পুজোর মুখে কেমন আছেন শান্তিপুর, কৃষ্ণনগরের শোলাশিল্পীরা?

তিরুপতি চক্রবর্তী

আজ শান্তিপুর ও কৃষ্ণনগরের মালাকারদের শোলাশিল্পের কথা শোনাব। বাংলার অন্যতম লোকজ এই শিল্প পশ্চিমবঙ্গে সাধারণত দু’রকমের শোলা গাছ থেকে পাওয়া হায়। তাদের নাম হল ফুল শোলা এবং কাঠ শোলা। আরও একটি বিশেষত্ব হল এই গাছ জন্মায় বিশেষত ধানক্ষেতে। তা এই গাছ নিয়ে পৌরাণিক কাহিনি থাকবে না, তা হয় না। কারণ শোলাশিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেবদেবীদের সাজসজ্জার ব্যাপারও। আজ দুর্গাপুজোর পঞ্চমীতে আগে শুনে নেওয়া যায় সে-কথা। শিবের তখন বিয়ে হবে পার্বতীর সঙ্গে। সেইসময় স্বয়ং শিব এক অদ্ভুত ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। তাঁকে পরাতে হবে সাদা মুকুট। বিশ্বকর্মা তখন বললেন যে, তিনি সেই মুকুট তৈরি করবেন। এরপর শিবের ইচ্ছায় জলাশয়ে জন্মাল শোলাগাছ। তবে বিশ্বকর্মা কীভাবে বানাবেন মুকুট? তিনি তো কাঠ-পাথর খোদাইয়ে পারদর্শী। শোলা তো নরম। সেইসময় শিবের ইচ্ছায় জলাশয়ে এক সুকুমার যুবকের আবির্ভাব ঘটে, তাঁকেই ডাকা হয় মালাকার নামে। এখন যাঁরা শোলাশিল্পের সঙ্গে জড়িত, তাঁরা মালাকার নামেই পরিচিত এবং হিন্দু সমাজভুক্ত। মালাকাররা বংশানুক্রমে শোলা দিয়ে বৈচিত্র্যময় টোপর, দেবদেবীর অলংকার,  চালচিত্র, পুজোমণ্ডপের অঙ্গসজ্জার দ্রব্যাদি, মালা, গয়না, খেলনা ও গৃহসজ্জার নানা দ্রব্য তৈরি করেন। মালাকাররা শিবের উপাসক।

নদিয়ার কৃষ্ণনগর ও শান্তিপুর শোলাশিল্পের জন্য প্রসিদ্ধ। এখানে মূলত মালাকার ও বাগরা এই শোলার সাজ তৈরি করেন। এক সময় শান্তিপুর এলাকায় এ শিল্পের কারিগর মালাকারদের বসবাস ছিল। অবশ্য বর্তমানে সেখানে শোলার কাজ তেমন হয় না। এখন দু-তিন ঘর মানুষই এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত।

কথা হচ্ছিল বাগআচড়ার অন্যতম বিখ্যাত শোলা শিল্পী বিজয় মালাকারের সঙ্গে। বিজয় মালাকার, যিনি আজ এই শোলাশিল্পের পরম্পরাকে সুনামের সঙ্গে বয়ে নিয়ে চলেছেন। তিনি বলছিলেন, ‘ধৈর্য এবং শিল্পী মনের অভাবই এই শিল্পের বড় সমস্যা এখন।’

এলাকায় এখনও অনেকে শোলার কাজ করেন। তাঁরা সবই পূর্বপুরুষের হাত ধরে এসেছেন এই পেশায়। বিজয়বাবু আরও বলেন, ‘এটা খুবই সুক্ষ্ম এক কাজ।’ এঁরা সমাজের চাহিদা অনুসারে শোলা দিয়ে দেবদেবীর গয়না, তাঁদের চালচিত্র ও পোশাক তৈরিতে অত্যন্ত দক্ষ। শান্তিপুর, কৃষ্ণনগর বেশিরভাগ পুজোমণ্ডপের চালচিত্র ও মণ্ডপসজ্জার কাজ মালাকাররাই করে থাকেন।

নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগরের মহাদেব মালাকার এবং তারক মালাকারের শোলার তৈরি টোপর ও বিয়ের মালা সূক্ষ্মতা ও নিপুণতায় অপূর্ব। এঁরা বংশপরম্পরায় এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত। তাঁদের নাম আজ ভারতবর্ষের কোনায় কোনায় ছড়িয়ে পড়েছে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই শিল্পের প্রসার কমছে। তাছাড়া এবার করোনার দাপটে খুবই দুর্বিষহ অবস্থা হয়েছে তাঁদের। এ-কথাই জানা গেছে শোলা শিল্পীদের কাছ থেকে। আসলে পুজোর আসর সেভাবে জমেনি এই করোনাকালে। বরাত পেলেও অন্যান্য বছরের মতো পাননি। তাই একপ্রকার অনিশ্চয়তায় দিন গুজরান করছেন তাঁরা।

ছবি: লেখক

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *