বীরভূমের শহরে নেশা করার জন্য চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা অব্যাহত, ভাঙছে সংসারও

Addiction Birnhum

মহিউদ্দীন আহমেদ

ঘটনা এক। কলেজে পড়তে পড়তে মোনালিসা প্রেমে পড়ে রহিতের (দু’টি নাম আসল নয়)। প্রেম করে দুই বাড়ির অমতে বিয়েও করে। বিয়ের বছর দু’য়েকের মধ্যেই সম্পর্কে ফাটল ধরে। একমাত্র সন্তানকে নিয়ে মোনালিসা এখন থাকে মায়ের বাড়িতে। রহিতের বাবা বিশ্বভারতীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মী। ভালো বেতন পেলেও জীবনের শেষ বয়সে এখন শুধুই হা-হুতাশ। বউমা মোনালিসা ভালো হলেও রহিত নেশাগ্রস্ত। প্রেম করে বিয়ের বছর দু’য়েকের মধ্যে মোনালিসা এখন দোষারোপ করছে তার ভাগ্যকে। কি ভুল করেছি! কারণ স্বামী দেখতে সুন্দর হ্যান্ডসাম হলেও ব্রাউন সুগারের নেশায় আসক্ত। বেসরকারি সংস্থায় কাজ করার পর নেশার জন্য এখন কাজ নেই। বাবার সঙ্গেও সম্পর্কে চিড় ধরেছে।

আরও পড়ুন: রাজ্য পুলিশের উচ্চ পর্যায় বড় রদবদল

ঘটনা দুই। কোলে দুই সন্তান নিয়ে পার্টি অফিস, থানা বারবার ঘুরেছে অতসী (আসল নাম নয়)। স্বামী দেখে না। দিনে যা রোজগার করে, সবই ঢেলে দেয় নেশা করতে। সংসারে খরচ দেয় না। ছেলেদের পোশাক-আশাক তো দূরের কথা, দু’বেলা পেটের ভাত জোগাড় করতেই হিমশিম অবস্থা হয় অতসীর। বাবুদের বাড়িতে কাজ করে কোনও রকম দিনাতিপাত। বছর তেইশের অতসী জীবনের চরম দুর্গতি নিয়ে কোনও রকমে বেঁচে আছে। স্বামী তার নেশাখোর।

এগুলি খণ্ডচিত্র মাত্র। মদ, গাঁজা, ব্রাউন সুগারের মতো নেশা শহরে শুধু চুরি ছিনতাই বাড়িয়ে শহরবাসীর জীবনযাপন ওষ্ঠাগত করেছে তাই নয়। নেশাগ্রস্তদের পরিবারের স্ত্রী, মা, বাবা, নিষ্পাপ শিশুদের জীবনকেও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে ঢেলে দিয়েছে। মদ, গাঁজা, ব্রাউন সুগার নেশাগ্রস্তদের অনেক সংসার ভেঙে যাচ্ছে। বাড়ছে পারিবারিক হিংসার ঘটনাও। নেশার দ্রব্য বিক্রি করার জন্য একাধিক ব্যক্তিকে ধরা হয়েছে। পুলিশ, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন থেকে স্থানীয় রাজনৈতিক-সামাজিক নেতা, কাউন্সিলরদের সহযোগিতায় নেশা বিক্রেতাদের আখড়া ভাঙচুরও করা হয়েছে। তবুও নেশাদ্রব্যর সাপ্লাই বন্ধ করা যায়নি। এটা যেমন একটা বড় সমস্যা, তেমনি নেশাখোরদের কাউন্সেলিং করার মতো সামাজিক বা সরকারি উদ্যোগও সেভাবে নেই।

আরও পড়ুন: দুঃস্থদের আর্থিক সাহায্য দিয়ে বীরভূমে বৃক্ষরোপন করবে জেলা জমিয়তে হিন্দ

বেসরকারিভাবে নেশা মুক্তি কেন্দ্র বোলপুরে থাকলেও সেখানে খরচের ব্যাপার থাকায় গরিব মানুষ যেতে পারে না। বোলপুরের হরগৌরীতলার বাসিন্দা সমাজকর্মী গোপাল ভট্টাচার্য, বোলপুর পৌরসভার কাউন্সিলর রাধেশ্যাম আঁশ বলেন, “সরকারি হাসপাতালে সাধারণ অসুখ-বিসুখের যেমন চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে, সেরকম নেশায় আসক্ত ব্যক্তি মানসিক চিকিৎসা সহ কাউন্সেলিং করার সেন্টার দরকার। যাতে গরিব মানুষ বিনামূল্যে এই পরিষেবা পায়।” শহরে নেশা করার জন্য চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা যেমন অব্যাহত, তেমনি সাংসারিক অশান্তির ঘটনাও বিদ্যমান।

বোলপুরের বাসিন্দা সমাজকর্মী মহম্মদ আলি বলেন, “বোলপুর শান্তিনিকেতন সত্যিকারের শান্তিপ্রিয় জায়গা। বড় ধরনের অশান্তি, ভেদাভেদ নাই। কিন্তু নেশার ঘটনা একেকটি পরিবারকে একেবারে শেষ করে দিচ্ছে। যা সত্যিই চিন্তার কারণ।” বীরভূম চাইল্ড লাইনের কো-অর্ডিনেটর দেবাশিস ঘোষ বলেন, “নেশা সমস্যা বীরভূম জেলার বোলপুর শান্তিনিকেতন ছাড়াও সিউড়ি রামপুরহাট শহরেও রয়েছে। এই সমস্যা শহরেই বেশি।” তিনি জানান, কোনও নেশাগ্রস্ত যদি মাইনর হয় তাহলে প্রতিটি বিপিএইচসিতে অন্বেষা নামের সরকারি প্রকল্পে একজন করে কাউন্সিলর রয়েছে। মাইনর বয় বা গার্ল হলে আমাদের জানালে আমরা যোগাযোগ করে তাকে সুস্থ করে স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর চেষ্টা হয়। কিন্তু বড়দের জন্য বিনামূল্যে সেরকম ব্যবস্থা নেই।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *