সাম্প্রতিক বাংলা সাহিত্যের নিরিখে বিরলতমদের একজন হাসান আজিজুল হক

সুমিত নাগ

“আমি কিছুই আবিষ্কার করতে পারি না, তৈরি করতে করতে পারি না, নির্মাণ করতে পারি না। আমি বড় অদ্ভুতভাবে মাটিলগ্ন এবং বলা যায়, অভিজ্ঞতা দিয়ে একেবারে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। সেখানে আমি মনে করি, অনেকে আমার লেখা পড়ে বিরক্ত হতে পারে, তেমন গল্প নেই, নতুন চিন্তা নেই, নতুন কায়দা নেই এ আবার কেমন কথা, সেটা আমার জন্য বড় আশঙ্কারই কথা…।” (হাসান আজিজুল হক, সাক্ষাৎকার, কালি ও কলম)

দেশভাগের কিছু পর, যে-তরুণ, নব-গঠিত পশ্চিমবঙ্গের অবিভক্ত বর্ধমান জেলা ছেড়ে তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানে— যা পরে বাংলাদেশ— চলে যান, সেই তরুণই, শেষ অর্ধ-শতাব্দী কালে বাংলা দেশ এবং সামগ্রিক বাংলাভাষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক হিসেবে হাসান আজিজুল হক স্মরণীয় হবেন। তাঁর সাহিত্য রাঢ় বাংলা ও বাংলাদেশের গভীরে প্রোথিত সমাজ-চেতনা থেকে নারী-পুরুষের সম্পর্ক ও বিবিধ রাজনৈতিক সমীকরণের দলিলের মতো উঠে এসেছে বললেও অত্যুক্তি হবে না আদৌ। তাঁর ছোটগল্পে, এবং অবশ্যই, প্রথম উপন্যাস ‘আগুনপাখি’তে, যে-আশ্চর্য সাহিত্য-সৃষ্টির পরিচয় মেলে, তা দুই বাংলার বিদগ্ধ সাহিত্য মহলে স্বীকৃত এবং তাঁর সৃষ্টির আবিষ্কার-পুনরাবিষ্কার আগামী সময় ধরে চলতেই থাকবে। সেই প্রসঙ্গে যাবার আগে, যদি নজরে আনি, স্বয়ং লেখকেরই নিজের লেখা সম্পর্কিত উপরোক্ত মন্তব্যটি, তাহলে সেটি পড়ে কিছুটা বিস্মিত হতেই হয়। সন্দেহ থাকতেই পারে, মন্তব্যটি নিশ্চয় নিজের লেখা সম্পর্কে বিনয়বশতই কতকটা, তা সত্ত্বেও, তাঁর সাহিত্যকে তাৎক্ষণিক বিচার করতে গেলে এই পথে এগোনো খুব ভুল হবে কি?  

আরও পড়ুন: জীবননামা

কিন্তু, তা কী করে সম্ভব? নতুন কিছু আবিষ্কার, কিংবা নির্মাণের প্রসঙ্গ তাও মানা গেল, কিন্তু নতুন চিন্তা নেই, এমনকী নতুন কায়দাও নেই— তা কীভাবে শেষ পঞ্চাশ-ষাট বছরে বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ লেখকের লেখার বৈশিষ্ট্য হতে পারে? এই সময়ে বাংলা সাহিত্য প্রভাবিত হয়েছে বিবিধ সাহিত্য-রীতি কিংবা ধারার অনুপ্রেরণায়, যার অনেকাংশই বিদেশাগত। বহু তত্ত্ব, বহু চিন্তায়— একইসঙ্গে ধনী ও দরিদ্র, ব্যপ্ত ও জটিল হয়েছে লেখকদের সৃষ্টির গতিপথ। সেখানে দাঁড়িয়ে কীভাবেই বা আমরা দেখতে পারি এমন একজন গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী লেখকের সাহিত্য-যাত্রা যা নতুন আবিষ্কারের পথে হাঁটে না, বলেই মনে করছেন লেখক স্বয়ং?

জন্ম, রাঢ় বাংলার গ্রামীণ একান্নবর্তী পরিবারে। তিনি নিজেই বলেছেন, পরিবারের প্রায় ৫০ জন সদস্য দেশভাগের পরেও, পূর্ব-পাকিস্তানে আসেননি। চলে এসেছিলেন, তাঁর বাবা। দর্শন-শাস্ত্রের ছাত্র তরুণ হাসান যখন গল্প লিখতে শুরু করলেন, তখন কলকাতা এবং ঢাকায় নতুন ধরনের সাহিত্য আন্দোলন শুরু হয়েছে। কাহিনি ও কাহিনিহীন গল্প— এই দুয়ের মাঝে রাজশাহীতে তরুণ লেখক যেন মধ্যপন্থা নিচ্ছেন। কোনও বিশেষ তত্ত্বের খপ্পরে না-পড়ে, কোনও বিশেষ রীতির অনুসারী না-হয়ে, বুনছেন যে-কাহিনি তা অনেক বেশি দৃশ্য-নির্ভর, গড়ে তুলছেন যেন একেকটি মুখও সেভাবেই— চরিত্রগুলিকে দেখতে দেখতে; তাঁর প্রথম বিখ্যাত গল্প, ‘শকুন’— যা দৃশ্য-নির্মাণের মধ্যেই এক আশ্চর্য নির্লিপ্তি ও নিরপেক্ষা বর্ণনার মধ্যেই ফুটে ওঠে। কিংবা তাঁর আরও পরের বিখ্যাত ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ যেখানে তিনি এরকম আশ্চর্য বাক্য লিখতে পারেন; ‘অল্প বাতাসে একটা বড় কলার পাতা একবার বুক দেখায় একবার পিঠ দেখায়’। কখনও কখনও তাঁর লেখার উঠে আসে, প্রায় জীবনানন্দীয় লাইন; ‘বৃষ্টির ফোঁটার মতো শিশিরের শব্দ শুনছে’। সম্ভবত, এখানেই তিনি আলাদা হয়ে যান, কোনও সাহিত্য-আন্দোলন কিংবা তত্ত্বে গা না ভাসিয়েও; আর কে না জানে, সমস্ত সাহিত্য-আন্দোলন এবং তত্ত্ব কোথায়, কতদূর গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে। তিনি যেভাবে জন্ম নিল ছোটগল্পকার হিসেবে, লেখক হিসেবে তাঁর পিছনে তাই মূলত, তাঁর ‘দেখার’ ক্ষমতা এবং সেই থেকে জন্ম নেওয়া ভাষা-শিল্প ফর্ম, পরিবেশ এবং খোদ গল্পকে আলাদা জায়গা দিল। পরের দিকের সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেও বলেছেন, সাহিত্য তত্ত্ব হোক বা দর্শন-তত্ত্ব (যা তাঁর নিজের পাঠ্য-বিষয় ছিল) কোনোটাই শিল্পীর সৃষ্টিতে কাজে লাগে না— সে ‘পোস্ট-মডার্ন’ হোক বা ‘পোস্ট-কলোনিয়াল’!

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২৫)

হাসান আজিজুল হকের কম-বেশি পাঁচ দশকের সাহিত্য জীবনের ওপর আতশকাচের নজর না ফেলেও আরও একটি বিষয় দেখা যাবে, তিনি সাম্প্রতিক বাংলা সাহিত্যের নিরিখে বিরল, বিরলতমদের একজন। প্রথমত, তিনি লিখেছেন, বেশ কম পরিমাণে। এত দীর্ঘ সময়ে প্রধানত ছোটগল্প তাও মাত্র কয়েকটি গল্পগ্রন্থে। অনেক পরে লিখেছেন, উপন্যাস ও আত্মজীবনী-মূলক লেখাগুলি। তা সত্ত্বেও বলতেই হয়, বিপুল সাহিত্য-সৃষ্টি করতে অভ্যস্ত বাঙালি লেখককুলের মধ্যে। বলতেই হচ্ছে, এত অল্প সংখ্যক লেখা লিখেও যিনি সাহিত্য জগতে এত দীর্ঘ প্রভাব ফলতে পারেন, তাঁর কৃতিত্ব কতটা! তবে, এত কম লেখার মধ্যে যে-বিষয়টি আরও বিস্ময়কর তা হল, দীর্ঘদিন তিনি কোনও উপন্যাস লেখেননি। এটা সত্যিই বিস্ময়কর কারণ, যদিও বিদেশে গল্পকার ও উপন্যাসিকদের অনেক সুস্পষ্ট বিভাগ দেখা যায়, বহু লেখক কেবলমাত্র একটিই শাখায় কাজ করে চলেন, আমাদের ভাষায় সে চিন্তাও করা যায় না। সেই ছোটগল্পকার হাসান আজিজুল হক, প্রথমবার উপন্যাস লিখলেন কম-বেশি চার দশক সাহিত্য চর্চা করে ফেলার পর। তিনি নিজেই জানিয়েছেন, উপন্যাস লেখার তেমন কোনও প্রয়োজন অনুভব করেননি পূর্বে। অর্থাৎ আত্মার তাগিদের থেকে কিছুই বড় হয়ে ওঠেনি। ছোটগল্পকার হিসেবে এই ‘বিশুদ্ধতা’ বজায় রাখা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বিরল ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হতেই পারে।

এই প্রসঙ্গে, ‘আগুনপাখি’ উপন্যাসটির উল্লেখ করা আবশ্যক। সম্ভবত, এই উপন্যাসের কারণেই, পশ্চিমবঙ্গে তাঁর খ্যাতি অনেক বেড়েছে আন্দাজ করা যায়, বিশেষত ‘আনন্দ পুরস্কার’ লাভের পর। দেশভাগ-দাঙ্গা ইত্যাদি নিয়ে বাংলা ও ভারতীয় উপমহাদেশের সাহিত্যে উৎকৃষ্ট রচনার সংখ্যা কম নয়। কিন্তু, যে-জায়গায় উপন্যাসটি অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাসের থেকে আলাদা হয়ে যায়, তা হল, এক যৌথ মুসলমান পরিবারের অশিক্ষিত নারী— যিনি তাঁর গৃহের যৎসামান্য পরিসরের বাইরে দেশ-ধর্ম-রাজনীতি সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানেন না— তাঁর জবানিতে বলা কাহিনি। এই উপন্যাস রচনার জন্য, লেখক সচেতনভাবেই ফিরেছেন, তাঁর শৈশব-কিশোরের দিনগুলিতে। শুধু সেই সময়ের রাঢ় বাংলার মুসলমান পরিবারের নিখুঁত চিত্র-রচনাই নয়, কাহিনি বর্ণনায় তিনি বেছে নিয়েছিলেন গ্রামীণ-কথ্য ভাষাই। আরও এক আশ্চর্য বিষয় হল, এই কাহিনিতে কোনও অবস্থাতেই তিনি ওই রমণীর দেখার গণ্ডি যতটুকু, তার বাইরে যাননি— দাঙ্গা, মৃত্যু, হাহাকার, হিংসা—সমস্ত কিছুই যতটুকু দেখা গিয়েছে তাঁর চোখ দিয়ে, ততটুকুই; তাতেই মূর্ত হয়েছে সময়-দেশ-ইতিহাস। একজন লেখকের নিজের ক্রাফটের ওপর কী আশ্চর্য দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস থাকলে, তবেই এমন স্বল্প পরিসর ও সামান্য কয়েকটি চরিত্রের প্রেক্ষিতে, গোটা উপমহাদেশের ইতিহাসের এমন নিদারুণ অধ্যায়কে সার্থকভাবে ধারণ করার কথা চিন্তা করা যায়, ভেবে বিস্মিত হতেই হয়।

আরও পড়ুম: মুর্শিদাবাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি: স্বাধীনতা পূর্ব

বস্তুত, শুধু এই উপন্যাসেই নয়, আরও অনেক ছোটগল্প থেকেই দেখা যাবে, রাঢ় বাংলা ছেড়ে, দীর্ঘদিন আগে চলে গেলেও রাঢ় বাংলা তাঁর ভিতর থেকে যায়নি। জানা যায়, মজা করে নিজেকে ‘ঘটি’ বলতেও দ্বিধা করতেন না। তবে, ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’কে দেখা সাক্ষাৎকারে তিনি যে-অব্যর্থ কথাটি বলেছিলেন, তা হল, তিনি নিজেই যেহেতু ছিন্নমূল; তাই, দেশভাগ ও ছিন্নমূল হওয়ার যন্ত্রণা তিনি বোঝেন অনেক বেশি। এও বলতে দ্বিধা করেননি, বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষের নিজের ভিটে ছেড়ে আসার এই যন্ত্রণা না থাকায়, তাঁরা কখনোই এই মর্মযন্ত্রণা অনুভব করতে পারবেন না। যে যন্ত্রণা অনুভব করেছেন, পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গে আগত লক্ষ-লক্ষ শরণার্থী। তিনি এই সাক্ষাৎকারেই বলেছেন, ইতিহাসে আসলে সত্য বলে কিছুই নেই। যে, যেভাবে দেখে। এবং তাঁর সাহিত্যের মধ্যে দিয়ে ভারতীয় ভূখণ্ডের পূর্ব-প্রান্তের ইতিহাস এবং ইতিহাসের ক্রীড়নকরা সকলেই জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের এক জনপ্রিয় লেখক আনিসুল হক বলেন, বাংলাদেশের সাহিত্যের স্তম্ভ তিনজন হক: সৈয়দ শামসুল হক, মাহমুদুল হক এবং হাসান আজিজুল হক। শেষ জনও চলে গেলেন, বেঁচে থাকবেন তাঁর সাহিত্যে। 

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *