মধ্যপ্রদেশ বৃত্তান্ত (ষষ্ঠ পর্ব) – ভোপাল ভীমবেঠকা

MadhyaPradesh

অঙ্কিতা

মধ্যপ্রদেশের এই মালভূমি অঞ্চল মূলত দাক্ষিণাত্য মালভূমিরই এক অংশ। সেই কোনও এক প্রাচীন ক্রিটেসিয়াস কালে জন্ম হয়েছিল এই মালভূমির। তখনও এই ভূখণ্ড ভ্রাম্যমাণ। এশিয়াখণ্ডের বুকে এসে থিতু হয়নি সে। একদা সেই ভ্রাম্যমাণ ভূখণ্ডের বুকে টহল দিয়ে বেড়াত অতিকায় ডাইনোসরেরা। এই অঞ্চলের মাটির রং প্রধানত কালো অথবা বাদামি। আগ্নেয়পাথরের মতো কালো রঙের মাটির কারণ লৌহ আকরিকের আধিক্য, যা এসেছে ব্যাসল্ট থেকে। উচ্চ আর্দ্রতা ধারণ ক্ষমতার কারণে এই মাটিতে সেচের প্রয়োজন কম, ফলে একদা হিংস্র জন্তুসংবলিত বনভূমি ছিল আজকের এই রুখাশুখা মালভূমিটি। ডাইনোসরদের কাল তো প্রাচীন অতীতের কথা, তারপরেও এই অঞ্চল বারংবার আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে বিভিন্ন প্রাণীর, এমনকী প্রায়মানবদেরও। লক্ষাধিক বছর পুরনো প্রায়মানবদের ফসিলের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে এই অঞ্চলেই।

আরও পড়ুন: মধ্যপ্রদেশ বৃত্তান্ত (৫) – মাহেশ্বর ওমকারেশ্বর

ভীমবেঠকার পথে

আজ আমরা চলেছি পাঁচমরি। পথে দেখব ভীমবেঠকা। স্বাদ নেব এক অনন্ত অতীতের। গতকাল হোটেলে এসে শুতে শুতে রাত প্রায় দেড়টা বেজে গিয়েছিল। আজ সকালে উঠেই আবার যাত্রা শুরু। ভোপাল থেকে পাঁচমরি প্রায় দু’শো কিলোমিটার। ভোপাল শহরটা আমাদের দেখা হয়নি। ভোপালের জন্য একটা দিন রাখা উচিত ছিল। ভোপাল থেকে তিরিশ-চল্লিশ কিলোমিটার দূরের রাজাভোজের শিব মন্দিরেও যাওয়া হয়নি। আমরা বাঙালি টুরিস্ট পার্টি, ঘোড়ায় জিন দিয়ে পথে নেমেছি। সকাল ন’টা বাজতে না বাজতেই ব্রেকফাস্ট সেরে আমরা বেরিয়ে পড়লাম হোটেল ছেড়ে। ভোপাল শহরটা খুব সাজানো গোছানো। আমরা ন্যাশনাল হাইওয়ে ধরে ফেললাম, শীতের কুয়াশা সবে সরতে শুরু করেছে।

আরও পড়ুন: মধ্যপ্রদেশ বৃত্তান্ত: মান্ডু

ভীমবেঠকা গুহাচিত্র এশিয়ার মধ্যে প্রাচীনতম আর পৃথিবীতে দ্বিতীয় প্রাচীনতম গুহাচিত্র। কিন্তু সাতসকালে গাড়িতে বসে সেইসব নিয়ে কথা হচ্ছিল না। কথা হচ্ছিল ভ্রমণ শেষে আমাদের গুহায় ফেরা নিয়ে। সেই যে ট্রেনে ওঠার আগের দিন জানতে পেরেছিলাম আমাদের ফেরার টিকিটের ঠিক নেই। তারপর তো নর্মদা দিয়ে কত জলই বয়ে গেল। সন্তু প্রথমে একটা টিকিট কেটেছিল সাতনা থেকে হাওড়ার কোনও একটা ট্রেনের। দু-দিন যেতে না যেতেই সে ট্রেন ক্যান্সেল। সিদ্ধান্ত নিলাম দিল্লি হয়ে ফেরার। গোয়ালিয়র থেকে দিল্লি ট্রেনে চেয়ার কার বুক হল। দিল্লি থেকে কলকাতা ফেরার জন্যেও টিকিট কাটা হয়েছিল এবং গতকাল জানা গিয়েছে, সেই ট্রেনও ক্যান্সেল হয়ে গেছে। এখনও আমাদের বাড়ি ফেরার ঠিক নেই। অবশ্য তার জন্যে যাত্রার আনন্দে ব্যাঘাত ঘটাব, এত বুদ্ধুও আমরা নই। সে দিল্লি পৌঁছে দেখা যাবেক্ষণ, এই ভেবে আমরা পথে মন দিলাম।

আরও পড়ুন: মধ্যপ্রদেশ বৃত্তান্ত: উজ্জয়িনী

অডিটোরিয়াম ও মাথার উপরে ঝুলন্ত পাথর

ভীমবেঠকা পৌঁছতে পৌঁছতে ভালোই বেলা হয়ে গিয়েছিল। ভোপাল পাঁচমরি হাইওয়ে ছেড়ে একটা ছোট রেললাইন পেরিয়ে ঢুকতে হয় ভীমবেঠকার জঙ্গলে। অবশ্য তেমন জঙ্গল নয় এখন, শীতকালীন পর্ণমোচী গাছের আধিক্য পাহাড়ের জঙ্গলকে ফাঁকা ফাঁকা করে দিয়েছে। ঢোকার মুখেই গেট আর পুলিশি প্রহরা। নাম ধাম লিখিয়ে, পরচা কেটে আমরা গাড়ি করে উঠতে শুরু করলাম পাহাড়ের উপরে। সেখানে প্রকৃতির খেয়ালে তৈরি হয়েছে পাথুরে গুহা। লক্ষাধিক বছরের বেশি সময় ধরে সেই গুহায় আশ্রয় পেয়ে এসেছে প্রায়মানব থেকে শুরু করে প্রাক্-মানবের গোষ্ঠী।

আরও পড়ুন: মধ্যপ্রদেশ বৃত্তান্ত: ইন্দোর

অডিটোরিয়ামের দেওয়ালের চিত্র সম্ভার

কয়েক কিলোমিটার জঙ্গল আর পাহাড়ি পথ বেয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম ভীমবেঠকা রকশেল্টার। বইতে পড়েছিলাম এখানে নাকি খুব পাহাড়ি মৌমাছির উৎপাত, প্রায় প্রতি বছরই নাকি মৌমাছির কামড়ে দু-তিন জন করে মানুষ মারা যায়। অবশ্য আমি আশপাশের জঙ্গলে কী গুহার ফোঁকরে কোথাওই মৌমাছির চাক দেখতে পেলাম না। হতে পারে শীতকাল, আশপাশের জঙ্গল ফাঁকা তাই হয়তো মৌমাছিরা অন্য কোথাও বাসা বাঁধতে গেছে, অথবা আজকাল ওখানে এত টুরিস্ট পার্টি যায় বলে হয়তো মৌমাছিদের উৎখাত করা হয়েছে।

এই পাহাড় জঙ্গলে প্রায় সাড়ে সাতশোর উপরে প্রাক্-মানুষদের গুহাবসতি ছিল। আমরা ঢুকে পড়লাম অডিটোরিয়াম হলের মধ্যে। দেখে অদ্ভুত লাগল, মনে হল কোনও এক প্রাচীনকালের এক দলপতি গলা তুলে বক্তৃতা করছে। আশপাশে নারীপুরুষ বাচ্চাকাচ্চার ভিড়। পাথরে পাথরে ধাক্কা খেয়ে সেই সদ্য আবির্ভূত শব্দরা খেলে বেড়াচ্ছে গুহাকন্দরে। তারপরে দেখলাম আঁকা ছবিগুলো। এতখানি বিস্ময় আমার জন্য অপেক্ষা করছিল, তা আমি সারাজীবনেও কখনও ভাবিনি।

আরও পড়ুন: মধ্যপ্রদেশ বৃত্তান্ত: গৌরচন্দ্রিকা

প্রকৃতির খেয়ালে কূর্ম অবতার

ভীমবেঠকার ছবি ইন্টারনেটে দেখতে পাওয়া যায়, কিন্তু ওই অনুভূতিটা পাওয়া যায় না। পথের উপরে দাঁড়িয়ে একটা কালচে ধূসর পাথরের গায়ে লাল রং দিয়ে আঁকা মানুষ, বাইসন, ঘোড়া আরও নানা রকমের চিত্র। তিরিশ হাজার বছর পুরনো চিত্র, কিন্তু মনে হচ্ছিল যেন কালই আঁকা! আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল। মানসচক্ষে দেখতে পেলাম হাজার হাজার বছর আগের ভীমবেঠকা। ঠিক এই সামনেটাতেই দাঁড়িয়ে এক মেয়ে। আমারই মতো বেঁটেখাটো, কালোকোলো, কোঁকড়া চুল আর থ্যাবড়া নাক। পরনে গাছের বাকল, হাত ঘষে ঘষে সে মনের আনন্দে চিত্র ফুটিয়ে যাচ্ছে এক প্রাচীন সমাজের।

ইতিহাসের পাতা থেকে

আমরা প্রায় খান পনেরো সাইট দেখলাম। বর বিয়ে করতে যাচ্ছে, দলপতি ঘোড়ায় চেপে যাচ্ছে, অনেক মানুষ বাদ্যি বাজাচ্ছে, নৃত্যরত মানুষের দল, হাতে বর্শা মানুষ, পশুশিকার, যোদ্ধা— অনেক ধরনের ছবি। কিছু অতি প্রাচীন কালের, কিছু পরবর্তী যুগের। সবথেকে পুরনো ছবিটা প্রায় তিরিশ হাজার বছরের, আর সবথেকে নতুনটা বৌদ্ধযুগের। হলুদ আর সাদায় আঁকা সেই ছবি। পুরনো যুগের ছবিগুলো লাল রং দিয়ে আঁকা। লাল রংটা কেন সহজলভ্য ছিল আর কী করেই বা এত বছর টিকে গেল, তা গাইড বলেছিল বোধহয়। কিন্তু এখন আর সে কথা মনে পড়ছে না। প্রাচীনকালের ছবিগুলোর মধ্যে একটা ছবি খুব বিখ্যাত, ছোটবেলায় ইতিহাস বইতেও ছিল ওই ছবিটা। একটা বিশাল আকৃতির বন্য বরাহের মতো প্রাণী একটি ক্ষুদ্র মানুষকে তাড়া করেছে। ছবিটা অনেকখানি উপরে পাহাড়ের গায়ে অদ্ভুত একটা জায়গায় আঁকা। কী করে পৌঁছল মানুষ ওখানে!

বিচিত্র চিত্র সম্ভার

শুধু ছবিই নয়, প্রকৃতির অদ্ভুত কারুকার্যও ছড়িয়ে আছে সম্পূর্ণ এলাকাটা জুড়ে। সাইট শুরুর মুখেই একটা পাঁচতলা বাড়ির সমান বিশালাকায় পাথর। সেই পাথর পরীক্ষা করে দেখা গেছে, তা নাকি কোনও এক কালে সমুদ্রের তলায় ছিল। এই জায়গাটা সমুদ্রের তলায় ছিল! প্রথমেই দেখেছিলাম অডিটোরিয়াম হলটা, তারপর কচ্ছপ আকৃতির একটা পাথর, আর একটা অদ্ভুত গাছ। কালচে রঙের গাছের কোটর থেকে সাদা রঙের অন্য এক প্রজাতির গাছ বেরিয়েছে। কালো মায়ের সাদা সন্তান। এরকমই নাম দিয়েছে গাছটার।

গাইড আমাদের ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সব দেখিয়ে দিল। একটু তাড়াহুড়ো করছিল। কোনও এক বিদেশি পার্টি এসেছে। গাইড ছেড়ে দেওয়ার পর আমরা নিজেরাই ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম এদিক-ওদিক। বেশ জায়গাটা। জানি না সেই প্রাচীনকালে কতখানি গভীর ছিল এখানকার জঙ্গল, তবে আজও বাঘ আছে আশপাশের জঙ্গলে। একটা বনবিভাগের গ্রুপ ঘুরতে এসেছে। তাঁরা বাঘের হিসাব করছিল। আমরা অবশ্য বাঁদর আর কাঠবিড়ালি ছাড়া অন্য কোনও জানোয়ার দেখতে পেলাম না।

পর্ণমোচী বৃক্ষের জঙ্গল

দেড়টা বাজার আগেই আমরা বেরিয়ে পড়লাম ভীমবেঠকা ছেড়ে। কিছুক্ষণ পরেই খাবার জায়গা পেতে আমরা কোনওমতে মধ্যাহ্ন ভোজনটা চুকিয়ে নিলাম। খালি পেটে ওঙ্কারেশ্বর ঘোরার বেদনা তখনও বেশ টাটকা হয়ে খোঁচাচ্ছিল।

আমাদের পাঁচমরি যেতে হবে। এখনও একশো কিলোমিটারের বেশি রাস্তা বাকি। মধ্যপ্রদেশের হাইওয়েগুলো ভীষণই ভালো। গাড়ি একেবারে হু-হু করে ছুটে চলল। রাস্তায় নর্মদা নদী পড়ল। এখানে নর্মদায় জলই নেই। ওঙ্কারেশ্বরের ওখানে বাঁধ দিয়ে নর্মদার জলস্তর ঠিক রাখা হয়। এখানে বিস্তীর্ণ বালুকাবেলা আর এক ফালি শীর্ণ জলরেখা। পাড় থেকে বালি তোলার জন্য বেশ কিছু লরি আর মানুষ দেখলাম। বালি তুলে লরি বোঝাই করে যাচ্ছে শহরের বাড়িঘর তৈরির জোগান।

পাঁচমরির আনন্দোৎসব

দেখতে দেখতে সন্ধে নামার আগেই আমরা পৌঁছে গেলাম পাঁচমরি। আজ ২৫ ডিসেম্বর সেকথা ভুলেই গেছিলাম। পাঁচমরিতে ঢোকার আগেই গাছে গাছে উৎসবের বার্তা। শহরের ঢোকার মুখটা বেশ সুন্দর করেই সাজিয়েছে। এবারের হোটেলটা আমরা ভালোই পেয়েছি। একদম রাস্তার মুখেই। রাত্রে বেশ মজা হল। ২৫ ডিসেম্বরে পুরো পাঁচমরি মেতে উঠেছে। বিশাল মিছিল বেরিয়েছে। অনেকগুলো ট্যাবলয়েড সাজিয়ে ছেলেমেয়েরা সেজেগুজে নাচতে নাচতে চলছে। অনেক ধরনের অভিনয় করছে। আমাদের হোটেলটা বড় রাস্তার উপরে হওয়ায় আমরা বেশ মজা করে দেখলাম। প্রায় এক ঘণ্টার শোভাযাত্রা। ২৫ ডিসেম্বরে পাঁচমরিতে এত উৎসব হয় জানা ছিল না। এ আমাদের উপরি পাওনা।

রাত গভীর হয়ে এলো। মানুষ ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে, আমি অতীতের স্বপ্ন দেখতে দেখতে ঘুম গেলাম।

ক্রমশ…

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *