‘ইল রিসরজিমেন্ত’ ইতালি জন্ম দিল ফুটবলের নতুন ভাষার

Italy Euro Cup 2021

ইন্দ্রজিৎ মেঘ

দেশটির ইতিহাস বলছে, ষাঁড় ছিল দক্ষিণ ইতালির উপজাতির প্রতীক। স্বাধীন ইতালিতে সামনিট যুদ্ধ হয়েছিল। এই যুদ্ধের সময় রোমান উদ্ধত নেকড়েকে রক্তাক্ত হতে হয়েছিল। ডিওনিসিয়াস অব হালিকারনাসাস নামক এক গ্রিক ইতিহাসবিদ ইতালিকে ‘ইটালুস’ বলেছিলেন। পরবর্তীতে আরও বিভিন্ন ঐতিহাসিকও ইতালিকে একই নামে ডেকেছিলেন। ব্রুত্তিউম উপদ্বীপের দক্ষিণ ভাগে অবস্থিত দক্ষিণ ইতালিই হালনাগাদের ইতালি। উপদ্বীপটির এখনকার নাম কালাব্রিয়া। রেনেসাঁর যুগে এহেন ইতালির অবদানের কথা সকলেই জানেন। ইতিহাস বলছে, নতুন কিছু সব সময় বিশ্বকে দিয়ে গিয়েছে ইতালি। লিওনার্দো দা ভিঞ্চির আঁকা ভিট্রুভিয়ান মানব নবজাগরণের যুগে অন্যতম সেরা শিল্পকর্ম ছিল। সেই ইতালি এবারের ইউরো কাপের ফাইনালে মাত্র দুই মিনিটের মাথায় লিউক শ-এর গোলে পিছিয়ে পড়ল। ঘরের মাঠে ইংল্যান্ডের দর্শকরা তখন জয়ধ্বনি দিতে শুরু করেছেন। অন্যদিকে, ইতালির সমর্থকরা মুখ বেজার করে ভাবছেন ৫৩ বছর পর তারা ইউরো কাপ পুনরুদ্ধার করতে পারবে কিনা। গ্যালারি থেকে তখন ফিসফাস শুরু হল। ইস, যদি লিউক শ-কে কোনও ইতালীয় ডিফেন্ডার ধরে রাখতে পারতেন, তাহলে হয়তো শুরুতেই এভাবে কিছু বুঝে ওঠার আগেই গোল খেতে হত না তাদের।

আরও পড়ুন: ক্রুশ্চেভ ভার্সেস টিটো: প্রথম ইউরো কাপ ফাইনাল ছিল ‘কমিউনিস্টদের লড়াই’

তবে গোলের কিছুক্ষণ পরেই ইতালি নিজেদের মধ্যে ছোট ছোট পাস খেলা শুরু করল। অন্যদিকে, ইংল্যান্ড মাঝেমাঝেই বেশ তেড়ে উঠছিল। কিন্তু কিয়েলিনির নেতৃত্বে ইতালি বোধহয় প্রথম গোলটি খেয়ে যাওয়ার পর শপথ করেছিল আর যাই হোক, গোল খাওয়া চলবে না। আর সেই কারণেই মাঝেমাঝে বিক্ষিপ্ত কিছু আক্রমণ ছাড়া ইংল্যান্ড সেভাবে আক্রমণে দানা বাঁধতে পারল না। নিজেদের রক্ষণকে সামলে নিয়ে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল ইতালি। তখন গ্যালারিতে ‘ইটস কামিং হোম’ গান শুরু হয়েছে। আর উদ্বুদ্ধ ইতালির ফুটবলাররা কাপ রোমে আনার জন্য একটার পর একটা আক্রমণ শানাতে থাকলেন। এর মধ্যেই ইংল্যান্ডের তিনজন ডিফেন্ডারকে পরাস্ত করে কিয়েসা বাঁ-পায়ে একটি দুর্দান্ত শর্ট নিলেন। কিন্তু ভাগ্য সুপ্রসন্ন না থাকায় শট অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হল। প্রথমার্ধে ম্যাচ শেষ হল ইংল্যান্ডের পক্ষে ১-০ অবস্থায়।

আরও পড়ুন: বাঙালি যেন ধন্দে: কোপা ফাইনাল নাকি মহালয়ার সকাল!

কান্নায় ভেঙে পড়েছেন হ্যারি কেনের স্ত্রী

দ্বিতীয়ার্ধে আহত বাঘের মতো খেলতে থাকে ইতালি। সমতায় ফেরার জন্য আরও মরিয়া হয়ে উঠল তারা। চূড়ান্ত আক্রমণাত্মক স্ট্যাটিজি নিলেন ইতালির কোচ মানচিনি। তিনি মাঠে নামালেন ডমেনিকো বেরার্দি ও ব্রায়ান ক্রিস্তান্তেকে। এরপর তাদের আক্রমণের ঝাঁঝ আরও বেড়ে গেল। ৬৭ মিনিটের পরিত্রাতা ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন বহু যুদ্ধের নায়ক লিওনার্দো বোনুচ্চি। উল্লেখ্য যে, ৩৪ বছর ৭১ দিন বয়সের বোনুচ্চি ইউরো কাপের ফাইনালে গোল করা সবচেয়ে বয়স্ক ফুটবলার হিসেবে নজিরও গড়লেন। ইতালি শুরুতেই গোল হজম করার পর যে ফুটবল উপহার দিল, তা ছিল শিল্পে মোড়া। সেখানে রয়েছে স্প্যানিশ টিকিটাকা কিংবা রন্ডো স্টাইল অফ ফুটবলের অপূর্ব মিশেল। রয়েছে ইতালিয়ান নিজস্ব ঘরানাও। ফুটবলে যেন চিত্রশিল্পের ক্লাসিসিজম আঁকছিলেন ইতালির ফুটবলাররা। শিল্পের কলাকৌশল যেন ছড়িয়ে পড়ছিল তাদের কোচ মানচিনির স্ট্র্যাটেজিতে। নিজেদের মধ্যে ৮২০টি পাস খেলা ইতালি যেন দৃশ্যকাব্য তৈরি করেছিল।

‘হোমে নয় রোমে’― ওয়েম্বলির গ্যালারিতে তখন ইতালির সমর্থকদের পোস্টার

টাইব্রেকারে যখন ইতালি জিতল, তখন বারবার মনে হচ্ছিল, কিংবদন্তি ফুটবলার পাওলো রসি, যিনি ২০২০-র ৯ ডিসেম্বর প্রয়াত হয়েছেন, তাঁকে এই জয় উৎসর্গ করলেন উত্তরসূরিরা। ওয়েম্বলির মাঠে ফাইনাল জেতার পর ৩৪টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে অপরাজিত থাকার রেকর্ড গড়ল ইতালি। তাছাড়াও তারাই একমাত্র দল, যারা মূল পর্বের দু’টি ম্যাচে টাইব্রেকারে জিতল। ইতালির এই জয়ের পর যখন স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণা নিয়ে ইংল্যান্ডের হ্যারি কেনের স্ত্রী কেটি গুডল্যান্ড হাপুস নয়নে কাঁদছেন, ঠিক তখনই ইউরোপের অন্যপ্রান্তে চলছে ট্রফি জয়ের উৎসব। রোমে সারারাত ব্যাপী সেলিব্রেশনে মেতে উঠল সমর্থকরা। কেবল তাই নয় বিশ্বের যেখানে যেখানে ইতালির সর্মথকরা আছেন, তাঁরাও মেতে উঠলেন আনন্দে। খবর পাওয়া গেল যে, কানাডার শহর টরন্টোয় এক জমকালো সেলিব্রেশনে মেতে উঠেছিলেন ইতালির সমর্থকরা। ওয়েম্বলিতে ব্রিটিশ সমর্থকে ভরা গ্যালারির এক কোণে ইতালির সমর্থকরা তখন পোস্টার দেখাতে ব্যস্ত, যেখানে লেখা আছে— “ট্রফিটি কেবল রোমে যাবে”। ‘ইল রিসরজিমেন্ত’। এর অর্থ পুনরুত্থান। ইতালির খেলা দেখে ভক্তরা বলতেই পারেন যে, পুনরুত্থান ঘটল ২০১৮-র বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জন করতে না পারা ‘জাত্যাভিমানী’ ইতালির।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *