হতভাগ্য স্বামীর বিলাপ

তন্ময় ভট্টাচার্য 

আশ্বিনের রাত। ঘড়ির কাঁটা বারোটা পেরিয়েছে। তারও প্রায় ঘণ্টাদেড়েক পরে, নির্জন এক ফ্ল্যাটের সামনে এসে দাঁড়াল শববাহী গাড়ি। দোতলায় তোলা হবে না দেহ। হাসপাতাল থেকে সরাসরি শ্মশানে না গিয়ে বাড়িতে আনা একটা কারণেই। স্বামী যেন শেষ দেখা দেখতে পান। গেটের কাছে নামানো হল মৃতাকে। সাজানো হল চন্দনে। সাদা কাপড়ে ঢাকা শরীর। কয়েকটা মালা দীর্ঘশ্বাস ফেলছে বুকে। স্বামী নেমে এলেন। বলা ভালো, ধরে-ধরে নামিয়ে আনা হল প্রায়-নব্বই বৃদ্ধকে। ছাপ্পান্ন বছরের দাম্পত্যজীবনের ইতি। তিনি কি বুঝতে পারছেন এই চলে যাওয়া? আর কোনোদিন দেখা হবে না; এতদিনকার আশ্রয়ের পালা ফুরোল— সত্যিই কি বুঝতে পারছেন তিনি? ধীরে ধীরে এসে দাঁড়ালেন স্ত্রী-র সামনে। চুপ করে তাকিয়ে রইলেন খানিকক্ষণ। অস্ফুটে কাউকে বললেন— ‘মায়েরে উপরে লইয়া আইবি না?’ তারপর, জড়ো হল দু’টি হাত। কাঁপতে কাঁপতে ছুঁল কপাল। ছুঁয়েই রইল, যতক্ষণ না আবার তাঁকে পৌঁছে দেওয়া হয় দোতলায়।

এরপর বেশিদিন বাঁচেননি বৃদ্ধ। বছরদেড়েক পরেই মৃত্যু। না, হাসপাতাল আর শ্মশানের মধ্যিখানে ফ্ল্যাট ফিরে আসেনি সেদিন।

আরও পড়ুন: বিবিধ পরব, বহু-মানভূম

মৃত্যুর পরে কি সত্যিই ঈশ্বর হয়ে যান সবাই? এই সমাপ্তিই ফারাক গড়ে দেয় জীবিত ও মৃতের মধ্যে? নইলে কেনই বা স্ত্রী-কে প্রণাম করবেন তিনি! বিদায়ের ভাষা? প্রেমের? নেত্রকোণার? নাকি এতদিন সঙ্গে থাকার জন্য ধন্যবাদজ্ঞাপন?

দেখি আর ভাবি। ব্যক্তি-অভিজ্ঞতার সঙ্গে মেলানোর উপায় নেই। তা বলে এই অনুভূতি কি আমার অচেনা? মৃত্যু ছাড়া অন্য-অন্য যে সমাপ্তি, ধরা দেয়নি তাও? শূন্যতার নিম্নস্তরেও কি অভিষেক ঘটেনি এতদিনে?

সেই হারানোর ভাষা কেমন? কতখানি নিঃস্বতা চেপে ধরলে কবিতায় হাহাকার লিখে ফেলে মানুষ? কিংবা স্তব্ধতা? সম্পর্ককেন্দ্রিক বইয়ের অভাব বাংলায় নেই। বাবা, মায়ের মৃত্যুজনিত শূন্যতাকে নিয়ে লেখা কবিতার বইও দুর্লভ নয়। সম্পর্কচ্ছেদের ব্যথাও লুকিয়ে রেখেছে কত-না কবিতা। কিন্তু স্ত্রী-বিয়োগ? তা নিয়ে সম্পূর্ণ এক বই? আমার সীমিত পাঠ-অভিজ্ঞতায় চট করে মনে পড়ে না। বিক্ষিপ্ত কিছু কবিতা থাকলেও, গোটা বই— নাহ্‌। মনে পড়ে না কিছুতেই।

এই মনে না-পড়ার দিনকালেই নাগালে পৌঁছেছিল একটি বই। ১৪০ বছর আগের। দুর্লভ, নিঃসন্দেহে। বর্তমান প্রজন্মের কেউ খোঁজ রেখেছেন কিনা সন্দেহ। পাকেচক্রে সে-বই পাওয়ার পর, প্রথম পাতা দেখে চমকে উঠেছিলাম। কী লেখা ছিল তাতে?

কবিতার বই, না বিলাপের? এমন বিষয় যে বইয়ের, তার নামটিও অবাক-করা। ‘ব্রত উদ্‌যাপন’। প্রথম পাতায় কবির নাম নেই কোনও। সচেতনভাবে নিজেকে লুকিয়ে রেখেছেন নিজেকে। স্ত্রী-র প্রয়াণে হাহাকার ছাড়া আর কিছুকেই প্রাধান্য দিতে চাননি কবি। ফলে, কবির নামের জায়গায় লেখা— ‘শ্রীযুক্ত বাবু সত্যচরণ গুপ্ত দ্বারা সংশোধিত ও প্রকাশিত’। সে না হয় হল। কিন্তু কবি কে? ভূমিকার শেষে গিয়ে উল্লেখ পাই তাঁর। বরং ইঙ্গিত বলা চলে। ‘শ্রীহঃ—’। নামের আদ্যাক্ষর ‘হ’। এর বাইরে নিজের পরিচয় দিতেও যেন কুণ্ঠিত তিনি। আমরা, আলোচনার সময়, হ-কে ‘হরিপ্রসন্ন’ করে নিই?

কিন্তু কেন নিজের নাম গোপন রাখলেন হরিপ্রসন্ন? হয়তো নিজের এই ভগ্নদশা প্রকাশ্যে আনতে চাননি। পুরুষ হয়ে স্ত্রী-র মৃত্যুতে আস্ত বই লিখে ফেলা— ‘লোকে কী বলবে’, ব্যঙ্গের শিকার হতে হবে কিনা— ইত্যাদি দ্বন্দ্বে কি ভুগছিলেন তিনি? বইটির প্রকাশকাল ১২৮৭ বঙ্গাব্দ। অর্থাৎ, ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দ। সে-সময়কার সমাজকে ভুললে চলবে না। পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোয়, নিঃসংকোচে নিজেকে প্রকাশ করা কি অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছিল তাঁর পক্ষে?

হতে পারে, ভুল পথে ভাবছি। স্ত্রী-র মৃত্যুতে এক ‘হতভাগ্য’ স্বামীর বিলাপ— এই-ই এক ও একমাত্র উপজীব্য হয়ে থাক, তাই হয়তো চেয়েছিলেন তিনি। ব্যক্তি এখানে গৌণ। চেয়েছিলেন, ভাবীকালের কাছে ব্যক্তিনাম নয়, পৌঁছে যাক শুধু বিয়োগব্যথাটুকু। হরিপ্রসন্নবাবু, ১৪০ বছর পরে এক তরুণ আপনার লেখা পড়বে, বোঝার চেষ্টা করবে আপনার শূন্যতা— ভেবেছিলেন কখনও?

ভূমিকায় তো মহাকালের হাতেই সব সমর্পণ করেছিলেন তিনি! কেউ পড়ুক বা না-পড়ুক, সময়ের দলিলে লিখিত হয়ে থাকবে এই ব্যথামালা— তাতে তাঁর সন্দেহ ছিল না কোনও। ভূমিকা, না চিঠি? সম্বোধন করছেন ‘হিংস্র কাল’-কে। লিখছেন, ‘জগতে যাহাই সুন্দর তাহাতেই তোমার অধিক লোভ।’ অভিমানী এক স্বামীর নিষ্ফল বাক্য। সমাধান নেই। অভিযোগ জানানো আছে শুধু।

‘এই পৃথিবীতে আমারও একটি পরম সুন্দর কুসুম-মুকুল ফুটিতেছিল। আশা করিতেছিলাম কুসুমটী চিরদিনই প্রস্ফুটিত থাকিবে। হঠাৎ তোমার তাহাতে দৃষ্টি পড়িল। ফুলটী ফুটিয়াই শুখাইয়া গেল! সেই শুষ্ক কুসুমের আর কি থাকিবে? তাহার রূপ গৌরব চিরস্থায়ী হইল না! তাহার গুণও কাহাকেও দেখাইতে পাইলাম না! তবে কাল আমার অনুরোধ, কুসুমটী তোমার করে দিতে দিতে এই যে অশ্রু বিসর্জ্জন করিতেছি, অন্ততঃ কিছুকাল ইহা যাঁহারা আমার দুঃখে চিরকাল দুঃখী তাঁহাদের স্মরণপথে রাখিও।’ শ্রীহঃ—

কেন আত্মহত্যা করেছিলেন মহালক্ষ্মী? তা আমরা জানি না। শুধু দেখতে পাই, কালের হাতে স্ত্রী-র মৃতদেহ তুলে দিচ্ছেন হতভাগ্য স্বামী। মহালক্ষ্মী কি কিশোরী ছিলেন মৃত্যুকালে? ‘কুসুম’ ফোটার অনুষঙ্গ পড়ে তাই-ই মনে হয়। হরিপ্রসন্ন কাঁদছেন। ভূমিকা লিখতে লিখতে তাঁর চোখের জল ফোঁটা ফোঁটা জমছে পাতায়। ১৪০ বছর পরেও স্পষ্ট সেই দাগ। শ্রীহঃ— পুরুষমানুষ— কাঁদছেন।

আরও পড়ুন: ঈশ্বরের মেয়ে

কবিতায় পরে আসব। অবশ্য কবিতার বই হলেও, একটি দীর্ঘ কবিতা বলাই ভালো। বা দীর্ঘ হাহাকার। হরিপ্রসন্নের সে-অধ্যায়ে প্রবেশের আগে, উঁকি দিই আরেকটি বইয়ে। ইতিমধ্যে, হরিপ্রসন্নের সময়কে অনেক পিছনে ফেলে এসেছে বাংলা সাহিত্য। ১৪০ বছর— নেহাত কম সময় নয়। অজস্র বাঁকবদলের মধ্যে দিয়ে নতুন-নতুন ভাষা তৈরি করেছে কবিতা। কিন্তু বিষয়, অনুভূতি? স্ত্রী-বিয়োগের ব্যথা? তাও কি বদলে যায়?

১৪২৭ বঙ্গাব্দ। ইংরেজি ২০২১। প্রকাশিত হল ‘বছরে বারোটি মাহ’। কৌশিক বাজারীর কবিতা। মাসের বদলে ‘মাহ’ দেখে মনে পড়ে বিদ্যাপতির ‘এ ভরা বাদর, মাহ ভাদর’। পরের তিনটি শব্দ, ‘শূন্য মন্দির মোর’— দু-ফর্মা বইয়ের পাতায়-পাতায় লুকিয়ে রাখবেন বলেই কি কৌশিকদা ‘মাহ’ ব্যবহার করলেন?

হরিপ্রসন্ন যেমন স্পষ্ট লিখেছিলেন— স্ত্রী-বিয়োগে হতভাগ্য স্বামীর বিলাপ— কৌশিকদা তেমনটি লেখেননি। ফলে, কবিতা পড়ে কবির ব্যক্তিজীবনে উঁকি দেওয়াও অনৈতিক। তবু তাঁর স্ত্রী-বিয়োগের সংবাদ যখন প্রকাশ্যেই রয়েছে এবং কবিতাগুলিতেও ফুটে ওঠে সে-ইঙ্গিতই, অনুমান করতে অসুবিধা হয় না কোনও। কৌশিক বাজারী কি হরিপ্রসন্নের বইটি পড়েছেন? মনে হয় না। অথচ কোথাও গিয়ে ১৪০ বছরের ব্যবধানে মিলে গেলেন দু’জন। মিলিয়ে দিল দু’টি ঘটনা— স্ত্রী-বিয়োগ ও বাংলা কবিতা লেখা।

না, হরিপ্রসন্নের মতো আলাদা কোনও ভূমিকা লেখেননি কৌশিকদা। তবে বিভাব কবিতাটি তুলে ধরলে, মনে হয়, দু’জনেরই ব্যথাই এক—

‘বছরে বারোটি মাহ ফিরে ফিরে আসে
আবার এসেছ তুমি নিঠুর এপ্রিল!
দগ্ধ হাওয়া বয় পথে, ধূসর আকাশে
বন্ধ করি দরোজায় খিল
নিয়তিরা তিন বোন, উল বোনে, হাসে
মধ্যরাত, ১৭ এপ্রিল

আমার খাতার পৃষ্ঠা ছিঁড়ে ফেলি ত্রাসে’

১৭ এপ্রিল— বউদির চলে যাওয়ার দিন? হরিপ্রসন্নের ‘হিংস্র কাল’ই কি ‘নিঠুর এপ্রিল’ হয়ে উঠল কৌশিকদার কবিতায়? হরিপ্রসন্নের অশ্রুবিসর্জন আর কৌশিকদার স্মৃতিআক্রান্ত হওয়া, ত্রাসে খাতার পৃষ্ঠা ছিঁড়ে ফেলা— কোথাও কি মিলে যায় সমস্তটাই?

স্ত্রী যদি প্রেমিকা না হয়ে উঠতেন, শূন্যতা এভাবে অনুভূত হত না। হরিপ্রসন্ন ও কৌশিক— দু’জনেই প্রেমিক। ফারাক এক জায়গাতেই। হরিপ্রসন্নের লেখায় সন্তানের প্রসঙ্গ আসেনি কখনও। হয়তো স্ত্রী-বিয়োগের সময় নিঃসন্তান ছিলেন তাঁরা। হরিপ্রসন্ন কি যুবকবেলাতেই হারিয়েছেন স্ত্রী-কে? আবেগ ও ঘটনাক্রমের ইঙ্গিত সেদিকেই। কৌশিকদা চল্লিশ ছুঁই-ছুঁই বয়সে বিপত্নীক। আবেগ নিয়ন্ত্রিত। দৈনন্দিনতার মধ্যে বিদ্যুতের মতো চমকে-চমকে ওঠেন স্ত্রী। কৌশিকদার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ বুবু— তাঁর ছেলে। বাপ-ব্যাটা আর লুকিয়ে-থাকা মায়ের সংসার ‘বছরে বারোটি মাহ’-তে। হরিপ্রসন্ন সেখানে যেন কিশোরী স্ত্রী-র প্রয়াণে ভেঙে পড়ছেন, নিজেকে সামলাতে পারছেন না কিছুতেই।

হরিপ্রসন্ন লেখেন—

‘এমন সুখের জীবন আমার
কোন্‌ মহাপাপে করি ছারখার
সুধার ভাণ্ডার গরলে ডুবালে?
কেন কেন প্রিয়ে ছাড়িয়া গেলে?’

সেখানে, কৌশিকদার প্রতিক্রিয়া স্থির, শান্ত, নিঃস্তব্ধ সংসারীর মতো—

‘কী কী পদ রাঁধা হল দেখে নিয়ে আমরা আবার
বসে পড়ছি খাবার আসরে
গোলাকার টেবিলের চারপাশে দুলে উঠছে লেসের চাদর

তোমার শূন্য চেয়ার নিঃশব্দে অল্প হেসে ওঠে…’

চেয়ারের এই হেসে ওঠা, থাকা-না থাকার এই বিভ্রমজার্নি কৌশিক বাজারীর লেখা জুড়ে। স্ত্রী তাঁর সঙ্গে না থেকেও আছেন। কবিতা শুনে ঈর্ষান্বিত হন, অন্য নারীর ইঙ্গিত পেলে অভিমান করেন। এ এক আশ্চর্য দাম্পত্য। যার ফুরান নেই কোনোদিন।

আরও পড়ুন: বিদ্যাসাগরের শকুন্তলা, এক অনুপম সাহিত্যরস

বুবু কি এখন বাবার কবিতা পড়ে? না পড়লেও, বড় হয়ে পড়বে নিশ্চিত। দেখবে, বাবা কীভাবে পাতার পর পাতায় এঁকে রাখছেন মা-কে। বাবার লেখা পড়ে মা-কে চিনবে সে। শিখবে, কীভাবে ভালোবাসতে হয়। বাবাকে আরেকটুখানি আঁকড়েও কি ধরবে না? মা হয়ে উঠবে না বাবার?

কিংবা, হয়তো এখনই, বাবার কবিতা পড়ে টের পাচ্ছে— চারপাশের সবকিছুই মাতৃমুখী। এই ঘর, দেওয়াল, খেলনা কিংবা জানলার বাইরের গাছ— মা তাকে ঘিরে রয়েছে সর্বত্রই। এমন ঘের কি টের পাননি বাবাও? নইলে লিখবেনই বা কেন— ‘উড়ন্ত পাতার হাওয়া বুবুর কপাল ছুঁয়ে চুমু খেয়ে যায়/ আমাকে ছোঁয় না অভিমানে…’। বুবুকে মায়ের চুম্বন দেখছেন বাবা। ভরে উঠছে মন। কিন্তু সে-ভরে ওঠার মধ্যে দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে। অভিমান। হ্যাঁ, তোমার সঙ্গে তো আমার আজীবন অভিমানেরই সম্পর্ক। চলে না হয় গেছই, তা বলে অভিমান কি কম পড়তে পারে!

এই অভিমান, খুনসুটি ও দাম্পত্যস্মৃতিই বাঁচিয়ে রাখে তাঁদের। তাঁদের, অর্থাৎ হরিপ্রসন্ন ও কৌশিকদাকে। আর সেই স্মৃতিমাখা ঘর যখন শূন্য হয়ে যায়? হরিপ্রসন্নের কোনও বুবু নেই। থাকার মধ্যে এক বিস্মিত জিজ্ঞাসা— কেন বিষ খেতে গেলেন মহালক্ষ্মী? কোনও কথা মুখ ফুটে বলতে পারেননি? কোনও অভিমানে বেছে নিতে হল মৃত্যুর পথ? নাকি হরিপ্রসন্ন নিজেই দায়ী, ধরতে পারছেন না বলেই শূন্যতা চেপে বসছে আরও?

‘যে গৃহ কখন ছিল স্বর্গ-মত,
প্রবেশিলে প্রাণ আনন্দে পূরিত,
যার প্রতি কক্ষে— প্রতি পাদ স্থলে
ছিল মোর তরে পূর্ণ কুতূহলে
আজি সেই গৃহে পারি না পশিতে
কোন দিকে আর পারি না চাহিতে।’

স্ত্রী-হীন, শ্রীহীন যে ঘর হরিপ্রসন্নের কাছে দমবন্ধ ঠেকছে, সেই ঘর থেকেই কৌশিকদার অপেক্ষার পালা শুরু। বেশ টের পেয়েছেন তিনি, স্মৃতি থেকে পালানোর মতো বোকামি আর হয় না। বরং সর্বস্ব দিয়ে, সবকিছু জড়িয়ে তা অনুভব করাই হয়ে উঠতে পারে শান্তির—

‘বহুদিন পর আজ আবার এক নৈঃশব্দ্য এসেছে ঝরোখাতে
সারাদিন পার হয়ে গেল, তুমি তো এলে না?
দাম্পত্যের গল্প আর হবে না কখনও?’

নিজেও জানেন, হবে। হয়ে চলেছে প্রতিনিয়তই। তবু এই যে জিজ্ঞাসা, ক্ষণিকের অভিমান— এটুকু তো জায়েজ! কেন চলে গেল সে? গেলই যখন, ফিরে এলো কেন? ‘যাওয়া তো নয় যাওয়া’— এই দ্বন্দ্বময় দৈনন্দিনতার থেকে বড় প্রাপ্তি কিছু নেই। দ্বন্দ্ব ক্ষতবিক্ষত করে, বিধ্বস্তও; কিন্তু পাশাপাশি যে চিন্তার জোগান দেয়, সেই চিন্তাই স্মৃতি ঘেঁটে জীবন্ত করে তোলে অপরজনকে। দোষারোপ আর অভিমানের পালাই বেশি। কিন্তু সেই দোষারোপের আড়ালেও লুকিয়ে থাকে প্রাণ। তুমি আছ বলেই দোষারোপ। যদি না থাকতে— না-ই থাকতে যদি, প্রয়োজন পড়ত না দোষ দেওয়ার। অভিমানের। দিব্যি একটা পাথরজীবন কাটিয়ে দেওয়া যেত। তা হয়ে উঠছে না বলেই দোষ দেব তোমায়। আছ অথচ নেই— এই টানাপোড়েন আর কদ্দিন?

আরও পড়ুন: ভোজপুরি বিতর্ক: হিন্দি জাতীয়তাবাদ এবং আরও কিছু প্রাসঙ্গিক আলোচনা

কেউ বলবেন, সারাজীবন। কেউ আবার— নাহ, এই যন্ত্রণা দিনের পর দিন ভোগ করা সম্ভব নয়। আমি প্রথম দলের। অনুপস্থিতির মধ্যেও— তিলে তিলে, প্রতিমুহূর্তে আবিষ্কারের, নতুন-নতুন ব্যথায় মুচড়ে ওঠার যে জীবন— তাকে হারাতে চায় কোন হতভাগা! প্রেম যদি হয়, এমনই হোক। যদি কৌশিক বাজারী হন, এমনই—

‘তুমি কি মাঝপথ থেকে ফিরে এসে ঘরে বসে আছ? খুব কি জরুরি কিছু ফেলে গিয়েছিলে? আমি দ্রুত ফিরে আসি। দূর থেকে দেখি, বসে আছ বন্ধ দরজায় একাকিনী। তোমারও তো ঘর নেই, ভাঙা ডেরা, ফিরে আসছি, দুই হাত ভীষণ আজ খালি…’

যদি সত্যিই হাত খালিই থেকে যায়? হৃদয় দিয়ে জড়িয়ে নিতে হয় তখন। যেমনটি চেয়েছিলেন হরিপ্রসন্ন—

‘প্রিয়া মম প্রাণ ত্যজিল কি দুখে
একবার ফের জিজ্ঞাসিব তাকে—

একবার তারে হৃদয়ে ধরিয়া
কাঁদিব প্রাণের আশা মিটাইয়া;
…………
হায় প্রিয়ে! যদি তিলেকের তরে
এখন আসিয়া দেখা দিতে মোরে,

দেখাতাম তবে বক্ষ বিদারিয়া
কত মনোক্ষোভে মরিরে পুড়িয়া!’

১৮৮০। হরিপ্রসন্ন উত্তর খুঁজছেন কাব্যে। বারবার ডাক পাঠাচ্ছেন— এসো, বলে যাও অন্তত, কেন চলে গেলে! হ্যাঁ, জিজ্ঞাসার জন্য কবিতারই আশ্রয় নিয়েছিলেন তিনি। বিশ্বাস ছিল, কবিতা এমনই শক্তিময়ী— নিজের মতো এগোতে-এগোতে পথ দেখিয়ে দেবে ঠিক। আর, যদি নাও দেখায়, থেকে গেল এ-বই। একসঙ্গে থাকার দিনগুলোয় কী দিতে পেরেছি, আদৌ পেরেছি কিনা, জানি না। কিন্তু যখন তুমি নেই, এ-বইয়ের মধ্যেই রেখে যাব আমার যা-কিছু বক্তব্য। হয়তো মুখ ফুটে বলতে পারিনি আগে। ভেবেছিলাম, সঙ্গেই তো রয়েছ! আলাদা করে বলার দরকার কী! না-থাকার দিনগুলোয় ঘিরে ধরছে আপশোস! যদি বলতে পারতাম! যদি শুনত, হয়তো এমন পরিণতি হত না। হয়তো— হয়তো— হয়তো—। তা যখন হলই না, এ-বই থাকুক। মহালক্ষ্মী, আমি এখানে গৌণ। নিজের নাম দিইনি কোত্থাও। ‘হে সমুদ্রমৎস্য, তুমি, তুমি—’; তুমিই এক ও একমাত্র। ভবিষ্যৎ তোমাকেই চিনবে। জিজ্ঞেস করবে, কেন বেচারাকে ছেড়ে গেলেন এভাবে? খুব দরকার ছিল কি?

জানি না, হরিপ্রসন্নও সেই উত্তর পেয়েছিলেন কিনা শেষপর্যন্ত। কিন্তু যে কবিতার শরণ তিনি নিয়েছিলেন, তা তাঁকে পথ দেখিয়েছিল। লিখতে লিখতে পৌঁছেছিলেন সেই অপার সান্ত্বনার জগতে, যেখানে হাহাকার নেই আপশোস নেই মৃত্যুশোক অপরাধবোধ কিচ্ছুটি নেই থাকার মধ্যে শুধু প্রেম— উদ্‌যাপনই যার ধর্ম। বইয়ের নামও তো ‘ব্রত উদ্‌যাপন’। মহালক্ষ্মী, তোমার প্রতি এই বিরহ— এ কি শোকাচ্ছন্ন হওয়ার? আমরা দু’জনে মিলে, অন্তত এ-বইয়ের মধ্যে, জিতে কি যাইনি, বলো?
“এতদিন ধরে করিয়া যতন
করিলাম ‘মহা’ মন্ত্রের সাধন
আজি কাল-করে করি সমর্পণ
করিলাম প্রেমব্রত-উদ্‌যাপন।”

এই চারটি লাইন দিয়েই দীর্ঘকাব্য শেষ করছেন হরিপ্রসন্ন। এরপর আর কিছু বলার নেই। কালের হাতে তুলে দিয়েছেন সব। ১৪০ বছর পেরিয়ে, সেই কাব্য আমার সামনে। হরিপ্রসন্নর পাশে বসছি। অবাক হয়ে দেখছি তাঁর বদলে-বদলে যাওয়া মুখ। যন্ত্রণায় কুঁকড়ে থেকে শুরু হয়েছিল যে যাত্রা, ধীরে ধীরে ভরে গেল জ্যোতিতে। দাবিদাওয়াহীন অনন্ত শান্তির জগৎ। হরিপ্রসন্ন ডুব দিলেন। ভেসে না উঠলেও চলে আর…

আরও পড়ুন: পাঁচটি কবিতা

কৌশিকদাও কি অমন ডুবেরই প্রতীক্ষায়? না, স্বধর্মচ্যুত হননি তিনি। হরিপ্রসন্ন যেখানে উদ্‌যাপন-শেষে মহাকালকে দায়িত্ব দিয়েছেন রক্ষার, কৌশিকদা তখনও অপেক্ষায়। হরিপ্রসন্নর কবিতার মূল শক্তি হাহাকার। কৌশিকদার ক্ষেত্রে, দীর্ঘশ্বাস। ডুব দিয়েছেন তিনিও, তবে সে-ডুবের শেষে নতুন কিছু হবে— এই আশা ছাড়ছেন না কিছুতেই।

‘ডাকো, ডাকো তাঁকে, অনেক মুহূর্ত পল ক্ষয় হয়ে গেছে… বলো—
ফিরে এসো একদিন, দেখা হবে অচিনের ছায়াঘেরা ঘাটে, জলখেলা হবে…।’

জলখেলার স্বপ্ন মিশে তাঁর ডুবে। ‘ফিরে এসো একদিন’। এই ডাক, এই বিশ্বাসই একদিন ফিরিয়ে আনবে স্ত্রী-কে, এও আমরা জানি। সত্যি-মিথ্যের তর্ক এখানে অচল; কবিতার শক্তিকে বিচার করতে বসব, তত স্পর্ধা কই! কৌশিকদার বিরহে বিলাপ নেই। বড়জোর অজান্তে নেমে আসা দু’টো জলের ধারা মুছে নেওয়া। তারপর হাসিমুখ, অপেক্ষার শুরু…

আর, যদি হরিপ্রসন্ন ও কৌশিক বাজারীর সম্পূর্ণ বিপরীত দিক থেকে দেখি? মৃত স্বামীর প্রতি স্ত্রী-র বিরহ? এ-লেখার বিষয় তা নয়। তবু, ভীষণভাবে মনে পড়ছে একজনের কথা। কিছুতেই কিছু নয়— না লিখলে গর্দানও নেবেন না কেউ, কিন্তু সেই স্নেহব্যথার কাছে ছুটে যেতে চাইছি বারবার। তাঁরা, স্বামী-স্ত্রী, দু’জনেই কবি। নব্বই পেরিয়ে মারা গেলেন স্বামী। স্ত্রী তখন সত্তরের ঘরে। এ-বয়সের শোকে বিলাপ আসে না। শান্ত ও শীতল শূন্যতা শুধু ছড়িয়ে পড়ে যাপনে। স্তব্ধতার ভার বেড়ে যায়। হরিপ্রসন্ন বা কৌশিকদা এই সমাধিদশায় পৌঁছননি, হয়তো বয়সের কারণেই। স্বামীহারা এই বৃদ্ধা পৌঁছেছেন। আর লিখেছেন—

‘শোকের আগুনে
অশ্রুজলে সেদ্ধ হতে হতে
একমুঠো চাল আমার জীবন
আজ হাঁড়িভরতি ভাত
উথলে পড়ছে, উপচে উঠছে।

এই অন্ন কেউ খাবে?
এই অন্ন কাকে দেব?
এসো, বোসো,
তোমাকেই আস্তেব্যস্তে বেড়ে দিই—
তুমি খাও, খেয়ে তৃপ্ত হও।’

সন্তানবৎ স্বামীর মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে খাইয়ে দিচ্ছেন বৃদ্ধা। আমরা দেখছি। আর বিশ্বাস করে ফেলছি— না, ওঁরা আলাদা হননি। ওঁদের আলাদা করতে পারে, এমন সাধ্য পৃথিবীতে কারোর নেই। আর সব ভেঙে যায়— প্রেম, বিবাহ, এমনকী মানুষও। কিন্তু সন্তানস্নেহ? এ-অনুভূতি ভাঙে বুঝি? ভেঙেছে কোনোদিন?

দেবারতি মিত্র ও মণীন্দ্র গুপ্ত। ওঁরা সুখে থাকুন। আমরা বরং অবাক হতে শিখি…

ছবি ইন্টারনেট

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *