সবুজ মেরুন আবেগের বিস্ফোরণ এভাবেই হয়

পারমিতা রায়

আজকের দিনটা যে কীভাবে কেটে গেল কেমন করে বলি! গতকাল থেকেই সাজো-সাজো রব চারিদিকে। ক্লাব সেজে উঠছে সবুজ মেরুন আলোয়, পতাকায়। আমাদের মনেও তখন উৎসবের রং। ভাবনাচিন্তা চলছিল, আচ্ছা এই অবস্থায় কি তেমন জমায়েত হবে? আজ সকাল থেকেই চোখ থাকল বিভিন্ন গ্রুপের ফেসবুক পেজের লাইভে। কাজকর্ম মাথায় উঠল। হায়াতের ভাবগম্ভীর পরিবেশে অনুষ্ঠান শুরু হতেই কিবু স‍্যারের জন‍্য, বেইতিয়া, গঞ্জালেস, বাবা-সহ আমাদের সেই টিমটার জন্য ভীষণ মনখারাপ হচ্ছিল। এপ্রিলে কত আনন্দ করে সারাদিন ধরে উৎসব করব কোথায়, এখন ফেসবুক পেজে ঝলক দেখেই সাধ মিটোতে হচ্ছে। অবশ্য স্ক্রিনে কিবু স‍্যার-সহ সবাইকে দেখে, তাঁদের কথা শুনে ভালো লাগল। তবে এসবই তো আনুষ্ঠানিকতায় বাঁধা।

আরও পড়ুন: কন্যার পোস্টে মোহনবাগান পাগল পিতার তর্পণ

আসল খেলা শুরু হল এরপর। শোভাযাত্রার লাইভ বিভিন্ন ফ‍্যান পেজ যখন দেখাতে শুরু করল তখনও একেবারে প্রথম দিকে অতটা আন্দাজ করতে পারিনি, ক্রমে শোভাযাত্রা যখন উল্টোডাঙায় পৌঁছল, আরিব্বাস এত জনসমুদ্র! কেউ বাইকে, কেউ গাড়িতে, কেউ স্রেফ হাঁটছে। মুখে মাস্ক আছে বটে, জয়ধ্বনি দেবার সময় তা থুতনিতে। অন‍্যসময় মানে অন‍্যক্ষেত্রে এসব দেখলে কিন্তু তেলেবেগুনে জ্বলে উঠতাম। এই কালবেলায় এ কি অনাসৃষ্টি! কিন্তু এই একটা ক্ষেত্রে আমি অন্ধ। ভয় লাগছে ছেলেপুলেগুলোর কী হবে ভেবে, কিন্তু ওদের ওপর যে রাগ করতে পারছি না। ওরা তো পুজোর বাজার করতে বেরোয়নি, কোনও রাজনৈতিক মিছিলেও হাঁটছে না। না, ওরা কোনও পার্থিব চাওয়া-পাওয়ার হিসেব-নিকেষ করেনি। ওরা হাঁটছে একটা ক্লাবের আবহমান ইতিহাসকে ছুঁয়ে-ছুঁয়ে নতুন স্বপ্ন দেখতে চেয়ে। ওরা চলেছে ১৩০ বছরের চলমান জীবনের রূপ-রস-গন্ধ গায়ে মেখে মর্যাদার সঙ্গে মাথা উঁচু করে।

আরও পড়ুন: মহাকাব্যের নাম মোহনবাগান: সারথি বঙ্গ জনতা

সবুজ মেরুন আলোয় সেজে উঠেছে বর্ধমানের কার্জন গেট

১০৯ বছর ধরেই এই মোহন-জনতার ছবি বারবার রাজপথ থেকে বাংলার অলিগলি দেখে চলেছে, আবারও দেখবে। এদেশে ফুটবল জনতার, ফুটবল দর্শকের জন্মই হয়েছে মোহনবাগানের হাত ধরে। অখণ্ড বাংলার সাধারণ মানুষ মাঠে এসেছে মোহনবাগানের জয় দেখতে। একটা দলের জয়কে তারা নিজের জয়, দেশের জয় বলেই ভেবে এসেছে। তাই এগারোর জয়ে অমন প্রাণের স্পন্দন, অমন সাবলীল আনন্দের বহিঃপ্রকাশ। সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত অনেক অনেক পরিবর্তনের ভিতর দিয়ে এই মোহন-জনতাকে এগোতে হয়েছে। এসেছে অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতি, ঘরে-বাইরে অনেক বাঁকা কথাও শুনতে হয়েছে বৈকি। তবু এদের কেউ দমাতে পারেনি। কবি শক্তি চট্টোপাধ‍্যায় জানতেন কেন এরা অপ্রতিরোধ্য— এদের ‘রক্তে মিশে আছে প্রতিষ্ঠান’ বিচ্ছিন্ন করা যাবেই না।

আরও পড়ুন: কাছে কিন্তু তবু সুদূর: এক হোটেলে থেকেও আই লিগ সেলিব্রেশন অধরা শিলটন ফৈয়াজের কাছে

এই এবারের কথাই ধরা যাক না, এই ২০১৯-২০’র মরশুম। ডুরান্ড এল না, কলকাতা লিগ এল না, শেখ কামাল এল না। আই লিগের শুরুতেই হোঁচট! কিন্তু তবু কি দমানো গেল? খেলা সেই কল‍্যাণীতে। ভিড়ে ঠাসা ট্রেনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শিয়ালদা থেকে অতখানি পথ সেই কল্যাণী পৌঁছতে। তবে স্টেশনে ট্রেন ঢুকতেই এক্কেবারে জমজমাট ব‍্যাপার। পিলপিল করে ট্রেন থেকে নামছে সমর্থকের দল। তারপর সবুজ- মেরুন রং উড়িয়ে শোভাযাত্রা করে মাঠে যাওয়া। ব‍্যাগট‍্যাগ সব জমা করে মাঠে ঢুকলেই মনখুশ। কি সুন্দর সবুজ ঘাসের মাঠ। হলে কী হবে! এই মাঠেই ২-৪’এ হার, চার্চিলের কাছে। একেবারে ছি! ছি! রব উঠল চারিদিকে। অথচ খেলেছিল কিন্তু ভালোই। তাহলে কি পরের ট্রাউ ম‍্যাচটায় ভিড় হবে না? কোথায় কি টিভিতে দেখলাম ভালোই ভিড়। ট্রেনের গণ্ডগোল, এনআরসি-জনিত সমস‍্যা কোনও কিছুকেই তোয়াক্কা করেনা মোহনজনতা। প্রতিটি হোমম‍্যাচেই ভিড়ে ঠাসা স্টেডিয়াম। ট্রাউ আর বিশেষ করে গোকুলম ম‍্যাচটা জিতেই জনতার প্রত‍্যাশা বেড়ে গেল। ডুরান্ড ফাইনালেরও প্রতিশোধ বেশ ভালোভাবেই নেওয়া হল। আর তারপর তো শ্রীনগরে ৬ জানুয়ারি রিয়েল কাশ্মীরের সঙ্গে জেতার সেই স্বর্গীয় আনন্দ। শুরু হল স্বপ্নের স্পেল। পঞ্জাব এফসি-র সঙ্গে অ্যাওয়ে ম‍্যাচে, চেন্নাই সিটির কাছে হোম ম‍্যাচে আটকে যাওয়া ছাড়া বাকিটা শুধু দেখে যাওয়া। ধারাবাহিকভাবে এই পর্যায়ের ফুটবল খেলে যাওয়া! উফ্ এখনও ভাবলে শিহরিত হই! সেই ২৩ পাসের গোল! রূপকথা হয়ে থাকল আমাদের কাছে এবারের আই লিগ।

আরও পড়ুন: আই লিগ জয়ী মধুর স্মৃতি : সোশ্যাল মিডিয়ায় আবেগপ্রবণ তুরসুনাভ

তবু এখনও মাঝেমাঝেই মনে হয় ১০ মার্চ আইজল এফসি-র বিরুদ্ধে বাবার গোলটা যদি না হত! অনিবার্য কারণে সেদিন মাঠে যেতে পারিনি। তাই টিভি দেখতে দেখতেই ভাবছিলাম আজই হবে তো! অনেক মোহনবাগানিই ভাবছিল মানে যারা মাঠে যায়নি, আজ ড্র হলে ক্ষতি কী? ডার্বি জিতে চ‍্যাম্পিয়ন হব! আর ফিরতি ডার্বি! এখনও টিকিটের দাম ফেরত পাওয়া গেল না! ভাগ‍্যিস আমাদের বাবা ছিল। বাবাই বাঁচিয়েছে। চারটে ম‍্যাচ বাকি থাকতেই চ‍্যাম্পিয়ন! আজ কি সত্যিই ঘরে থাকা যায়! এই মোহন- জনতার বুকের ভিতর আগুন আছে।

বারেবারেই তার আঁচ পাওয়া গিয়েছে। কেন ২০১৫-র আই লিগের শোভাযাত্রা তো এখনও টাটকা। আর ২০০২-এর সেই পয়লা বৈশাখ? বাপ রে কী উত্তেজনা! শেষে রেডিয়োর খেল সমাচারে কান পেতে বসে আছি। অবশেষে গোয়া থেকে এল সেই আকাঙ্ক্ষিত জয়ের খবর। চার্চিলকে কে বধ করল! না স‍্যালিউ! আর তারপর দল ফিরলে যে উন্মাদনা! উৎসবের দিনে পুরনো দিনের সুখস্মৃতি সব এভাবেই ফিরে ফিরে আসে।

এভাবেই বয়ে চলে বয়ে চলবে মোহনতরী আমাদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে-মড়িয়ে। মনে পড়ছে প্রসূন স‍্যারের কথা। প্রসূন বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়। কবি, শিক্ষক, ফুটবল বিশ্লেষক, লেখক প্রসূন স‍্যারকে মোহনবাগানের সদস‍্য গ‍্যালারিতে একবার দেখেছিলাম কলকাতা লিগের খেলায়। মোহনবাগান গোল দিলেই উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠছেন ছেলেমানুষের মতো। তাঁর একটা কবিতার চারটি লাইন দিয়েই বরং শেষ করি।

‘অফিসে ভীষণ চাপ এদিকে বৌ-এর
কেনাকাটি বায়নাক্কা বাকি আছে ঢের
ওদিকে বসের মেয়ে সদনে ফাংশান
ওফ্… ফের বিকেলে টানছে মোহনবাগান’

কবে যে আবার সেই সোনালি বিকেল আসবে!

কভার ছবিটি সবুজ মেরুন আলোয় উদ্ভাসিত হাওড়া ব্রিজের। ক্যামেরায় চিন্ময় শেঠ

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *