মধ্যপ্রদেশ ভ্রমণ বৃত্তান্ত (অষ্টম পর্ব) – কানহা ন্যাশনাল পার্ক

অঙ্কিতা

মধ্যপ্রদেশ অরণ্য অধ্যুষিত রাজ্য। যে অরণ্য শুরু হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া-পুরুলিয়া অঞ্চলে, তা-ই ক্রমে বিহার ও ওড়িশা হয়ে বিস্তার লাভ করেছে ছত্তিশগড় ও মধ্যপ্রদেশে। ছত্তিশগড় বাদ দিলেও মধ্যপ্রদেশের প্রায় ১২% এলাকা জুড়ে আছে ঘন অরণ্য। শুধু মধ্যপ্রদেশেই মোট এগারোটা ন্যাশনাল পার্ক আর পঁচিশটা স্যাংচুয়ারি আছে। এদের মধ্যে বিখ্যাতগুলো হল কানহা, বান্ধবগড়, পান্না, সাতপুরা ইত্যাদি। উপরোক্ত ন্যাশনাল পার্কগুলো বাঘের জন্যে বিখ্যাত। কানহা অরণ্য-অঞ্চলটি চিল্পি রেঞ্জের বেশ কাছে। বাঘের সংখ্যা এখানেই সবথেকে বেশি। সেই আশাতেই কানহাকে বেছে নিয়েছিলাম ন্যাশনাল পার্কের তালিকার মধ্যে থেকে।

আরও পড়ুন: মধ্যপ্রদেশ বৃত্তান্ত (৭) – পাঁচমারি

পাঁচমারি ছাড়িয়ে

বান্ধবগড়ও বেশ পুরনো ও সমৃদ্ধ ন্যাশনাল পার্ক। কানহা আর বান্ধবগড় দু’টো জায়গাই জব্বলপুর থেকে যাওয়া যায়। দু’টোই জব্বলপুর থেকে একশো ষাট-সত্তর কিলোমিটার দূরে। জব্বলপুর রেলের মাধ্যমে ভারতের বড় বড় শহরগুলোর যুক্ত। কানহা ঢুকতে ঢুকতে বিকেল গড়িয়ে গেল। যথেষ্ট সকালেই পাঁচমারি থেকে বেরিয়েছিলাম। আগেরদিন হোটেলে বলেও রেখেছিলাম সকাল সকাল আমরা ব্রেকফাস্ট করব। কিন্তু আর পাঁচটা শৈলশহরের মতো পাঁচমারিরও ঘুম ভাঙতে কিঞ্চিৎ বেলা হয়। তবু ন’টা বাজতে না বাজতেই সব কিছু মিটিয়ে দিয়ে হোটেল ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছি আমরা। পাঁচমারি থেকে কানহা তিনশো কিলোমিটারেরও বেশি পথ। সূর্য ডুবিয়ে তবে আমরা কানহার হোটেলে ঢুকতে পেরেছিলাম।

আরও পড়ুন: মধ্যপ্রদেশ বৃত্তান্ত (ষষ্ঠ পর্ব) – ভোপাল ভীমবেঠকা

মধ্যপ্রদেশের হাইওয়েতেও প্রায়ই দেখা যায় এরকম দৃশ্য

পাঁচমারি ছাড়তে ইচ্ছা করছিল না, কত কিছুই তো দেখা হল না; অন্যদিকে আবার কানহার অরণ্য হাতছানি দিয়ে ডাকছিল। বাঘমামা ডোরা জামা গায়ে দিয়ে গহীন অরণ্যে কোথায় হামা দিয়ে বেড়াচ্ছেন, সেই সব না দেখলে চলে? এই দীর্ঘ তিনশো কিলোমিটার রাস্তাতে একটা জিনিসেরই বেশ অভাব, সেটা হল ভালো পরিচ্ছন্ন রেস্তরাঁ। বারোটা বাজতেই আমরা মোবাইলে রেস্তরাঁ খুঁজতে শুরু করলাম। ধু-ধু মাঠ, খাপছাড়া পাতাঝরা গাছের জঙ্গল, রুক্ষ অনাবাদী জমি ছাড়া কিছুই নেই। অতিকষ্টে একটা ছোটখাটো শহরে পৌঁছনো গেল। কিন্তু সেখানে আমাদের মনমতো কোনও রেস্তরাঁ খুঁজেই পেলাম না। গুগল ম্যাপ জানাল কিছু দূরে একটা ভালো রেস্তরাঁ আছে। কপাল ঠুকে বেরিয়ে পড়লাম শহর ছেড়ে।

প্রায় আধ ঘণ্টা যাওয়ার পরে রিসর্টটার দেখা পেয়েছিলাম। ওটা ভুয়ো হলে আমাদের কপালে সেই দিন দুঃখ ছিল, কারণ ওই রাস্তায় পরবর্তী দু-ঘণ্টা একটা ভুট্টা কী চায়ের দোকানও চোখে পড়েনি আমার। তোফা খাওয়াদাওয়া সেরে আবার পথ চলা শুরু।

আরও পড়ুন: মধ্যপ্রদেশ বৃত্তান্ত (ষষ্ঠ পর্ব) – ভোপাল ভীমবেঠকা

কানহার জঙ্গলে বার্কিং ডিয়ার

এই রাস্তা ধরে চললে স্পষ্টতই বোঝা যায় মধ্যপ্রদেশে কীভাবে অরণ্যভূমি ধ্বংস করে মাইলের পর মাইল চাষের জমি বানানো হয়েছে। শুনেছি মধ্যপ্রদেশের বর্তমান তীব্র জলসংকটের কারণও এই অরণ্যভূমির উৎখাত। আগে পাঁচমারি থেকে কানহা পর্যন্ত পুরো রাস্তাটাই ঘন অথবা মধ্যম জঙ্গলাকীর্ণ ছিল। আজ সেই রাস্তা ধরে গেলে শুধুই রুক্ষ ধূসর নগ্ন লালমাটি চোখে পড়ে। বইতে পড়েছি, স্বাধীনতার সময়েও সেই অমরকণ্টক থেকে শুরু করে ওমকারেশ্বর পর্যন্ত ভয়ানক ঘন জঙ্গল-অধ্যুষিত ছিল এই স্থান। মধ্যে মধ্যে ছিল অরণ্যেরই পুত্রকন্যা ভিল, গোন্ড, খোন্ড, বৈগা, বারেলস, কনজর প্রভৃতি বিভিন্ন প্রজাতির আদিবাসীদের গ্রাম। ক্রমে জঙ্গল উচ্ছেদ হতে হতে সেই গ্রাম এবং প্রজাতিগুলোও হয়তো আজ হারিয়ে গেছে অথবা জঙ্গলের সঙ্গে সঙ্গেই তারা ক্রমে সরে গেছে অমরকণ্টকের দিকে। 

আরও পড়ুন: মধ্যপ্রদেশ বৃত্তান্ত (ষষ্ঠ পর্ব) – ভোপাল ভীমবেঠকা

কানহার নদী

বিকেল চারটে নাগাদ আমরা হাইওয়ে ছেড়ে গ্রামের রাস্তায় ঢুকলাম। কানহা অরণ্য অঞ্চলটা বেশ বিস্তীর্ণ। ছড়ানো ছিটানো টাইপের। ভ্রমণের গল্প বলার আগে কানহা জঙ্গল সম্পর্কে কিছু কথা বলা যাক। সম্পূর্ণ কানহা জঙ্গলকে চারটে কোর এরিয়া (কানহা, কিসলি, মুক্কি, সারহি) এবং চারটে বাফার এরিয়ায় (খাতিয়া, খাপা, ফেন, সিজোরা) ভাগ করা হয়েছে। বুঝতেই পারছেন কোর এরিয়ায় বাঘ দেখার চান্স বেশি আর বাফার এরিয়া মানে বিড়ালের ভাগ্যে শিকে ছেঁড়া।

এই আটটা এরিয়ায় যাওয়ার জন্য মোট তিনটে গেট। খাতিয়া, মুক্কি আর সারহি। প্রত্যেকটা জোন বা এরিয়ার টিকিট অনলাইনে কেনা যায়। প্রতিদিন সকালে আর বিকেলে জঙ্গলে ঘোরার স্লট থাকে। একটা গেট থেকে অন্য গেটে যাওয়ার জন্য ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট থেকে গাড়ির ব্যবস্থা আছে, নিজস্ব গাড়িতেও যাওয়া যায়, কোনওরকম পারমিট ইত্যাদি লাগে না। জঙ্গলের ভিতরে ঘোরার জন্যে অবশ্যই ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের গাড়ি ছাড়া সম্ভব নয়। আমরা যখন গেছিলাম এক-একটা গাড়িতে ছয় জন করে যেতে পারত। 

আরও পড়ুন: মধ্যপ্রদেশ বৃত্তান্ত: উজ্জয়িনী

কানহার জঙ্গলে গ্রে লেঙ্গুর

প্রায় চার মাস আগে টিকিট কাটা সত্ত্বেও আমরা মুক্কি গেটের কাছের বাফার জোনের টিকিট আমরা পেয়েছিলাম। কিন্তু হোটেল পেয়েছিলাম খাতিয়া গেটে। বড় হাইওয়ে ছেড়ে কিছুদূর যেতেই জঙ্গল চলে এলো। চলে এলো চাকার তলায় পিচ রাস্তা। কানহা প্রথমেই আমাদের অভ্যর্থনা জানাল এক পাল হরিণ দেখিয়ে। আমাদের ড্রাইভার দাদাই প্রথম দেখলেন। ধীরে ধীরে গাড়ি থামিয়ে দিলেন। হরিণগুলো পাশেই জঙ্গলের মাঝে ঘাস খাচ্ছিল। দু’টো মদ্দা আর ডজনখানেক মাদি হরিণের বড়সড় একটা দল।

আরও পড়ুন: মধ্যপ্রদেশ বৃত্তান্ত: ইন্দোর

রিসর্টের গেট, পরেরদিন সকালে তোলা

সূর্য প্রায় ডুবতে বসেছে তখন আমরা সরু নদীটা পার করলাম। সামান্য দু-চারটে হোটেল আর দোকান ইত্যাদি। গ্রামের মধ্যে দিয়ে রাস্তা, যখন হোটেলের সামনে দাঁড়ালাম, তখন নিজের মনের মধ্যেই কেমন একটা সন্দেহ জাগল। হোটেলটা কোথায়? এ তো প্রায় দেড়-দু-মানুষ উঁচু মাটির মোটা দেওয়াল। জঙ্গলের মধ্যে কীরকম কী হোটেল হবে এইসব ভেবেচিন্তে কানহাতেই সবথেকে বেশি টাকা খরচ করেছি আমি হোটেল বুকিংয়ে। সেখানে হোটেলের কোনও বিল্ডিংই যে দেখা যায় না। মাটির পাঁচিলের ওপাশ থেকে খড়ের ছাউনি উঁকি মারে যে। মা আমার দিকে একবার কটমট করে তাকাল। যা থাকে কপালে বলে আমি ঢুকে পড়লাম।

আরও পড়ুন: মধ্যপ্রদেশ বৃত্তান্ত: গৌরচন্দ্রিকা

রিসর্টের বাগানে

উঠোন, ছাউনি ঘেরা দাওয়া, করিডোর দিয়ে গিয়ে যখন হোটেলের ভিতরে গিয়ে দাঁড়ালাম তখন বেশ চমকে গেলাম। এটা তো হোটেল নয়, এ তো রিসর্ট; সবথেকে ভালো হয় একে পান্থনিবাস বললে। ছোট ছোট অজস্র একতলা ঘর গাছের আড়ালে আড়ালে উঁকি মারছে। বাগানের মধ্যে দিয়ে হেঁটে হেঁটে আমাদের ঘরের দিকে গেলাম। বাইরের থেকে মাটির দেওয়াল, খড়ের ছাউনি। ভিতরে পাকা মেঝে, পরিষ্কার বড় ঘর, সুন্দর করে সাজানো। সম্পূর্ণ জায়গাটা উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা যাতে করে জীবজন্তু আচমকা ঢুকে চলে আসতে না পারে। জঙ্গলের এত কাছে এরকম একটা পান্থনিবাস পেয়ে, মনটা ভালো হয়ে গেল।

জঙ্গলে পায়ে হেঁটে বাঙালি বীরপুঙ্গবের দল

পরের দিন বিকেলের স্লট বুক করা ছিল আমাদের জঙ্গলে ঘোরার জন্য। সকালটা পুরো ফাঁকা। অবশ্য আগের দিনের সারাদিনের জার্নিতে সবাই একটু কাহিল হয়ে পড়েছিল, তবু ভোরবেলা একটা ওয়াকিং ট্যুর বুক করলাম হোটেল থেকে। বলা বাহুল্য, কানহায় একমাত্র খাতিয়া গেটেই ওয়াকিং ট্যুর পারমিট করে।

মধ্যপ্রদেশের ঠান্ডা আমরা প্রথম অনুভব করলাম কানহায়। সামনে জঙ্গল থাকার জন্যই হোক বা অন্য কারণে কানহায় কাটানো দুই রাত্তিরে অসম্ভব ঠান্ডা পড়েছিল। মায়েরা হোটেলওলাকে বলে এক্সট্রা কম্বলও নিয়েছিল। সকালবেলা ঠান্ডায় দাঁত ঠকঠক করতে করতে আমরা চার জন হোটেল থেকে বেরিয়ে পড়লাম। একটা বাচ্চা গাইডের ভরসায় বনজঙ্গলের মধ্যে দিয়ে হাঁটা শুরু হল। হোটেল থেকে মাত্র পাঁচশো মিটারের মধ্যেই জঙ্গল শুরু হয়ে গেছে। হালকা কুয়াশায় ঢাকা গাছপালা। ক্ষণে ক্ষণে পাখি ডাকছে। এর আগে কখনও জঙ্গলে পায়ে হেঁটে ঘুরিনি। তায় যেখানে বাঘের ভয়। পথ চলতে চলতে বাবা একটা গাছের লম্বা ডাল কুড়িয়ে নিল। জানাল, বাঘ এলে এক ঘা কষিয়ে তারপর পেটে যাব।

রিসর্টের পিছনের ঘন জঙ্গল

বাঘ আসেনি। এলে কী হত তার কোনও ধারণা আমার নেই। আমাদের চ্যাংড়া গাইড নির্ঘাত তিন লাফে কোনও গাছে উঠে যেত। আর বাকিরা সবাই বাঘের পেটে যেতাম। বাঘ না থাকুক, সেই দিন জঙ্গলে ঘুরতে ঘুরতে আমি অনুভব করছিলাম স্নায়ুগুলো যেন ক্রমে টানটান হয়ে যাচ্ছিল। ওই পাথর, ওই ছোট্ট টিলা কী ওই ঝোপটার পিছনেই হয়তো সেই হলুদ ডোরাকাটা। অথবা, অন্য কোনও পশু। অথবা, সাপ। ঝরা পাতার উপর দিয়ে হাঁটতে গেলেই খচরমচর শব্দ হচ্ছিল। যতটা পারা যায় সাবধানে পা ফেলছিলাম। যদি কপাল গুণে কালকের মতো হরিণের পালও দেখা দেয়। নাহ, প্রায় ঘণ্টা দেড়েক জঙ্গলে ঘুরেও কেউ দেখা দিল না। এতক্ষণে গাঁয়ে ফেরার পায়েহাঁটা রাস্তাও পেয়ে গেলাম। ফেরার পথে একটা কচি শিয়াল ঝোপঝাড় থেকে উঁকি দিয়ে চারটে শহুরে বাবু-বিবিদের দেখল কিছুক্ষণ মন দিয়ে। তারপর বড়সড় একটা ভেংচি কেটে ছুটে ফিরে গেল নিজের ঘরে।

ভোরের জঙ্গলে পশুপাখিরা

দুপুরে খেয়েদেয়ে আমরা ছুটলাম মুক্কি গেটের উদ্দেশে। রাস্তাটা অনেকটাই জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে। মাঝেমাঝে কিছু মাটির বাড়ি দেখতে পাচ্ছিলাম। মুক্কি গেট থেকে জিপ নিয়ে প্রায় আধ ঘণ্টা হাইওয়ে দিয়ে গিয়ে ঢুকে পড়লাম জঙ্গলে। বাঘ মামার দেখা না পেলেও ছোটবড় মিলিয়ে যথেষ্ট পশুপাখির দেখা পেলাম। একটা বন্য শুয়োরের দল দেখলাম, রীতিমতো হিংস্র টাইপের। জিপে না থাকলে ওদের ওই হাতখানেকের দাঁত দিয়ে আমাদের ফেঁড়ে ফেলতে বেশি সময় লাগত না তাদের। বার্কিং ডিয়ার, স্পট ডিয়ার আর চিঙ্কারা বা গ্যাজেল ডিয়ারের দল দেখলাম। বাঘ মামার চরণচিহ্ন দেখলাম একগাদা। সবথেকে সুন্দর যাকে দেখলাম, সে হল একটা মদ্দা বারশিঙ্গা। বিশাল আকৃতির হরিণ, ছড়ানো ডালপালার মতো তার শিঙের বাহার। পথের উপর রাজকীয় ভঙ্গিতে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি।

মুক্কির বাফার জোনে

গন্ধ, শব্দ, বর্ণে জঙ্গলটা ঝিমঝিম করছিল। অদৃশ্য এক তরঙ্গ যেন বারংবার ছুঁয়ে যাচ্ছিল আমাদের। গাছের ঘন বুনোট ভেদ করে বৈকালিক সূর্যের আলো ঠিক স্পটলাইটের মতো এসে পড়েছিল বারশিঙ্গাটার উপরে। জঙ্গলের দেবী ঠাকুরানির বাহন কী এরকমই দেখতে হয়! এই দার্ঢ্য, এই অপরিসীম ঔদ্ধত্য, এই লীলাময় সারল্য; এ তো সাধারণ জন্তুর হতে পারে না। কৃপা করার মতোই বারশিঙ্গা একবার তার বিশালাকায় ঘাড়টি ঘুরিয়ে আমাদের দিকে দৃকপাত করল। দেখল শহুরে মানুষদের আদেখলামি, বোধহয় খানিক বিরক্ত হয়েই ঠুক-ঠুক করে লম্বা লম্বা পায়ে ঢুকে পড়ল জঙ্গলে। আমাদের জিপের গাইড ফোনে অন্য জিপের গাইডদের বারশিঙ্গার অবস্থান জানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। ফালি রোদটা তখন সরু পথের উপর চিক চিক করছিল যেন এক স্বপ্নের মতো।

কানহার বিখ্যাত বারশিঙ্গা

বাঘ আমাদের দেখা হয়নি। হোটেলের অন্য বাসিন্দাদের থেকে খবর নিতে গেছিলাম, বিশেষ করে যে গ্রুপগুলো কানহা কোর রিজিয়নে টিকিট পেয়েছিল। দুর্ভাগ্যবশত কেউই বাঘের টিকি দেখতে পায়নি। হোটেলের ম্যানেজার জানালেন, বিগত এক সপ্তাহ ধরেই গোটা কানহা রিজিয়নেই বাঘের একটাও স্পট হয়নি। কে জানে বাঘেরাও হয়তো ক্রিসমাসের ছুটিতে ছুটি নিয়ে জঙ্গলের আরও গভীরে পালিয়ে গেছে। মধ্যপ্রদেশের ন্যাশনাল পার্কে বাঘ দেখতে আসার মূল সময় হল গরমকাল। প্রকৃতি তখন প্রচণ্ড উচ্চমেজাজে থাকলেও বাঘ মামার দর্শন মেলে। গরমকালে সাধারণত জঙ্গলের মধ্যে জলাশয়, খাল ইত্যাদি একেবারেই শুকিয়ে যায়। তখন দু-চারটে জলাশয় যেখানে জল থাকে সেইসব জায়গায় অন্যান্য পশুপাখি সমেত বাঘেরাও আসে জলকেলি করতে।

জঙ্গলে সূর্যাস্ত

হোটেলে ফিরে আসতে আসতে রাত হয়ে গেল। বারশিঙ্গাটা আমার মনপ্রাণ ভরিয়ে রেখেছিল। সারারাত তার পিঠে চেপেই কোনও এক অরণ্য অধ্যুষিত প্রাচীন ভারতের পথে পথে ঘুরে বেড়ালাম। স্বপ্নের সেই গহন বনজঙ্গলের স্বাদ আজকের এই জিপে করে ঘোরা ন্যাশনাল ফরেস্টের শিডিউলড ট্যুর কখনোই দিতে পারবে না। পরের দিন যেতে হবে জব্বলপুর। আমাদের ট্যুরের মধ্যবিন্দু। জঙ্গলের বিচিত্র সব আওয়াজ শুনতে শুনতে কম্বলের ওমে ডুবে ক্রমে হারিয়ে গেলাম ঠাকুরানির দেশে।

ক্রমশ…

ছবি: লেখক

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *