শুভ জন্মদিন অমিতজি

Amitabh Bachchan

অরিন্দম পাত্র

বার বার হেরে গিয়েও যিনি হারেন না, বার বার ব্যার্থতার অন্ধগলিতে পথ হারিয়েও যিনি ফের সাফল্যের রাজপথে ফেরত আসেন, আটাত্তরতম জন্মদিনেও শত রোগব্যাধিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে যিনি স্বমহিমায় বিরাজমান, তিনিই যে শতাব্দীর মহানায়ক উপাধি পাওয়ার যোগ্য তাতে আর সন্দেহ কি? শুধু ফিল্ম নয়, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে হারতে হারতে হারান হয়ে যাওয়া মানুষ তাঁর মানসিক শক্তি, লড়াই করার অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতা আর অদম্য জীবনীশক্তি থেকে অনুপ্রেরণা পেতে পারেন। সত্তরের উত্তাল দশকে, ইমার্জেন্সি’র কালো সময়ে মানুষ যখন হারিয়ে যেতে বসেছিল হতাশা, বেরোজগারি, দারিদ্র‍্যের অন্ধকারাচ্ছন্ন কানাগলিতে, ঠিক তখন রূপোলী পর্দায় মসিহা সেজে তাদেরকে স্বপ্ন দেখতে শেখান ৬ ফিট ৩ ইঞ্চির এক সিংহ হৃদয় যুবক। জন্ম হয় এক “Angry Young Man” এর, নাম অমিতাভ বচ্চন।

আরও পড়ুন: রতন কাহারকে নিয়েই এবার নতুন রূপে তবলা-ফোক-এর মিশেলে মুক্তি পেল ‘গাঁদা ফুল’

Amitabh Bachchan, 78 Today, Writes About His "Greatest Gift" From Fans

১৯৪২ সালের আজকের দিনে তখনকার এলাহাবাদ আর অধুনা প্রয়াগরাজে, কবি হরিবংশ রাই বচ্চনের বাড়িতে যে শিশুটি জন্মগ্রহণ করেন, পিতা হরিবংশ তার নাম রেখেছিলেন ইনকিলাব! কিন্তু খুব শিগগিরই সহ কবি সুমিত্রানন্দন পন্থের পরামর্শত তার নাম পাল্টে রাখেন অমিতাভ! কবিপুত্র ও নৈনিতালের শেরউড কলেজ এবং দিল্লি ইউনিভার্সিটির কিরোড়িমল কলেজের প্রাক্তনী যে রূপোলী পর্দায় অবতীর্ণ হবেন শেষমেশ তার পিছনে তাঁর মা তেজী বচ্চনের ভূমিকা ছিল অনেকটাই। এক সময় থিয়েটারে প্রচুর আগ্রহী তেজী বচ্চন ফিল্ম দুনিয়া থেকেও অভিনয়ের প্রস্তাব পেয়েছিলেন! কিন্তু শতাব্দীর মহানায়কের বোম্বে যাত্রার পথ ও কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। যে ব্যারিটোন ভয়েস শুনে মন্ত্রমুগ্ধ হয় আসমুদ্র হিমাচল, সেই ম্যাজিক ভয়েসের মালিককেও প্রত্যাখ্যান করেছিল অল ইন্ডিয়া রেডিও। ৬’৩” র বিরাট উচ্চতা এবং unconventional looks এর জন্য ফিল্মে সুযোগ পাওয়াটাও এক প্রকার অসম্ভব হয়ে পড়ে অমিতজীর। ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড জয়ী ফিল্ম “ভুবন সোম” এর পরিচালক শ্রদ্ধেয় মৃণাল সেন অমিত জী’কে ভয়েস ওভার দেওয়ান নিজের ছবিতে। তারপর ওই বছরই অর্থাৎ ১৯৬৯ সালে খোয়াজা আহমেদ আব্বাস পরিচালিত “সাত হিন্দুস্থানি” ছবিতে প্রথম ব্রেক জোটে তালঢ্যাঙা ওই যুবক ছেলেটির। অভিষেক ছবিতেই National award জুটে যায় Best Male Debutante artist এর। কিন্তু বিধি বাম! ১৯৬৯ থেকে ১৯৭২ পর্যন্ত পর পর ১২ টি ছবি ফ্লপ করে পরবর্তীকালের শাহেনশা’র!

আরও পড়ুন: শুরু হতেই চূড়ান্ত অশ্লীলতার অভিযোগ, সোশ্যাল মিডিয়ায় বিগ বস বয়কটের ডাক

তার পরের বছর অর্থাৎ ১৯৭৩ স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে হিন্দি ফিল্মের ইতিহাসে! সেলিম খান ও জাভেদ আখতার জুটি একটা unconventional script লিখে দোরে দোরে ঘুরছিলেন সবার। অধিকাংশ প্রথম সারি’র হিরো না করে দেয় প্রজেক্টটি হাতে নিতে। পরিচালক প্রকাশ মেহেরা আগ্রহী হলেও হিরো হবেন কে? কারণ গল্পটা সেই সময়ের ফিল্মি গপ্পের সাথে একদম সাযুজ্যপূর্ণ ছিল না। অ্যাকশন ক্রাইম ফিল্ম যার অনেকটা জুড়েই এক রাগী যুবকের দাপাদাপি আর মারদাঙ্গা। সেলিম-জাভেদ জুটির মনে পড়ল ওই ঢ্যাঙ্গা যুবকটি’র কথা! ব্যাস! তৈরি হল ইতিহাস! জন্ম নিল এক নতুন ধারার ফিল্ম! এক নতুন হিরো যে হয়ে উঠল আম জনতার নয়নের মণি! Angry young man of Hindi film industry… পর্দায় যার কান্ডকারখানা দেখে দুনিয়ার বঞ্চিত, শোষিত, বুভুক্ষু মানুষ দিনের শেষে ঘুমোতে যেত পরম শান্তিতে! সেই শুরু! তারপর আর পেছন ফিরে তাকানো নয়। যশ চোপড়া, প্রকাশ মেহেরা এবং মনমোহন দেশাই এর সাথে হাত মিলিয়ে একের পর এক সুপারহিট ফিল্ম তৈরি হতে থাকল অমিতাভ বচ্চনের। শোলে, দিওয়ার, কালাপাত্থর, ত্রিশূল, ডন, মুকাদ্দর কা সিকান্দর ইত্যাদি। ১৯৭৮ ওনার কেরিয়ারের সবচেয়ে সফল বছর। ওই বছর মোট ৬ টি হিট ফিল্ম উপহার দ্যান অমিত জী, যারমধ্যে চারটিই ছিল পর পর একই মাসে রিলিজ হওয়া। পাশাপাশি যশ চোপড়া তাঁর মধ্যেকার অন্যান্য অবতার গুলিকেও সস্নেহে বের করে আনতে থাকেন, রোমান্টিক অবতার! ১৯৭৬ সালের “কভি কভি” যার অন্যতম নিদর্শন। তাঁর কমিক টাইমিং এর উজ্জ্বল উদাহরণ ও আমরা পাই বিভিন্ন ফিল্মে যেমন “নমকহালাল”, ” ইয়ারানা” প্রভৃতি ছবিতে।

Why I will never watch Amitabh Bachchan's Sooryavansham

কিন্তু চিরটাকাল সবার এক যায় না! এল ১৯৮২ সাল। “কুলি” ছবির সেটে এক অ্যাকশন দৃশ্যের শুটিং করতে গিয়ে মারাত্মক আহত হলেন মহানায়ক! পেটে এক অসম্ভবরকম খারাপ injury নিয়েও সবার শুভেচ্ছা ও শুভকামনায় ফিরে এলেন মৃত্যুর মুখ থেকে। কিন্তু তখনও তিনি জানেন না যে অসুস্থতার সময় প্রায় ৬০ ইউনিট রক্ত গ্রহণ করার সময়ে তাঁর শরীরে অজান্তেই বাসা বেঁধেছে হেপাটাইটিস বি’ ভাইরাসের জীবাণু! পাশাপাশি ধরা পড়ল জটিল নার্ভজনিত অসুখ “মায়েস্থেনিয়া গ্র‍্যাভিস”! আস্তে আস্তে কাজ কমিয়ে তিনি ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৭ শুরু করলেন রাজনৈতিক কেরিয়ার সাংসদ হিসাবে! কিন্তু সেখানেও ব্যার্থতা ছাড়া কিছুই পেলেন না, উল্টে একরাশ আর্থিক বদনাম নিয়ে ফিরলেন। ফের শুরু হল তাঁর ফিরে আসার লড়াই। পর পর ছবি ফ্লপ হতে থাকল, ১৯৯০ এর দশকে ব্যার্থতা ছাড়া কিছুই তাঁর হাতে এল না! “তুফান”, “হাম”, “ম্যায় আজাদ হুঁ” ইত্যাদি একগাদা ফ্লপ ফিল্মের তকমা জুটল। কিন্তু এই ১৯৯০ সালেই যশ জোহরের “অগ্নিপথ” ফিল্মে অসাধারণ অভিনয়ের সুবাদে জিতে নিলেন জীবনের প্রথম ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড as best actor..
ব্যাবসা আর প্রডাকশন এ হাত পাকাতে খুললেন এ বি সি এল, কিন্তু সেখানেও সর্বস্ব খুইয়ে হয়ে পড়লেন দেউলিয়া! না রইল হাতে ফিল্ম, না রইল ঘুরে দাঁড়ানোর মত পুঁজি! সারা ভারত চুপচাপ প্রহর গুনতে থাকল মহাতারকার সশব্দ পতনের!

Amitabh Bachchan compares his 'then and now' and we cannot miss his  throwback photos | Entertainment News,The Indian Express

কিন্তু real fighter রা বোধহয় অমিত জী’র মতই হন! অথবা উনিই হয়ত সবচেয়ে বড় লড়াকু! ২০০০ সাল। পার্শ্বচরিত্রে নারায়ণ শঙ্করের মত একজন ন্যায়, নীতিনিষ্ঠ প্রবীণ প্রিন্সিপালের ভূমিকায় অভিনয় করলেন “মহব্বতে” ছবিতে যশরাজ ফিল্মস এর ব্যানারে।ছবি হিট। পাশাপাশি টেলিভিশনের পর্দায় শুরু করলেন নতুন ইনিংস। গেম শো কৌন বনেগা করোড়পতি’র হোস্টের ভূমিকায়। প্রশংসার ডালি উপচে পড়ল! নিজের অ্যাংরি ইয়ং ম্যানের ইমেজ ভেঙ্গেচুরে অন্য ছাঁচে ফেলে গড়লেন নিজেকে। ইগো উপড়ে ফেলে আজকের দিনের তরুণ সুপারস্টার দের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে শুরু হল নতুন এক অমিতাভ বচ্চনের পুনর্জন্ম! The Actor Amitabh Bachchan..

ওনার এই দ্বিতীয় ইনিংস আমার বেশি পছন্দের। নানান চরিত্রে নিজেকে experiment করে পারফেকশনের চরম সীমায় পৌঁছে গিয়েছেন অমিত জী। ফলস্বরূপ সুদীর্ঘ কেরিয়ারের ৫ টি ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড এর ৩টিই পেয়েছেন এই পরীক্ষানিরীক্ষার সুবাদে এই সময়! ব্ল্যাক (২০০৫), পা (২০০৯), পিকু (২০১৫)! কি সব অভিনয়! ব্ল্যাকের জেদী মূক-বধির বাচ্চাদের প্রশিক্ষক হোক, বা পা’তে ১৩ বছর বয়স্ক প্রোজেরিয়া আক্রান্ত মরণাপন্ন রুগী হোক, বা পিকু’র কোষ্ঠকাঠিন্য আক্রান্ত খিটখিটে মেজাজের বাঙালি বুড়ো ভাস্কর ব্যানার্জি! প্রতিটি ভূমিকাতেই তিনি অনন্য! পাশাপাশি “বিরুদ্ধ”, “বাগবান”, “ওয়াজির”, “সরকার”, “খাকি”, “পিংক” তাঁর এই সময়ের আরও কিছু উল্লেখযোগ্য কাজ! ২০১৩ সালের হলিউড ফিল্ম “দ্য গ্রেট গ্যাটসবি” তেও লিওনার্ডো ডি ক্যাপ্রিও এবং টোবে ম্যাগুয়েরের পাশাপাশি তাঁর স্ক্রিন প্রেজেন্স নজর কাড়ে, মুগ্ধ করে!

Before Amitabh Bachchan's Pink: A look at Bollywood's most high-profile  character actor - Movies News

তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ বিস্তর! অন্তর্মুখী, স্বার্থপর, দানবিমুখ, আরও কত কি! সেসব বিচার করার কেউ নই আমি! কিন্তু শুধু তাঁর জীবন যুদ্ধ, সমস্তরকম odds এর বিরুদ্ধে তাঁর লড়াকু মানসিকতা, নিঃসন্দেহে শিক্ষণীয়! কি কি ঝড় না বয়ে গেছে তাঁর উপর দিয়ে! কিন্তু সুবৃহৎ অশ্বত্থ গাছের মত অবিচল ও সুদৃঢ় রয়ে গেছেন তিনি। কেরিয়ারে দোলাচল, রাজনৈতিক ব্যার্থতা, জীবন সঙ্কট, আরও কত কি! হেপাটাইটিস বি’ ভাইরাসের সংক্রমণে নিজের ৭৫% লিভার হারিয়েও করোনা ভাইরাসের মারণ থাবা জয় করে ফিরে এসেছেন তিনি! তাই আজকের দিনে মোবাইলের কলার টিউনে তাঁর ব্যারিটোন ভয়েস স্থান পাবে না তো কার পাবে?

ভাল থাকুন, সুস্থ থাকুন শতাব্দীর মহানায়ক! আরও অনেক পথ হাঁটতে হবে যে আপনাকে! নিজের বাবা’র লেখা এই কবিতাটিই হোক আপনার জীবন পথের পাথেয়….

"तू न थकेगा कभी,

तू न थमेगा कभी,
तू न मुड़ेगा कभी,
कर शपथ! कर शपथ! कर शपथ!
अग्निपथ! अग्निपथ! अग्निपथ!”

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *