৩২ বছর ঢাক বাজাচ্ছেন, এবারের মতো পুজো কখনও দেখেননি রামদেওয়ানপুর গ্রামের ঢাকি তুফান প্রামাণিক

Dhaki

অনিন্দ্য বর্মন, ইন্দ্রজিৎ মেঘ

আশ্বিন-কার্তিক বাঙালির উৎসবের মাস। দুর্গাপুজো থেকে জগদ্ধাত্রীপুজো অবধি, বাংলার প্রান্তিক মানুষেরা বাড়তি আয়ের আশায় নিজস্ব পেশা কিছুদিনের জন্য মুলতবি রেখে অন্য কাজে মনোনিবেশ করেন। কেউ দেন রোল-চাউমিনের দোকান, কেউ চপ-মুড়ি, আইসক্রিম বা অন্যান্য। প্রায় প্রত্যেকটি ছোট-বড় পুজোমণ্ডপের বাইরেই দেখা যায় তাঁদের স্টল। আরও একটি পেশায় গ্রামীণ প্রান্তিক মানুষেরা ভরসা করেন। কারণ তাঁদের ছাড়া কোনও পুজোই পরিপূর্ণ হবে না।

আরও পড়ুন: পুজোর মুখে কেমন আছেন শান্তিপুর, কৃষ্ণনগরের শোলাশিল্পীরা?

তবে এই পেশাটি বলা যেতে পারে একরকম নেশাই। আর তা হল মণ্ডপে মণ্ডপে ঢাকিদের উপস্থিতি। বিশেষত ঢাক ছাড়া পুজো আমরা ভাবতেই পারি না। এই নেশার টানে গ্রাম ছেড়ে পুজোর ক’টা দিন ঢাকিরা শহরে আসেন। আমরাও মেতে উঠি তাঁদের সঙ্গে, ঢাকের তালে, মায়ের আরাধনায়।

ছোটবেলার দুর্গাপুজো মামারবাড়িতে কাটানোর সুবাদে ঢাকিদের খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। তখন পুজোমণ্ডপের উদ্বোধন হত পঞ্চমীর সন্ধ্যায়। এখনের মতো মহালয়ার আগেই দেবীর বোধন হত না। ঠিক প্রতিপদ অথবা দ্বিতীয়ার দিন, শয়ে শয়ে ঢাকি ট্রেনে করে আসত শিয়ালদহ স্টেশন কিংবা কালীঘাট। যাঁদের বাঁধা বায়না, তাঁদের জন্য গাড়ি নিয়ে উদ্যোক্তারা স্টেশনেই হাজির হতেন। যাঁরা বায়না পেতেন না, তাঁরা সমবেত ঢাক বাজাতেন স্টেশন চত্বরের বাইরে কিংবা কালীঘাট ব্রিজের কাছে। সেখানে জমায়েত হতেন পুজো কমিটির লোকজন। যে ঢাকিকে পছন্দ হত, দরদামের পর বায়না করে নিয়ে যাওয়া হত। বিজয়ার পর ঢাকিরা পাড়ায় আসত সামান্য বকশীশের আশায়।

আরও পড়ুন: পুজো মণ্ডপে নিষিদ্ধ অঞ্জলি-সিঁদুর খেলা: হাইকোর্ট

এবছর হয়তো সবই অন্যরকমের। এবার তো মায়ের ঘরেও করোনাসুর। উচ্চ আদালতে বিচারপতির রায়, অগুনতি মানুষের প্রাণের সঙ্গে বিপাকে পড়েছেন প্রান্তিক মানুষজন, যাঁরা সামান্য লাভের আশায় দোকান দেন। বিপন্ন হয়েছেন ঢাকিরাও।

এইরকম অবস্থাতেই কলকাতার কালীঘাটের রাস্তায় পাওয়া গেল তুফান প্রামাণিককে। বাস পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার রামদেওয়ানপুর গ্রামে। বাবা এবং গুরু শঙ্কর প্রামাণিকের তত্ত্বাবধানে ১৯৮৫-তে জন্মানো তুফানবাবু আজ ৩২ বছর ঢাক বাজাচ্ছেন। তাঁরা বংশপরম্পরায় চার পুরুষের ঢাকি। ঠাকুরদা ঈশ্বর নকুলচন্দ্র প্রামাণিকও ছিলেন প্রখ্যাত ঢাকি। তাঁদের গ্রামে ঢাকির রেওয়াজ প্রথম তাঁরা এবং আরও ক’টি পরিবার মিলে চালু করেন। আজ তাঁদের গ্রামে আরও অনেক ঢাকি পরিবার রয়েছে।

তুফানবাবু জানালেন যে, গ্রামের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের ঢাকের মিস্ত্রিরাই ঢাক বানায়। সেই ঢাকই তাঁরা বাজান। তবে এবছর টাকার অভাবে ঢাকে নতুন ছাউনি দেওয়া সম্ভব হয়নি। শুধু মেরামতি করা হয়েছে। ধাকের পিপা বা খোলটা তাঁরা বানিয়েছেন আমকাঠ দিয়ে। কারণ আমকাঠের দাম কম এবং একইসঙ্গে টেকসইও। ঢাকের ওপরের কাশফুলগুচ্ছও সেভাবে সাজানো হয়নি এবার।

তুফানবাবু আরও জানান যে ষষ্ঠী থেকে দশমী, প্রত্যেকদিন ঢাকের বোল এবং গৎ আলাদা হয়। ‘দেরে না দেরে না তাক তে না তের তাক তে না তের’ বোল দিয়ে ষষ্ঠীর দিন মায়ের আগমনী শুরু হয়। কথিত আছে, দশমীর দিন বিদায়ের সুরে একটা মজার ছড়া আছে— ‘যাও না ঠাকুর ঘর যাও না / চিড়া মুড়কি খেয়ে যাও না।’ অর্থাৎ মা চলে যাওয়ার আগে তাকে খাইয়ে তবেই শ্বশুরবাড়ি পাঠানো হচ্ছে।

তবে শুধু তুফানবাবুই নন, অন্য অনেক ঢাকির অবস্থাই বেশ শোচনীয়। লকডাউন মোটামুটিভাবে কেটেছে। কাজ নেই, টাকার অভাব। তাও ব্যক্তিগত গাড়ি ভাড়া করে তৃতীয়ার দিন শহরে এসেছেন পুজোমণ্ডপে ঢাক বাজাবেন বলে। কিন্তু তারা এখনও বায়না পাননি। তুফানবাবুর সঙ্গে সহকারী সুকুমার এবং আরও ৪-৫ জন ঢাকি। ঘুরছেন বায়নার খোঁজে। আশা, এই সমস্ত ঢাকির ঢাকের আওয়াজে পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে এবছরের শারদোৎসব।

ছবি: ডিকু ভট্টাচার্য

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *