Latest News

Popular Posts

যা দেখি, যা শুনি, যা লিখি

যা দেখি, যা শুনি, যা লিখি

পৌষালী চক্রবর্তী

কংসাবতী, আম্রুহাঁসা, সিরগি নদীতে জল বাড়ে, কমে— সময় এগিয়ে চলে। নিত্যনৈমিত্তিক কাজের সঙ্গে সঙ্গে আমারও দিন কাটতে থাকে। তবে কাজের ধরনই এমন যে হঠাৎই নতুন কিছু চলে আসে, অভাবিতপূর্ব পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের সঙ্গে আমার ঘর-বসত চলতে থাকে। একটা সরকারি আবাসন আস্তে আস্তে আমার ঘর হয়ে ওঠে। আদিগন্ত বৃক্ষপূজার, প্রকৃতি উপাসনার উপকূলে আমি ব্যাগে করে মাটির ঠাকুর নিয়ে আসি। মাটির ছোট্ট লক্ষ্মী গণেশ, গোপাল। কেউ কেউ আবার কাচের ফ্রেমে বাঁধানো মনসা, সরস্বতী। শুশুনিয়া থেকে নিয়ে আসি পাথরের শিব, পাথর প্রদীপ। আমার ঘরই হয়ে ওঠে আমার ঠাকুর-দেবতার ঘর। দেশান্তরী জীবনে বাক্স-প্যাঁটরার সঙ্গে বাঁধা ছাঁদা হয়ে ঈশ্বরও কেমন ঠাঁইনারা হন।

আরও পড়ুন: জেলার নাম বাঁকুড়া

প্রতীকী ছবি। সৌজন্য ইন্টারনেট

অফিসে কয়েকটি মেয়ে দেখা করতে আসে, যাদের ফুটবলই ঈশ্বর। তাদের সঙ্গে আসেন তাদের কোচ, তাদের মাস্টারমশাই। আক্ষরিক অর্থেই ‘খিদ্দা’। রাজ্যস্তরের এক ফুটবল প্রতিযোগিতায় জেলার প্রতিনিধিত্ব করার জন্য তারা নির্বাচিত হয়েছে। এখন তারা এবড়োখেবড়ো এক মাঠে প্র্যাকটিস করে। আর কোনও পরিকাঠামোই সেরকমভাবে তারা পায় না। বাড়ির অবস্থাও তেমন জোরালো নয়। মাস্টারমশাই তাদের নিয়ে এসেছেন, যদি কিছু সুরাহা করা যায়।

তাদের সঙ্গে গিয়ে পৌঁছলাম প্র্যাক্টিসের মাঠে। হাইরোডের একপাশে বিরাট মাঠ। কিছুটা অসমতল, নুড়ি-পাথরও বেশ কিছু মিশে আছে ঘাসের ফাঁকে ফাঁকে। হাইরোডের অন্য পারে ধানক্ষেত, তারপর সারিবাঁধা সবুজ পাহাড়। বিকেলের সূর্য অন্য দিকে ডুবুডুবু হওয়ায় পাহাড় ও পাহাড়ি গাছের বাহার কেমন নীলাভ হয়ে উঠেছে। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে চলে গেছে রেলপথ। কত পুরনো সময়, পুরনো ইতিহাস ছুঁয়ে গিয়েছিল তার নিশ্চল, ধাতব ট্র্যাক। কেমন লেগেছিল এই জঙ্গল, মালভূমি চিরে চলে যাওয়া প্রথম রেলের যাত্রীদের? ভাবতে ভাবতে হুঁশ ফেরে কাদের যেন কলকাকলিতে। দেখি মাঠময় বল নিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে রঙিন জার্সির খেলুড়েরা। তাদের দৌড়, বল পাস দেওয়া দেখে মনে হয় তারা যেন আমার ছোট্ট ছোট্ট ডানামেলা রঙিন প্রজাপতি। শুঁয়ো গুটি কেটে উড়াল দিয়েছে। সার্থক হোক তাদের এই সব সীমাবদ্ধতা মাড়িয়ে, ছাড়িয়ে ছুটে যাওয়ার প্রয়াস। সত্যি, এখানে পোস্টিং না পেলে আমার ধারণাই হত না এতদঞ্চলে মেয়েদের মধ্যে ফুটবল এমন জনপ্রিয় একটি খেলা! তারা অনেকেই দক্ষ খেলুড়ে এবং প্রাণপণ ভালোবেসে ফুটবলটা খেলে। আর্চারিতেও তারা সবিশেষ প্রতিভাবান। আমাদের থাকাকালীনই আর্চারি অ্যাকাডেমি গড়ার উদ্যোগ শুরু হয়েছিল। কোচের সঙ্গে কথা বলে তাদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে স্পোর্টস স্যু আর স্টার্টার আনানোর ব্যবস্থা করা হয়। তাও খুব ভালো জিনিস কাছাকাছি পাওয়া যাবে না। হয় কলকাতা নয় তো তার থেকে কাছের, ভিনরাজ্য জামশেদপুর থেকে আনতে হবে। লোক পাঠানো হয় যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নিয়ে আসতে। আর তাদের জন্য সামন্য কিছু স্বাস্থ্যকর ডায়েটের ব্যবস্থা করা যায়। তাদের দৌড়, ঘাম, প্র্যাকটিস, বড় ম্যাচ খেলার উত্তেজনার সঙ্গে সঙ্গে আমিও জড়িয়ে পড়ি ক্রমাগত…

আরও পড়ুন: বাংলায় বিবিধরূপে মনসা পার্বণ ও রান্নাপুজো

প্রতীকী ছবি। সৌজন্য ইন্টারনেট

ভাবতে অবাকই লাগে আমাদের দেশে ক্রিকেটের দাপানির চোটে কোণঠাসা হয়ে যাওয়া খেলাগুলোতে যারা প্রতিভার ছাপ রাখতে পারে, তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠই সাধারণ, অতি সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসে। আমাদের প্রথাগত, বিদ্যায়তনিক শিক্ষাব্যবস্থায় যেসব ছেলেমেয়ে পড়াশোনা করতে ঠিক ভালোবাসে না, অমনযোগী, কিন্তু কোনও খেলাধুলায় দারুণ পারদর্শী; অথবা দেখা গেল চারুকলা, ভাস্কর্য বা হস্তশিল্পে তুমুল আগ্রহী— সেইসব ছেলেমেয়েদের প্রতিভা বিকাশের বা তাকে ঠিক দিশায় পরিচালিত করার সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। গ্রামাঞ্চলে, তার থেকেও প্রত্যন্ত অঞ্চলে সে সমস্যা আরও প্রকট। এমতাবস্থায় নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েদের, বাবা-মায়ের প্রত্যাশার চাপ সইতে হয় না। খাটুরে বাবা, মা মানুষ দু’টো উদয়াস্ত হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে আর ছেলেমেয়েদের দিকে তেমন নজর রাখতে পারে না। এই পাকেচক্রে কখনও বাচ্চাদেরও কাজে ঢুকে পড়তে হয়। সিস্টেমের নজরদারি গলে স্কুলছুট হয়ে পড়ে। আবার এমন প্রত্যাশাহীন, কিছু হয়ে উঠতেই হবে— এই চাপ থেকে মুক্ত জীবনে মেয়েটা বা ছেলেটা আধপেটা শাকভাত যা পাচ্ছে, তাই খেয়ে পাড়ার মাঠে প্রাণপণ দৌড়তে দৌড়তে, ষোলোআনার দিঘির জল তোলপাড় করে সাঁতার কাটতে কাটতে আচমকা কোনওদিন নজরে পরে যায় এমন কোনও ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো খিদ্দা’র। তারপর শুরু হয় তাদের রক্তাক্ত লড়াই। সেই লড়াইয়ের পথ কেমন ছিল, সে খবর আমরা রাখি না, লড়াইয়ে সঙ্গ দিতে পারি না। হঠাৎ কোনওদিন চমকপ্রদ সাফল্যের আলোয় চমকে উঠি। এমন তো হামেশাই আমরা দেখি কমনওয়েলথ গেমস বা এশিয়াডে হচ্ছে, বা অন্য কোনও বড় খেলার আসরে। পদক জিতে বা অলিম্পিকে সুযোগ পেয়ে আমাদের চমকে দিচ্ছে। আমাদের মেয়েগুলোও রাজ্যস্তরে খেলার সুযোগ পাওয়ার আগে ওদের প্রতিভার কথা জানতে পারতাম কিনা সন্দেহ…

ব্লকে একটি বিরাট জলাশয় ছিল, যার সিংহভাগই পদ্মবন। কাজে যাওয়া আসার সময় পদ্মদিঘির পথ ধরার সুযোগ হলে আমার মন আনন্দে ভরে উঠত। আর যদি মেঘ করে আসত দিঘির বুকে, তাহলে তো কথাই নেই— ‘আকাশ ঘিরে মেঘ করেছে/ সুয্যি গেল পাটে/ খুকু গেল জল আনতে/ পদ্ম দিঘির ঘাটে…’

আরও পড়ুন: ‘নিজস্ব ঘুড়ির প্রতি’: বঙ্গে বিশ্বকর্মা

প্রতীকী ছবি। সৌজন্য ইন্টারনেট

ছোটবেলায় পড়া ছড়ার জগৎ থেকে এক আশ্চর্য চিত্ররূপ আমার চোখে, মনে ভর করে। একটি ছোট্ট মেয়ে যেন আকাশপটে চুল ছড়িয়ে বসে আছে। এপথে আর কিছুটা গেলেই শাল জঙ্গলের পরে সুষমাদিদের বাড়ি। সুষমাদি অফিসে জমাদারের কাজ করেন। ওদের পাড়ায় যাচ্ছি একটি বাল্যবিবাহ রোধ করতে। খবর এসেছে ডিস্ট্রিক্ট চাইল্ড প্রোটেকশন ইউনিট থেকে। একটি বছর পনেরোর মেয়ের বিয়ে হতে চলেছে। এইসব ক্ষেত্রে মেয়েটি নিজে বিয়ে করতে আগ্রহী থাকলে পরিস্থিতি খুব জটিল হয়ে যায়। এই মেয়েটিও আমাদের হুমকি দিতে থাকে জোরজবরদস্তি তার বিয়ে বন্ধ করা হলে, সে আত্মহত্যা করবে। কিন্তু আমরাও তো পিছিয়ে আসতে পারি না। বিয়ে করার তার শরীর মন কোনওটাই তৈরি থাকে না ওইটুকু বয়সে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমরা বোঝাতে থাকি। ততক্ষণে গোটা গ্রামের লোক আমাদের ঘিরে ধরেছেন। মেয়ের বাবা বলেন, ১৮ বছর হলে এই বিয়ে ভাঙা মেয়ের সম্বন্ধ না পেলে আমরা কি তার পাত্র দেখে দেব! গ্রামের লোকেরা উত্তেজিত হয়ে পড়ছেন। উত্তাপ চড়ছে। একদিকে আমার খারাপও লাগছে বেশ। মেয়েটির দিনমজুর বাবা অনেক কষ্ট করে বিয়ের সামান্য আয়োজন করেছেন। সামনে একটু উঠোন মতো জায়গায় শামিয়ানা খাটানো, আলুর বস্তা রাখা। বিয়েবাড়ির ভোজ হবে বলে বেশ কয়েকটা মুরগি আনা হয়েছে। তার সঙ্গে নাচার মেয়ে। সবটা একসঙ্গে মিলিয়ে কেমন কষ্ট হতে থাকে। অবশেষে প্রায় বিকেলের মুখে তারা মুচলেকা দিতে রাজি হয়, মেয়ের বিয়ে দেবে না বলে। মেয়েকে বলে পরদিন ব্লক থেকে লোক আসবে, সে যেন অবশ্যই স্কুলে যায়। স্কুলের সঙ্গেও কথা হয়, যাতে দিদিমণিরা নজর রাখেন একটু। সে যাত্রা এভাবেই পেরিয়েছিল।

তবে কিছু কিছু ঘটনা আলোর মতো আসত। কিছু আবার মজার ছলেও…

ক্রমশ…

এই ধারাবাহিকের বাকি পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

তুৎ পাখি উড়া দিলে…
পশ্চিমে দেশান্তরের মরশুম
বিরহড়দের কাহিনি: পুরাকথায়, গানে
সূর্যাস্তের দেশে
মাটি-জল-মুক্তামাছ
এই ঘর, এই উপশম
সিসিফাস ও স্বচ্ছতার পাঠান্তর
স্বাধীনতার সূর্যদের লড়াইধন্য সেইসব পবিত্র ভূমি
মানভূমের মনসা পরব
পূর্বমেঘের শস্যবাসনা
প্রজনন মায়া লাগে শস্যচরাচরে
দিনরাত্রির কাব্য

পৌষালী চক্রবর্তী পেশায় রাজ্য সরকারি আধিকারিক। রসায়ন, তুলনামূলক সাহিত্য ও বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্যের গবেষক। আগ্রহের বিষয় ইতিহাস, দর্শন, উনিশ শতক। নেশা বই পড়া, ফোটোগ্রাফি, পাহাড়ে বেড়ানো আর ভারতীয় মার্গ সংগীত শোনা। প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘লিলিথ জন্মেরও আগে’ (২০২০)। তাঁর চাকরি-জীবনের প্রথম পোস্টিং পুরুলিয়া জেলায়। তিনি তাঁর পুরুলিয়া যাপনের কথা লিখবেন ধারাবাহিকভাবে ‘তুৎ পাখি উড়া দিলে’ কলামে। কখনও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার জারণে, কখনও রূপক গল্পের কল্প আখ্যানে তাঁর এই নিবেদন অতীতচারী, বর্তমান-আবদ্ধ, অনাগত কালের পুরুল্যার করকমলে…

টাটকা খবর বাংলায় পড়তে লগইন করুন www.mysepik.com-এ। পড়ুন, আপডেটেড খবর। প্রতিমুহূর্তে খবরের আপডেট পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন। https://www.facebook.com/mysepik

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *