জনাইয়ের বাকসা গ্রামে…

Jania

অনিন্দ্য সুন্দর দাস

জমিদারবাড়ির দোতলার জানালা থেকে দেখা যাচ্ছে পর্তুগিজদের বজরা ভেসে চলেছে। জনসমাগমে উৎসবমুখর বাড়িটার ঝাড়বাতি থেকে চুঁইয়ে পড়ছে বনেদিয়ানা। ঢাক-ঢোলের আওয়াজে হাঁড়িকাঠে ব্যা-ব্যা করতে থাকা প্রাণীটার ঘাড়ে কোপ পড়তেই সময় গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে ঝরে পড়ল। চোখের সামনে আবার সেই ভাঙা দেউল, মজে যাওয়া নদী আর জনমানবশূন্য ধ্বংসস্তূপ ফিরে আসে। ভাঙা রাজবাড়ির ঠাকুরদালানে পায়রার বকবকম ডাক যেন অতীত ইতিহাসের কথা বলে চলে নিঃশব্দে।

আরও পড়ুন: ইছামতীতে বিসর্জন বসিরহাটের ঐতিহ্য: করোনায় পড়ল ছেদ

মনে মনে সেকেন্ডের কাঁটা উলটো দিকে ঘুরে চলল। গোলা পায়রার গায়ের রঙের মতোই ঘোলাটে অতীত মেঘলা নদীকে বলে চলেছে তার আত্মকথা। পরাবাস্তবতার স্পর্শে মজে যাওয়া সরস্বতী নদী মুহূর্তে হয়ে ওঠে স্রোতস্বিনী। গোধূলি আলোয় চাঁদ সওদাগরের ডিঙি ভেসে যায়, ছপ্ছপ্ দাঁড়ের আওয়াজ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। বড় বড় গাছেদের ছায়া নেমে আসে। নদী বাঁক নেয়, বাঁক নেয় সময়ও।

দেওয়ান ভবানী চরণ মিত্র কিছুদিন ধরে সরস্বতী নদীর ধারে গেলে মাঝেমাঝেই শুনতে পাচ্ছেন শিব স্তোত্র আর ঘণ্টাধ্বনি। অথচ কাছাকাছি কোনও মন্দির নেই। তিনি ঠিক করেছেন দ্বাদশ শিব মন্দির করবেন নদীর ধারে। মন্দির তৈরি হচ্ছে জোরকদমে। মেঘ করে এসেছে খুব। বৃষ্টি নামবে মনে হওয়ার আগেই বৃষ্টি নামে মুষলধারে। সামনের ঠাকুর দালানের নীচে দাঁড়াবো বলে ছুটতে ছুটতে দেখি হারিয়ে যাচ্ছে ঠাকুরদালান— হারিয়ে যাচ্ছে বৃষ্টি। পড়ন্ত বিকেলের রোদ এসে পড়েছে দ্বাদশ শিব মন্দিরে। পাশেই একটা বারোয়ারি পুজো প্যান্ডেল থেকে গান ভেসে আসছে বেশ জোরে।

আরও পড়ুন: বিজয়া

সন্ধ্যা নামছে। মেঠো বাজারের খড়ের চালের দোকানগুলোয় প্রদীপের আলোয় জমাট বেঁধেছে অন্ধকার। ময়রাদের আজ ভীষণ আনন্দের দিন। নতুন রকমের সন্দেশ মন হরণ করেছে জমিদারবাবুর। প্রচুর সন্দেশ তৈরির বরাত পেয়েছে আজ। এ পাড়ার পরান নাগ কলকেতায় দোকান দিয়েছিল। তার ছেলে ভীম নাগ খুব নাম করেছে সেখানে। লেডি ক্যানিংয়ের মিষ্টি বানিয়ে চমকে দিয়েছে সবাইকে। এই ময়রা পাড়ার সবাই অবশ্য ওই লেডি কেনি মিষ্টি চেখে দেখেনি তবু ভীম নাগকে নিয়ে তাদের গর্বের শেষ নেই।

গ্রামের চণ্ডীমণ্ডপে আজ আড্ডা জমেছে খুব। এ গ্রামের মুখুজ্জেদের প্রাণকৃষ্ণ রাসমণির মন্দিরের এক পরমহংসের ভক্ত হয়েছে তাই নিয়ে আলোচনা চলছে। এক বয়স্ক ভদ্রলোক হুঁকোয় টান দিয়ে বলতে লাগলেন, “রাসমণির মন্দির! তা বটে; তোমরা আর জানবে কী করে? সেদিনের ছেলেছোকরা সব। রানি এই মিত্তিরদের রঘুনাথ মন্দির দেখে ওনার কালীমন্দির সেই আদলেই বানিয়েছিলেন সেটা জানো?”

আবার একবার হুঁকোয় সুখটান দিতে গিয়ে কাশতে লাগলেন তিনি। একটু পর চণ্ডীমণ্ডপে তর্ক জমে উঠল এ গ্রামেরই সিঙ্গি বংশের কালীপ্রসন্ন সিংহ হুতোমের নকশা লিখে কলকাতায় খুব নামডাক করেছে, তাকে নিয়ে। মাতব্বরদের একদল কালী সিঙ্গির গুণকীর্তন করছে সে মহাভারত লিখেছে বলে।

একটা ফাস্ট ফুডের স্টল থেকে এগরোল আর চিকেন কাটলেটের গন্ধটা নাকে আসতেই ঝাপসা হয়ে এল চশমার কাচ। খড়ের ছাউনি দেওয়া দোকানগুলোর জায়গায় দেখি বহুতল দাঁড়িয়ে আছে। বেশ খিদে পেয়েছে, একটা এগরোল খাওয়া যাক। এরপর দেখতে গেলাম চৌধুরিদের বাড়ির দুর্গাপুজো। দেবীর এখানে চারহাত। কাঠামোয় রাধাকৃষ্ণের মূর্তি শাক্ত ও বৈষ্ণবদের দ্বন্দ্ব অবসানের ইঙ্গিত দেয়।

সামনের বিশাল অশ্বত্থ গাছটা ক্ষয়িষ্ণু আভিজাত্যের দিকে অপলক তাকিয়ে আছে। শুকনো পাতা উড়তে উড়তে এসে পড়ল স্নান বাঁধানো পুকুরের বৈকালিক চাতালে। ঠিক তখনই পাশের চাঁপা গাছ থেকে খসে পড়া ফুলটা নিচু হয়ে নিতে যেতেই ফুলটা আর দেখতে পেলাম না, অথচ বাকি সব তেমনই আছে। ফুলটা কি সদ্য গাছতলায় পড়েছিল, নাকি অনেক কাল আগের ফেলে আসা অতীতের স্মৃতি? কী জানি…

● যাঁরা বর্তমান আর অতীতের গোলকধাঁধায় মানসভ্রমণ করতে ভালোবাসেন; সময়ের নিজস্ব কোনও অস্তিত্ব নেই, সে শুধু থাকে আমাদের চেতনায়— এ কথা একবার হলেও যাঁরা উপলব্ধি করতে পেরেছেন, তাঁরা ঘুরে আসুন জনাইয়ের বাকসা গ্রামের দুর্গাপুজোয়। গাছগাছালি ঘেরা, মজে যাওয়া সরস্বতী নদী, ভীম নাগ, হুতোম প্যাঁচা, পর্তুগিজদের স্মৃতি আর চাঁদ সওদাগরের ডিঙি বয়ে যাওয়ার বিশ্বাস বুকে নিয়ে থাকা এই জনপদ এককালে ছিল খুব সমৃদ্ধ। পুজোর সময় মনোহরা আর লম্বা বোঁদের স্বাদ নিতে নিতে ঘুরে দেখতে পারেন জনাই রাজবাড়ি, বাজারবাড়ি, চৌধুরিবাড়ি, সিঙ্গি বাড়ির ৩০০/৪০০ বছরের প্রাচীন পুজো। আর ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দে তৈরি আটচালা শৈলীর দ্বাদশ শিব মন্দির, রঘুনাথ মন্দির (১৭৯২ খ্রিস্টাব্দ), বদ্যি মাতার মন্দির আর সবুজের সমারোহ।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *