‘কেউ ভোলে না কেউ ভোলে’ (অন্তিম পর্ব)

প্রণব বিশ্বাস

সম্পর্কের টানাপোড়েনে কোনও তরফেই কথা আর এগোয়নি। তাছাড়া সমাধি হয়ে যাওয়ার পর মৌখিক ক্ষোভ প্রকাশ ছাড়া আর কী-ই বা করার ছিল। সেদিনের সভা শেষ হয়েছিল বসন্ত চৌধুরির কবিতাপাঠে। কী ভালো যে পড়েছিলেন, সেই শ্রবণস্মৃতিও অক্ষয় হয়ে আছে আমার মনে।

আরও পড়ুন: ‘কেউ ভোলে না কেউ ভোলে’ (প্রথম পর্ব)

ঢাকায় যাঁরা গেছেন, তাঁরা সকলেই মুক্ত কণ্ঠে বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিসৌধ ঢাকার অন্যতম দ্রষ্টব্য এখন, অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে তা সুরক্ষিত। হবে নাই বা কেন? তাছাড়া শুনতে পাই, ঢাকায় এখন খ্যাতকীর্তিদের ছেড়ে আসা বাসস্থান, জিনিসপত্র যেখানে যেটুকু পাওয়া যাচ্ছে সেটুকু সংরক্ষণ করা হচ্ছে। অবশ্যই এ এক মহতী উদ্যোগ। ইতিহাসের প্রতি দায়িত্ববোধের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মাত্র ক’দিন আগে দীপেশ চক্রবর্তীর কথনে শুনছিলাম ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কীভাবে রক্ষা করা হয় ইতিহাসের উপাদান। আমাদের এ শহরে বিশিষ্টজনদের বাড়ি ভেঙে বহুতল নির্মাণের খবর খবরের কাগজে বেরোয় মাঝেমাঝে। দু-একটি চিঠিপত্র বেরোয় কিংবা বেরোয় না, আমরা বেমালুম উদাসীন থাকি, থাকতে ভালোবাসি। বকুলবাগানে রাজশেখর বসুর বাড়ি কেউ চিহ্নিত করতে পারবেন না। ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে প্রেমেন্দ্র মিত্রের, ছবি বিশ্বাসের বাড়ি, আরও কত কিছুই। শতবর্ষে শোনা গেল হেমন্ত মুখোপাধ‍্যায়ের গানের খাতা, ব‍্যবহৃত হারমোনিয়াম, বইপত্র কোনও কিছুরই নাকি সন্ধান নেই। বছর কুড়ি আগে সুভাষ মুখোপাধ্যায় বাংলা আকাদেমির কাছে অনুরোধ ‌করেছিলেন, অন্তত কলকাতা ও সন্নিহিত অঞ্চলে যেসব বাড়িতে লেখকেরা বসবাস করেছেন, সেসব বাড়ি চিহ্নিত করে ফলক লাগানো হোক। একইভাবে নাট‍্য ও সঙ্গীত আকাদেমি নিজের নিজের ক্ষেত্রে এই কাজটা করুক। কেউ কান দেয়নি, তখনো দেয়নি, এখনও দিচ্ছে না। বেহালা ব্রাহ্মসমাজ ধ্বংসের মুখে, অনেক চিঠিচাপাটির নিট ফল শূন্য। অথচ এখানে দ্বিজেন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ তো বটেই, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথও এসেছেন বলে শোনা যায়। শানু লাহিড়ী একবার একটা ম‍্যাপ তৈরি করেছিলেন, সেই ম‍্যাপে দেখানো হয়েছিল কলকাতার দক্ষিণ অঞ্চলে লেখক, কবি, চিত্রকর, গায়ক, নৃত‍্যশিল্পী, অভিনেতাসহ সৃষ্টিশীল মানুষেরা কে কোথায় থাকেন।

আরও পড়ুন: গোষ্ঠ পালের ইন্টারভিউ: স্মৃতিমেদুর রূপক সাহা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অবস্থিত জাতীয় কবি কাজী নজরুলের সমাধি

এতসব কথা এসে পড়ল নিছক কথার টানে, স্মৃতিরক্ষা, ইতিহাসের দায় ইত্যাদি প্রসঙ্গে। একটা গল্পের কথা মনে এল প্রসঙ্গত। বলছি গল্প, আসলে ঘটনা, হীরেনবাবুর কাছে শোনা। হিন্দু মুসলমান সম্পর্ক নিয়ে এক আলোচনায় কলকাতার তৎকালীন মেয়র আব্দুর রহমান সিদ্দিকী (সম্ভবত) বলেছিলেন একজন মুসলমানের কাছে এই দেশ অনেক বেশি আপনার কেন-না মৃত্যুর পরেও তার শরীর এই দেশের মাটিতেই মিশে থাকে, আগুনে পুড়ে তার‌ দেহ ছাই‌ হয়ে শূন্যে মিলিয়ে যায় না। কথাটায় তর্কের অবকাশ থাকলেও আবেগের গভীরতা মিথ্যে হয়ে যায় না। নজরুলের আত্মজনদের ইচ্ছের বিরুদ্ধে তাঁর পার্থিব শরীর মিশে গেল ভিন দেশের মাটিতে। যদিও তিনি তখন সেদেশের সম্মাননীয় নাগরিক। কিন্তু ‘এই দেশেতে জন্ম যেন এই দেশেতে মরি’র যে দুর্মর অভিলাষ মানুষের চিরায়ত তার কী হবে? ইদানীং অবশ্য কবির তৃতীয় প্রজন্মকে গৃহীত ব্যবস্থার পক্ষেই কথা বলতে শুনি। এক পুরুষ ফাঁকে চিন্তার গতি নতুন পথ খোঁজে। এছাড়া যে গরিমা তাঁর অন্তিমশয্যা ঘিরে বা ধানমণ্ডির বাড়ির যে প্রাচুর্য কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গ কোনোদিনই তেমন ব্যবস্থা করে উঠতে পারেনি, এই না পারার লজ্জাদংশন আমাদের ভবিষ্যৎ সঙ্গী হয়ে রয়ে গেল। এটা না মেনে উপায় নেই।

ধানমণ্ডির ‘কবি ভবন’। এখন যা নজরুল ইনস্টিটিউট

নজরুলের কথা এলে বিস্মৃত এক মানুষ এসে হঠাৎ মনের দরজায় টোকা দিতে থাকেন। ফর্সা, একটু বেশি ফর্সা যেন, সুন্দর মুখশ্রীই হবে, নাম রমাপ্রসাদ, এটুকুই,  এরপর আর কিছু মনে করতে পারি না। তিনি আমার অতি ছোটবেলায় ‘লিচুচোর’, ‘খুকু ও কাঠবেড়ালি’ শুনিয়ে মন জয় করে নিয়েছিলেন। আর অতি সন্তর্পণে আমার কানে একটা মন্ত্র গুঁজে দিয়েছিলেন যে, রবীন্দ্রনাথের চেয়ে নজরুল অনেক বড় কবি। যদিও তখন এ-দু’জনের কারও সঙ্গেই আমার সামান্য পরিচয়ও নেই। কথাটা হয়তো মনের অবচেতনে চিরদিনই মুখ লুকিয়ে থেকে যেত, যদি না সাম্প্রতিক সময়ে এক বন্ধু কথাটা আমার কাছে নতুন করে না পাড়তেন। তিনি অবশ্য সঙ্গে আরো একটা নাম জুড়ে দিয়েছেন, শরৎচন্দ্র।

প্রশ্নটা নতুন কিছু নয়, ভালো লাগা না-লাগার সূত্রে আমরা সবকিছুই ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের মতো করে দেখতে চাই আর ভালোও বাসি। তুলাদণ্ড একটা হাতে থেকেই যায়। তাঁর প্রশ্ন খুব সোজা, সরলও বটে। জিজ্ঞাসার অন্তরমহলে দলীয়তার সিলমোহর শনাক্ত করতেও অসুবিধে হয় না। তিনি বেশ সরলভাবেই জিজ্ঞেস করলেন, রবীন্দ্রনাথ যে খুব বড় সে তো সবাই জানে। তবে তিনি কি নজরুল-শরৎচন্দ্রের চেয়েও বড় এ-বিষয়ে একদিন আপনার কাছে শুনব। এইসব প্রশ্ন শরৎচন্দ্র-নজরুল পর্যন্তও পৌঁছেছে, তাঁরা এর উত্তরও দিয়েছেন নিজের মতো করে। আবেগে থরোথরো মানুষ নজরুল। তখন তিনি হুগলি জেলে বন্দি। সহবন্দিরা একদিন তাঁকে কথাটা বললেন, তখন তাঁরা জেলখানার মাঠে আড্ডায় মেতেছিলেন, কথাটা শুনে তিনি দৌড়ে গিয়ে গোলপোস্টের বাঁশ তুলে এনে কমরেডদের বলেছিলেন দ্বিতীয়বার কখনও কথাটা বললে বাঁশ দিয়ে মাথা গুঁড়িয়ে দেবেন।

নজরুলকে আমি মাত্র একবারই দেখেছি। রাজ‍্য সরকার একসময় পঁচিশে বৈশাখের মতো‌‌ এগারো জ‍্যৈষ্ঠতেও রবীন্দ্র সদনের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠানের আয়োজন করত। একবার কাগজের বিজ্ঞপ্তিতে দেখেছিলাম সেবারের অনুষ্ঠানে কাজী নজরুল ইসলাম উপস্থিত থাকবেন।

কবিতীর্থ চুরুলিয়ায় | 638449 | কালের কণ্ঠ | kalerkantho
চুরুলিয়ার কবিতীর্থ

নজরুল বস্তুত জীবন্ত এক কিংবদন্তি। তাঁকে নিয়ে কত গল্প চারদিকে ছড়ানো। তাঁর অসুস্থতা নিয়েও কথার শেষ নেই। পাড়ার ক্লাবেরা তখন সরকারি অনুদানে পুষ্ট ছিল কিনা জানি না, তবে সামাজিক দায়িত্ব পালনের নানান কাজে সদা সর্বদাই তাদের দেখা যেত। এরমধ্যে ‌সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো ছিল ছোটদের নিয়ে নানান কর্মকাণ্ড। ড্রিল, ব্রতচারী, অন্যরকমের খেলাধুলা ছাড়াও বড় আকর্ষণের আর একটি জিনিস ছিল ক্লাবব্যান্ড। ব্যাগপাইপ নামের মজাদার এক বাদ্যযন্ত্র ছিল, থাকত বাঁশি আর ড্রাম। যখন শোভাযাত্রা বেরোত, সে হত বড় আকর্ষণের। সাদা প‍্যান্ট, শার্ট, জুতোয় সুসজ্জিত সবাই। এর ওপর তেরছা করে জড়ানো বস্ত্রখণ্ড কখনও বাঘছালসদৃশ বা অন‍্য কোনও সুদৃশ‍্য চিত্রণে চিত্রিত। প্রতিটি ক্লাবের বস্ত্রখণ্ড ভিন্ন, তাতেই ক্লাবের পরিচিতি। প্রতি দলের মধ্যে আছে শোভন প্রতিযোগীর মনোভাব, কার যাত্রীসংখ‍্যা বেশি, কার বাদ‍্যযন্ত্রে বৈচিত্র্য বেশি এইসব নিয়ে। মাঝখানে প্রশস্ত ব‍্যবধান রেখে দু’জন পাশাপাশি, কিন্তু শোভাযাত্রা চলাকালীন যাত্রীরা এক পঙ্‌ক্তি হয়ে সর্পিল গতি নিচ্ছে বা আরও কত মুদ্রা। নয়নাভিরাম দৃশ‍্যের অবতারণা রাজপথে। কত যত্ন নিয়ে পাড়াতুতো দাদারা এসব শেখাতেন। উৎসব-অনুষ্ঠানে বেরোত প্রভাতফেরি বা বৈকালিক শোভাযাত্রা (পুজোর বিসর্জন ও এর অন্তর্গত)। স্বাধীনতা দিবস, প্রজাতন্ত্র দিবস, আর সুভাষচন্দ্রের জন্মদিন ছিল উৎসবের দিন (এই তালিকায় গান্ধিজয়ন্তী বা শিশু দিবস কেন যে থাকত না?)। এইসব উৎসবের জন্যে সুরে বেসুরে সমবেত গলায় গাওয়ার জন্য শেখা হয়ে যেত কত স্বদেশি গান। এখান থেকেই তো শেখা ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’ বা ‘শিকল পড়া ছল’ বা ‘আমরা ছাত্রদল’। অভিভাবকেরা বাড়ির ছেলেমেয়েদের ক্লাবে পাঠিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতেন। এখনকার মতো মেলামেশার জাতবিচার তখন ছিল না, সবাই সবার সঙ্গে মিশতে পারত। আর ছিল ২৫শে বৈশাখ আর ১১ জৈষ্ঠ। এর প্রস্তুতিতে শেখা, শোনা হয়ে যেত কত কবিতা কত গান।

‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’… কণ্ঠ: সত্য চৌধুরি

এই পাড়াসংস্কৃতি, স্কাউট, ব্রতচারী, মণিমেলা, সব পেয়েছির আসর, ক্লাব ব্যান্ড, ২৫শে বৈশাখ, ১১ই জ‍্যৈষ্ঠ যাই যাই করেও শতাব্দীর শেষপর্যন্ত কোথাও কোনওভাবে টিকে থাকলেও এখন সবই হাওয়ায় হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়া। ইংরেজি মাধ্যমের গর্বিত অভিভাবকেরা পঁচিশে বৈশাখের নিদাঘ দুপুরে ছেলেমেয়েদের স্কুলে পৌঁছে দেন আর নজরুল নামটাও তাঁদের অজানা। সরকারি অনুদানে ক্লাবের ঘরবাড়ির শ্রীবৃদ্ধি হচ্ছে, অনুষ্ঠানে ভাড়া দিলে আয় অনেক। ড্রিল বা ব্রতচারীর জন‍্য যে ঘেসো জমি ছিল তা এখন শাণে বাঁধানো। অটো, ট‍্যাক্সি, ব‍্যক্তি-গাড়ির রাত-আবাস। এতে ক্লাবের রোজগার হয় ভালো। উপায়ের টাকা কোন কাজে লাগে সে প্রশ্ন কে করবে। পল্লিবাসীর সঙ্গে ক্লাবের আর কোনও নাড়ির যোগ নেই।

‘ভরিয়া পরাণ শুনিতেছি গান…’ কণ্ঠ: মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়

কথা তো উঠতেই পারে নজরুলকে নিয়ে কথা কইতে বসে এত কথার অবতারণা কেন? নজরুল ছিলেন উদ্দাম তারুণ্যের উজ্জ্বল প্রতিনিধি। তাঁর স্বপ্নের স্বদেশে চিরতরুণকেই অগ্রপথের সারথি ভেবেছেন তিনি। সবল, সতেজ, কল্পনাপ্রবণ, প্রাণশক্তিতে ভরপুর তারুণ্যের দেশই তো তাঁর স্বদেশ। যে জন্মদিনের কথা দিয়ে প্রসঙ্গের অবতারণা হয়েছিল, সেখানে তাঁকে আনা হয়েছিল। অনুষ্ঠান শুরুর অল্পক্ষণের মধ্যেই তিনি অস্থির হয়ে ওঠায় তাঁকে দ্রুত সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হল। কিন্তু যে নজরুল ইসলামকে সেদিন মঞ্চে দেখেছিলাম আর যাঁর কথা আশৈশব শুনে এসেছি, নানা স্মৃতিকথায় যাঁর বর্ণময় ব‍্যক্তিসত্তার উজ্জ্বল বর্ণনা পড়েছি এই দু’জন কি একই মানুষ? কোথায় তাঁর পেয়ালার মতো ভরপুর ভাসমান চোখ, প্রাণের চাঞ্চল্য, যাঁর উপস্থিতিতে গোটা পরিবেশ নিমেষে পাল্টে যেত, সেই কবি? ফুলের জলসায় নীরব কবিকে টেনে না আনার মধ্যেই ছিল সৌজন্যের প্রকাশ। সেটুকু মর্যাদা বাক্‌হীন, স্মৃতিহীন, ইচ্ছে-অনিচ্ছে জানানোর শক্তি না-থাকা একজন মানুষকে কি দেওয়া যেত না? তাঁকে এইভাবে জনকোলাহলের পরিসরে নিয়ে আসা সুবুদ্ধির পরিচায়ক নয়, কথাটা সেদিন মনে হয়েছিল, আজও সেখান থেকে ফিরে আসার কোনও কারণ দেখছি না।

‘খেলা শেষ হল…’ কণ্ঠ: ধীরেন্দ্র চন্দ্র মিত্র

কুড়ি-বাইশ বছরের সংক্ষিপ্ত সাহিত্যজীবন নজরুলের। কিন্তু অভিজ্ঞতার অফুরন্ত ভাঁড়ারে পরিপূর্ণ সে জীবন। ছোটবেলার বিচিত্র জীবনে নাই বা গেলাম। পরবর্তী জীবনে সৈনিকবৃত্তি, রাজদ্রোহের জেরে জেলে যাওয়া, উনচল্লিশ দিনের অনশন, পত্রিকা সম্পাদনা, হাসির ফোয়ারা ছুটিয়ে গোটা বাংলা চষে বেড়ানো, কল খুললে জলের যেমন অনিরুদ্ধ গতি তেমন করেই অনির্বার গান ও কবিতার ফসল ফলানো, শৌখিন জীবনের উল্লাস থেকে চরম দারিদ্র্যের রসাস্বাদন, অগুনতিবার বই নিষিদ্ধ বা বাজেয়াপ্ত হওয়া, কবিতা লেখা বন্ধ রেখে প্রাদেশিক জাতীয় সম্মেলনের (কৃষ্ণনগর ১৯২৬) স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন ও তার প্রশিক্ষণের দায়িত্ব নেওয়া, চলচ্চিত্র শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অভিনয়, গল্প ও চিত্রনাট্য লেখা, সংগীত পরিচালনা, বেতারের জন‍্য নতুন নতুন অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা, গ্রামাফোন কোম্পানিতে গান শেখানো, হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতি স্থাপনকে জীবনের ব্রত করে নেওয়া। পূর্ণ স্বাধীনতার দাবিও তো তাঁর লেখনীতেই প্রথম ধ্বনিত– “ধূমকেতু ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়। ভারতবর্ষের এক পরমাণু অংশও বিদেশীর অধীন থাকবে না।…”

Depart Magazine|List Your Ad

উন্মত্ত ঝড়ের মতো এক জীবন। তাই হয়তো অচিন্ত‍্যকুমার তাঁকে ‘জ‍্যৈষ্ঠের ঝড়’ নামে চিহ্নিত করেছেন। তবুও একথা না মেনে উপায় নেই যে, তিনি বিদ্রোহী অবশ্যই, কিন্তু তিনি প্রেমিকও, হয়তো একটু বেশিই প্রেমিক, প্রেম দিতে আর‍ নিতেই যেন তাঁর আসা।

‘বন-কুন্তল এলায়ে…’ কণ্ঠ: দেবব্রত বিশ্বাস

‘হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা’ আর ‘অপরূপ রূপকথা’ পড়ার পর যাঁর কাছে আমি চিরপ্রণত সেই বুদ্ধদেব বসুর লেখায় যখন পড়লাম, “…’আমি চির-শিশু, চির-কিশোর’— একথা বিদ্রূপের বাঁকা হাসির সঙ্গে নজরুলের সাহিত্যিক জীবনে সত্য হয়েছে। পঁচিশ বছর ধরে প্রতিভাবান বালকের মতো লিখেছেন তিনি, কখনো বাড়েননি, বয়স্ক হননি… প্রতিভার প্রদীপে ধী শক্তির শিখা জ্বলেনি…”

‘যদি আর বাঁশি না বাজে…’ কণ্ঠ: কাজী সব্যসাচী

তখন খানিকটা বিস্মিত, কিছুটা বিরক্তও যে হইনি তা বলতে পারব না, কিন্তু প্রথম তারুণ্যের উচ্ছ্বাস অন্তর্হিত হবার পর এখন বুঝতে অসুবিধে হয় না যে প্রেরণার প্রবলতা তাঁকে আত্মস্থ হবার সুযোগ দিল না বলেই নিজের বৃত্তে ঘুরে যাওয়া তাঁর নিয়তি হয়ে উঠল। নজরুলের নিজস্ব জোরালো ধরনে মুগ্ধতা ছিল স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের, হয়তো আশঙ্কাও। একদিন তিনি নজরুলকে সতর্ক করে বলেছিলেন, বিধাতা তোমাকে পাঠিয়েছেন তলোয়ার হাতে, সে কি তিনি তোমায় দিয়েছেন দাড়ি চাঁচবার জন্য? মনজোগানো লেখার দায় মেটানোর বিপদ বিষয়ে সতর্ক করতেই রবীন্দ্রনাথ কথাগুলো বলেছিলেন। দুর্ভাগ্য, নজরুল কথাগুলো নিলেন আক্ষরিক অর্থে, ভেতরের কথা বুঝতে না চেয়ে বা পেরে লিখলেন, “গুরু কন তুই করেছিস শুরু তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁচা”। সৌম্যেন্দ্রনাথের স্মৃতি বলছে কত স্নেহে রবীন্দ্রনাথ তাঁকে পড়ে শুনিয়েছেন কালিদাসের কাব্য কিংবা ইংরেজি কবিতা। নজরুলের তখন শোনার মন আর নেই, তখন সত্যি তিনি চলচঞ্চল বাণীর দুলাল।

কুড়ির দশকের গোড়ার দিক। দিলীপকুমার রায় ফিরেছেন ইউরোপ থেকে আর নজরুল হাবিলদারের উর্দি খুলে গান আর কবিতার ভরা তরী নিয়ে কলকাতায়। বাংলা গানের পরম্পরায় নতুন এক ধারা এল নজরুলের হাত ধরে। গজল। দিলীপকুমার রায়ের ভরাকণ্ঠের ঔজসে জলসায় জলসায় মূর্ত হচ্ছে নজরুলের গান। ‘বাগিচায় বুলবুলি তুই’, ‘ভরিয়া পরাণ শুনিতেছি গান’, ‘চেয়ো না সুনয়না’র মতো সব গান। ‘এত জল ও কাজল চোখে পাষাণী আনলে বলো কে’— হিন্দুস্থানি লোকগানের ধারায় কাজরি চালে বাঁধা এই গান শুনে অতুলপ্রসাদ লিখেছিলেন ‘জল বলে চল, মোর সাথে চল’। আর দেশাত্মবোধের গান তো আছেই। শিখরস্পর্শী ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’ গেয়ে দেশে স্বদেশবোধের জোয়ার আনার বিনয়ী অনুরোধ ছিল সুভাষচন্দ্রের, দিলীপকুমার খুশিমনে সে আজ্ঞা মিটিয়েছেন নানা অনুষ্ঠানে। ১৯২৮-এ দিলীপকুমার রায় স্থায়ীভাবে পণ্ডিচেরি চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে নজরুল লিখলেন অনবদ‍্য সেই গান ‘সাজিয়াছ যোগী, বল কার লাগি, তরুণ বিবাগী’। গত শতকের বিশের দশকের মাঝামাঝি সময়ের কলকাতা তিন যুবার প্রতিভার স্পর্শে ঝলমলে হয়ে উঠেছিল, তিনজনেই পরস্পরের বন্ধু ও অনুরাগী, দিলীপকুমার রায়, সুভাষচন্দ্রে বসু আর কাজী নজরুল ইসলাম।

Nazrul: Bengal's Beloved Rebel Poet

নানা ধারার গানে নজরুল-প্রতিভার প্রকাশ ও বিকাশ ঘটেছিল। একসময় তিনি মাতলেন কীর্তনে। পরপর লেখা হতে লাগল কীর্তনাঙ্গের গান— ‘কেন প্রাণ ওঠে কাঁদিয়া, / কাঁদিয়া কাঁদিয়া কাঁদিয়া গো। / আমি যত ভুলি ভুলি করি / ততো আঁকড়িয়া ধরি / ততো মরি সাধিয়া / সাধিয়া সাধিয়া সাধিয়া গো।’ এভাবেই এল শ‍্যামাসংগীত, ‘শ্মশানে জাগিছে শ‍্যামা মা’র মতো আরো কত গান, ইসলামি গানও। ঝরনা ধারার মতো অবিরল সংগীতস্রোত তখন, সুর-রাগ-রাগিণী নিয়ে কত রকমের যে পরীক্ষা নিরীক্ষা, হারিয়ে যাওয়া রাগ খুঁজে বের করার আকুল প্রয়াস।

Image

পশ্চিমবঙ্গে ৬০-এর শেষ থেকে ৮০-র গোড়া পর্যন্ত নজরুলগীতির জোয়ারে বাংলাগানের প্রশস্ত প্রাঙ্গণ উদ্বেলিত ছিল, তারপর কখন যে ভাটার টানে জল শুকিয়ে গেল এখন আর তা খেয়ালও করতে পারিনা। কত গুণী শিল্পীর গান শুনেছি তখন— ধীরেন্দ্র চন্দ্র মিত্র, সুপ্রভা সরকার, পূরবী দত্ত, অঞ্জলি মুখোপাধ‍্যায়, ফিরোজা বেগম, অখিলবন্ধু ঘোষ। মানবেন্দ্র মুখোপাধ‍্যায়, ধীরেন বসুও।

‘ফুলের জলসায় নীরব কেন কবি…’ কণ্ঠ: অঞ্জলি মুখোপাধ্যায়

মিথ্যা বিশ্বাসের ফাঁদ নিপুণ হাতে পাতা হয় সরল জীবনে, অনায়াসে ছলনা সয়ে শান্তির অক্ষয় অধিকার পাওয়া সহজ নয়। রণক্লান্ত নজরুল সে অধিকারে বঞ্চিত রইলেন। জীবনের জটিল অঙ্কে ভুল হল তাঁর। কিন্তু ভুল-ঠিকের বিচার কি এতটাই সহজ? নাকি ঠিক-ভুলের বিচারে যাওয়াটাই বড় ভুল? ২৪-এ নজরুলের বিয়ে, ৩৯ থেকে স্ত্রী দুরারোগ্য অসুস্থতায় চলৎশক্তি রহিত। পুত্র বুলবুলের মৃত্যু প্রায় বিনা চিকিৎসায়, আর্থিক অনটন, সাংসারিক অশান্তি, অস্থিত জীবন। একটু সুখের মুখ দেখবেন ভেবে সোনার শিকলে বাঁধা পড়লেন। শিকল শিকলই রইল, সোনা আঙুলের ফাঁক গলে কোথায় তলিয়ে গেল তার হদিশ পাওয়া গেল না। গ্রামাফোন কোম্পানিতে গান শেখানো আর গান রচনার চাকরি। কয়েক খিলি পান, কয়েক কাপ চা আর হাতে ধরিয়ে দেওয়া হারমোনিয়াম। সারাদিন চলছে এই কাজ। কার জন‍্য লিখছেন, কে গাইছে, কে সুর দিচ্ছে কোনও কিছুরই আর তখন হিসেব নেই। কাগজ আর কলম হাতে পেলেই লিখে ফেলার দৈবী শক্তি লুট হয়ে গেল বাণিজ্যিক স্বার্থে। এই পর্বের গান সম্পর্কে একদা অন্তরঙ্গ সৌম‍্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মনে হল, এসব গান শ‍্যাওলার মতো ভাসবে জলের ওপরে মনের গভীরতাকে স্পর্শ করতে পারবে না। এরপর দীর্ঘ চৌত্রিশ বছরের নিরবচ্ছিন্ন নীরবতা। নীরবতা শেষ মৃত্যুর অন্তিম আশ্রয়ে।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *