উলা বীরনগরের প্রাচীন বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোর ইতিহাস

সম্পা গাঙ্গুলি

উলা বা বীরনগর নদিয়া জেলার অন্তর্গত এবং রানাঘাট মহকুমার একটি সুপ্রসিদ্ধ গ্রাম ছিল। বর্তমানে এই বীরনগর পুরসভার অধীন। ১৮৬৯ সালের ১ এপ্রিল উলা বীরনগর পুরসভার অধীনস্থ হয়। উলু বনাকীর্ণ বিস্তীর্ণ চরের আবাদ থেকেই এই স্থানের নাম হয়েছে ‘উলা’। কেউ কেউ মনে করেন ফারসি শব্দ ‘আউল’ বা ‘জ্ঞানী’ থেকেই এই স্থানের নামকরণ হয়েছে উলা। আবার আরব্য ভাষায় ‘উলা’ শব্দ থেকেও এরকম নাম হওয়া বিচিত্র নয়। কারণ আরব্য ভাষায় ‘উলা’ অর্থ শ্রেষ্ঠ বা প্রথম। পাঠান আমলে উলা একটি বিশিষ্ট নগর ছিল বলেই জানা যায়। আবুল ফজল কৃত ‘আইন-ই-আকবরি’ গ্রন্থে ও উলা বীরনগরের উজ্জ্বল উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। ব্রিটিশ আমলে উলার জনগণের বীরত্ব দেখে ইংরেজরা এই উলার নাম পরিবর্তন করে নাম দেয় ‘বীর নগর’ অর্থাৎ ‘বীরদের নগর’।

আরও পড়ুন: দুর্গা-দর্শন: বাংলাদেশ দিনাজপুর রাজবাড়ির ইতিবৃত্ত

মুস্তফিদের দুর্গাপুজোর হোম ঘর

এই উলাবীরনগর ছিল জমিদার অধ্যুষিত অঞ্চল। এখানকার বেশিরভাগ মানুষই হিন্দু ছিল বলে জানা যায়। ব্রাহ্মণের সংখ্যা নেহাত কম ছিল না। তাই এই অঞ্চলে যেমন বারো মাসে তেরো পার্বণ লেগেই থাকত, তেমনই বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গোৎসবের প্রচলনও ছিল এই উলা বীরনগরে প্রাচীনকাল থেকেই। জানা যায় যে, মহামারির আগে (১৮৫৫) উলা বীরনগরে প্রায় ৮০/১০০টি পারিবারিক দুর্গাপুজো হত। কিন্তু বর্তমানে বনেদি পারিবারিক দুর্গাপুজো বলতে মিত্র-মুস্তফিদের পুজো আর মুখার্জি পরিবারের দুর্গাপুজোর কথাই জানতে পারা যায়।

আরও পড়ুন: বিলুপ্ত স্রোতের প্রতীক মুর্শিদাবাদের কাশিমবাজার রাজবাড়ির দুর্গাপুজো

মুস্তফিদের দুর্গা মন্দিরের ভেতরকার কারুকাজ, যা এখন প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত

উলা বীরনগর যেহেতু জমিদার অধ্যুষিত অঞ্চল ছিল, তাই এখানে বহু দেবদেবীর মন্দির ও স্থাপন করা হয়েছিল। আর এইসব মন্দিরগুলোর বেশিরভাগই জমিদার রামেশ্বর মিত্র-মুস্তফির দ্বারা নির্মিত। মিত্র-মুস্তফিদের বাড়িতেও অনেক মন্দির নির্মাণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে জোড়াবাংলা কৃষ্ণ মন্দিরটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এছাড়া এই বংশেরই বংশধর আত্মারাম মিত্র-মুস্তফির পুত্র কালিকুমার মিত্র-মুস্তফি প্রথম দুর্গাপুজোর দালান নির্মাণ করেন। এই দালানটি উলা বীরনগরের সর্বাপেক্ষা বৃহৎ দুর্গাপুজোর দালান ছিল। এর উচ্চতা ছিল প্রায় ৪০ ফুট।

আরও পড়ুন: প্রাচীন পুজোর রানাঘাট

মুস্তফিদের নহবতখানা, যেখানে দুর্গাপুজোয় নহবত বাজত সারাক্ষণ

মিত্র-মুস্তফিদের দুর্গাপুজোর কিছু ভিন্ন রীতি অনুসৃত হত। জমিদার মুস্তফিদের বাড়ির সিংহদ্বারের সম্মুখে বোধনের একটি অতি প্রাচীন বেল গাছ ছিল। জানা যায় যে, সেই বেল গাছের নীচে রামেশ্বর মিত্র-মুস্তফির জ্যেষ্ঠ পুত্র রঘুনন্দন মুস্তফি গভীর রাতে ইষ্ট দেবীর সাধনা করতেন। প্রতি বৎসর দুর্গাপুজোর পূর্বের নবমী তিথি থেকে সেই বেল গাছের নীচে মুস্তফি বাড়ির দুর্গাপুজোর ঘট স্থাপন করা হত। এত প্রাচীন বেল গাছ সমগ্র বাংলাদেশে আর ছিল কিনা, সে-বিষয়ে সন্দেহ আছে।

মুস্তফিদের নবনির্মিত বোধনের মন্দির। এখানেই আগে বহু প্রাচীন বেল গাছ ছিল

শত শত বছর ধরে (আনুমানিক ৩৪৩ বছর) মুস্তফিদের এই দুর্গাপুজোর ঘট স্থাপিত হয়ে আসছে সেই বেল গাছের নীচে। এর পর ১৬৮৩ খ্রিস্টাব্দে রামেশ্বর মিত্র-মুস্তফি দুর্গাপুজোর একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু মুস্তফিদের পুজোর প্রচলন হয়েছিল আরও প্রায় বছর ছ’য়েক আগেই। অর্থাৎ ১৬৭৮ থেকে ১৬৭৯ খ্রিস্টাব্দের সময় থেকে। কিন্তু বর্তমানে বোধনের সেই বেল গাছটি আর নেই। সেই জায়গায় সান বাঁধানো ছোট একটা মন্দির করে রাখা হয়েছে বোধনের জন্য।

আরও পড়ুন: বাংলাদেশ সুনামগঞ্জের চৌধুরী বাড়ির দুর্গাপুজো

মুস্তফিদের দুর্গা মন্দিরের বড় বড় কাঠের থামের উপর সুন্দর সুন্দর কারুকার্য ছিল, যেগুলো আজ বিনষ্ট হয়ে গেছে

সেই বেলগাছের অদূরে মুস্তফি বাড়ির দুর্গাপুজোর একটি বৃহৎ দোচালা চণ্ডীমণ্ডপ ও নির্মাণ করা হয়েছিল। এই চণ্ডীমণ্ডপটি ছিল প্রাচীন বাংলা ঘরের অপূর্ব নিদর্শন। দেওয়ালগুলো ছিল ইস্টক নির্মিত ও কাদার গাঁথান করা। এই মন্দিরটির দেওয়ালে নানারকম সুন্দর সুন্দর কারুকার্য, বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি, সূক্ষ্ম নকশা ও কুলুঙ্গি ছিল। সেইসব কারুকার্য এতই সুন্দর ও মনোমুগ্ধকর ছিল যে, মানুষ প্রতিমা না দেখে কারুকাজ দেখে মুগ্ধ হয়ে যেত। বহু দূরদূরান্ত থেকে লোক সমাগম হত এই মন্দির দর্শন করার জন্য।

মুস্তফিদের দুর্গা মন্দিরের ভেতরের অংশে রাখা প্রতিমার কাঠামো

জানা যায় যে, নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র উলায় আসলে এই মন্দিরে উপবেশন করতেন ও তার শোভা দর্শন করতেন। সেইটি ছিল টেরাকোটার কারুকাজ দ্বারা সুশোভিত। কিন্তু বর্তমানে সেই মণ্ডপটির আর কোনও চিহ্ন নেই। তাদের উত্তরসূরিদের চরম ঔদাসীন্যে সবই ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। এখন নতুন করে একটি দুর্গাপুজোর মন্দির নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু কোনও এক কালে এই বাড়িতেই দুর্গাপুজোর সময় প্রচুর সমারোহ হত। নহবতখানায় পুজোর তিন দিন ধরে নহবত বাজত। এই দুর্গা মন্দিরের চূড়ায় একটার ওপর আর একটা এমনি করে পিতলের ঘড়া বা কলস বসানো ছিল। এসবই এখন অতীত। সংস্কারের অভাবে সবকিছুই ধ্বংস হয়ে গিয়েছে।

আরও পড়ুন: বসিরহাটের বনেদি বাড়ির পুজো: কিছু জনশ্রুতি, কিছু প্রথা

মুস্তফিদের নবনির্মিত দুর্গাপুজোর মন্দির

মিত্র-মুস্তফি বাড়ির দুর্গামূর্তির একটি বৈশিষ্ট্য হল, ‘এই প্রতিমা ঘোড়ারূপী সিংহবাহিনী মৃন্ময়ী মাতৃরূপা।’ যা আজও বর্তমান রয়েছে। পূর্বে যে একমাস আগে বোধন আরম্ভ হত বেল গাছের নীচে বর্তমানে তা পঞ্চমীর তিথি থেকে শুরু হয়। এই পুজোর নিয়মানুসারে সপ্তমীতে হোমাগ্নি প্রজ্বলিত হয়ে চলে নবমী পুজো পর্যন্ত। পুজোর নৈবেদ্য হিসেবে কাচা সবজি সহযোগে ফল, চিঁড়ে, মুড়কি দেওয়ার রীতি ছিল যা আজও অব্যাহত রয়েছে। মুস্তফিরা যেহেতু অব্রাহ্মণ ছিল, তাই তাঁদের রান্না করা ভোগ দেওয়ার রীতি ছিল না। জানা যায় যে, বাহান্নটি ছাগ বলি ও প্রচুর মোষ বলি হত। কিন্তু বর্তমানে বলি দেওয়া হয় না। রাতে লুচি মিষ্টি সহযোগে সন্ধ্যারতি দেওয়ার নিয়ম আজও প্রচলিত আছে। দুর্গাপুজোর হোমের ভস্ম একটি নির্দিষ্ট কক্ষে বছরের পর বছর ধরে রেখে দেওয়ার নিয়ম ছিল, কিন্তু এখন সেই হোমের ভস্ম হোমকুণ্ডেই রাখা হয়। দশমীতে চূর্ণী নদীতে প্রতিমা বিসর্জনের রীতি নিয়মানুসারে আজও প্রচলিত আছে। পুজো উপলক্ষে প্রচুর জনসমাগম আগেও হত, এখনও হয়। কিন্তু মিত্র-মুস্তফি বাড়ির দুর্গাপুজোর সেই বনেদিয়ানা বা জৌলুস আজ আর নেই। সবই কালের স্রোতে হারিয়ে গেছে।

আরও পড়ুন: বৈষ্ণব এবং শাক্ত মতের সমষ্টি বাগনান কল্যাণপুরের রায়বাড়ির পুজো

মুখার্জি জমিদার বাড়ির বর্তমান দুর্গা প্রতিমা, যা এখন তাঁদেরই উত্তরপুরুষ গুণেন্দ্র নাথ মুখার্জির বাড়িতে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে

উলা বীরনগরের আরও একটি বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজো এখনও প্রদীপের টিমটমে আলোর মতো করে জ্বলছে। সেটি হল জমিদার মহাদেব মুখার্জি পরিবারের দুর্গাপুজো। এই পরিবারের দুর্গাপুজোর প্রচলন হয়েছিল জমিদার বামুনদাস মুখার্জির সময়কাল থেকে। ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগেই মুখার্জি জমিদারদের একটি দুর্গাপুজোর দালান নির্মাণ করা হয়েছিল বলেই জানা যায়। তবে এই পরিবারের দুর্গা দালানের আজ আর কোনও অস্তিত্ব নেই। তাঁদের উত্তরসূরিদের ঔদাসীন্যেই সেগুলো আজ কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

আরও পড়ুন: পাকিস্তান থেকে শরণার্থী হয়ে আসা বান্নু সমাজের হাতে শুরু হওয়া রাবণ দহন আজ রাঁচির ঐতিহ্য

মুখার্জি জমিদার বাড়ির প্রাচীন সিংহ দরওয়াজা-ওয়ালা বাড়ির অংশ, প্রায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে

জমিদার মুখার্জি পরিবারের দুর্গাপুজোর আলাদা কোনও নিয়ম রীতির বিশেষভাবে জানতে পারা যায়নি। পঞ্জিকা মতে, দুর্গাপুজোর নিয়ম অনুযায়ী এই পরিবারের দুর্গাপুজো সম্পন্ন হত যা আজও হয়। পূর্বে দুর্গাপুজোর সময় মুখার্জি পরিবারের তরফ থেকে সর্বসাধারণের জন্য তিনদিন ধরে ভোগপ্রসাদ বিতরণ করা হত। পুজোর তিনদিন গ্রামের কারোর বাড়িতেই রান্নাবান্না করার প্রয়োজন পরত না। সকলেই সেই ভোগপ্রসাদ পেতেন। এই পরিবারের পুজোতেও বলি দেওয়ার নিয়ম ছিল, কিন্তু এখন বলি বন্ধ করে দিয়েছে। বলি হত নবমী তিথিতে। জানা যায় যে, মায়েরা পর্যন্ত মাথায় ধুনুচি নিয়ে এই পুজোয় অংশগ্রহণ করতেন। পুজোয় বহু জনসমাগম ও হত। মানুষের মনোরঞ্জনের নাচ-গান ইত্যাদির ব্যবস্থা করা হত। এই নৃত্যগীতাদির ব্যবস্থা করা হত দুর্গা মন্দিরের চাঁদনিতে। এই পরিবারের দু’পাশ দিয়ে দোতলা চকমিলান গৃহের সারি ছিলো। মুখার্জি পরিবারের দুর্গা মন্দিরের গায়েও নানাবিধ কারুকার্য খচিত ফুল, লতা, পাতাও বিভিন্ন দেবীর মূর্তি নকশা কাটা ছিল। কিন্তু বর্তমানে সেই সবের আর কোনও চিহ্ন নেই।

আরও পড়ুন: শান্তিপুরের বড় অদ্বৈত অঙ্গনে শারদীয়ায় পূজিতা হন দেবী কাত্যায়নী

বর্তমানে গুণেন্দ্র নাথ মুখার্জি পরিবারের দুর্গাপুজোর দালান

জমিদার মুখার্জি পরিবারের মূল দুর্গামন্দিরটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে সেই পুজো অনুষ্ঠিত হয় তাঁদেরই বংশধর শ্রীগুণেন্দ্র নাথ মুখার্জির বাড়িতে। তাঁদের বংশধরদের কথায় জানতে পারা গিয়েছে যে, পঞ্জিকার রীতি অনুযায়ী আজও তাদের পুজো সম্পন্ন হয়। জমিদার বামনদাস মুখার্জির সময়কালে তিনদিন ধরে সকল গ্রামবাসীদের যে ভোগ দেওয়ার রীতির প্রচলন ছিল, এখন আর সেইসব কিছুই নেই। এই পরিবারের দুর্গামূর্তি হল সিংহবাহিনী মৃন্ময়ী মাতৃরূপ। এই পরিবারের দুর্গা পুজোর মায়ের রান্না করা ভোগ দেওয়ার নিয়ম ছিল আজও তা বিদ্যমান। দশমীতে বিসর্জন দেওয়ার রীতি প্রচলিত আছে।

মুস্তফি বাড়ির বর্তমান দুর্গা প্রতিমা

জমিদারি আমলে দুর্গাপুজোর উপলক্ষে প্রচুর সমারোহ ও জনসমাগম হত। এখানকার স্থানীয় মানুষেরা পুজোর এই তিনদিন আনন্দে উৎসবে মেতে থাকত। তখনকার দিনে কোনও বারোয়ারি পুজোর প্রচলন ছিল না। কিন্তু বর্তমানে বারোয়ারি পুজোর প্রচলন হওয়ায় বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোর সেই জৌলুস হারিয়ে গিয়েছে। এখন খুব সাধারণভাবেই এই সব পুজোগুলো অনুষ্ঠিত হয়। তবে মিত্র-মুস্তফি বাড়ির দুর্গাপুজোর রীতিনীতি আজও কিছুটা প্রচলিত আছে। যাইহোক, দুর্গাপুজো যে বাঙালির আবেগের পুজো, ভালোবাসার পুজো প্রাচীন ইতিহাস ঘাটলেও তার প্রমাণ মেলে। উলা বীরনগরের এই দুর্গোৎসব এক মহামিলন মেলার ক্ষেত্র ছিল বলেই জানা যায়।

প্রচ্ছদ চিন্ময় মুখোপাধ্যায়

তথ্যসূত্র
সৃজন মিত্র-মুস্তফির ‘উলা বীর নগর ও তার পূজাপার্বণ ‘
কমল চৌধুরীর ‘নদিয়ার ইতিহাস’

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *