স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে রিলিজ হলে মরা গাঙে জোয়ার আনতে পারত ‘শেরশাহ’

অরিন্দম পাত্র

নব্বইয়ের দশকের শেষের দিক থেকে শুরু করে ২০০৪/২০০৫ পর্যন্ত দেশপ্রেম-ভিত্তিক ওয়ার ফিল্মের একটা বিরাট ট্রেন্ড চলেছিল বলিউডে। যার শুরুটা হয়েছিল মূলত ১৯৯৭ সালের জে পি দত্তা পরিচালিত ‘বর্ডার’ ফিল্মের মাধ্যমে। তারপর দত্তা সাহেবের হাত থেকে ‘এলওসি’ অথবা ফারহান আখতার নির্মিত ‘লক্ষ্য’ প্রভৃতি ফিল্ম ভারতীয় ‘ওয়ার ড্রামা’ জঁর-কে সমৃদ্ধ করেছে। কিন্তু গত ১০ বছরে সেভাবে আর যুদ্ধভিত্তিক ফিল্ম তৈরি হয়নি। একমাত্র ২০১৯-এর ‘উরি’ অথবা ২০১৭ সালের ‘দ্য গাজি অ্যাটাক’ বা দত্তা সাহেবেরই ২০১৮ সালের ফিল্ম ‘পল্টন’ বাদ দিলে আর কোনও ইদানীংকালের ওয়ার ড্রামার কথা মনে আসে না। সেই গ্যাপ বা শূন্যস্থানটা ‘শেরশাহ’ কতটা পূরণ করতে পারল, সেটা নিয়েই কিছুটা আলোকপাত করার চেষ্টা করব।

আরও পড়ুন: সূর্যে নাকি লকডাউন

আমাদের জেনারেশন একটাই যুদ্ধ দেখেছে, সেটা ১৯৯৯ সালের ভয়ানক কার্গিল যুদ্ধ। প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানের চোরাগোপ্তা আক্রমণে ৫০০-র ওপর সেনা জওয়ানের মৃত্যু দেখেছে। আর দেখেছে, অমানুষিক অত্যাচার করে হত্যা করা ক্যাপ্টেন সৌরভ কালিয়ার মৃতদেহ। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে কার্গিল যুদ্ধের আরেক অন্যতম শহিদ মরণোত্তর পরমবীর চক্র জয়ী ক্যাপ্টেন বিক্রম বাত্রার জীবন নিয়ে তৈরি ফিল্ম ‘শেরশাহ’ কার্গিল যুদ্ধের শহিদদের অমর স্মৃতির প্রতি একটি বিনম্র শ্রদ্ধার্ঘ্য। প্রোডাকশন হাউস আর হিরোর নাম শুনে প্রথমেই একটা নাক মুখ চোখ কুঁচকানি চলে এলেও ছবিটি যে সত্যিই ‘টেকনিক্যালি ওয়েল মেড’ সেটা স্বীকার করতে কোনও দ্বিধা নেই।

ছবির মুখ্য আকর্ষণের টানটান চিত্রনাট্য আর থ্রিলিং ওয়ার অ্যাকশন কোরিওগ্রাফি এবং অবশ্যই দুর্দান্ত সিনেমাটোগ্রাফি। একমাত্র দুর্বলতার জায়গা বলতে যেটুকু আছে, তা হল রোমান্টিক সাব প্লটটুকু। বিক্রম বাত্রার মতো সিংহহৃদয় আর অসমসাহসী সেনা অফিসারের চরিত্রটিকে সাফল্যের সঙ্গে তাঁর জীবনের খুঁটিনাটি সমেত পর্দার সামনে উপস্থাপিত করতে এই চিত্রনাট্য কোনও কসুর করেনি। পাশাপাশি ক্যারেক্টর ডেভালপমেন্টও খুব ভালো হয়েছে। আর অ্যাকশন সিকুয়েন্সগুলি সত্যিই খুব থ্রিলিং আর ন্যাচরাল লেগেছে। পাশাপাশি দুর্ধর্ষ রিয়ালিস্টিক লোকেশন আর সিনেমাটোগ্রাফি ও ভিএফএক্স-এর কাজ অত্যন্ত তারিফযোগ্য ছিল। মাউন্টেন ওয়ারফেয়ার-এর খুঁটিনাটি ডিটেলিংগুলি খেয়াল করলে বোঝা যাবে যে, রীতিমতো রিসার্চ করে বানানো হয়েছে ছবিটি। ছবির ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বেশ ভালো লাগল। গানগুলি শ্রুতিমধুর, তবে শেষ দৃশ্যে বি. প্রাক-এর কণ্ঠের গানটি আবেগপ্রবণ দর্শককে অশ্রুসজল করে তোলার ক্ষমতা রাখে।

আরও পড়ুন: ইমারজেন্সি এবং কিশোর কুমার: পুরনো বিতর্ক নতুন করে দেখা

এবারে আসি অভিনয় প্রসঙ্গে। মুখ্য ভূমিকায় সিড মালহোত্রা আছেন শুনে আমি কিন্তু প্রমাদই গুনেছিলাম। পর পর ছবি না চলার কারণে গুরুদেব জোহর এবারে শিষ্যকে এই ছবিটি উপহার দিয়েছিলেন, তা বোঝাই যায়। কিন্তু না, সিদ্ধার্থ লেটার মার্কস নিয়ে যে পাশ করে গেছেন তা স্বীকার করতেই হবে। বিক্রম বাত্রার দেশপ্রেম, জোশ আর সাহসিকতাকে নিজের মতো করে সুন্দরভাবেই পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি। তবে রোমান্টিক দৃশ্যগুলিতে ওনাকে কিছুটা আড়ষ্ট লেগেছে। আর আর্মি জয়েন করার আগের দৃশ্যগুলিতে কেন জানি না মনে হল সিদ্ধার্থর বড় চুল দেখানোর জন্য পরচুলা ব্যাবহার করা হয়েছে। যেটা দেখতে একেবারেই ভালো লাগেনি। বিক্রমের বাগদত্তা ডিম্পলের ভূমিকায় কিয়ারা আদবানির স্ক্রিনস্পেশ কমই ছিল। কিন্তু অসম্ভব সুন্দর দেখতে লেগেছে কিয়ারাকে। কপালের মাঝখানে একটা ছোট্ট টিপ আর ভারতীয় সাজসজ্জা যেন কিয়ারার আসল সৌন্দর্য্য পর্দার সামনে বের করে এনেছিল। অভিনয়ও তিনি মন্দ করেননি। পার্শ্বচরিত্রে বিক্রমের সহযোদ্ধাদের চরিত্রে শিব পণ্ডিত, নিকিতিন ধীর, শতাফ ফিগার, রাজ অর্জুন প্রমুখের অভিনয় বেশ ভালো।

আরও পড়ুন: কিশোর কুমারের ৯২তম জন্মদিনে অমিত কুমারের অভিনব শ্রদ্ধার্ঘ্য

সবমিলিয়ে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে থিয়েটার রিলিজ হলে এ ছবি হয়তো বা সিদ্ধার্থের কেরিয়ারের মরা গাঙে জোয়ার আনলেও আনতে পারত। আর একটা কথা না বললেই নয়। সেটা হল, বিক্রম বাত্রার মতো আত্মত্যাগে সদাপ্রস্তুত হাজার হাজার ভারতীয় সেনার কথা আমরা যেন না ভুলে যাই এই ১৫ অগাস্টের প্রাক্কালে। ওঁরা আছেন, তাই আমরাও আছি। নাহলে আরামকেদারায় হেলান দিয়ে গরম চা’য়ে চুমুক দিতে দিতে এই ফিল্ম রিভিউ লেখাটা হয়তো সম্ভব হত না।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *