পুরুলিয়ার তেলকুপিতে জলের নীচে ইতিহাস

দেবদুলাল কুণ্ডু

পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলার দামোদর নদীর ভেতরে জলমগ্ন হয়ে আছে একটুকরো ইতিহাস। আসুন সেই ইতিহাসের সন্ধান করা যাক।

জায়গাটির নাম তেলকুপী; কেমন যেন মনে হচ্ছে ‘তেলের কূপ’ জাতীয় কিছু হয়ত ছিল; আসলে ‘তৈলকম্পী’ থেকেই তেলকুপী নামটি এসেছে। একসময় জায়গাটি মানভূম জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। বর্তমানে রঘুনাথপুর থানার অন্তর্গত লালপুর, গুরুন, তারাপুর, জামডি, পাথরবিড়া, ঘরবিড়া প্রভৃতি গ্রাম নিয়ে তেলকুপী গঠিত।

আরও পড়ুন: রিপন কলেজ: কলকাতা থেকে দিনাজপুর

গরমকালে জলের জেগে ওঠে তেলকুপীর এই মন্দির

ইতিহাস বলছে, শিখরবংশের পূর্বতন রাজধানী এই তৈলকম্পীতে আবস্থিত ছিল। এখান থেকে পঞ্চকোটগড়ের দূরত্ব ছিল সাড়ে দশ মাইল। এই পঞ্চকোটে শিখরবংশের প্রাচীন রাজধানী অবস্থিত। অনুমান করা হয় এঁরাই পাঞ্চেতের প্রাচীন রাজবংশ। এই বংশের রাজা রুদ্রশিখর বরেন্দ্রভূমি উদ্ধারের জন্য সাহায্য করেছিলেন পালবংশের রাজা রামপালকে। সন্ধ্যাকর নন্দী রচিত ‘রামচরিতম্‌’ নামক সংস্কৃত কাব্যগ্রন্থে রুদ্রশিখরের বর্ণনা পাওয়া যায়।

অনুমান করা হয়, তেলকুপীর প্রাচীন ও লুপ্তপ্রায় মন্দিরগুলি একসময় পাঞ্চেত ও কাশীপুরের রাজাদের অধীনে ছিল। দামোদরের পাশে অবস্থিত হওয়ায় বাণিজ্যের সুবিধা ছিল এখানে। স্বাভাবিকভাবে এই জায়গাটি একদা নদীবন্দরে রূপ নিয়েছিল। কিন্তু কালের দণ্ডাঘাতে আজ সবই মাটির সঙ্গে মিশে গিয়েছে প্রায়। ধ্বংসের যেটুকু বাকি ছিল, সেটা সম্পন্ন হয়েছে দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশনের দ্বারা পাঞ্চেত বাঁধ নির্মাণের পর। ১৯৫৭ সালে বাঁধ নির্মাণের পরে তেলকুপী জলমগ্ন হয়ে যায়; এবং অধিকাংশ মন্দির চলে যায় জলের নীচে।

আরও পড়ুন: স্বাধীনতা আন্দোলনে মুর্শিদাবাদ

তেলকুপীর মন্দির ও তাদের নির্মাণশৈলী সম্পর্কে প্রথম জানা যায়, ১৮৭৮ সালে প্রকাশিত জে ডি বেগলারের ‘Report of A Tour through the Bengal Provinces (vol. VIII)’ গ্রন্থে। তাঁর মতে, সে-সময় ছোটনাগপুর সার্কেলে তেলকুপী ছাড়া কাছাকাছি অবস্থিত এত  উৎকৃষ্ট মানের মন্দির আর কোথাও দেখতে পাওয়া যায়নি। তিনি প্রায় ২৩টি মন্দির দেখতে পেয়েছিলেন। তার মধ্যে নদীর ধারে প্রথম সারিতে ছিল দেখেছিলেন ১৩টি মন্দির। দ্বিতীয় ভাগে ছ’টি মন্দির দেখেছিলেন গ্রামের পশ্চিমদিকে। এখানে অনেক মূর্তিও ছিল। আর তৃতীয় সমষ্টিতে তিনি তিনটি মন্দির ও একটি মঠের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করেছিলেন। বেগলার যখন খোঁজ পেয়েছিলেন, তখন মন্দিরগুলি ভালো অবস্থায় ছিল। আলাদা করে দরজা-জানলা-দেওয়ালের কারুকার্য স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যেত। মন্দিরের গর্ভগৃহে দেবমূর্তির অধিষ্ঠান দেখতে পেয়েছিলেন তিনি। কোনোটায় বিষ্ণুমূর্তি, কোনোটায় সূর্যদেবতা, আবার কোনোটায় শিবলিঙ্গের অস্তিত্ব লক্ষ করেছেন তিনি।

আরও পড়ুন: বারোভুঁইয়ার অন্যতম ভুঁইয়া চাঁদ রায়ের শান্তিপুরের রথের কাহিনি

কিন্তু হান্টার সাহেব উল্লেখ করেছেন, এখানে ন’টি মন্দির রয়েছে। তিনি অনুমান করেছিলেন একটি মন্দিরে ২৪তম জৈন তীর্থঙ্কর মহাবীরের মূর্তি ছিল। আবার পুরাতাত্ত্বিক দেবলা মিত্রের মতে, জৈন তীর্থঙ্কর নন, এটি আসলে ছিল ভৈরবনাথের মন্দির। ১৯৫৮ সালে মন্দিরটি পুরোপুরি দামোদরের গর্ভে বিলীন হয়ে যাবার আগে গ্রামবাসীরা নিত্যপূজা করত এখানে।

১৯০৩ সালের গোড়ার দিকের বেঙ্গল সার্কেলের আর্কিওলজিকাল সার্ভেয়ার টি. ব্লচ বেগলার বর্ণিত ১৩টি মন্দিরের ভেতরে মাত্র ১০টি দেখতে পান। তখন মন্দিরগুলি জলের উপরে ভেসে ছিল। বড় বড় পাথর কেটে কেটে নিখুঁতভাবে জোড়া দিয়ে মন্দিরগুলি তৈরি করা হয়েছিল। বড় ফাঁকগুলি ভরাট করার জন্য করবেলিং (Corbelling) পদ্ধতির সাহায্য নেওয়া হয়েছে। কোনও পাথর বা কাঠের নকশা করা টুকরো চাপ দিয়ে দেওয়ালে এই পদ্ধতিতে জোড়ানো হয়।

আরও পড়ুন: বারোভুঁইয়ার অন্যতম ভুঁইয়া চাঁদ রায়ের শান্তিপুরের রথের কাহিনি

এখানকার মন্দিরের গোলাকার গম্বুজগুলি নাকি এইভাবেই তৈরি। অনুমান করা হয়, এগুলি মুঘল পিরিয়ডে তৈরি হয়েছিল। ভূতাত্ত্বিক নির্মল কুমার বসু ১৯২৯ সালের প্রথমদিকে তেলকুপী পরিদর্শন করেন। তিনি এই মন্দিরগুলির সঙ্গে ওড়িশার রেখ জাতীয় দেউলের সাদৃশ্য খুঁজে পেয়েছেন। তাঁর মতে, “যাহাই হউক উড়িষ্যার প্রভাব যে তেলকুপীতে একেবারেই পড়ে নাই তাহা বলা চলে না। তেলকুপীতে একটি অপেক্ষাকৃত আধুনিক রেখ দেউল আছে।” [‘মানভূম জেলার মন্দির’/ প্রবাসী (১৩৪০)]

আরও পড়ুন: ধ্বংসের দোরগোড়ায় সুন্দরবন: ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব ও আজকের বিতর্ক

তেলকুপীর পাশে আচকোদা গ্রামের একটি মন্দির ধ্বংসের মুখে

কিন্তু দামোদর নদ আজ সবটুকু গ্রাস করে নিয়েছে। একমাত্র গরমকালে এখানে এলে একটা কী দু’টো মন্দিরের কিছুটা অংশ দেখা যায়। এ যেন সত্যিই কীর্তিনাশা।

কিন্তু না, পুরোটাই নদীর দোষ নয়; এই মন্দিরগুলি ধ্বংসের পেছনে মানুষেরাও কম দায়ী নয়। প্রত্ন-গবেষক সুভাষ রায়ের মতে, মন্দিরগুলি জলে নিমজ্জিত হবার পেছনে ডিভিসি তথা সরকার কম দায়ী নয়। বাঁধ তৈরির ফলে দামোদর গ্রাস করেছে মন্দির নগরীকে। তিনি ও তাঁর দল মানভূম জেলার লোকসংস্কৃতি পরিষদের হয়ে ডিভিসিকে বারংবার চিঠি লিখেছেন ব্যবস্থা নেবার জন্য। কিন্তু কোনও সুরাহা হয়নি। তাই উত্তর প্রজন্মের দৃষ্টি পথের আড়ালে একেবারে হারিয়ে গেল মন্দির নগরী তেলকুপী।

আরও পড়ুন: মুঘল দরবারে আম

সৌজন্য মানভূম লোকসংস্কৃতি পরিষদ

এখন যাঁরা যাবেন, তাঁরা একেবারে হতাশ হবেন না। কিছু ভগ্নশেষ দেখতে পাবেন; তবে যাবেন গরমকালে। তখন নদীর জল অনেকটাই শুকিয়ে যায়; এই সুন্দর ভাস্কর্য জেগে ওঠে আমাদের চোখের সামনে। তবে একটা কি দু’টো মন্দির দেখা যেতে পারে; আশপাশে আরও কয়েকটির দেখা মিলতে পারে সেগুলি হল— লালপুর গ্রামে জলের প্রান্তে দেলগড়া; গুরুডি গ্রামের ভাঙা মন্দির ও শিবমন্দির; ঘরবিড়া গ্রামের প্রাচীনতম ‘দেল’, গুরুডি গ্রামের শিবলিঙ্গ, বিষ্ণু ও নেমিনাথের মূর্তি; জামাডি গ্রামের চাষের জমিতে মা লিরলা’র চতুর্ভুজ মূর্তি ইত্যাদি।

পথনির্দেশ
আসানসোল থেকে আদ্রা ট্রেনে যাবার পথে জয়চণ্ডী স্টেশনে নেমে গাড়ি রিজার্ভ করে নেবেন। রঘুনাথপুর চেলিয়ামা গিয়ে সেখানে প্রথমে ‘বান্দা’ দেউল চোখে পড়বে। বলবেন ‘তেলকুপী ঘুরে দেখব’। গাড়িতে করে করগালির ঘাটে নেমে নৌকা করেও তেলকুপীর মন্দির দু’টি দেখে আসতে পারেন।

      
তথ্যঋণ ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার
১) রামামৃত সিংহ মহাপাত্র।
২) তরুণ কুমার সরখেল।
৩) সুভাষ রায়।
৪) মধুসুদন মাজি।
৫) জালাধান বা ওয়েবসাইট।
৬) মানভূম লোকসংস্কৃতি পরিষদ।

Facebook Twitter Email Whatsapp

2 comments

  • Dr. Subhransu Roy

    কিছুটা স্রোতের বিপরীতে গিয়েই কিছু মানুষ ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টায় উদ্যোগী হয়ে এমন ইতিহাসের সন্ধান করে। এক সমৃদ্ধ অথচ অনেকটাই অনালোচিত ইতিহাস রয়েছে এই তেলকুপীর জলের নিচে। পড়তে পড়তে রোমাঞ্চ লাগে ইচ্ছা হয় একদিন গিয়ে দেখে আসার। তাই এই লেখা শুধু ইতিহাসের সন্ধান নয়, পর্যটনের সুলুকসন্ধান দেয় এই লেখা। লেখককে অনুরোধ করব, এমন ধরনের আরো লেখার জন্য। আর হ্যাঁ, মাইসেপিক ডট কম ওয়েবে প্রকাশিত দেবদুলাল কুণ্ডুর ‘পুরুলিয়ার তেলকুপিতে জলের নীচে ইতিহাস’ লেখাটি এখনও পর্যন্ত ২১০০ মানুষ খুলে দেখেছেন । তাই লেখকের সঙ্গে পাঠকবন্ধুদেরও অসংখ্য ধন্যবাদ। লেখক আর পাঠকের মেলবন্ধনই তো লেখার সাফল্যকে বয়ান করে।

  • Durga Sankar Dirghangi

    অজানা অতীতের এই ঐতিহ্যবাহী ঐতিহাসিক
    মন্দিরগুলি নিয়ে আরও গবেষণা হবার প্রয়োজন আছে। দু:খ লাগে দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন
    এত বড় জলাধার তৈরি করল, কিন্তু আমাদের
    মন্দিরগুলি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রইল। জৈন
    ধর্মীয় লোকেদের বসবাস ছিল এই সব অঞ্চলে।
    তেলকুপির মন্দিরগুলি জৈন মন্দির। ASI কোন
    ভাবে Restore করবেন। এই দর্শনীয় স্থান গুলির
    কথা সবাই জানূক। আমাদের সংস্কৃতি রক্ষা পাক।
    অসাধারণ উপস্থাপনা। শুভেচ্ছা জানাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *