হারিয়ে যাওয়া গবেষণাগারের খোঁজে

ড. সৌমিত্র কুমার চৌধুরী

স্যার রোনাল্ড রসের অধীনে আরও এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাগারের অস্তিত্ব ছিল বঙ্গপ্রদেশে। নিরূপণ করা সম্ভব সেই গবেষণাগারের অবস্থান। হুগলি জেলার পাণ্ডুয়া ব্লকের অধীন ম্যালেরিয়া অধ্যুষিত মহানাদ গ্রামে ছিল ওই গবেষণাগারের অবস্থিতি। কলকাতা শহর থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরে গবেষণাগার তৈরির ভৌগলিক ও বৈজ্ঞানিক প্রেক্ষাপট কী ছিল? উল্লেখ করা আবশ্যক যে মহানাদ অতি প্রাচীন এবং সমৃদ্ধ এক নগরী। ঐতিহাসিক বিচারে ‘মহানাদ’ এক সময়ের বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্য ধর্মের লীলাভূমি ছিল। ব্রিটিশ শাসনকালে মহানাদ ও কলকাতার মধ্যে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু হয়। স্কটিশ মিশন এই অঞ্চলে উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে বহুবিধ কাজকর্ম শুরু করেছিল। স্কটিশ মিশনের সৌজন্যে প্রাপ্ত বাগানবাড়িতে স্কটিশ ডাক্তার রস গবেষণাগার তৈরি করেছিলেন। সম্ভবত খোলামেলা বড় জায়গায় পাখিদের ম্যালেরিয়া (Avian malaria) সংক্রান্ত বিষয়ে গবেষণার কাজ সুবিধাজনক ছিল। পক্ষীকুলের ম্যালেরিয়া বিষয়ে ডাক্তার রসের গবেষণাকর্মের বহু প্রমাণ আছে।

এমন কী করে হয়? গবেষণাগার তো অনুসন্ধানের জন্য। পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয় সেখানে, খুঁজে বেড়াতে হয় প্রশ্নের উত্তর। কিন্তু গবেষণাগার, তাকেই খোঁজ পেতে হবে! কোথায়, কেমন সেই ল্যাবরেটরি? সচেষ্ট হব অন্বেষণে। হারিয়ে যাওয়া গবেষণাগার, সেটি সাধারণ কিছু নয়। অসাধারণ। এক নোবেল-জয়ী বিজ্ঞনীর গবেষণাগার।

স্বনামধন্য সেই বিজ্ঞানী, স্যার রোনাল্ড রস (১৮৫৭-১৯৩২)। চাকরিজীবনের শুরুতে ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষে সামরিক বিভাগের ডাক্তার তিনি। চাকরিতে যোগ দেন একশো চল্লিশ বছর আগে (১৮৮১)। ম্যালেরিয়া রোগ সংক্রান্ত গবেষণায় সাফল্যের কারণে তাঁর নোবেল প্রাপ্তি (১৯০২)। ভারতে কর্মরত থাকাকালীন (১৮৮১-১৮৯৯) তিনি আবিষ্কার করলেন এক নতুন তথ্য। প্রমাণ করলেন যে ম্যালেরিয়া পরজীবীর (Malaria parasite) বাহক (vector) আনোফেসিল মশা। যুগান্তকারী আবিষ্কার। কাজটি সম্পন্ন করলেন কলকাতা শহরে (২০-২১ আগস্ট, ১৮৯৭)।

আরও পড়ুন: অক্সিজেন সংবেদন

ভারতের বহু শহরে ডাক্তার হিসাবে কাজ করলেও কলকাতা এবং সেকেন্দ্রাবাদ ছিল তাঁর মূল কর্মক্ষেত্র। কিন্তু তাঁর প্রধান গবেষণাগারগুলি দেশের কোথায় কোথায় ছিল? এ-প্রশ্নের উত্তর বেশ জটিল, কারণ প্রাসঙ্গিক অনেক তথ্যই অজানা। তবু সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে আমরা এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজব।

প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তি অনুযায়ী, গবেষণার মূল কেন্দ্রগুলো ছিল সেকেন্দ্রাবাদ, কলকাতা এবং অপর একটি জায়গা। কোথায় সেই অপর জায়গা? কী ধরনের গবেষণা হত সেখানে?

সেই স্থান অবিভক্ত বাংলায়। শহর কলকাতা থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরের এক গ্রাম।  সেই আলোচনা পরে। আপাতত অন্য প্রসঙ্গ। সেকেন্দ্রাবাদে গবেষণাগার কথা জানা গেলেও সেখানে স্যার রোনাল্ড রসের সহকারী ডাক্তার রত্নম পিল্লাই সম্পর্কে আমরা অল্পই জানতে পেরেছি।

ইতিহাসের লিপিবদ্ধ তথ্য অনুযায়ী, ডাক্তার রসের কলকাতার গবেষণাগারটি ছিল তৎকালীন প্রেসিডেন্সি জেনারেল (P.G.) হাসপাতালে (অধুনা শেঠ সুখলাল কারনানি মেমোরিয়াল হাসপাতাল)। উল্লেখ আছে ডাক্তার রসের রচনায় (Memoirs)। উল্লিখিত হয়েছে কলকাতার কাজকর্ম সম্পর্কে বহু তথ্য। গবেষণাগারে স্থানাভাব, ম্যালেরিয়া রোগীর রক্ত সংগ্রহের অসুবিধা ইত্যাদি  (Memoirs)। [৩] ডাক্তার রসের আগে এই গবেষণাগার ব্যবহার করেছেন আরেক জন ব্রিটিশ সেনা ডাক্তার, অধ্যাপক ডি ডি কানিংহ্যাম।

আরও পড়ুন: অমরত্বের অন্বেষণ

চিত্র ১ – কলকাতায় ডাক্তার ক্যানিংহামের এই গবেষণাগারেই স্যার রোনাল্ড রস গবেষণা করতেন। (www.welcomeimages.org-এর সৌজন্যে প্রাপ্ত ছবি)

কানিংহ্যামের গবেষণাগারটি (চিত্র ১) ব্যবহারের সুযোগও সহজে মেলেনি। এর জন্য উপর মহলের সুপারিশ প্রয়োজন হয়েছিল। সুপারিশ এসেছিল ডাক্তার প্যাট্রিক ম্যানসনের কাছ থেকে। তৎকালীন ইংল্যান্ডের বিশ্ববিখ্যাত ম্যালেরিয়া গবেষক ডাক্তার প্যাট্রিক ম্যানসন। অবশ্য তার আগে ডাক্তার রসকে কলকাতায় বদলি করতেও প্যাট্রিক ম্যানসনের সাহায্য দরকার হয়েছিল।

বহু প্রতিকূলতার মধ্যে অসাধারণ উদ্দম ও মনোবল সম্বল করে গবেষণা চালিয়েছিলেন ডাক্তার রস। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাব, উপরওয়লার ঘন ঘন বদলির আদেশ, দেশের উষ্ণ আবহাওয়া, গবেষণায় বহু ব্যর্থতা। এসব সত্ত্বেও উনি প্রমাণ করতে সমর্থ হলেন যে, ম্যালেরিয়া পরজীবীর বাহক আনোফেসিল মশা। গবেষণার এক পর্যায়ে রোগীর রক্ত সংগ্রহে অসুবিধা দেখা দিয়েছিল। এ তথ্য ডাক্তার রস তাঁর স্মৃতিকথায় লিখে গিয়েছেন। সম্ভবত সে-কারণেই গবেষণার সুবিধার্থে তিনি ম্যালেরিয়ার অন্য মডেল খুঁজছিলেন। মানুষের শরীরে মারণরোগ ম্যালেরিয়া আক্রমণের কারণ বুঝতে পৃথিবীর অনেক বৈজ্ঞানিক সে-সময়ে পাখির ম্যালেরিয়াকে গবেষণার মডেল হিসাবে মানতেন। রোনাল্ড রসও ‘পক্ষী-ম্যালেরিয়া’ গবেষণায় মনোনিবেশ করেছিলেন। কিন্তু পাখি সংক্রান্ত গবেষণাকর্ম তো অল্প পরিসরে সম্ভব নয়। তাহলে কোথায় সম্ভব হয়েছিল ডাক্তার রসের পক্ষী-ম্যালেরিয়া সংক্রান্ত গবেষণা? বর্তমান নিবন্ধে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজব।  

আরও পড়ুন: অতি ছোট, ক্ষমতায় সূর্যেরও বেশি

রসের নোটবুকের পৃষ্ঠা, যেখানে তিনি মশার মধ্যে ‘পিগমেন্টেড বডি’ রেকর্ড করেছিলেন, যা পরে তিনি ম্যালেরিয়া পরজীবী হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন

সংগৃহীত তথ্য জানান দিচ্ছে, স্যার রোনাল্ড রসের অধীনে আরও এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাগারের অস্তিত্ব ছিল বঙ্গ প্রদেশে। নিরূপণ করা সম্ভব সেই গবেষণাগারের অবস্থান। হুগলি জেলার পাণ্ডুয়া ব্লকের অধীন ম্যালেরিয়া অধ্যুষিত মহানাদ গ্রামে ছিল ওই গবেষণাগারের অবস্থিতি। কলকাতা শহর থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরে গবেষণাগার তৈরির ভৌগলিক ও বৈজ্ঞানিক প্রেক্ষাপট কী ছিল?

উল্লেখ করা আবশ্যক যে, মহানাদ অতি প্রাচীন এবং সমৃদ্ধ এক নগরী। ঐতিহাসিক বিচারে ‘মহানাদ এক সময়ের বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্য ধর্মের লীলাভূমি ছিল। ব্রিটিশ শাসনকালে মহানাদ ও কলকাতার মধ্যে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু হয়। স্কটিশ মিশন এই অঞ্চলে ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে বহুবিধ কাজকর্ম শুরু করেছিল। স্কটিশ মিশনের সৌজন্যে প্রাপ্ত বাগানবাড়িতে স্কটিশ ডাক্তার রস গবেষণাগার তৈরি করেছিলেন।

পক্ষী-ম্যালেরিয়া (Avian malaria)  সংক্রান্ত গবেষণা সুবিধাজনক হবে, তাই খোলামেলা এবং বড় জায়গায় গবেষণাগার স্থাপন করেছিলেন স্যার রোনাল্ড রস। পক্ষীকুলের ম্যালেরিয়া বিষয়ে ডাক্তার রসের গবেষণা কর্মের বহু প্রমাণ লিপিবদ্ধ আছে। আগেই উল্লিখিত, অত্যন্ত বাস্তব কারণে ডাক্তার রস পাখির রক্তে মশা-কামড়ের প্রভাব অন্বেষণে মনোনিবেশ করেছিলেন। মানুষের শরীরে ম্যালেরিয়ার বিস্তার খুঁজতে বিশ্বের বহু বৈজ্ঞানিক সে সময়ে পক্ষী-ম্যালেরিয়াকে গবেষণার মডেল হিসাবে ব্যবহার করতেন।

কিন্তু মহানাদে ডাক্তার রসের গবেষণাগারে যে পাখি প্রতিপালিত হত, তার প্রমাণ কোথায়? উত্তর হিসাবে প্রথমে বলতে হয়, কলকাতায় ডাক্তার রস কানিংহ্যামের যে গবেষণাগারটি (চিত্র ২) পেয়েছিলেন তা ছিল অত্যন্ত অপরিসর। [৪] অপ্রশস্ত জায়গায় পাখি সংক্রান্ত গবেষণা অসম্ভব। মহানাদে ডাক্তার রসের প্রশস্ত গবেষণাগারে যে পাখি প্রতিপালন ও গবেষণা হত তার নির্দিষ্ট প্রমাণ হিসাবে দাখিল করা যায় নিচের একটি ছবি। ছবির প্রসঙ্গ পরে আলোচিত হবে।

আরও পড়ুন: সূর্যে নাকি লকডাউন

চিত্র ২ – LABORATORY AT CALCUTTA. SURGEON-MEJOR ROSS, MRS.ROSS, MAHOMED BUX, A LABORATORY ASSISTANT, AND BIRDS IN CAGE, 1898. মহানাদে (জেলা হুগলি) ডাক্তার রোনাল্ড রসের গবেষণাগার। Commons.wikimedia.org-এর সৌজন্যে পাওয়া ছবি। এখানে LABORATORY AT CALCUTTA লিখিত থাকলেও এর অস্তিত্ব হুগলি জেলার মহানাদ গ্রামে। ছবিতে ডাক্তার রস ও মিসেস রসের সঙ্গে মহম্মদ বক্সের পিছনে দাঁড়িয়ে আছেন ডাক্তার রসের ভারতীয় সহকারী, কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় (বয়স ২১)। ছবিতে সিঁড়ির নিচে রাখা হয়েছে খাঁচাবন্দি অসংখ্য পাখি।

মহানাদে কী ধরনের গবেষণা চলত, তার বিবরণ কোথাও নেই। কিন্তু প্রমাণ আছে যে, ডাক্তার রসের সহকর্মী কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৭৭-১৯২৩) মহানাদ গ্রামে চিকিৎসা ও গবেষণার কাজে আসতেন। ডাক্তার রস নিজেও মহানাদে আসতেন এবং থাকতেন। এ-প্রসঙ্গে বলবার আগে কিশোরীমোহনের পরিচয় দেওয়া আবশ্যক।

কিশোরী মোহন ছিলেন ‘বিজ্ঞান-গবেষক, বিজ্ঞানের স্নাতক (রসায়ন শাস্ত্র, প্রেসিডেন্সি কলেজ), সমাজকর্মী এবং বহুবিধ কর্মকাণ্ডে যুক্ত। পিতা, শ্রীননীলাল বন্দ্যোপাধ্যায় শিক্ষক। ফারসি এবং সংস্কৃত ভাষায় ছিলেন সুপণ্ডিত। ঠাকুরদা দুর্গাদাস ছিলেন আয়ুর্বেদ-চিকিৎসক। কিশোরীমোহন তাঁর ঠাকুরদার আয়ুর্বেদ-চিকিৎসার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত ছিলেন এবং আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার সঙ্গে বিজ্ঞানের মেলবন্ধন ঘটিয়ে তদানীন্তন গ্রামবাসীদের চিকিৎসা করতেন। সেই সূত্রে কলকাতার ডাক্তারদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল।’

আরও পড়ুন: সাম্প্রতিক বাংলা সাহিত্যের নিরিখে বিরলতমদের একজন হাসান আজিজুল হক

কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়

কিশোরী মোহনের পৈতৃক আবাস ছিল পানিহাটি এবং মাতুলালয়ের অবস্থান ছিল শিয়ালদহ সংলগ্ন এন্টালি অঞ্চল। প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যায়ন কালে কিংবা পিজি হাসপাতালে যাতায়তের জন্য এন্টালিতেই থাকতেন তিনি। পৈতৃক বাড়িতে থেকে সংলগ্ন গ্রামাঞ্চল এমনকী গঙ্গার অপর পারে হুগলি জেলার বহু গ্রামে চিকিৎসা করতেন। সে-যুগে গ্রামবাসীরা কিশোরীমোহনকে একজন নির্ভরযোগ্য ডাক্তার রূপেই জানতেন। তৎকালীন বিখ্যাত চিকিৎসক ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায় (১৮৮২-১৯৬২), পরবর্তীকালে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী (১৯৪৮-১৯৬২), ছিলেন তাঁর নিকট-বন্ধু।৭, ৮

কলকাতায় ডাক্তার রসের সহকারী কিশোরীমোহনের এন্টালির মাতুলালয় তথা জন্মস্থান থেকে পিজি হাসপাতাল ছিল পায়ে হাঁটা পথ। আবার পাণ্ডুয়ার মহানাদও ছিল কিশোরী মোহনের পরিচিত এবং পৈতৃক আবাস থেকে জলপথে সহজ ছিল মহানাদ যাওয়া-আসা। পৈতৃক আবাস পানিহাটি থেকে নৌকায় গঙ্গা পেড়িয়ে কিশোরীমোহন সহজেই মহানাদে, ডা. রসের অতিথিশালা (Guest House) তথা গবেষণাগারে পৌঁছে যেতেন। বর্তমানে পানিহাটি থেকে জলপথে ত্রিবেণী পৌঁছে গাড়িতে মহানাদে পৌঁছানো যায়। এছাড়া হাওরা-বর্ধমান (মেন) লাইনে পাণ্ডুয়া স্টেশনে নেমে অটোরিকশা বা বাসে ছ’কিমি দূরে মহানাদে পৌঁছানো যায়।

আরও পড়ুন: নিউজিল্যান্ডের কিছু সাহিত্য সাময়িকী ও লিটল ম্যাগাজিন

তৎকালীন মহানাদে বাংলাদেশের অনেক ধরনের সাধারণ পাখি নিয়ে গবেষণা করেছিলেন ডাক্তার রস। যেমন কাক, চড়াই, পায়রা, বাবুই, ভরত পাখি (Larks)। গবেষণায় তিনি প্রমাণ করতে পেরেছিলেন যে, কিউলেক্স মশার দংশন পাখিদের ম্যালেরিয়া ঘটায় আর মানুষের ম্যালেরিয়ার কারণ অ্যানোফেলিস মশার দংশন।৪, ৯

মহানাদে ডাক্তার রসের গবেষণাগারের অস্তিত্ব সম্পর্কে ‘মহানাদ বা বাংলার গুপ্ত ইতিহাস’ বইয়ের ভূমিকায় ড. প্রদীপ্ত বন্দ্যোপাধ্যায় লিখছেন, “স্যার রসের সময় হুগলি জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মানুষ ম্যালেরিয়ার প্রকোপে পড়েছিল। মহানাদ ও তার আশপাশের গ্রামগুলি থেকে মশা সংগ্রহ করে তাদের উপর (ডাক্তার রস) পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান এবং তাদের গতিপ্রকৃতি, সংক্রমণের ধরন-অধ্যয়ন করেন।” [৫]।  

গবেষণার কাজে স্কটিশ ডাক্তার রোনাল্ড রসের আগমনের অনেক আগে মহানাদে স্কটিশ মিশন শিক্ষা বিস্তারের কাজ শুরু করেছিল। আলেকজান্ডার ডাফ ‘ফ্রি চার্চ মিশন স্কুল’ (পরবর্তীতে ইউনাইটেড ফ্রি চার্চ মিশন স্কুল) প্রতিষ্ঠা করেন ১৮৫৬ সালে। এ প্রসঙ্গে ড. প্রদীপ্ত বন্দ্যোপাধ্যায় আরও লিখছেন [৫], “আলেকজান্ডার ডাফ–এর নেতৃত্বে স্কটিশ মিশন মহানাদে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ওর লাগোয়া একটি স্থানে এই পরীক্ষাগারটি (ডাক্তার রসের গবেষণাগার) অবস্থিত ছিল। বর্তমানে ওই বাড়িটি নেই এবং সেই স্থানে বনসৃজন করা হয়েছে। ওই বাড়িটি আমি দেখেছি। পুরনো স্টাইলে তৈরি উঁচু বাড়ি…”।

প্রবন্ধকারের সঙ্গে আলোচনায় (মার্চ ২০১৬) ড. প্রদীপ্ত বন্দ্যোপাধ্যায় একই কথা জানিয়েছেন। তিনি আরও লিখেছেন, ‘এই বাড়িটি পরবর্তীকালে কিনে নেন এক ডাক্তার, জনপ্রিয় অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসক শ্রীঅবনীমোহন ভট্টাচার্য। এই বাড়িতেই ডাক্তার অবনীমোহন ভট্টাচার্য মহাশয়ের চেম্বার ছিল। পরবর্তীকালে মহানাদের পাট উঠিয়ে চুঁচুড়ায় বাড়ি নির্মাণ করে তিনি সদর শহরেই বসবাস শুরু করেন।’ [৫]

স্থানীয় বয়স্ক মানুষজনের মুখে এই বাড়ির ইতিহাস এবং সেখানে ডাক্তার অবনীমোহন ভট্টাচার্যের বসবাসের কথা প্রবন্ধকারও শুনেছেন (২০১৫-১৬)। কিন্তু কেমন ছিল সেই বাড়ি?

ওই বাড়ি (চিত্র ২)সম্পর্কে বলবার আগে বাড়ির মালিকানা এবং সম্পত্তি-হাতবদলের প্রসঙ্গও অনিবার্য। স্কটিশ মিশনের কাছ থেকে কিনে নেওয়া ওই বাড়ির দীর্ঘ সময়ের মালিক ছিলেন ডাক্তার শ্রীঅবনীমোহন ভট্টাচার্য। তাঁর মৃত্যু হয় ১৯৯৫ সালে। পরিতাপের বিষয়, অবনীবাবুর জীবিতকালে ওই বাড়ি তথা গবেষণাগার সম্পর্কে কোনও অনুসন্ধান হয়নি। এই বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন ডাক্তার ভট্টাচার্যের পুত্র সত্যব্রত ভট্টাচার্য (জন্ম ১৯৪৩)। সত্যব্রতবাবুর বর্ণনার ভিত্তিতে (ফেব্রুয়ারি ৯, ২০১৬) এই বাড়িটির বিবরণ (চিত্র ২) লেখা হচ্ছে। তাঁর স্ত্রী এবং ভ্রাতৃবধূর স্মৃতি-নির্ভর বাড়িটির বর্ণনাও একই রকম।

লম্বা বারান্দাওয়ালা গথিক স্টাইলের বাড়ি, মোটা থামের উপর দাঁড়িয়ে। মাটি থেকে অনেক উপরে উঁচু প্লিন্থের উপর বাড়ির মেঝে। মেঝে এবং ভূমিতলের (Land surface) মাঝখানটা ফাঁপা। সিঁড়ি ডিঙিয়ে বারান্দা পেরিয়ে প্রশস্ত হল ঘর, তার প্রান্ত সীমায় ফায়ার প্লেস। হল ঘরের বাঁ-দিকে লম্বা-চওড়া দু’টি ঘর। ঘরের পেছেনে খুব বড় আকারের বাথরুম-পায়খানা। হল ঘরের ডান দিকেও একই রকম লম্বা-চওড়া দু’টি করে ঘর এবং ঘরের পেছেনে বৃহদাকার বাথরুম। বাড়ির দরজা জানালা সেগুন কাঠের তৈরি এবং মাটি থেকে শিলিঙ পর্যন্ত তার বিস্তার। দরজা-জানালার পেছনে ফ্রেমবন্দি কাচের শার্সি। বাড়ির সিলিংয়ে মেহগনি কাঠের কড়ি বরগা। সিলিংয়ে লাগানো হাতে টানা পাখার কপিকলও তাঁরা দেখেছেন। আর দেখেছেন বড় বাড়িটির বাইরেও খোলা মেলা প্রচুর জায়গা। সত্যব্রতবাবু, তাঁর স্ত্রী এবং ভ্রাতৃবধূর মতে, নিচের ছবিটি (Commons.wikimedia.org-এর সৌজন্যে পাওয়া) তাঁদের এক-সময়ের মালিকানাধীন মাহানাদে অবস্থিত বাড়ি (চিত্র ২)। তবে বাড়ি ও বারান্দার অল্প অংশই ধরা পড়েছে ছবিতে। ছবির ডানদিকে (চিত্র ২) বারান্দার আরও অনেকটা অংশ দৃশ্যমান নয়। লেখকের মতে, সে-সময় অনুন্নত মানের ক্যামেরায় (ওয়াইড অ্যাঙ্গেল লেন্সের সাহায্য বিনা), সম্পূর্ণ বাড়িটির চিত্রগ্রহণ হয়তো সম্ভব ছিল না। ওই বাড়ির অপর কোনও ছবি ভিন্ন সূত্র থেকে এখন অবধি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ওই গৃহের একদা অধিবাসী ও মালিকবৃন্দ ছবিটিকে তাঁদের বাড়ি বলে শনাক্ত করেছেন। 

মহানাদের ওই বাড়িতে, মশা ও বিভিন্ন পাখি নিয়ে গবেষণা করে গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব আবিষ্কার করেছিলেন স্যার রোনাল্ড রস। কী সেই তত্ত্ব? ‘পাখিদের শরীরে ম্যালেরিয়া জ্বরের সংক্রমণ ঘটায় কিউলেক্স মশার দংশন’ বর্তমানের স্কুলছাত্ররা জানলেও একশো কুড়ি বছর আগে অজানা ছিল বিষয়টি।

আরও পড়ুন: মুর্শিদাবাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি: স্বাধীনতা পূর্ব

বাড়িটি তথা নোবেল পুরস্কারের সঙ্গে সম্পর্কিত গবেষণাগারটি কালের গ্রাসে পড়ে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জীর্ণ হতে হতে সম্পূর্ণই ভেঙে পড়ে। ইতস্তত কিছু ইটের পাঁজা এখনও দেখা যায়।

গবেষণার কাজে কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় কীভাবে মহানাদে পৌঁছতেন, আগে বলা হয়েছে। ডাক্তার রস কেমন করে মহানাদে পৌঁছতেন? এ প্রসঙ্গে জানা যায়, “বাংলায় প্রথম রেলওয়ে চালু হয় হাওড়া থেকে হুগলি ও পরে পাণ্ডুয়া স্টেশনের মধ্যে। মহানাদে ডাফ সাহেবের স্কুল ও তার সন্নিহিত অঞ্চলের অবস্থান পাণ্ডুয়া স্টেশন থেকে মাত্র ছয় কিলোমিটার দূরে। অনুমান করা যেতে পারে স্যার রস তাঁর কাজের জন্য কলকাতা থেকে রেলযোগে পাণ্ডুয়া স্টেশনে নেমে মহানাদে আসতেন।” [৫] প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখযোগ্য, কলকাতা-পাণ্ডুয়া ভারতবর্ষের দ্বিতীয় রেলপথ। এর সূচনা হয় অগাস্ট ১৮৫৪। ব্রিটিশ শাসিত ভারতের প্রথম রেলপথ মহারাষ্ট্রের বম্বে-থানে।

বর্তমান নিবন্ধ সম্পর্কিত বহু ইতিহাস আজও অজানা। কিছু তথ্য হয়তো এখনও গবেষক ও সাধারণ মানুষের প্রচেষ্টায় উদ্ধার করা সম্ভব। বর্তমান রচনা সেই উদ্দেশে একটি সামান্য প্রয়াস মাত্র।

তথ্যসূত্র

১. The Nobel Prize internet archive

২. দ্য হিন্দু, আগস্ট ১৯, ২০১৪

৩. Memoirs of Ronald Ross (Keynes Press, UK) by Sir Ronald Ross.

৪. Sir Ronald Ross and the Malarial Parasite: Discovery of its Route – From Man to Mosquito and Back, Shobhona Sharma, Resonance July 2006.

৫. মহানাদ বা বাংলার গুপ্ত ইতিহাস, প্রভাস চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, এম সি সরকার অ্যান্ড সন্স, তৃতীয় সংস্করণ। 

৬. R Ross, Researches on malaria, Nobel Lecture, December, 12, 1902. (From Nobel Lectures, Physiology or Medicine 1901-1921, Elsevier Publishing Company, Amsterdam, 1967).

৭. মলয় রায় চৌধুরী, আমার দাদামশায় কিশোরী মোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, সৃজন, জানুয়ারি ২০১৪ বইমেলা সংখ্যা।

৮. ড. সৌমিত্র কুমার চৌধুরী, ম্যালেরিয়া গবেষণায় বিস্মৃত ভারতীয় বৈজ্ঞানিক, জ্ঞান ও বিজ্ঞান, ফেব্রুয়ারি ২০১৬

৯. www. Malariaparasite.com/wp-content.

পরিশিষ্ট

লন্ডনের School of Tropical Medcine-এর আর্কাইভে মহানাদ বা কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে কোনও লিখিত তথ্য নেই। ছবিতে (চিত্র ২) LABORATORY OF CALCUTTA লিখিত থাকলেও এর অবস্থান ছিল মহানাদে এর স্বপক্ষে আর্কাইভ কতৃপক্ষ আরও প্রমাণ চাইছে। ওরা নতুন তথ্য সংগ্রহে ইচ্ছুক এবং বর্তমান লেখককে চিঠিপত্রের মাধ্যমে ওরা এ কথা জানিয়েছে।

লেখক পূর্বতন বিভাগীয় প্রধান ও এমেরিটাস মেডিক্যাল সায়েন্টিস্ট, চিত্তরঞ্জন জাতীয় কর্কট রোগ গবেষণা সংস্থান।

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *