চড়াই-উতরাইয়ের কথা: জন্মদিনে পক্ষীবিদ সালিম আলি

ড. মাল্যবান চট্টোপাধ্যায়

প্রকৃতিকে তিনি জানতে শুরু করেছিলেন বাল্যকালে শিকারি হবার লক্ষ্য নিয়ে। আসলে তিনি বড় হয়েছিলেন জিম করবেটের (১৮৮৫-১৯৫৫) ভারতবর্ষে। কিন্তু যতই তাঁর জীবন পরিণতির দিকে এগিয়েছে, ততই তাঁর মধ্যেকার অণুবিশ্ব, মহাবিশ্বের সঙ্গে একাত্ম করেছিল। তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক বদলে যাওয়া মানুষ। পরবর্তীকালে পক্ষীবিদ, সংরক্ষণবাদী এই মানুষটি উপলব্ধি করেছিলেন, ‘‘…জীবহত্যা আমার দু-চক্ষের বিষ। এটা নিছক বর্বরতা বলে আমি মনে করি; যারা তা করে, তারা যত পরনাই নিন্দার যোগ্য।’’

আরও পড়ুন­ ‘কোন আলোতে প্রাণের প্রদীপ’

এভাবেই যিনি নিজেকে আর নিজের বাইরের মহাবিশ্বকে একসূত্রে জুড়েছেন, তিনি সালিম মইজুদ্দিন আবদুল আলি (১৮৯৬-১৯৮৭) বা সালিম আলি। আজকের দিনে তিনি জন্মেছিলেন ঔপনিবেশিক ভারতে।

পাখি নিয়ে মানুষ কেন ভাবে? সালিম আলির উপলব্ধির ইতিকথাকে ছোঁয়ার আগে ভারতের পক্ষী ভাবনায়  আগ্রণীদের কথাও উল্লেখ করা জরুরি। পক্ষীকুলকে সন্ত্রস্ত না করে তাদের পর্যবেক্ষণ করার মানসিকতা নিয়েই জৈন লেখক হংসদেব ত্রয়োদশ শতকে লিখেছিলেন ‘মৃগ-পক্ষী-শাস্ত্র’। যখন ভারতে আসছেন বলবন, কুতুবুদ্দিন আইবকের মত তুর্কি শাসক, ভারতে চলছে রাজনৈতিক লড়াই, তখন কেনই বা জীবজন্তুর পর্যবেক্ষণ নির্ভর এই গ্রন্থ লিখলেন হংসদেব? এর উত্তর মৃগ-পক্ষী-শাস্ত্র গ্রন্থের শুরুতে থাকা এক কাহিনিতে বলা হয়েছে, মহান শাসক সৌদদেব একদিন অরণ্যে মৃগয়া করতে যান ও সেখনে ভীত সন্ত্রস্ত প্রাণীকুলকে দেখে অনুভব করেন যে, জীবজন্তুদের নিজেদের মতো করে অরণ্যে বাঁচতে দিলে তবেই অরণ্য তার নিজের সৌন্দর্যকে তুলে ধরতে পারবে। তাই প্রাণী শিকার নয়, এদের নিজের মতো করে বাঁচতে দেওয়া দরকার, দরকার এই প্রাণীকুলকে জানা আর এজন্যই ডাক পড়ে হংসদেবের। মধ্যযুগে পাখি নিয়ে ভাবনার ক্ষেত্রে সম্রাট জাহাঙ্গিরের নাম  উল্লেখযোগ্য। তাঁর কাছে কোনও অচেনা পাখি আনা হলে তিনি তাকে নিরীক্ষণ করে, সেকালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চিত্রকর, মনসুরের কাছে পাঠাতেন প্রতিকৃতি আঁকবার জন্য। এভাবে মুঘল চিত্রকলার গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিয়েছিলেন পাখি।

আরও পড়ুন­:­ কমলা হ্যারিস: যে রং আগুনের, পলাশের

সেই ধারারই উত্তরসূরি বলা চলে উনিশ শতকে মহারাষ্ট্রে জন্মানো সালিম আলি (১৮৯৬-১৯৮৭)। তিনি যে সময় ভারতের বিজ্ঞানচর্চা করেছেন, তখন আকাশে ছিলেন বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, গণিতবিদ রামানুজ প্রমুখ বিজ্ঞানসাধকগণ। জগদীশচন্দ্র বসুকে বাদ দিলে বাকিদের সকলে গবেষণা করেছিলেন তাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে যা মূলত গবেষণারগার কেন্দ্রিক ছিল। জগদীশচন্দ্র বসু কিছুটা প্রকৃতি পর্যবেক্ষণের নিরিখে তাঁর গবেষণা এগিয়ে নিয়ে গেলেও তিনি পুরোপুরি প্রকৃতি পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণা করেননি। জীবনের বিভিন্ন ধারাতে তিনি প্রতিষ্ঠিত করেছেন নিজেকে। এখানেই সালিম আলি এমনই একজন ব্যক্তি, যিনি তাঁর গোটা জীবনটা ব্যয় করেছেন প্রকৃতি পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণার মাধ্যমে মানব সমাজের কল্যাণের চেষ্টার মধ্য দিয়ে। ভারতের আধুনিক পক্ষীচর্চার ক্ষেত্রে সালিম আলির পূর্বসূরি হিসেবে, প্রথম অন্যতম কাজ করেন পেশায় ভূতাত্ত্বিক ক্যাপ্টেন জেমেস ফ্রাঙ্কলিন। তিনি যুক্তপ্রদেশের বিন্ধ্য পার্বত্য অঞ্চলে পাখি পর্যবেক্ষণ করেন এবং ১৮৩১ সালে এ নিয়ে  ‘Proceding of the Zoological Society, (London)’ তাঁর গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। এছাড়াও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ভারতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠিতা অ্যালান অক্টোভিয়ান হিউমের নাম। যাঁর উদ্যোগে পক্ষীতত্ত্ব নিয়ে প্রথম  ভারতীয় জার্নাল প্রকাশিত হতে শুরু হয়েছিল ১৮৭২ সালে।

আরও পড়ুন: পালাবদলের প্রেক্ষাপট: মার্কিন মুলুকের নির্বাচন

এবার আসা যাক সেই সালিম আলির জীবনের কথায়। যে সংস্থার সংস্পর্শে আসার মধ্যে দিয়ে সালিম আলি আগ্রহী হয়ে ওঠেন, পাখি চর্চার ক্ষেত্রে তার নাম বম্বে ন্যাচারাল হিস্ট্রি সোসাইটি। তাঁর ছাত্রাবস্থায় শিকারকে অনেকটাই রোমান্টিকতার মোড়কে দেখা হত। সংরক্ষণের চেতনা সে সময়ে ততটা প্রবল ছিল না। এই ধারায় এগোনো সালিম আলির জীবন বদলে দেয় একটি ঘটনা। তাঁর আত্মজীবনীতে তিনি বলেছেন যে, ইসলাম ধর্মে তিনি জেনেছিলেন চড়াই পাখি খাওয়া অপরাধ নয়। কিন্তু এই বিধিই তাঁর চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছিল। একদিন শিকার করা পাখিটা আদৌ চড়াই কিনা, তা নিয়ে তাঁর সন্দেহের অবসানের জন্যই তিনি হাজির হন বম্বে ন্যাচারাল হিস্ট্রি সোসাইটিতে। সেদিন তাঁর সন্দেহের নিরসন যেমন হয়েছিল, তেমনি এই সংস্থার গ্রন্থাগারের সান্নিধ্যে আসার মধ্যে দিয়ে তাঁর বিভিন্ন পাখি সম্পর্কে জানবার আগ্রহ প্রকাশ ক্রমশই বিকশিত হতে শুরু করেছিল। সেদিন তিনি জেনেছিলেন তাঁর শিকার করা পাখিটি চড়াইয়েরই এক প্রজাতি, জংলি চড়াই। এভাবেই তাঁর ভিতরকার শিকারি মানুষটি ক্রমশ বদলাতে শুরু করেছিল এক পক্ষীপ্রেমী মানুষে যখন তাঁর প্রথাগত শিক্ষাও ছিল না পাখি নিয়ে। পেশার সূত্রে তিনি গিয়েছিলেন বার্মাতে। পারিবারিক ব্যবসার কারণে ১৯১৪ সালে তিনি দক্ষিণ বার্মার তাভোই শহরে যান। এই যাত্রা তাঁর অল্পকালের জন্যই ছিল। এখানে থাকার সময়েও তিনি স্থানীয় পাখি সম্পর্কে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করতে থাকেন। তবে পাখি নিয়ে গবেষণা তাঁর নিতান্তই শখ ছিল দীর্ঘদিন অবধি। দক্ষিণ বার্মার পাখি নিয়ে তথ্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে তিনি সাহায্য পেয়েছিলেন ইমপিরিয়াল ফরেস্ট সার্ভিসের কর্মী জে সি হপউডের। এখানে তাঁর চোখে এমন অনেক পাখি ধরা পড়ল যা ভারতের মাটিতে তিনি দেখেননি, যেমন নীলকণ্ঠ জাতীয় সাদা ডানার কালো পাখি, যা তিনি তাভোইতে দেখেন। তবে এত অবধিও  এসব ছিল তাঁর শখেরই বিষয়বস্তু। তাঁর এই শখ কিছুটা বাস্তবতার ছোঁয়া পেতে থেকে ১৯১৭ সালের শেষের দিকে, যখন তিনি ফিরে আসেন পড়াশোনা জন্য ভারতে। বোম্বাইয়ের সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের জীববিদ্যা বিভাগের অধিকর্তা রেভারেন্ড ফাদার ব্ল্যাটার এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা নেন। তিনি ব্যবসার কারণে বোম্বাইতে বাণিজ্যিক আইন পড়তে আসা সালিম আলিকে দেখে বুঝেছিলেন যে, তাঁর আসল আগ্রহ প্রাণিবিদ্যা। তাঁরই উৎসাহে তিনি প্রাণিতত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা করেন ।

পড়ার পাট চুকিয়েও তিনি প্রাথমিকভাবে পাখিকে শখের জায়গাতেই রেখেছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে তিনি পেশার কারণে আবার বার্মায় চলে যান। এ সময় তাঁর পারিবারিক ব্যবসা বদলে যেতে থাকে এবং তিনি যুক্ত হতে থাকেন কাঠের ব্যবসায়। ১৯২২ সালে তিনি যখন বার্মার রয়েছেন, তখন উপলব্ধি করেছিলেন একশৃঙ্গ গণ্ডারের অবলুপ্তি সংকেতকে। বার্মার জঙ্গলে সে-সময় থেকেই বেপরোয়াভাবে গণ্ডারের শিংয়ের কারণে গণ্ডার হত্যা শুরু হয়ে গিয়েছিল।

১৯২৪ সালে তিনি আবার বম্বেতে ফিরে আসেন। ১৯২৬ সালে বোম্বাইতে প্রিন্স অফ ওয়েলস মিউজিয়ামে প্রকৃতিবিজ্ঞান বিভাগে গাইড লেকচার হিসাবে চাকরি পান তিনি, যা তাঁর জীবনের শখকেই করে তোলে তাঁর পেশা। এই কাজের সূত্রে তিনি পক্ষীতত্ত্ব নিয়ে পড়বার জন্য ব্রিটিশ মিউজিয়ামে, বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করেন। ১৯২৯ সালের ভারতবর্ষে গান্ধিজির নেতৃত্বে ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলন যে মাত্রা পেয়েছিল, তার প্রভাব থেকে বাদ যাননি সালিম আলিও। তিনি আত্মজীবনীতে বলেছেন, ব্রিটিশ মিউজিয়াম সেই সময়ে তাঁর আবেদনের প্রেক্ষিতে খুব একটা সদার্থক উত্তর দেননি সম্ভবত তিনি ভারতীয় ছিলেন বলে। তাই সুযোগ পেয়ে তিনি বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পক্ষীতত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন এরতিন স্ট্রেসেম্যানের কাছে। এখানে পক্ষীতত্ত্ব নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে শেখার মধ্য দিয়েই তাঁর পক্ষীতাত্ত্বিক হয়ে ওঠা শুরু। এই সময়ে তিনি বোম্বাইতে ন্যাচারাল হিস্ট্রি সোসাইটির সঙ্গে জোট বেঁধে পক্ষীতাত্ত্বিক চর্চার কাজ শুরু করেন তিনি এবং প্রথম আবেদন জানান হায়দরাবাদের নিজামের রাজ্যে কাজ করতে চেয়ে। নিজাম সরকারের আর্থিক সাহায্য নিয়ে ১৯৩১ সালের শেষের দিক থেকে ১৯৩২ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত তিনি বোম্বে ন্যাচারাল হিস্ট্রি সোসাইটির পক্ষে হায়দরাবাদের পাখির সমীক্ষা চালান, যা অনেক তথ্য তুলে আনে সর্বসমক্ষে। এই সমীক্ষার মধ্যে দিয়ে তিনি স্পষ্টতই বলেন, শিকারযোগ্য প্রাণীদের রক্ষী হিসাবে যারা কাজ করত তারা অধিকাংশই দুর্নীতিগ্রস্ত, যে কারণেই হায়দরাবাদের দেশীয় রাজ্যে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের সমস্যা তৈরি হয়েছিল।

এর পরবর্তীকালে ত্রিবাঙ্কুরে কোচিন সরকারের কাছে পাখি সমীক্ষার আবেদন জানিয়েছিলেন তিনি এবং তা মঞ্জুর হলে কেরালার পাখি নিয়েও তিনি গুরুত্বপূর্ণ কাজ শুরু করেন। সালিম আলি বিস্মিত হয়েছিলেন হিমালয় কিংবা পশ্চিম চিনে বা মালয়েশিয়ায় উদ্ভিদ ও বন্যপ্রাণীর সঙ্গে ভারতের দক্ষিণ প্রান্তে থাকা এই অঞ্চলের অদ্ভুত সাদৃশ্য লক্ষ্য করে। দেশীয় রাজ্যগুলির মধ্যে কচ্ছের মহারাজার সহযোগিতা তিনি পেয়েছিলেন। সেখানে তিনি একটি পাখিরালয়কে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। যার নাম ছিল ধানটুনির পাটন। এই অঞ্চলটিতে পরিযায়ী পাখিদের যথেষ্ট ভিড় ছিল যা সালিম আলির আগ্রহের বিষয় ছিল।আন্তর্জাতিক রাজনীতিও সালিম আলির জীবনকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করেছে। তাঁর শিক্ষাজীবন যেমন প্রভাবিত হয়েছিল ১৯২৯ সালে, তেমনি স্বাধীন ভারতেও তিনি বাধার মুখোমুখি হয়েছেন পাখি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে। ১৯৫৯ সালে জেনেভাতে একটি সম্মেলনে পাখি বাহিত রোগ নিয়ে আলোচনা হয়েছিল যার সিদ্ধান্তের নিরিখে  ভারত থেকে যোগ দেওয়া সালিম আলি ভারতেও সম্মেলনে আসা অন্য দেশগুলির মতো পাখির পায়ে রিং পরানোর মাধ্যামে তাদের গতিবিধি নজরে রাখার জন্য প্রকল্পটি শুরু করেছিলেন। যদিও মার্কিন সাহায্য থাকার কারণে এই প্রকল্পের সঙ্গে লেগে যায়ে মার্কিন বিদ্বেষের রং।

সালিম আলির জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত তিনি হয়ে উঠেছিলেন প্রকৃতিপ্রেমী ও পরিবেশ সংরক্ষণবাদী মানুষ। এ প্রসঙ্গে ভরতপুর রাজ্যের কথা বলা যেতে পারে। সেখানে তিনি পরিবেশ রক্ষার্থে একজন আধুনিক পরিভাষায় Activist হয়ে উঠেছিলেন। মহেশ রঙ্গরাজন এ বিষয়ে উল্লেখ করতে গিয়ে বলেছিলেন যে ভরতপুরের কেওলাদেওঘানা নামক পাখি শিকারের জায়গাটিকে পরবর্তীকালে জাতীয় অভয়রণ্যে পরিণত করার কৃতিত্ব সালিম আলিরই প্রাপ্য। ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হয় ব্রিটিশ শাসনের থেকে। ভরতপুর নামক দেশীয় রাজ্যের রাজা ভরতপুরের ভারতভুক্তির পক্ষে মত দিলেও এক্ষেত্রে একটি শর্ত জুড়ে দিয়েছিলেন। এতে বলা হয়েছিল যে কেওলাদেওঘানা জলাশয়ে মহারাজা ও তাঁর বন্ধুদের পাখি শিকারের যে অধিকার দেশীয় রাজ্য হিসেবে ব্রিটিশ শাসনকালে বজায় ছিল, তা ভারতভুক্তির পরেও থাকবে যা ভারত সরকারের পক্ষ থেকে মেনে নেওয়া হয়েছিল। ভারতভুক্তির পরে মহারাজা পাখি শিকারের অধিকার নির্বিচারে প্রয়োগ করে যেতে থাকেন। সালিম আলির স্মৃতিকথায় সে ইতিহাস উঠে আসে। তিনি বলেছেন স্বাধীনতার আগে অবশ্য শুধুমাত্র মহারাজা নয়, ব্রিটিশ আধিকারিকরাও পাখি শিকার করতেন ও উপভোগ করতেন। সালিম আলি উল্লেখ করেছেন ১৯৩৮ সালের নভেম্বর মাসে কেওলাদেওঘানাতে যে পাখি শিকার হয়েছিল, সেখানে প্রধান ভূমিকায় ছিলেন বড়লাট লিনলিথগো আর সেবারে ৪২৭৩টি হাঁস ও রাজহাঁস মারা পড়েছিল। ১৯৪৭-এর পর সাহেবেরা চলে গেলেন, কিন্তু মহারাজা তাঁর পক্ষীনিধনের উপভোগ করতে থাকেন। এতে স্থানীয়রা ক্ষুব্ধ হতে থাকেন। তারা দাবি করতে থাকেন যে, এই জলাশয়কে কেন্দ্র করে তারা কৃষির বিকাশ ঘটাতে চান। এই সময় সালিম আলি ভীষণ ভাবে সচেতন হয়ে ওঠেন এবং তিনি উপলব্ধি করেন যে এই জলাশয়টি যদি রাজার হাত থেকে সরিয়ে সাধারণের জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে কেওলাদেওঘানা বাস্তুতন্ত্রের ক্রমে নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রকট হবে। তিনি জওহরলাল নেহরুর প্রধানমনন্ত্রিত্বাধীন সরকারের কাছে এই বিষয়ে আবেদন জানান। ফল হিসেবে ভারত সরকার এ বিষয়ে সচেষ্ট হন, মহারাজা তাঁর একচ্ছত্র অধিকার ছেড়ে দেন এবং কেওলাদেওঘানা হয় প্রথমে জলচরদের অবাধ বিচরণস্থান ও পড়ে জাতীয় অভয়ারাণ্য।

তবে ৮৭ বছর বয়সে স্বাধীন ভারতের নাগরিক হিসেবে তিনি বারংবারই আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন যে আধুনিকতার চাহিদা মেটাতে গিয়ে উন্নয়নের নামে এই অঞ্চলে যে পরিবেশ তথা জৈববৈচিত্র্য নষ্ট করা হচ্ছে। যে সময়ে সালিম আলি পাখি নিয়ে চর্চা করেছেন, সে সময় নিছক পেশার তাগিদ ছাড়া এ বিষয়ে গবেষণা করার প্রবণতা খুব বেশি ছিল না। তাঁর সময়কালে এক্ষেত্রে অন্যতম ছিলেন সুন্দরলাল হোরা (১৮৯৬-১৯৫৫)। যিনি প্রাণীবিদ্যা নিয়ে পড়েছিলেন, কিন্তু তার প্রয়োগ শুরু করেছিলেন Zoological Survey of India-তে চাকরি পাওয়ার পর। এখানেই সালিম আলি অন্যরকম। তিনি পেশার কারণে নয়, নেশার কারণেই পাখি নিয়ে চর্চা শুরু করেছিলেন, যা তাঁকে পরবর্তীকালে অনন্যতার শিরোপা দিয়েছিল। তাঁর জীবনের অন্যতম আর একটি দিক হল অর্থনৈতিক পক্ষীতত্ত্ব নিয়ে চর্চা করা। অর্থনৈতিক দিক থেকে কোন পাখি উপকারী, কৃষি-বান্ধব হতে পারে, সেটি তিনি বুঝতে চেয়েছিলেন। এ নিয়ে ঔপনিবেশিক সরকারের কৃষি মন্ত্রকের কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন তিনি। যদিও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ১৯৩৬ সালে ‘Current Science’ পত্রিকায় একটি প্রবন্ধে তিনি এ বিষয়ে আলোচনাও করেছিলেন। এক্ষেত্রেও তিনি পথিকৃৎ বলা চলে। তাঁর প্রথম লেখা বই The book of Indian Birds  (১৯৪১)। এছাড়াও Birds of Kerala, Birds of Sikkim এরকম অসংখ্য গ্রন্থ তাঁর ভাবনার প্রকাশক। তাঁর The Book of Indian Birds সম্পর্কে পরবর্তীকালে মন্তব্য করতে গিয়ে ইন্দিরা গান্ধি বলেছিলেন, বেশিরভাগ ভারতবাসীর মতো পাখি নিয়ে বাছবিচার করার কথা তাঁরও মনে হয়নি। কিন্তু দেহরাদুন জেল থেকে তাঁর বাবার পাঠানো সালিম আলির এই বইটি তাঁর কাছে এক নতুন জগৎই খুলে দিয়েছিল। ভাবনার নতুন দিগন্ত তিনি এভাবেই উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন ভারতবাসীর কাছে। তিনি আসলে ভাবতে শেখান, জন্ম দেন এক বোধের। এখানেই ১৯৭৬ সালে পদ্মবিভূষণ পাওয়া সালিম আলির গুরুত্ব।

সহায়ক গ্রন্থাবলি ও নিবন্ধ 
১. সালিম আলি, চড়াই উতরাই, (The Fall of a Sparrow গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ। অনুবাদক, সুভাষ মুখোপাধ্যায়), ন্যাশানাল বুক ট্রাস্ট, নয়াদিল্লি, ২০০৮।
২. Salim Ali, Bird Study in India: Its History and  its Importance, India International Centre Quarterly, Vol.6, No.2 (April 1979).
৩. Mahesh Rangarajan, India’s Wildlife History: An Introduction, Permanent Black & The Ranthambhore Foundation, Delhi, 2001.

লেখক আসানসোল গার্লস কলেজের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক

Facebook Twitter Email Whatsapp

3 comments

  • Sri Nabarun Chakraborty

    সঠিকভাবে মনে পড়ছে না স্কুলে পড়ার সময় নবম বা দশম শ্রেণীতে The Fall of a Sparrow আমাদের ইংরাজি টেক্সটে ছিল। সেটা পড়ে প্রথমবার সেলিম আলির কথা জানতে পারি। তারপর পরবর্তীকালে পক্ষীতত্ত্ব বা সেলিম আলির কথা ভালো করে জানি।
    এই লেখাটি খুবই আকর্ষক,তথ্যবহুল এবং সহজ সরল ভাষায় যে যেকোনো মানুষের কাছে সহজে গ্রহণযোগ্য।
    আপনাকে ধন্যবাদ।

  • অসাধারন বললেও কম বলা হবে।

  • Amrita Basu Roy Chowdhury

    An excellent essay for the avid learners.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *