Latest News

Popular Posts

প্রজনন মায়া লাগে শস্যচরাচরে

প্রজনন মায়া লাগে শস্যচরাচরে

পৌষালী চক্রবর্তী

ভ্রমর কাঁচা বাঁশে বসলে বর্ষার মেঘ ভাঙা আকাশে শুরু হয় ভাদ্র রোদের শরৎ পাহারা। মাঠে মাঠে ফনফনিয়ে বেড়ে উঠছে সবুজ ধানের শীষ। মানভূমে এসেছে করমের মাস। খেতে খেতে ধান রোওয়া শেষ হলে কৃষিজীবী মানুষের জীবনে এসেছে দু’দণ্ডের অবসর। এসময়ে কৃষিকেন্দ্রিক বিভিন্ন উৎসবে পরবে নাচে, গানে মুখরিত হয়ে ওঠে গ্রামজীবন। মূলত ভূমিজদের উৎসব হলেও করম-জাওয়া ধীরে ধীরে সাঁওতাল, কুড়মি, মাহালি, ঘাসি, বাউড়ী, হাঁড়ি সকলেই আপন করে নিয়েছেন একে। হড়মিত্যানের আশ্চর্য ভূমি!

আরও পড়ুন: জগদর্শন কা মেলা (পর্ব ২)

ছবি সৌজন্য: মাটির ঘর

করমের গল্প শুনি আমাদের স্বনির্ভর দলের এক দিদি, আরতি দির কাছে। তাঁর সঙ্গে গিয়েলাম ও করম পুজো দেখতে। ভাদ্র মাসে ধানগাছ গর্ভিণী হয়। এ মাসেরই পার্শ্ব একাদশী বা শুক্লা একাদশী তিথিতে হয় করম। ‘জাওয়া’ হল করমের প্রধান অঙ্গ। এই একাদশীর সাতদিন কী পাঁচদিন কী তিনদিন আগে কুমারী মেয়েরা খুব ভোরে উঠে বন থেকে শালের দাঁতনকাঠি ভেঙে নিয়ে আসে। তারপর নদী কিংবা পুকুর ধারে গিয়ে ‘কি তেল মাখামাখি/ কি হোলদা মাখামাখি’; তারপর ডুবস্নান। উপকরণ দেখে মনে হয় করম অঙ্কুরোদ্গমের শস্য পরব।

ডুবস্নানে যাওয়ার সময় মেয়েরা বাঁশে বোনা ডালা ও টুপা নিয়ে যায়। স্নান সেরে পুকুর বা নদীর বালি নিয়ে ভরে নেয়। এর পরের অঙ্গগুলোতে অংশগ্রহণ করে সাধারণত বারো বা তেরো বছরের কুমারী মেয়েরা। স্নানের পর ভিজে কাপড়ে মেয়েরা ছোট শালপাতার খালা বা থালায় রমা, মুগ, কুথ্থি, অড়হর ও ধান শস্যাদি বীজ বপণ করে; তার মধ্যে সিঁদুর ও কাজলের তিনটি দাগ কাটে। একে বলে ‘বাগাল জাওয়া’।

আরও পড়ুন: ‘ভালোবাসিবে বলে ভালোবাসিনে’

ছবি সৌজন্য: abcherryhills.in

খালায় বীজপোঁতা হয়ে গেলে তৈরি হবে জাওয়া ডালি। তিন বা পাঁচ বা সাতজন কুমারী মেয়ে যাদের ‘জাওয়ার মা’ বলা হয়, তারা ডালায় বীজ ছড়ায়।

‘জাওল মাই জাওল কিআ কিআ জাওয়া
জাওল মাই গো কুরথি বহুরা
সেহ গো কুরথি এক পাঁতা সইর পাঁতা
বাগাইলাকে দেবেই মই রাঁড়া ভঁইসা’

নিজের নিজের ডালা চিহ্নিতকরণের জন্য কাশ কাঠি পুঁতে দেওয়া হয়। স্নানের ঘাটে ডালা সামনে রেখে সারিবদ্ধভাবে জাওয়া পাতার নাচ হয়— ‘কাঁসাই নদীর বালুয়ে জাওয়া পাতিব লো’। পরে ডালাটি ঘরের ভিতরে কোনও উঁচু জায়গায়, শিক কিংবা তক্তায় ঝুলিয়ে রাখা হয়। প্রতি সন্ধ্যায় কুমারী মেয়েরা ডালার চারপাশ ধরে তাকে গোবর নিঙানো আঙিনায় বা আখড়ায় নিয়ে যায়।

‘করম কাটিকুটি আখড়া বন্দনা করি
গোপিন সব করে একাদশী—
আজ রে করম ভেল রাতি’

তারপর ডালা ঘিরে ধরে শুরু হয় নৃত্যগীত—

‘ছড়িয়ে দেহ আখড়া বাহরাঁরে দেগো ডালেয়া
বাহরাঁরে দেগো ডালেয়া
ইওগো নাচিখেলি, নাচিখেলি ঘারা ঘুরি যাব।’

ব্রতের সাতদিন মেয়েরা কঠোর শুদ্ধাচারে থাকে। স্নান সেরে জাওয়া ডালার ওপর হলুদ জল ছেটায় আর বলে—

‘আমাদের জাওয়া ওপারে তালগাছের পারালো
সুরজ ওঠে খিলি খিনি আমাদের জাওয়া ওঠে না…’

উপোসের আগের দিন হয় মজঁত। দিনের স্নান সেরে বিজোড় সংখ্যক ঝিঙা পাতা উল্টে পেতে প্রতি পাতায় একটা করে দাঁতন কাঠি বসানো হয়। রাত্রে বানানো হয় চালগুঁড়ির পিঠে। ঘরের ছাউনি বা চালে সেই পিঠে সাজিয়ে দেওয়াকে বলে ‘চালসিয়া’।

আরও পড়ুন: অমরত্বের অন্বেষণ

ছবি সংগৃহীত

পুজোর দিন দুপুর দুপুর উপবাসী মেয়েরা শুদ্ধাচারে ফুল তুলতে যায়। ধানের পাতা, শালুক, পদ্ম প্রভৃতি তুলে আনে। জাওয়া করমের প্রতিটি পর্বের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী জড়িয়ে থাকে নাচগান। ছেলেরা দলবেঁধে ছাতা ডাল অর্থাৎ শাল ডাল নিয়ে আসে। গড়াইত একটি করম গাছের ডাল লায়া বা পুরোহিতের বাড়ির সামনে পুঁতে দিয়ে আসে। এটি হল করম গোঁসাই বা করম ঠাকুর। সন্ধের পর হয় করম পুজো। দু’টি করম ডাল পাশাপাশি পুঁতে পুজো করা হয়। যেন করম রাজা ও করম রানীর বিবাহ অনুষ্ঠান। করম রাজা সূর্য ও রাণী পৃথিবীর প্রতীক। এ দু’য়ের পরিণয়ে শস্যবাসনা তরান্বিত হয়। করম নাচের মুদ্রায় ধানরোপণ, ধানকাটা প্রভৃতি প্রকাশ পায়। করম পুজোর উপাচার দুধ, শসা, ধানের গাছ, পিঠা প্রভৃতি। পুজো শেষে সামান্য বিশ্রামের পর আখড়ার করম তলায় জাওয়া ডালি এনে শুরু হয় নাচগান। সারারাত ধরে নাচগান চলে আর আখ্যাত হয় ধরমু ও করমু এই দুভাইয়ের গল্প। বিভিন্ন বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে গিয়ে করম ঠাকুরের পুজো করার পর কীভাবে তাদের কপাল ফেরে সেই কাহিনি বলা চলে পরদিন সূর্য ওঠা পর্যন্ত। মনে করা হয় ধরমু করমুর মাধ্যমেই করম পুজোর সূচনা হয়। জাগরণের শেষে সকালে ধানগাছি এনে আলপনা এঁকে পুজো করে তারপর বাসিভাত। জাওয়া বিসর্জনের সময় অঙ্কুরিত বীজগুলো উপড়ে ফেলে নিজেদের ভেতর ভাগাভাগি করে নেয় মেয়েরা। সেগুলি বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দিয়ে শস্য ও শান্তি বৃদ্ধির কামনা করে করম ডাল জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে নাচের ছন্দে, গানের সুরে আগামী বছরের জন্য পথ চাওয়া—

‘যাও যাও করম গোঁসাই
যাও ছয় মাস রে
যাও ছয় মাস
ঘুরে ভাদর মাসে আনব ঘুরাঞ’

বিবাহিত মেয়েরাও বিয়ের প্রথম বছরে করমের ব্রতী হতে পারে। সেজন্য তাদের থাকে বচ্ছরকারের অপেক্ষা—

‘কাঁসাই নদীর সরু বালি
সাজাইবো করম ডালি
করম আছে কাঁস নদীর পারে
মনে পড়ে করম পরবে
আর না রহব শ্বশুর ঘরে’

জাওয়া করমের নৃত্যগীত সারিবদ্ধ যৌথ নৃত্যগীত। একে পাঁতা গীত ও বলে। তবে শস্য পরব ছাড়াও অন্যান্য সময়েও পাঁতা নাচগান হয়।

‘ধান ফুলে রে মালা সাজল না সাজল না
শবদে সখি রে বাঁশি বাজল না বাজল না’

অনেকেই মনে করেন দাঁড়নাচ, দাঁড়গীত, দাঁড়ঝুমৈর, পাঁতা নাচ, ঝিঙ্গ্যাফুলি, ভাদরিয়া গীত সবই জাওয়া করম নাচের নামান্তর।

আরও পড়ুন: পুরুলিয়ার তেলকুপিতে জলের নীচে ইতিহাস

ছবি সংগৃহীত

অ্যাডিনা কর্ডিফোলিয়া বিজ্ঞানসম্মত নাম বিশিষ্ট করম গাছকে অনেকে কদমের সমতুল বলে কদমের কৃষ্ণ-অনুষঙ্গ খোঁজেন করমে। একজন মাস্টারমশাই বলছিলেন মানভূমের আদিবাসিন্দা অনেক কৃষিজীবী সম্প্রদায় করম গাছকে ভালোবাসার প্রতীক মনে করেন। একইসঙ্গে তারা করম ডালে করম গোঁসাইয়ের আরাধনা করেন। লোকায়ত বৃক্ষশস্য উপাসনায় কীভাবে ছোঁয়াচ লাগে এক পৌরাণিক মহাকাব্যিক চরিত্রের প্রেমকাহিনির।

মাস্টারমশাইয়ের কাছে আরও শুনছিলাম অধুনা প্রায় অবলুপ্ত ঘেরাগীতের গল্প। আদিম শিকারজীবী ও কৃষিজীবী সমাজের এই নাচগানে নর্ত্ক গিরিদা নামক বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে ঘুরে ঘুরে নাচতেন, তাকে ঘিরে থাকতেন দোহারীরা। অনেক সময় বৃষ্টিবন্দনা করা হত ঘেরাগীতে। তবে তিনি কোনও ঘেরাগীত শোনাতে পারেননি।

তেমনই ভাদু পরব সম্পর্কে কেউ কেউ বলেন এটা ভাদুই ধানের নবান্ন উৎসব। ভাদ্রমাসে আউশ ধান পাকলে তা কেটে ঘরে তোলা হয়। তবে ভাদুর অন্য অনেক গল্পও প্রচলিত। সেসব লোকআখ্যান যা যেমন শুনেছি, সেসব নয় অন্য আরেকদিন বলা যাবে।

করমের পরেই ভাদ্রমাসের শুক্লা দ্বাদশী তিথিতে এতদাঞ্চলে পালিত হয় ইঁদ পুজো। আদিবাসীদের শাল গাছ প্রতীকে এই পুজোর সঙ্গে কোথাও জুড়ে গেছে আর্য সংস্কৃতির ইন্দ্রধ্বজ পুজো। মূলত বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুর ও ঝাড়গ্রাম রাজবাড়িতে জাঁকজমকের সঙ্গে এই পুজো অনুষ্ঠিত হয়। এটি একটি ব্যতিক্রমী পরব যেখানে বহিরাগত ভূস্বামী বা সামন্তরাজাদের উৎসবে মূলনিবাসী মানুষজনের পুজোর সমন্বয় ঘটে। পুজোর দিনে জঙ্গল থেকে দু-তিনটি শালগাছ কেটে এনে একটি বিশেষ স্থানে পোঁতা হয় যাকে ইঁদকুড়ির মাঠ বলা হয়। শালগাছের ডালপালা পরিষ্কার করে কাণ্ডগুলোতে আগাগোড়া কাপড় জড়ানো হয় এবং তার মধ্যে সবচেয়ে বড় গাছের মাথায় একটি ঝুড়ি ঝোলানোর ব্যবস্থা রাখা হয়। ঝুড়িটিকে কাপড়ে জড়ানো অবস্থায় ছাতার মতো দেখায়। একেই ইঁদ বলে। এটিকে ইন্দ্রের প্রতীক কল্পনায় পুজো করা হয়। ইঁদগাছের তলায় বেদি তৈরি করে তার ওপর ঘট স্থাপন করে বৈদিক বিধানে হোমযজ্ঞ করে পুজো হয়। পুরোহিতরা এ দু’য়ের অভিন্নতা প্রচার করে থাকেন। আগে রাজ্যজয়ের পর, রাজ্যের শ্রীবৃদ্ধি কামনায় রাজারা এই পুজো করতেন। লোকায়ত শালবৃক্ষ উপাসনার সঙ্গে কেমন জড়িয়ে গেছে ইন্দ্রপুজো। বরাবাজারের ইঁদট্যাঁরে জাঁকজমকের সঙ্গে ইঁদ মেলা হয়। আগামী শস্যবর্ষে সুবৃষ্টি, সুখ-শান্তি ও শস্যসমৃদ্ধি কামনায় জাওয়া নিবেদনের মাধ্যমে ইন্দ্র উপাসনা করা হয়। ওই দিন ইঁদট্যাঁরে সাঁওতাল, কুড়মি, ভূমিজ জনগোষ্ঠীর মহিলারা ভুট্টা, গম, কুথ্থি, ছোলা, ন’দিনের চারাগাছ সহ জাওয়া ইন্দ্রধ্বজের নীচে ছড়িয়ে দেন। আর সারিবদ্ধভাবে জাওয়া করমের নাচগান করেন।

আরও পড়ুন: নদিয়ার পুতুলনাচ

ছবি সংগৃহীত

ভাদরের ভরা বাদর আর রোদঝিলমিল পার করে আশিনের ডাক সংক্রান্তির দিন হৈমন্তী হাওয়া শস্যচরাচরে বয়ে গিয়ে নিয়ে আসে সহরায়, নবান্নের আগাম ডাক। মানভূমের লোকগানগুলি পরব-ভিত্তিক ও ঋতু-ভিত্তিক। লোকগান-কেন্দ্রিক বিভিন্ন লোককথা ও লোকবিশ্বাসগুলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় মানুষ বছরকে মূলত দু’টি শস্যপর্যায়ে ভাগ করেছিল ফসলের ঋতু ও ফসলশূন্যতার ঋতু। ফসলের ঋতুটি ১৩ জ্যৈষ্ঠর রোহিন দিন থেকে শুরু হয়ে পৌষ সংক্রান্তি অর্থাৎ মানভূমে টুসু ভাসানের দিন পর্যন্ত ব্যাপ্ত থাকে। তারপর থেকে শুরু হয় ফসলশূন্যতার ঋতু। চলে রোহিনের আগে পর্যন্ত। অদ্ভুতভাবে ফসলশূন্যতার সঙ্গে সঙ্গেই ১ মাঘ থেকে মানভূমে কৃষিবর্ষের সূচনা। এইদিন আড়াই পাক ভূমি কর্ষণ করে পরবর্তী বছরের চাষের সূচনা করা হয়। এছাড়া আখ্যান যাত্রা, ভাও ও ভানসিং পুজো, খেলাই চণ্ডীর পুজো, ধর্ম ও শিবের গাজন ইত্যাদি পুজো ও লোকধর্মের বিভিন্ন আচার পালনের মধ্য দিয়ে তারা এই ফসলহীন ঋতুর উধয়া গীত গান। উধয়া শব্দটি উদোম বা নগ্নতার সমধর্মী হতে পারে। টুসু ভাসানের পর মানুষ উদোয়া গান গাইতে গাইতে ফেরে। এ গান ঘরে কিংবা গ্রামে গাওয়া হয় না।

‘উঠহুঁ না দেলে ভৌজি গো
নিদহুঁ না দেলে গো
আ রে, অতি বেগেঁ হল ভিনিসার’

ফসলহীন, বৃষ্টিবর্জিত এই কালে উধয়া গীতে আসে বৃষ্টি ভাবনার কথাও—

‘বাঁধ ত দেলে রাজা হো
দেশেকেরা অড়ে—
আ রে, পিঁঢ়িআ ত দেলে অজগর
ঝলকলে আওএ হো
শিরেকে গাগরিআ
মলকলে আওএ পানিহর’

শস্যশূন্যতা থেকে এ গানে জন্ম নেয় বৃষ্টিবাসনা। বসন্তের কয়েকদিন পলাশ মাতন আর ‘শূন্যশাখা লজ্জা ভুলে যাক পল্লব আভরণে’ টুকু বাদ দিলে উধয়াগীতের এই পর্যায়ে মানভূম ডুব দেয় রুক্ষতার সন্ন্যাসযাপনে, ভীষণ ভয়ের জল শুকিয়ে যাওয়ার কালে…

ক্রমশ…

এই ধারাবাহিকের বাকি পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

তুৎ পাখি উড়া দিলে…
পশ্চিমে দেশান্তরের মরশুম
বিরহড়দের কাহিনি: পুরাকথায়, গানে
সূর্যাস্তের দেশে
মাটি-জল-মুক্তামাছ
এই ঘর, এই উপশম
সিসিফাস ও স্বচ্ছতার পাঠান্তর
স্বাধীনতার সূর্যদের লড়াইধন্য সেইসব পবিত্র ভূমি
মানভূমের মনসা পরব
পূর্বমেঘের শস্যবাসনা

টাটকা খবর বাংলায় পড়তে লগইন করুন www.mysepik.com-এ। পড়ুন, আপডেটেড খবর। প্রতিমুহূর্তে খবরের আপডেট পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন। https://www.facebook.com/mysepik

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *