গুয়াহাটিতে দুর্গাপুজোর সেকাল-একাল

সঞ্জয় গুপ্ত

দুর্গাপুজো বললেই কেমন যেন একটা বাঙালি বাঙালি গন্ধ নাকে ভেসে আসে। চারপাশের হট্টগোল, পুজোসংখ্যার বিজ্ঞাপন আর বাজারের দৃশ্য দেখলে মনে হবে পুজো বোধহয় বাংলাতেই আটকে আছে। অথচ বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে, সেই পুরাণে খ্যাত হরি হরের যুদ্ধকাল থেকেই কামরূপ রাজ্যে দুর্গাপুজোর প্রচলন ছিল। কামাখ্যা মন্দির, প্রাচীন কামরূপে দুর্গাপূজা হওয়ার সাক্ষ্য দেয়। কোথায় যেন পড়লাম কামাখ্যা মন্দিরে ১৫৬৫ সাল থেকেই দুর্গাপুজো হয়ে আসছে। তবে তারও আগে ১০৪৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে উজনবাজারের উগ্রতারা মন্দিরে নাকি দুর্গাপুজো হত। সেসময় অবশ্য কামরূপ ছিল নাকি পাল রাজাদের অধীনে। গুয়াহাটি তখন প্রাগজ্যোতিষপুর নামেই পরিচিত ছিল।

আরও পড়ুন: ত্রিপুরার দুর্গাপুজো

ব্রোঞ্জের তৈরি গোলাকৃত একটি মূর্তি পাওয়া গিয়েছিল, কাহিলিপাড়া এলাকায়, মাটি খননকার্য চালাবার সময়। সেই মূর্তি (plaque)-টি ছিল ত্রিনয়নী দুর্গার সঙ্গে ছিন্ন মহিষের মূর্তি সহ। মোটামুটি এটা তৈরি হয়েছিল নয় বা দশম শতাব্দীতে। লেখক কুমুদস্বর হাজারিকার মতে, সে হিসেব হিসেবে নিলে দুর্গাপুজার চল অসমে অনেক পুরনো।

আরও পড়ুন: অসমের নীলাচল পর্বতের দুর্গাপুজো

তবে ব্যক্তিগত পরিবারকেন্দ্রিক দুর্গাপুজো, যতদূর জানা যায় শুরু করেছিলেন, উজনবাজার রাজবাড়িতে, ১৮৮৯ সালে আহোম রাজকুমার ঘনকান্ত সিংহ। প্রয়াত ঐতিহাসিক সদানন্দ চালিহার মতে, অবশ্য এই পুজো শুরু হয়েছিল ১৮২১ সালে, ঘনকান্ত সিংহের বাবা স্বর্গদেও চন্দ্রকান্ত সিংহ দ্বারা। আপার অসমে গণ্ডগোল চলার ফলে তিনি নাকি তখন গুয়াহাটিতে ছিলেন। কিন্তু ১৮২১ বা ১৮৮৯ সাল হোক, এই বিষয়ে সন্দেহ নেই, গুয়াহাটিতে পারিবারিক সবচেয়ে প্রাচীন দুর্গাপুজো শুরু হয় উজানবাজার রাজবাড়িতে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজপরিবারের পক্ষে খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়ল। সাধারণ মানুষের সাহায্যে পুজো চলল, এবং এভাবেই এই পুজো চলে এল রাজবাড়ি ছেড়ে, ১৯৩০ সালে উজনবাজার বারোয়ারি মণ্ডপে। এখনও সেখানেই চলছে পুজো।

আরও একটি রাজপরিবারের পুজো শুরু করেছিলেন, লুকি বলে, অসম রাজ্যের, বোকো জায়গায়, একটি সামন্ত রাজ্যের রানির পরিবারের লোকজন। পুজো শুরু হয়, পানবাজারের রানিবাড়ি বলে জায়গাটিতে থাকা তাঁদের বাড়িতে। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে শুরু হওয়া এই পুজো, এখন রানিবাড়ি এলাকার লোকজনরাই চালিয়ে যাচ্ছেন। রানিবাড়ি জায়গাটির নাম অবশ্য, লুকি রাজ্যের রানির বাসস্থান ওখানে থাকার জন্যই পড়েছিল।

শতাব্দী প্রাচীন আরও বেশ কিছু পুজো হয় এই শহরে। তবে এদের মধ্যে সবচেয়ে পুরনো পুজো কোনটি, তা বলা বেশ কঠিন। এই পারিবারিক পুজোগুলির মধ্যে, উজনবাজারে হওয়া লক্ষ্মীপ্রসাদ বরুয়ার বাড়ির পুজো অন্যতম ছিল। প্রথম এই পরিবারের পুজো হত টীয়ক, আহোম রাজাদের আমল থেকে। তারপর পরিবার প্রথমে, বার্মিজদের আক্রমণের সময় প্রথম এলেন নলবাড়িতে, সেখান থেকে গুয়াহাটি। লক্ষ্মীপ্রসাদ ছিলেন, বিখ্যাত অভিনেতা নটপ্রভাকর সত্যপ্রসাদ বরুয়ার পিতামহ। চুনিলাল দে, কটন কলেজের প্রথম চারজন শিক্ষকের মধ্যে একজন, ১৯০১ সালে, পানবাজার নাগকাটা পুকুরের পাশে তাঁর বাড়িতে দুর্গাপুজো শুরু করেন।

উলুবাড়িতে দেব কুটিরে দুর্গাপুজোর ইতিহাসও একশো বছর পুরনো। দেব কুটিরের পুজো নাকি শুরু করেছিলেন সুরেশ চন্দ্র দেব। মনিপুরি বস্তিতে, ভদ্র পরিবারের পুজো শুরু হয়েছিল একশো বছর আগে। সেই পুজো আবার নাকি বিখ্যাত ছিল বিজুলী মিল দুর্গাপুজো নামে।

রায় বাহাদুর কালিচরণ সেনের বাবা শ্রীমন্ত সেনের আদি বাড়ি ছিল পালাঙ গ্রামে, অধুনা বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলায়। সেখানে শুরু করা দুর্গাপুজো, ১৯০৭ সালে, স্থানবদল করে শুরু হল পানবাজারের ডেনিশ রোডে, সেনবাড়িতে।

পানবাজারের হরিসভার পুজোও শুরু হয়েছিল ১৯১৫ সনে। খুব সাত্ত্বিক উপায়ে অনুষ্ঠিত এই পুজোও দেখতে দেখতে ১০৫ বছর পেরিয়ে এল।

উজনবাজারের আরও একটি বিখ্যাত পারিবারিক পুজো শুরু করেছিলেন বড়দাকান্ত বিষয়া (bishaya)। আজকের অসমিয়া চলচিত্রের বিখ্যাত অভিনেত্রী বরশারানী বিষয়া সেই পরিবারেরই একজন। ১৯২৬ সালে প্রথম ঘটপুজোর মাধ্যমে এই পুজো শুরু করেন বড়দাকান্ত। তাঁর ছেলে ক্ষিরোদাকান্ত বিষয়া প্রতিমা পুজো শুরু করেন। প্রতিমার গায়ে সত্যিকারের সোনার অলংকার পড়ানো হয়। সেই যে প্রথম সোনার অলংকার পরানো হয়েছিল, আজও সেই অলংকারই পরানো হয়। একচালার মূর্তি তৈরি হয় বাড়িতেই এবং তিন পুরুষ ধরে একই প্রতিমা তৈরির পরিবার বানাচ্ছেন। এমনকী কুমারটুলির যে দোকান থেকে প্রথমবার দেবীর পোশাক কেনা হয়েছিল, সেখান থেকেই আজও কেনা হয়। শুধু একটি বদল হয়েছে এই কয়েক বছরে। একসময় বিসর্জনের সময় খুব আতশবাজি জ্বালানো হত। বরপেটা থেকে লোক আসত বাজি বানাতে। সেটা বন্ধ হয়ে গেছে বেশ কিছু বছর হল।

Durga, Lakshmi and Saraswati

বদলাবেই সব কিছু। দুর্গাপুজোর বহুল প্রচার শুরু হয়েছিল ব্যক্তিগত বাড়ির পুজো হিসেবে, তারপর এলো বারোয়ারি পুজো… পাড়ার পুজো। এখন দিনে দিনে গুয়াহাটিতে চল বাড়ছে ফ্ল্যাট বাড়ির পুজোর। সংখ্যা বাড়ছে, জাঁকজমক বাড়ছে, খরচ বাড়ছে। মনে হয় এর কিছু সুফল অর্থনীতির উপরও পড়ছে। সেই সুফলের কিছুটা হয়তো ছুঁয়ে যায়, সমাজের সেই দরিদ্র-নিপীড়িত অংশটুকুকেও।

 

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *