকৃতি দাঁড়াইল। তাহার মস্তক ছাদে ঠেকিল, সেই মস্তকে চক্ষু দুইটি জ্বলিতে লাগিল।’ ভাবলেই গায়ে কাঁটা দেয় না? পোষা কুকুরটাকে পর্যন্ত ভূতটা এসে গলা টিপে মেরে রেখে দিয়ে যায়…

আরও পড়ুন: পিকাসোর আলো, পিকাসোর অন্ধকার

উপাসনার মাসি রুমা এবার বলে উঠল, আমিও একটা হানাবাড়ির গল্প জানি। হেমেন্দ্রকুমার রায়ের লেখা। নাম, ‘পোড়ো বাড়ি। দাঙ্গার পর থেকেই বাড়িটা খালি পড়ে আছে। অথচ লোকে সেই বাড়িতে থাকতে ভয় পায়। সেই বাড়িই ভাড়া নিলেন কথক। সঙ্গে ভৃত্য রামসহায়। দক্ষিণ দিকের জানলা খুলে দিতেই পাওয়া গেল মৃতদেহের দুর্গন্ধ। আর তারপর যা হল! ‘ঠিক পাশেই আমার গায়ের সঙ্গে গা মিলিয়ে শুয়ে আছে আর একটি জীবের দেহ! কোমল, রোমশ, জীবন্ত দেহ! স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে তার শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ। সেই সঙ্গে পেলুম একটা জান্তব গন্ধ! আলো জ্বালতে দেখা গেল বিছানার চাদরের ওপরে কতগুলো কাদামাখা পদচিহ্ন! কী সাংঘাতিক, তাই না?

উপাসনার মাসতুতো দাদা পটকাই বলল, সমরেশ বসুর ‘ভুল বাড়িতে ঢুকে’ তোমরা কেউ পড়েছ? গোগোল সমুদ্রের ধারে ঘুরছে। হঠাৎ ওর চোখে পড়ল পশ্চিম দিকের বালির উঁচুতে একটা দোতলা বাড়ি। দেখেই বোঝা যায়, পোড়োবাড়ি। লোকজন নেই। বাড়িটার চারপাশে বোধহয় পাঁচিল ছিল। বালির বুকে কোথাও কোথাও এখনও ভাঙা অংশ জেগে আছে। একতলা-দোতলায় দু-একটা দরজা খোলা। ভেতরে অন্ধকার। উপাসনার মামাতো দাদা মিমো বলল, তোমরা সবাই ভুলে যাচ্ছ প্রফুল্ল রায়ের ‘অদৃশ্য হাত ছবি আঁকে’ উপন্যাসটার কথা। আগেরটা যদি হয় গোগোলের গল্প, এটা তবে রাহুলের। কলকাতার বাইরে বেড়াতে গিয়ে তুমুল ঝড়বৃষ্টির রাতে রাহুল আর অয়ন ভগ্নস্তূপের মতো বিশাল এক নির্জন পোড়ো বাড়িতে আশ্রয় নেয়। সেখানে মধ্যরাতে ভাঙাচোরা দেওয়ালে ইটের টুকরো দিয়ে ছবি এঁকে অশরীরী কেউ বুঝিয়ে দেয় একটি কিশোরীকে সেখানে খুন করা হয়েছে!

আরও পড়ুন: রানাঘাটের শরীরচর্চার ইতিহাস

উপাসনার পিসতুতো দাদা পিকু বলে, তোমরা একটা দারুণ হানাবাড়ির গল্প মিস করছ। সুচিত্রা ভট্টাচার্যের ‘জোনাথনের বাড়ির ভূত’। মিতিনমাসি কেমন সমাধান করেছিল? একশো চল্লিশ বছরের পুরনো বাড়ি। সেই বাড়িতেই যত উদ্ভট কাণ্ড। মাঝরাতে পিয়ানো বেজে ওঠে। বিশ্রী আওয়াজ হয়। হানাবাড়ি যেমন হয় আর কী! উপাসনার আর এক দিদির নাম, অৰ্ণি। সে বলল, সত্যজিৎ রায়ের ‘অনাথবাবুর ভয়’ আমাকে সত্যিই ভয় পাইয়ে দিয়েছিল! সেই গল্পে ছিল রঘুনাথপুরের হালদার-বাড়ির কথা! দু’শো বছরের পুরনো ভগ্নপ্রায় জমিদারি প্রাসাদ। সেই প্রাসাদের দোতলার উত্তর-পশ্চিম কোণের ঘরে ভূতের আনাগোনা!

উপাসনার বন্ধু সায়ক বলল, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ‘ঘর’ গল্পটার কথা মনে করে দেখো। সে এক মস্ত দালানবাড়ি, যার বড়বড় ঘরগুলো সব ধসে পড়েছে। দরজা-জানলা খুলে নিয়ে গেছে চোরে। অথচ এই ঘরগুলো মেহমান আর মোল্লা-মৌলবিদের জন্য বানিয়েছিলেন নবাব। সেই দালানবাড়িতেই পাওয়া গেল মড়ার মাথা, কিছু হাড়, একরাশ ধূসর চুল…

নৈঋত উপাসনার আরেক বন্ধু। সে বলল, আর শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘চকবেড়ের গোহাটায়’! সেই যে সাবিত্রী নামের গরুটা শালা-ভগ্নীপোতকে মাঠঠা আড়াআড়ি পার করে একটা পোড়ো বাড়িতে এনে ফেলেছিল! চারদিকে বড় বড় গাছ। তাতে আড়াল হওয়া একটা পোড়ো-পোড়ো বাড়ি। দেউড়ির পর একখানা দালান গোছের জিনিস দাঁড়িয়ে আছে।

উপাসনার পিসেমশাই রূপু বলল, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘হলদে বাড়ির রহস্য’ গল্পটার কথা তোমরা সবাই ভুলে গেলে? লাট্ট পাহাড়ের কাছেই সেই ছোট পাহাড়। আর সেই পাহাড়ের ওপর একটা হলদে রঙের বাড়ি। কাছাকাছি আর কোনও বাড়িঘর নেই। এক জমিদার শখ করে বানিয়েছিলেন সেই বাড়ি। দালানে কয়েকটা মোটামোটা থাম। সে থামের গায়ে পেন্সিলে কী সব হিজিবিজি লেখা! যখন-তখন দরজা খোলে আর বন্ধ হয়। দরজাটা এমনভাবে খোলা যে, মনে হয় যেন ঘরটা ওদের ডাকছে ভেতরে ঢুকে দেখবার জন্য। কী রহস্য জমছে না?

আরও পড়ুন: বনলতা সেন: ক্লান্ত ও বিষণ্ণ প্রেমিকের শোকগাথা

উপাসনার আরেক পিসি নিনি বলে উঠল, আমার তো খুব ভালো লেগেছিল, শম্ভুনাথ চট্টোপাধ্যায়ের ‘হাজার বুদ্ধের গুপ্তধন’। যিশু খ্রিস্টের মৃত্যুরহস্য ভেদ করতে কাশ্মীরে গেছেন ঘণ্টামামা। বাংলা সাহিত্যের এক স্মরণীয় থ্রিলার কাহিনি। ডাললেকের ওপর নির্জন রাজবাড়ি। সেই রাজবাড়ি যেন রহস্যময়, পরিত্যক্ত এক দ্বীপের মতো। সেই দ্বীপের এক কোণে সামান্য কিছু গাছপালার জটলা। ছায়া-ছায়া রহস্যময় পরিবেশে দু’টি শিকারা! উপাসনার এক দাদার নাম ননীগোপাল। সে বলল, আমার কিন্তু প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘হানাবাড়িই সবচেয়ে ভালো লেগেছে। সে তোমরা যাই বলো…

দেবস্মিতা বলল, হানাবাড়ি নিয়ে আমার খুব পুরনো একটা গল্পের কথা মনে পড়ছে। মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যের লেখা, নাম ‘হানাবাড়ি’। এই হানাবাড়িটি ছিল লাহোরে। তিন-চারশো বছরের পুরনো সাবেক আমলের এক কেল্লা। সে কেল্লার একেবারে পোড়ো দশা তখন। নিতান্ত বৃদ্ধ যারা তারাও কখনও কোনও জনপ্রাণীকেও। বাড়িতে বাস করতে দেখেনি। একসময় বহু বীভৎস নরহত্যা ওই কেল্লার মধ্যে ঘটেছে। রাত গাঢ় হলে নানা অশরীরী প্রেতাত্মাকে সেই কেল্লার মধ্যে নড়তে চড়তে দেখা যায়, তাদের গলার স্বর শোনা যায়। সেই স্বর কখনও করুণ, কখনও ক্রদ্ধ!

উপাসনা বলল, আর কেউ কিছু বলবে?

এই গল্পটা লিখেছেন, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। নাম, ‘হানাবাড়ির খপ্পড়ে’। উপাসনার আর এক দাদা ঐশিক। এবার সে কথা বলে উঠল, এ এক ডাক্তারের কাহিনি। এক রোগী দেখতে তিনি গিয়েছিলেন বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে। তখন সেই রোডের অধিকাংশ জায়গায় ছিল ডোবা আর জঙ্গল। গভীর রাত। সঙ্গের লোকটি যে বাড়িতে ডাক্তারকে নিয়ে পৌঁছলেন, সেটি বাগানের শেষ প্রান্তে, জীর্ণ অথচ প্রকাণ্ড। কিন্তু সমস্ত চুপচাপ, একটা আলোও জ্বলছে না কোথাও। প্রকাণ্ড একটা ভাঙা সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠতে হল। আর তারপরই লোকটি অদৃশ্য হয়ে গেল। রোগী যখন নাড়ি দেখাবার জন্য হাত বের করল, দেখা গেল, হাত নয়, সেটা একটা কঙ্কাল!

আরও পড়ুন: লক্ষ্মীকথা

দেবস্মিতা বলল, কেন, সরোজকুমার রায়চৌধুরীর ‘একটি সত্যকার ভূতের গল্প’। উত্তরবঙ্গের একটি জেলার সদর। চমৎকার নির্জন জায়গায় ভূতুড়ে বাংলো। একটু দূরেই নদী। বাংলোর তিন দিকে ঘুরে বয়ে চলেছে। আশপাশে কোথাও বসতি নেই। বাংলোর প্রায় পাশ দিয়েই শ্মশানে যাবার রাস্তা। একটি মেয়ে এই বাংলোয় গুলি করে আত্মহত্যা করেছিল। তারপর থেকে শ্বেতবসনা একটি মূর্তিকে কোনও কোনও রাতে বাগানে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়…

উপাসনা সবার কথাই মন দিয়ে শুনছিল। এবার একটা হাই তুলে বলল, হানাবাড়িতে আইসক্রিম পাওয়া যায় না? আমি এবার আইসক্রিম খাব। তারপর হঠাৎ তার চোখ বুজে এলো। হয়তো আইসক্রিমের স্বপ্ন দেখবে বলেই…

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *