অমৃতের সন্ধান ও অমৃতলাল পাড়ুই

অবশেষ দাস

ছোটবেলায় ধানের শীষ কুড়োনোর কথা খুব মনে পড়ছে। কচি হাতে চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ধানের শীষগুলো আমি, দিদি আর ভাই মিলে কুড়োতাম। একে অপরের দিকে মনোযোগ থাকত, কে কত বেশি ধানের শীষ কুড়িয়েছি, সেই দিকে। ছেলেমানুষি মনের একটা প্রতিযোগিতা। পাশাপাশি অনেকেই বিভিন্ন মাঠ ঘুরে ঘুরে ধানের শীষ কুড়োত, সেটা ছিল লক্ষ্মী সংগ্রহের তাড়না। আর আমরা নিজেদের জমিতে ধান তুলে নেবার পর অবশেষ হিসাবে যে ধানের শীষগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকত, সেগুলোই কুড়িয়ে নেওয়াটা ছিল বাবার দেওয়া দায়িত্ব। আমরা খেলাচ্ছলে সেটা পালন করতাম। দু-চারটে শালিক, ফিঙে বেশ স্বাধীনভাবে মাঠের ফসল নিজেদের আয়ত্তে রাখত। ধানের শীষ মুখে তুলে নিয়ে মাঠের মোটা আলপথের গায়ে ফুল ফোটা বাবলা গাছের উপর বসত, তারপর কোথায় ফুড়ুৎ হয়ে যেত কে জানে! কখনো-সখনো টিয়াপাখির ঝাঁক দেখা যেত। আমাদের ছেলেবেলার চোখ যেন সবুজে ভরে যেত। কেন জানি না ওই বয়স থেকেই কেমন যেন শিখে গিয়েছিলাম, জীবনের আকাশে জ্যোতিষ্ক খুঁজে পাওয়া। আমার জীবনের প্রথম মহাপুরুষ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। ‘প্রথম মহাপুরুষ’ কথাটা খুব সচেতনভাবে ব্যবহার করলাম। বাড়ির চারপাশ, আনাচ-কানাচ, তক্তপোশ, পরিবারের লোকজনের গলার স্বর যে বয়সে চিনে ফেলেছিলাম, বিদ্যাসাগরকেও চিনেছি ওই একই সময়। মহাপুরুষ শব্দটা শিখেছি আরো অনেক দেরিতে। আমার জীবনের আকাশে একে একে রবি ঠাকুর এসেছেন, বিবেকানন্দ এসেছেন, বাংলার মাঠ-ঘাট মুঠোতে ধরতে শিখেছি, জীবনানন্দের হাত ধরে। ঠিক যেভাবে ঘাসে ঘাসে শিশির ঝরে, আমার চোখ থেকে বইয়ের পাতায় পাতায় অশ্রু ঝরেছে, শরৎচন্দ্রের কাছে দাঁড়িয়ে। এ জীবনে আমার রাখাল হওয়া হল না। কিন্তু যাঁর কবিতা পড়ে রাখাল হয়ে থাকতে চেয়েছি, তিনি কবি জসিমউদ্দিন। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা আমার ঘর। আকুলপারা সন্ধ্যা প্রদীপের আলোতে তাকে দেখেছি। বিদ্যাধরীর তীরে দাঁড়িয়ে তাকে দেখেছি। রায়দিঘির দুপুরে বসে তাকে দেখেছি। ঝড়খালির জ্যোৎস্নায় তাকে দেখেছি। তাকে আরও কতভাবে দেখেছি বলে বোঝাতে পারব না। একটুকরো মায়ের আঁচলের মতো হৃদয়ে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনাকে বেঁধে রেখেছি। আমার বাংলার মুখ এই দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা।

আরও পড়ুন: ছাঁকনি

আমার আটত্রিশ পাতা জীবনে আমার দেখা সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্য-পুরোহিত পূজনীয় অমৃতলাল পাড়ুই। সাহিত্যমন্ত্রে তিনি সারাজীবন ধরে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার পূজা করে গেলেন। এই জেলার সাহিত্য-সংস্কৃতি, লোকাচার, উৎসব-অনুষ্ঠান কেবল তাঁর চোখেই দেখেছি। তীর্থে যাবার চেয়ে তাঁর কাছে যাওয়া ছিল আরও বেশি সৌভাগ্যের। আমার জীবনের আকাশে অমৃতলালবাবু অন্যতম একজন জ্যোতিষ্ক। তাঁকে প্রথম দেখেছিলাম পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি সভাঘরে (১৯৯৯)। প্রথম সাক্ষাতে তাঁর প্রতি খুব একটা আগ্রহ জন্মায়নি। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলা গ্রামীণ পত্র-পত্রিকা সমিতির প্রাণপুরুষ হিসাবে তাঁকে জেনেছিলাম।

মানুষ অমৃতলাল পাড়ুইকে আবিষ্কার করতে আমার অনেকটা সময় লেগে গেছে। একজন মেধাদুর্বল মানুষের কাছে সেটাই স্বাভাবিক। ধুতি-পাঞ্জাবি পরিহিত, সদা হাস্যময়, কর্তব্যপরায়ণ, বহু গুণসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব অমৃতবাবু দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার সাহিত্য ও সংস্কৃতি আন্দোলনের পুরোধা হয়ে উঠেছিলেন। তিনি একাধারে সংগঠক, সম্পাদক, লেখক ও গ্রাম-জীবনের রূপকার। আশুরালী গ্রাম উন্নয়ন পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা। বহু গুণ বহু সত্তার মধ্যে থেকে এই মানুষটির স্নেহপরায়ণ অভিভাবকত্বের প্রতি চিরকালের জন্য আকৃষ্ট হয়েছি। গভীর শ্রদ্ধা ও ভক্তিতে এই বিরল ব্যক্তিত্বের কাছে নতজানু হয়ে আছি। তিনি আমাকে সন্তানের চোখেই দেখতেন। তাঁর কথা লিখতে লিখতে বারবার তাঁর দু’টি পা মায়ের দেওয়া আলপনার মতো চোখে ভাসছে। এই পা দু’টিই তো আমাদের জেলাকে সারা বাংলার কাছে রানারের মতো পৌঁছে দিতে চেয়েছে। পুতুলনাচ, যাত্রা, পাঁচালিগান সবকিছু তিনি অমৃতের মতো আস্বাদন করেছেন। আর সেই অমৃতের আস্বাদ তিনি ছড়িয়ে দিয়েছেন দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার আনাচ-কানাচে, জনে জনে, হৃদয়ে হৃদয়ে। আঞ্চলিক ইতিহাস ও প্রত্ন গবেষণার প্রতি তাঁর আগ্রহ ও শ্রদ্ধা অন্তরে বিস্ময় জাগায়। তাঁর সম্পাদনায় হয়তো স্থাপত্য ছিল না, ষোলোআনা হৃদয় ছিল। জেলার লেখক, সাংবাদিক ও সর্বস্তরের শিল্পীদের আত্মপ্রতিষ্ঠার জন্য তিনি লড়াই চালিয়ে গেছেন। আসলে তিনি চেয়েছিলেন দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার আত্মপ্রতিষ্ঠা, এই জেলার হাত ধরে সমগ্র বাংলার আত্মপ্রতিষ্ঠা। তাঁর স্বপ্নের বীজ আমরা হাতের মুঠোতে ধরে আছি, তাঁর আদর্শ ও অন্তর প্রত্যাশার অভিমুখ ধরে সাহিত্য ও সংস্কৃতির যাত্রাপথকে আরও প্রশস্ত করতে হবে। আজ থেকে দুই দশক আগে কিংবা এক দশক আগে সাহিত্য আন্দোলনের যে ঢেউ দেখেছিলাম, কিছুটা হলেও ভাটা পড়েছে। সেজন্য তিনি মনে মনে আহত হয়েছিলেন। তাঁর সেই যন্ত্রণা উপলব্ধি করার মতো সক্ষমতা এতদিনে ঈশ্বর আমায় দিয়েছেন বলে বিশ্বাস করি।

আরও পড়ুন: শূর্পণখা: রাক্ষসী নয়, নারী

অমৃতবাবু হঠাৎই চলে গেলেন, যখন চারিদিকে মৃত্যুভয় থইথই করছে। সেই ভয়ের ভেতরে বসে আছে শারদীয়ার আবেশ, চারিদিকে শালুক ফোটার আনন্দ। তাঁর জীবনটা যেন শিউলি ফুলের মতো টুপ করে ঝরে গেল। আমরা হয়ে গেলাম অভিভাবকহীন। পুত্র হারানোর কাঁচা যন্ত্রণা তাঁর বুকে এখনও গেঁথে ছিল। সেজন্য তিনি যেন আরও বেশি কাজের মধ্যে ডুবে থাকতে চেয়েছিলেন।

প্রখ্যাত ক্রীড়া বিশেষজ্ঞ ও ইতিহাসের বিশিষ্ট অধ্যাপক শুভ্রাংশু রায়ের মুখে শোনা অমৃতবাবুর এক আশ্চর্য সৌজন্যবোধের কথা জেনে চমকে উঠেছিলাম। সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি তাঁর সীমাহীন শ্রদ্ধা ছিল। সাংগঠনিক আলোচনাসভায় তিনি কখনও মনোযোগে কার্পণ্য করতেন না। ব্যক্তিজীবনকে কখনোই তিনি আলোচনার টেবিলে আনেননি। বাড়ির সমস্যার কথা তিনি কখনও মুখ ফুটে বলেননি। ছেলে প্রচণ্ড অসুস্থ জেনেও তিনি জেলাজুড়ে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ছেলেকে নিয়ে বুকের গভীরে তির বিঁধে থাকার মতো প্রবল যন্ত্রণা তাঁর ছিল। কিন্তু সংস্কৃতি জগতের আত্মজনদের তা তিনি জানতে দেননি। তারিখটা ঠিক মনে নেই। সেদিন দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলা গ্রন্থাগারে ‘আঞ্চলিক ইতিহাস অনুসন্ধান উপসমিতি’র বিশেষ সভা চলছিল। গ্রন্থাগারিক শ্রীমধুসূদন চৌধুরি সহ আরও অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। অমৃতবাবু ছিলেন অন্যতম মধ্যমণি। শুভ্রাংশুবাবুও ছিলেন। অমৃতবাবু উৎসাহ সহকারে সবার কথা শুনছেন। কিছু কিছু বিষয় লিখে রাখছেন। প্রয়োজন মতো মতামতও দিচ্ছেন। অন্যদিনের তুলনায় অমৃতবাবুর মুখচ্ছবি এদিন ক্লান্তিতে ঢেকেছিল। হঠাৎ ফোনের রিংটোন শোনা যায়, তাঁর পকেটে। সৌজন্য বজায় রেখে আলোচনা কক্ষের বাইরে চলে যান। বাইরে থেকে অস্পষ্টভাবে শোনা গেল, “কিছু তাহলে করা গেল না”। দু-তিন মিনিট পরে উনি আবার আলোচনায় যোগ দিলেন। সবাই আলোচনার বিষয়ে ডুবেছিলেন। আলোচনা আরও বেশ কিছুক্ষণ চলল। মিটিং শেষ হবার পর যে যাঁর গন্তব্যে রওনা দিলেন। পরের দিন খুব সকালে গ্রন্থাগারিক মধুসূদনবাবু অধ্যাপক শুভ্রাংশু রায়কে একটি ফোন করেছিলেন। আর তখনই তিনি জেনেছিলেন, জেলা গ্রন্থাগারে মিটিং চলাকালীন অমৃতবাবুর একটি ফোন এসেছিল। আর সেই ফোনেই তিনি পুত্রের মৃত্যুর সংবাদ পান। কিন্তু তাঁর আচরণে কোনও প্রতিক্রিয়া প্রকাশ পায়নি। চলমান আলোচনা যাতে কোনওভাবে বন্ধ হয়ে না যায়, সেজন্য তিনি এত বড় মর্মবিদারী বিষয়টি গোপন করে গেলেন। পুত্রশোকের জ্বালা বুকে নিয়েও তিনি মিটিং চালিয়ে গেলেন। শুভ্রাংশুবাবুর কথায়, “মধুসূদনবাবু ফোনে আরও কয়েকটি কথা বলছিলেন, অমৃতবাবুর বিষয়ে। কিন্তু কোনও কথাই আর কানে আসেনি। এমন মানুষ, এমন সৌজন্য আর এ জীবনে দেখা সম্ভব নয় হয়তো। একেবারে গল্পের মতো। গল্প নয়, সত্যি কথা। আগুন চাপা দেওয়া যায়। শোক তো চাপা দেওয়া যায় না। অমৃতবাবু পেরেছিলেন।” এই অভিজ্ঞতার কথা শুভ্রাংশুবাবু শুধু নয়, আমরাও এ জীবনে ভুলব না। পুত্রশোকের গোপন দহন তাঁর জীবনীশক্তির সব শস্য তুলে নিয়ে গেল। তিনি যেন চুপচাপ মৃত্যুর কাছে আত্মসমর্পণ করলেন। একটা শালিক খুব সহজেই ধানের শীষ মুখে নিয়ে চলে যায়। ঠিক একই রকম ভাবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মৃত্যু এসে অমৃতবাবুকে নিয়ে গেল। আর আমরাও সত্যি সত্যি অনাথ হয়ে গেলাম। আমাদের বড় করে তোলা ছাড়া কিছুই তিনি চাননি।

আরও পড়ুন: জীবনের গাছপালা, জীবনের ডালপালা

আমার জীবনের প্রথম কবিতার বই ‘মাটির ঘরের গল্প’ (২০০৪)। তাঁর উৎসাহ ও আর্থিক সহযোগিতায় প্রকাশ পেয়েছিল। জনমানসে প্রবলভাবে সমাদরও পেয়েছিল। ওই একরত্তি বয়সে স্বরচিত গ্রন্থের মুখ দেখার সৌভাগ্য বহু স্বনামধন্য লেখকের কপালেও জোটে না। পূজনীয় অমৃতবাবুর সীমাহীন উদারতায় তা সম্ভব হয়েছিল। অঞ্চলভিত্তিক সাহিত্য সম্মেলনের প্রেক্ষিতে তিনি বেশ কয়েকবার ফতেপুরে এসেছেন। আমার নবনির্মিত গৃহে এসেছেন, একমুঠো ডাল-ভাত খেয়ে গেছেন। সন্তান হিসেবে এ আমার পরম পাওয়া। এই অঞ্চলভিত্তিক সাহিত্য সম্মেলনের হাত ধরে বারোআনা দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা দেখেছি। কত ধরনের মানুষ দেখেছি। কিন্তু অমৃতলালবাবুর মতো এমন নিপাট ভদ্রলোক খুব একটা দেখিনি। যখনই ভাদুড়ার দিকে যাই, সাকুয়ার পোলের কাছে থমকে দাঁড়ায় আমার পঞ্চ ইন্দ্রিয়। ওখান থেকে আশুরালি গ্রামের দিকে একটা আঁকাবাঁকা পথ চলে গেছে। আগে ইট বিছানো ছিল, এখন কংক্রিটের ঢালাই রাস্তা। ওই রাস্তার দিকে তাকালেই মনটা কেমন কেমন করে। কত কথা কত স্মৃতি উঠে আসে। ঠায় তাকিয়ে দেখি ওই রাস্তা। মনের অজান্তে রোদ মাখানো ওই পথে দীর্ঘ দুই দশকের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রতিধ্বনি শোনা যায়। গ্রামোন্নয়নের বার্তা শোনা যায়। এই গ্রাম আশুরালি নয়, অমৃত গ্রাম। ছোটবেলার ধানের শীষ কুড়োনোর কচি হাতটা যেমন হারিয়ে ফেলেছি, ঠিক তেমন জীবনের আকাশ থেকে অমৃতবাবুকেও হারিয়ে ফেলেছি। কিন্তু আমার মানস গঙ্গার তীরে প্রতিদিন যে সূর্য ওঠে সেখানে তিনি আপন গৌরবে ভাস্বর হয়ে ঋষির মতো বসে আছেন। আমার দিব্যচক্ষুতে দেখা এক অবিস্মরণীয় মহাপুরুষ অমৃতলাল পাড়ুই। তাঁকে সেবা করার সুযোগ পেলাম না, এই লেখাটাই আমার অঞ্জলি।

নিবন্ধক বিশিষ্ট সাহিত্যকার এবং বাংলা বিভাগ, বিদ্যানগর কলেজে অধ্যাপনারত

Facebook Twitter Email Whatsapp

2 comments

  • Syed Jahangir Hossain

    এতো সুন্দরভাবে শ্রদ্ধা নিবেদন করা শুধু আপনার দ্বারাই সম্ভব । ঈশ্বর আপনাকে এর উত্তম প্রতিদান দিক। আপনি আগিয়ে চলুন স্যার, আপনি আমাদের গর্ব।

  • Syed Jahangir Hossain

    এমন সুন্দর ভাবে শ্রদ্ধা নিবেদন করা তা শুধু আপনার দ্বারাই সম্ভব । স্যার আপনার লেখা যত পড়ছি ততই আপনার গুনমুগ্ধ হয়ে উঠছি । স্যার আপনি আমাদের গর্ব।আপনি আগিয়ে চলুন, ঈশ্বর আপনার সঙ্গে আছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *