শান্তিপুরের খাবড়াডাঙার করম পুজোয় যেন উঠে আসে আদিবাসীদের যন্ত্রণার কথা

Gter

তিরুপতি চক্রবর্তী

শহর থেকে একটু দূরে মাদলের দ্রিমি দ্রিমি স্বর ভেসে আসছে বাতাসে। শহর শান্তিপুর তখন নিদ্রায়, অধিকাংশ দুর্গা মণ্ডপে তখন নিশুতি। সেই সময় এই আকাশ কাপানো স্বর কোথায় শোনা যাচ্ছে? হ্যাঁ! করম পুজো হচ্ছে। আদিবাসীদের পাড়ায় এ এক বিকল্প বনদুর্গা পুজো।

আরও পড়ুন: জনাইয়ের বাকসা গ্রামে…

শান্তিপুর শহরের একটু দূরে বাবলা পঞ্চায়েতের খাবড়াডাঙা। এখানে বাস করেন আদিবাসী সম্প্রদায়ের সর্দাররা। অষ্টমীর দিন তাঁদের করম পুজো করেন। করম আদিবাসীদের একটি বিখ্যাত উৎসব। যা অনুষ্ঠিত হয় ভাদ্রমাসের একাদশীর দিন। কিন্তু এই খাবড়াডাঙা, মাঠপাড়া, রাজাপুর, আড় পাড়া, বাবলা সর্দার পাড়া, দিগনগর পঞ্চায়েতের সেনপুর, রাউতাড়া, কয়া প্রভৃতি বিস্তীর্ণ আদিবাসী মহল্লাগুলি দুর্গাপুজোর সময় তাঁদের করম পরবকে পালন করেন। প্রায় ২০০ বছর ধরে। অতীতে এরা জমিদারবাড়ির লাঠিয়ালের কাজ করত। সেই বাড়িতে দুর্গাপুজো হলেও এদের নীচু জাত বলে ঠাকুর ছুঁতে দিত না। এদের পরিবারকে দুর্গামণ্ডপের কাছে যেতে দিত না।

তাই এই প্রজন্মের আদি পুরুষদের জাত্যাভিমানে লাগে। তাঁরা তখন স্থির করেন নিজেদের মধ্যেই এই পুজো করবেন। কিন্তু নীচু জাতির সে অধিকার জন্মাক, সেটা তৎকালীন ব্রাহ্মণেরা চাননি। ফলে তাঁদের এই ইচ্ছা পূর্ণ হয়নি। তখন তাঁরা ফের করম পুজো করেন গ্রামে। পরবর্তীকালে দু’বার করম করার সামর্থ্য না থাকায় এবং তারা ভাদ্রমাসের করম আর পালন করেন না। এই দুর্গা অষ্টমীর করমই মূল করমে রূপান্তরিত হয়েছে৷

আরও পড়ুন: বিজয়া

অষ্টমীর দিন সন্ধ্যাবেলায় করম গাছের ডাল কেটে আনেন, আবার কেউ নবমীর সন্ধ্যায় ডাল কেটে আনেন। সারারাত জেগে গান-বাজনা হয় নবমীর সন্ধ্যায় হয় করম পুজো। তিনজন কুমারী মেয়েকে করম পুজোর ডালের সঙ্গেই পুজো করা হয়। সন্ধ্যায় পিঠে, লুচি, মুড়ি, চিঁড়ে, খই সহযোগে পুজো হয়৷ তারপর হাঁড়িয়া ও মাদলের রসে ডুবে চলে সারারাত নাচ, গান। চলে জাগরণের পালা।

দশমীর দিন সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি এই ডাল নিয়ে সেইসব কুমারী এবং উদ্যোক্তারা এলাকার সব বাড়ি বাড়ি যান আশীর্বাদী দিতে৷ ডাল উঠোনে এলে পরিবারের বধূ সেটি বরণ করেন। তারপর তার বাড়িতে সেই পূজিত ডাল ছুঁইয়ে দেওয়া হয়। সবশেষে স্থানীয় কাঁদরে তা বিসর্জন দেওয়া হয় দশমীর সন্ধ্যায়।

এই পুজোয় জাওয়া পাতা হয়। যে কুমারী মেয়েরা করম ডাল পুজো করবেন, তাঁরা ছোলা, বুট, মটর, কুর্তী, কলাই— এই ছয় রকম বীজ বুনে এই জাওয়া তৈরি করা হয়। সেই জাওয়া পুজোর দিন ডালের সঙ্গে এই জাওয়াও পূজিত হন৷ এবং তিনটি মুরগি বলিদান দেওয়া হয়৷

কেউ বলেন করম আমাদের বনদুর্গা কেউ বলেন কুমারী মা, কেউ বলেন হামার দুগ্গা। নাম বিভিন্নতা থাকলেও আদতে এটি করম পুজো। তবে তাঁদের গানে, তাঁদের ঘোষণায় বারবার ফিরে আসে দুর্গামণ্ডপে না উঠতে পারার যন্ত্রণার কথা।

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *