ছাওয়াল পাওয়ালের মুখে খেল্

ড. কল্যাণ চক্রবর্তী

গরু চরাতে গিয়ে বিস্তৃত অবসরে রাখাল বালক যখন তৃণভূমিতে কাষ্ঠখণ্ডে ডাংকলুই (ডাংগুলি) খেলে, তখন তার আনন্দ বিশ্বকাপ ক্রিকেটারের চাইতে কি কম হত? পায়ে পায়ে বাতাবি-লেবুর গেণ্ডুয়া খেলার আনন্দ বিশ্বকাপ ফুটবল খেলার চাইতে কী কম? হ্যাঁ, কমতি একটা ছিলই, আমাদের শহুরে শিষ্টসমাজের আগ্রহ। গ্রামীণ জীবন থেকে উঠে আসা খেলাগুলিতে সম্পন্ন মানুষ তার সন্তানকে অংশগ্রহণ করাননি। সাজিয়ে গুছিয়ে ব্যাটবল, হকিস্টিক আর ফুটবল ধরিয়ে দিয়েছেন। সবই দরকার। অনেকে ভালো খেলোয়াড় হলেন, কেউকেটা হলেন, পুরস্কার পেলেন; কিন্তু রাষ্ট্রবোধে, জাতীয়তাবাদে অনুপ্রাণিত হলেন না। তাদের অনেকে এমন রাজনৈতিক দলের ভিড়ে সুযোগ-সুবিধা অর্জনের জন্য দৌড়ালেন, যাঁদের হেডঅফিস ভারতের বাইরে।

আরও পড়ুন: সেই খেলা নেই, খেলার সাথিও নেই, লোকক্রীড়া হারিয়ে গেছে

খেলোয়াড় জীবনে মাটির গন্ধ লাগাটা যে কী, আমরা কতজন বুঝেছি! জীবনচর্যার গভীরে, বোধের প্রাথমিকে দেশি সংকল্প না জন্মালে একশো আটত্রিশ কোটির দেশ হয়েও ভারতবর্ষ বিদেশি খেলাধুলায়, অ্যাথলেটিক্সে বিশ্বজয় করতে পারবে না! এক দু’টো বিক্ষিপ্ত জয়ের উদাহরণ কখনও ক্রীড়াক্ষেত্রের অগ্রগতি বোঝায় না। জীবনবোধ চাই, রাষ্ট্রচেতনায় ক্রীড়ামানস চাই। দেশীয় রূপ-রস-গন্ধ নিয়ে তবে ফুটবল, ক্রিকেট, হকির জগতে পদসঞ্চারণ হোক। লোকক্রীড়ার ধারাবাহিক ভিতের উপর দাঁড়িয়ে সব খেলার অনুশীলন চলুক, সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা আসুক। কেবল প্রাইজ মানির জন্য খেলা নয়, জীবনের অঙ্গ হিসাবে খেলাধুলার চর্চা হোক।

আরও পড়ুন: সত্যজিৎ ঘোষ: ফ্ল্যাশব্যাকে আশির দশকের কলকাতা ফুটবল দুনিয়া

সম্ভাবনাময় অথচ দুস্থ ঘরের খেলোয়াড়দের পুষ্টির জন্য গৃহে, স্কুলে, কলেজে, ক্লাবে, নানান আয়োজনে পুষ্টি বাগান (Nutritional Garden) গড়ে তোলা হোক। খেলাধুলা করলে খিদে পায়, জঠরাগ্নিতে খাবার জোগাতে না পারলে, কখন সে খিদে মরে যায়! ওপার-বাংলা-খেদানো এক পাড়াতুতো দাদু থাকতেন আমাদের পাড়ায়। খেলাধুলা খুব পছন্দ করতেন। বলতেন, ‘‘ছাওয়াল পাওয়ালের মুখে খেল।” মানে হচ্ছে, মুখে দানাপানি জোগালে তবে ছাওয়াল বা সন্তান খেলুড়ে হবে। পেটপুরে পুষ্টিকর খাদ্য চাই। খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে পুষ্টি নিরাপত্তাও চাই। বাংলার ঘরে ঘরে বাগান হোক, স্কুলে স্কুলে বাগান, পাড়ায় পাড়ায় কানন। শহরের ছাদে, জানালায় সুযোগ থাকলে হোক বাগিচা।

আরও পড়ুন: অমল আলোয় ফুটবলার অমল গুপ্ত: কিছু স্মৃতি, কিছু কথা

ক্রীড়া দুই প্রকার— শিষ্ট ক্রীড়া (Classical Games) এবং লোকক্রীড়া (Folk Games)। লোকক্রীড়াকে বলা যেতে পারে ‘ফলাসক্তিহীন কর্ম’। আনন্দই সেখানে মুখ্য, অংশগ্রহণই মূল বিবেচ্য, একদেশীভবন করার প্রচেষ্টাই মূলসুর। প্রকৃতির মধ্যে থেকে আপন সৌকর্যে, আপন জীবনযুদ্ধকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে প্রেরণাদায়ী করে তোলার শিক্ষণীয় পরিকল্পনা ছিল আদিম সমাজে। সেটাই আনন্দরস পেয়ে শরীরচর্চাকে মূল আধার করে হয়ে উঠল ক্রীড়া। তাতে যোগ হল সমাজ ও সভ্যতার নানান যুগের চিত্রনাট্য। লোকক্রীড়া সংস্কৃত করে ক্রমান্বয়ে হয়ে উঠতে থাকল শিষ্টক্রীড়া, তারমধ্যে রাজ-রাজাদের অনুপ্রেরণা যোগ হল, সমাজপতিদের ইচ্ছা-অনিচ্ছা মিলে গেল, একটা সর্বজনীন রূপ লাভ করল। পক্ষান্তরে লোকক্রীড়া হল লোকসমাজের মধ্যে আয়োজিত ক্রীড়ামোদ, লোকসমাজের অফুরন্ত প্রাণশক্তি, যুক্ত হল শিকড়-সংস্কৃতি। খেলার মধ্যে কঠোরতা নেই, পোশাক-আশাকের বাধ্যবাধকতা নেই, সময় সীমার সীমানাবিন্যাস নেই। আছে প্রকৃতি থেকে নেওয়া ক্রীড়ার নানান উপকরণ। মাঠ-ঘাট হল জিমনাসিয়াম বা ক্রীড়াচত্বর। তাতে খেলতে আসেন সেই লোকগোষ্ঠীর সদস্যরা, আর অহরহ আনন্দরসে অবগাহন করেন। তারাই ক্রীড়াকে করে তোলে আনন্দমুখর।

লেখক বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের হর্টিকালচার ফ্যাকাল্টির বিশিষ্ট অধ্যাপক।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *