প্রতিজ্ঞা করি, আগামীকাল আবার চেষ্টা করব পৃথিবীকে আরও একটু সুস্থ করে তোলার

ডাঃ শুভদীপ কোনার
মেডিক্যাল অফিসার, ওয়েস্ট বেঙ্গল, হেলথ সার্ভিস

সকালটা শুরু হয় মোবাইলে ইনকামিং কলের দৌলতে। কখনো টালিগঞ্জের, সল্টলেকের, বা বেহালার, কখনো বা শেওড়াফুলি, মঙ্গলকোট। সবার মুখে বিভিন্ন প্রশ্ন― কারোর স্পট২ কমে যাচ্ছে, কারোর কোভিড-১৯ আরটিপিসিআর রিপোর্ট পজিটিভ আসায় ভীত-সন্ত্রস্ত। এরকম পরিস্থিতিতে জীবনে আগে কখনো পড়িনি এবং এটা হলফ করে বলতেই পারি, গত এক শতাব্দীর মধ‍্যে বতর্মান সময় স্বাস্থ্যকর্মী, ডাক্তার, নার্সদের কঠিনতম চ‍্যালেঞ্জের মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছে। দিনের শুরু শেষ মধ‍্যরাত্রি― যে কোনো সময় ‘জরুরি call’। আসলে পুরো টাইম স্প্যানটাই এখন জরুরি অবস্থা। ঘুম চোখে ফোন ধরার পর পেশেন্টের রিপোর্ট পজিটিভ শুনেই সম্বিত ফেরে। না না আর ঘুমালে চলবে না, এবার সিম্পটন শুনে পেশেন্টকে শান্তভাবে বলতে হবে, তার করণীয় সংগ্রাম এই নতুন ভাইরাসের বিরুদ্ধে আজ থেকে শুরু হল। এখানে অস্ত্র বলতে কিছু মেডিসিন, কিছু যোগব‍্যায়াম এবং কিছু খাবার-দাবার। এগুলো বলার পর পেশেন্টের ভীত কণ্ঠে প্রশ্ন― “স‍্যার ভালো হয়ে যাব তো?”

এ-মূহূর্তের কঠিনতম প্রশ্ন এটি। কারণ নির্দেশমতো সব অ্যাডভাইস পালন করলেও কিছু পেশেন্টের ক্রমবর্ধমান রেসপিরেটরি ডিসট্রেসকে কিছুতেই আমরা বাগে আনতে পারছি না। সমস্ত চেষ্টা ব‍্যর্থ করে একটি আইসিউ-তে ভর্তি থাকা করোনা আক্রান্ত রোগী যখন অনিচ্ছা সত্ত্বেও পৃথিবীর আকর্ষণ কাটিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়ে, তখন তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা ডাক্তার সিস্টার এবং অন্যান্য স্বাস্থ‍্যকর্মীরা তাদের চোখের জল গোপনে মুছে নেয়। অবশ্য দুঃখ করার সময় বেশি নেই, কারণ তার পর মুহূর্তেই হয়তো একজন বৃদ্ধকে ট্রান্সফার করা হয়েছে আইসিইউ-তে ওপেন ভেন্টিলেশন লাগবে, শুরু হয় তাকে ভালো করে তোলার প্রস্তুতি।

করোনাভাইরাস হল সমগ্র মানবজাতির এমন এক শত্রু, যার মোকাবিলা করার সঠিক পন্থা এখনো মানুষ জানে না। খালি চোখে দেখা যায় না এমন একটি আণুবীক্ষণিক কণা যে বিশ্বজুড়ে চলতে থাকা মানুষের এই ব‍্যস্ত কর্মকাণ্ডকে এক লহমায় থামিয়ে দিতে পারে, এটা হয়তো ২০১৯-২০ সালের আগে একবিংশ শতাব্দীর কোনো পণ্ডিতই ভাবেননি। মানুষ পরিস্থিতির দাস। তাই মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। জীবন সংগ্রামের হাজার লড়াইয়ের সঙ্গে যুক্ত হল নতুন একটি লড়াই― করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে এক অসম লড়াই। ‘অসম’ এই কারণেই যে করোনাভাইরাস কণা চোখে দেখা যায় না। সে নিঃশব্দে আক্রমণ করে গলার কাছে, তারপর পৌঁছে যায় লাংস বা ফুসফুসে। একবার সে ফুসফুসে বাসা বাঁধলে তাকে সেখান থেকে উৎখাত করতে মাথার ঘাম পায়ে পড়েছে ডাক্তারদের। আস্তে আস্তে ভাইরাস কণাগুলি বংশবিস্তার করছে মানুষের ফুসফুসে, পরিণত হয়ে যাচ্ছে তারা কয়েক মিলিয়ন কণায়। শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতাকে পরাস্ত করে লাংসের অ‍্যালভিওলাইকে ছারখার করে দিচ্ছে এই কণা। সিটি স্ক্যান থোরাক্স করলে তাই ধরা পড়ছে ‘Ground Glass Appearance’ এবং এটা ঘটছে অত‍্যন্ত কম সময়ের মধ্যে। ভাইরাস সংক্রমণের পরে শরীরে কয়েক মিলিয়ন কণা ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগছে মাত্র ২ দিন। তাই জ্বর, সর্দি, কাশি দুর্বলতা এসব সিম্পটমসের কোনো একটা থাকলেই র‍্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্ট এবং আরটিপিসিআর পরীক্ষা করা অত‍্যন্ত প্রয়োজনীয়। সঠিক সময় চিকিৎসা শুরু করা গেলে এবং ডাক্তারের পরামর্শ সঠিকভাবে মেনে চললে সুস্থতার হার বাড়বে। এই দ্বিতীয় ঢেউয়ের মোকাবিলা করতে তাই স্বাস্থ্য কর্মীদের সঙ্গে সমস্ত জনগণের সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

করোনাভাইরাস আক্রমণের উপসর্গগুলিও বৈচিত্র্যময়। কেউ বলছেন ‘মাথা ঘুরছে’ সঙ্গে অস্বস্তি, কারোর বা নিশ্বাসের সমস‍্যা, বুকে চাপ ভাব, আবার কারোর ‘স্বাদ গন্ধহীনতা’। তবে সব ক্ষেত্রেই মোটামুটি একটি কমন ফ্যাক্টর হল জ্বর। তাই এখন বলা হচ্ছে― “All fever are suspected due to Corona unless tested negative.” কথাটি আমি ও যখন শুনেছিলাম প্রথম বার, গলা শুকিয়ে গিয়েছিল ভয়ে। সঙ্গে মনের মধ‍্যে একটা ছবি ভেসে উঠল― ভারতবর্ষের কোনো এক নাম না জনা গ্রামের একটি মাটির ঘরে এক অসহায় বৃদ্ধ বাইরে বয়ে যাওয়া কালবৈশাখী ঝড়ের মধ্যে থেকে সামান্য একটু বাতাস নিজের ফুসফুসে টেনে নেবার ব‍্যর্থ চেষ্টা চালাচ্ছেন, আর তার পাশে বসে থাকা প্রিয়জনেরা হাজারো ‘টোটকা’ পদ্ধতিতে তার শরীরের অব‍্যক্ত যন্ত্রণা কমানোর চেষ্টা করছে…। হয়তো তারা জানে যে তারা হেরে যাবে… তাও চেষ্টার ত্রুটি নেই। বৃদ্ধটির শেষশয্যায় তাকে একটু শান্তি দেবার, তার কষ্ট যতটা সম্ভব লাঘব করার। সূক্ষ্মভাবে খোঁজ করলে দেখা যাবে এ ঘটনা বিরল নয়। পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতবর্ষের এমন অনেক প্রত‍্যন্ত জায়গায় বিকেলবেলা রাস্তা দিয়ে হাঁটলে দেখা যাচ্ছে মৃত মানুষের স্তব্ধ হয়ে যাওয়া দেহ। ‘করোনায় মৃত্যু’ শুনলে সেই মৃতদেহ সৎকারের সাহস কারোর নেই। সড়কপথে এই মৃত্যু মিছিলের দায়ভার কে নেবে? প্রশ্নটা থেকে যায়, উত্তর অজানা।

হে অভাগা দেশ ভারতবর্ষ, এখন আমরা সোশ্যাল মিডিয়াতে ৮ হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত শহরের নামি ক্লাবের ফুটবল খেলার সাফল্যে আবেগপ্রবণ হয়ে উঠি, কিন্তু মাত্র ৮০০ কিমি দূরে ‘করোনা জর্জরিত’ গ্রামের মানুষদের পাশে দাঁড়াতে হয়তো ভুলে যাই, বা হয়তো ইচ্ছাকৃতভাবে চোখ বন্ধ করে থাকি।

সারাদিন হাসপাতালে করোনা পজিটিভ পেশেন্টদের ওষুধ দেওয়া এবং তাদের সেফ হোমের উপযুক্ত ব‍্যবস্থার পর ক্লান্ত শরীরে যখন বাড়ি ফিরি, মনটা আরো ভারাক্রান্ত হয়ে যায় উপোরোক্ত কথাগুলো ভেবে। এখন এটা ভেবে শান্ত হই যে, বর্তমান স্বার্থপরতার যুগে স্বার্থহীন দেবদূতের মতো কাজ করছেন স্বেচ্ছাসেবীর দল। কাঁধে করে অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে যাওয়া, দুষ্প্রাপ্য রক্তের ব‍্যবস্থা করে দেওয়া থেকে শুরু করে কোভিড পেশেন্টদের সেফ হোমে পৌঁছে দেওয়া কোনো কাজেই তাঁরা পিছুপা হন না। মানবতা বেঁচে আছে বলেই এত যুবক-যুবতী স্বেচ্ছায় ঝাঁপিয়ে পড়েছে তাদের সমাজকে করোনা মুক্ত করে মানুষকে স্বাভাবিক জীবনযাপন ফিরিয়ে দিতে। খিদে তেষ্টা ক্লান্তি ভুলে ওদের এই প্রচেষ্টাকে সমগ্র জাতি চিরকাল মনে রাখবে। একজন স্বাস্থ্যকর্মী হিসাবে আপনাদের সবার কাছে আহ্বান জানাই, আপনারা সবাই মনস্থির করুন এবং প্রতিজ্ঞা করুন, “নিজে যদি ভালো থাকি আমাদের চারপাশে অসুস্থ মানুষের আমরা যে যতটা পারব সাহায্য করি।” এভাবেই গড়ে উঠতে পারে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি, যে জাতির প্রতিটা মানুষ একে অপরের বিপদে পাশে দাঁড়ায়, গড়ে উঠতে পারে ‘ইউটোপিয়া’ বা ‘স্বপ্নরাজ‍্য’।

করোনাভাইরাস আমাদের থেকে কী কেড়ে নিল? লক্ষ লক্ষ প্রাণ, সম্ভাবনাময় যুবক যুবতীর প্রজ্বলিত হবার সম্ভাবনা চিরতরে নিভিয়ে দিলো, বুঝিয়ে দিল― মানুষের হাতে প্রযুক্তি থাকতে পারে, কিন্তু প্রযুক্তি প্রকৃতির থেকে বড় নয়। করোনা কেড়ে নিল হাজার হাজার মানুষের জীবিকা, বাড়ল মানসিক চাপ, আত্মহত্যা। করোনাভাইরাস বুঝিয়ে দিল পৃথিবীর সব ধর্ম, বর্ণ, জাতির মানুষকে সে একইভাবে একই তীব্রতায় সংক্রমিত করতে পারে। তাই মানবজাতির উচিত এর থেকে অভিজ্ঞতা নিয়ে বৈষম্যবাদকে ভুলে গিয়ে এক সাম‍্যের পৃথিবী গড়ে তোলা, করোনা মুক্ত এক সুস্থ সুন্দর পৃথিবী। তাই শেষে এই প্রশ্ন থেকেই যায়― করোনাভাইরাস কি শুধুই এক বিশ্বব‍্যাপী মহামারি? না তার থেকে অনেক বেশি কিছু?

এসব ভাবতে ভাবতে যখন দিনের শেষে দু’চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে তখন মনে মনে প্রতিজ্ঞা করি, আগামীকাল আবার চেষ্টা করব পৃথিবীকে আরও একটু সুস্থ করে তোলার। অসুস্থ মানুষ যখন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ডিসচার্জ নিয়ে বাড়ি যায়, একজন ডাক্তারের কাছে সেটাই সবথেকে বড় প্রাপ্তি।  

তাই রাত ২টো ৩০ মিনিটের সময় এক ইমারজেন্সি কলে পেশেন্টকে পরামর্শ দেবার পর ফেসবুকটা খুলে ইয়ারফোনটা কানে নিয়ে চালিয়ে দি রূপম ইসলামের তৈরি ‘জীবাণু’ গানটি। আবার আলাদা উদ্দীপনায় পরের পেশেন্টটির কল রিসিভ করব। ঘুমে আচ্ছন্ন হবার পূর্ব মূহূর্তে শুনতে পেলাম গানটির শেষ চারটি লাইন। হ‍্যাঁ… ওই তো… গুরু বলছেন―  

“জীবন-প্রেমিক হলে হারে জীবাণুর ভয়
তাই আর অসুখ নয়, হোক সুখেরই সঞ্চয়।
যদি ভাবো হেরে যাব জিতে যাবে দুঃসময়।
তবে অসুখ জিতবে না, হবে সুখের দিগ্বিজয়… বিজয়।”

Facebook Twitter Email Whatsapp

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *