কাঙ্ক্ষিত আঁধারে

দিবাকর ভট্টাচার্য

বহুকাল আগের কথা। এক পাহাড়ের গায়ে প্রায় একই সময়ে আলোর দিকে মাথা তুলল তিনটি গাছের চারা। তাদের মধ্যে প্রথমটি বলল― “আমি অনেক বড় হব। বিরাট চেহারা হবে আমার।” দ্বিতীয়টি বলল― “আমি অনেক সুন্দর হব। সবাই আমার দিকে তাকিয়ে থাকবে।” তৃতীয়টি বলল― “আমি এত বড় হব যে, সবাই মুখ তুলে আকাশের দিকে চাইলে তবেই আমার মাথাটা দেখতে পাবে।”

হয়তো ঈশ্বর তাদের কথা শুনলেন। কালক্রমে প্রথম গাছটি সত্যিই প্রকাণ্ড আকারের হল। দ্বিতীয় গাছটি ফুলে ফুলে সত্যিই অপূর্ব সুন্দর দেখতে হল। তৃতীয় গাছটি সত্যিই যেন আকাশছোঁয়া উঁচু হল।

এছাড়াও এরা সবাই মনে মনে চেয়েছিল, যেন এরা বরাবর একজায়গাতেই থাকতে পারে।

এরপর একদিন এক কাঠুরিয়া এলো সেখানে। গাছতিনটিকে দেখতে পেয়ে সে বলল― “বাহ্। অনেকদিন বাদে মনের মতো তিন-তিনটি গাছ পাওয়া গেছে।” তারপরেই সে এক-এক করে গাছগুলোর গোড়ায় লাগাল জব্বর এক একটা কোপ।

প্রথম গাছ পড়ে যেতে যেতে বলল― “ঈশ্বরের ইচ্ছায় এবার নিশ্চয়ই আমি খুব শক্ত পোক্ত একটা কাঠের জিনিসে বদলে যাব। পৃথিবীর সবচেয়ে মহান যা, তার ভার বহন করব আমি। নিশ্চয়ই কোনো রাজার রথের চাকা হব আমি।”

দ্বিতীয় গাছ পড়ে যেতে যেতে বলল― “ঈশ্বরের ইচ্ছায় এবার নিশ্চয়ই আমি খুব সুন্দর একটা জিনিস হব। পৃথিবীর সেরা সুন্দর আসবে আমার সবচেয়ে কাছে। নিশ্চয়ই সবচাইতে সুন্দর কোনো মানুষের পালঙ্ক হব আমি।”

তৃতীয় গাছটি পড়ে যেতে যেতে বলল― “এ কেমন হল ঈশ্বর! আমি যে সবচেয়ে উঁচুতে থাকতে চেয়েছিলাম। তাহলে এভাবে মাটিতে পড়ে যেতে হচ্ছে কেন? আমি এই দৃশ্য দেখার চেয়ে চোখ বন্ধ করি।”

ঈশ্বর কী শুনলেন বা আদৌ কিছু শুনলেন কিনা কে জানে।

আরও পড়ুন: সুখের সন্ধানে

কাঠুরিয়া কাটা গাছগুলো বাজারে বিক্রি করে দিল। এরপর কেটে গেল বেশ কিছু কাল। প্রথম গাছটি একটি কেটে দু’টি চাকা বানিয়েছিল এক কাঠমিস্ত্রি। শক্তপোক্ত। কিন্তু কোনো রাজার রথের নয়। একটি ঠেলাগাড়ির চাকা। সুরতহাল করার জন্য মৃতদেহ নিয়ে যাওয়া হত এই ঠেলাগাড়িতে। দ্বিতীয় গাছটি কেটে একটি কাঠের চৌপায়া বানিয়েছিল আরেক কাঠমিস্ত্রি। মজবুত। কিন্তু কোনো সবচাইতে সুন্দর মানুষের পালঙ্ক নয়। এই চৌপায়া রাখা থাকত একটা লাশকাটা ঘরে। শব ব্যবচ্ছেদের জন্য মৃতদেহ রাখা হত এই চৌপায়ায়।

তৃতীয় গাছটি কেটে অন্য একটি কাঠমিস্ত্রি একটি ঘরের কড়ি― বরগা বানিয়েছিল। যা দেখতে গেলে সত্যিই মুখ তুলে তাকাতে হত। এই কড়ি― বরগা লাগানো হল একটা লাশকাটা ঘরে।

কোনো এক জায়গায় কখনো কোনো অস্বাভাবিক মৃত্যু হলে ওই কাঠের ঠেলাগাড়িতে নিয়ে যাওয়া হত সেই মৃতদেহকে। আর তারপর সেই মৃতদেহকে রাখা হত ওই কাঠের চৌপায়ায়― কাটাছেঁড়া করার জন্য। এবং চৌপায়াটা রাখা ছিল যে লাশকাটা ঘরে, সেই ঘরেই লাগানো ছিল ওই কড়িবরগাটি।

এসব হয়তো সম্ভব হয়েছিল ঈশ্বর বা পরমনিয়ন্তার কোনো কৌতুকী ইচ্ছাতেই।

এরা সেই ইচ্ছার জোরে সবাই একজায়গায় এলো বটে, কিন্তু কেউ কাউকে চিনতে পারল না। তাই ঠেলাগাড়ির চাকা চিনল না চৌপায়াকে। চৌপায়াও চিনতে পারল না কড়িবরগাকে। যদিও এরা মাঝেমাঝেই একজায়গায় এসে হাজির হত― যখন কোনো মৃতদেহ নিয়ে আসা হত এই লাশকাটা ঘরে।

মাঝেমাঝে এরা নিজেরাই নিজেদের মনে মনে বলত― কী চেয়েছিলাম আর কী হলাম!”

প্রথম গাছটি দুঃখ করে বলত― “সবচেয়ে বিরাট চেহারা ছিল বলে ভাবতাম সবচাইতে বেশি ভার বইব রাজার রথের চাকা হয়ে। তার বদলে হলাম এই গলাপচা মরা মানুষ বইবার ঠেলাগাড়ির চাকা। হা ঈশ্বর! তুমি এত নিষ্ঠুর!”

দ্বিতীয় গাছটি দুঃখ করে বলত― “সবচাইতে সুন্দর চেহারা ছিল বলে ভাবতাম সবচেয়ে সুন্দরকে নিয়ে থাকব― তার পালঙ্ক হয়ে। তার বদলে হলাম মরে কাঠ হয়ে থাকা মানুষের চিৎ হয়ে পড়ে থাকার জায়গা। ঈশ্বর! তুমি আমার ইচ্ছা নিয়ে এমন উপহাস করলে!”

তৃতীয় গাছটি কোনো কথাই না বলে চোখ বন্ধ করে নিশ্চুপে পড়ে থাকত আর ভাবত― “চোখ চাইলেই তো যত বীভৎস দৃশ্য! দেখব যত মরা মানুষ মুখ তুলে আছে আমার দিকে!ঈশ্বরের কী আশ্চর্য লীলা!”

ঈশ্বর তাদের এসব কথা শুনেছিলেন কিনা কে জানে? কিন্তু তিনি যে অবাঙ্―মনসো―গোচর। তাই অন্ধকারের আশ্রয়েই ঢেকে যেত এদের হাহাকার।

কিন্তু একদিন এক তুমুল ঝড়বৃষ্টির দিন― এক ব্যক্তির মৃতদেহ আনা হল ওই ঠেলাগাড়িতে করে। তিনি কিন্তু যে সে মানুষ ছিলেন না। ঈশ্বরের মতো রূপ তাঁর। ঈশ্বরের মতোই ছিল নাকি তার প্রজ্ঞা। তিনি ছিলেন মহাকবি। কিন্তু তিনি আত্মহনন করেছিলেন কোনো এক অজ্ঞাত কারণে। সত্তর বছর বয়সে। তাই তাঁকে আনতে হয়েছিলো ওই লাশকাটা ঘরে। এক পড়ন্ত বিকেলে। ঝড়বৃষ্টির প্রবল দুর্যোগের মধ্যে। এরপর ওই ঘরের নিকষ অন্ধকার ঢেকে দিয়েছিলো ঘরের সবকিছুকে। অবশ্যই ওই মহাকবিকেও।

আরও পড়ুন: হারু হরবোলা

হয়তো এ-সবই ঈশ্বর কিংবা এক পরমার্থকৌতুকীর ইচ্ছামাত্র।

তাই ওই সদ্যপ্রয়াত মহাকবি অমন নিবিড় অন্ধকারে যেন শুনতে পেলেন তাদের নিজস্ব কথাগুলো―

“আজ যাকে নিয়ে এলাম তিনি নাকি এক মহাপুরুষ! তাহলে এতদিন বাদে আমার স্বপ্ন সার্থক হল। আমি বরাবর চাইতাম, পৃথিবীর সবচেয়ে মহান ব্যক্তির ভার যেন আমি বহন করতে পারি”― বলল প্রথম গাছটি থেকে তৈরি সেই ঠেলাগাড়ির চাকাদু’টি। যখন ঠেলাগাড়িতে করে সেই লাশকাটা ঘরের দিকে আসছিল ওই মহাপুরুষের মৃতদেহটা। “এইসময়ে যিনি আমার উপর শুয়ে আছেন তিনি শুনছি এক শ্রেষ্ঠসুন্দর মানুষ। আমি বরাবর চেয়েছিলাম পৃথিবীর সবচাইতে সুন্দর যে তাকে যেন আমি কাছে পেতে পারি। ইনি সত্যিই সবচেয়ে সুন্দর। আজ আমার এতদিনের মনের বাসনা পূর্ণ হল”―কথাগুলি বলল দ্বিতীয় গাছটি কেটে তৈরি করা চৌপায়াটি। যখন ঠেলাগাড়ি থেকে নামিয়ে ওই চৌপায়ার উপর রাখা হল ওই অনিন্দ্যসুন্দর কবির মৃতদেহটি।

“আমার দিকে অমন ভাবে মুখ তুলে কেউ তাকিয়ে থাকবে ভাবতেই পারিনি। ওনার দৃষ্টি যেন স্থির নয়― নিবদ্ধ। নিষ্প্রাণ নয়― যেন অন্তর্ভেদী। ইনি কি কখনো মৃত হতে পারেন? শুনলাম ইনি একজন মহাজ্ঞানী মহোত্তম কবি ছিলেন। আমি চিরকাল ভেবে এসেছি, আমার দিকে যেন মানুষ মুখ উঁচু করে তাকিয়ে দেখে। এখন পৃথিবীর এক শ্রেষ্ঠ পুরুষ এইভাবে মুখ তুলে একদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছেন আমার দিকে। এতদিনে আমার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হল”― কথাগুলো বলল তৃতীয় গাছ থেকে কেটে তৈরি করা কড়িবরগাটি। যখন ওই মহাজ্ঞানীর মুখটি― তাঁর আশ্চর্য চোখ দু’টি উপরের দিকে স্থির হয়ে পড়েছিল ওই লাশকাটা ঘরে।

কারণ সেই মহান কবি ও দার্শনিক― অবশ্যই এক শ্রেষ্ঠ মানবপুত্র― এবং সমসময়ের কাছে ঈশ্বরসমান― তিনি তাঁর সত্তরতম জন্মদিনের প্রাক্কালে― মধ্যরাতে― এক মারাত্মক রাসায়নিক বিষপানে আত্মহত্যা করেছেন। অতএব তিনি যতই মহামানব হোন না কেন― একটি পর্যায়ের পর তাঁকে সরিয়ে নিতেই হল ফুলের স্তূপের ভিতর থেকে― প্রবল জনসমুদ্র থেকে। কারণ এরপর তাঁকে আসতে হল ওই ঠেলায় করে― চৌপায়ার উপরে― লাশকাটা ঘরে।

এই পর্বের কাজ করে যে গুটিকয়েক মানুষ,তারা তাদের কাজ সারতে লাগল নিয়মমাফিক। আর ওই নিয়মমাফিকই সেই রাতে ওই লাশকাটা ঘরে পড়ে রইলেন নিথর নিস্পন্দ মহাকবি। কারণ পরের দিন ভােরেই তাঁর যথাবিহিত শবব্যবচ্ছেদ হবে।

আর সেই সময়েই …

প্রয়াত মহাকবি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কবির বিদেহী আত্মাটি যেন শুনতে পেল পাশেই পড়ে থাকা ওই কাঠের ঠেলাগাড়িটির কথা― যে চৌপায়ায় শায়িত আছে ওই মৃতদেহটি সেই চৌপায়াটির কথা― এবং ওই লাশকাটা ঘরের সেই কাঠের কড়িবরগাটির কথা― মধ্যরাতের ওই অন্ধকারের গহনে….

এবং তখনই…

ওই বিচ্ছিন্ন আত্মা আর নির্বাক না থাকতে পেরে বলতে যাচ্ছিল―

― “ভুল! ভুল! সব ভুল ভাবছ তোমরা…”

―“আমায় যা দেখছ, যা শুনেছ আমার সম্পর্কে আমি তা নই…”

― “অন্তত এইমুহূর্তে তো নই…”

― “ওরা-ওরা সবাই, যারা এতকাল ছিল আমার পাশে― আমায় ভেবেছিল মহাকবি― মহাজ্ঞানী-ঈশ্বরতুল্য…”

― “কারণ আমি তাদের বুঝিয়েছিলাম, বলেছিলাম যে, আমার মধ্যেই তাঁহার সেই প্রকাশ― আমার কথায়― আমার শব্দে― আমার সুরে তিনিই বিরাজ করছেন সদাসর্বদা…”

― “ওরা আমায় মহামানব বানিয়ে ফেলেছিল― আর তখন আমার কোনো উপায় ছিল না সহজ মানুষ হয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে আসার…”

― “তাই ওই শেষ পথটা নিতেই হল― মারাত্মক যন্ত্রণার― কিন্তু তারপর এই অপার মুক্তি…”

― “আর এই মুক্তি আলোয় নয়― অগাধ অন্ধকারে…”

― “এখন এখানে আমাকে আর মহান ভেবে দেখানো দয়া করে…”

কিন্তু কিছুই সে বলে উঠতে পারলো না― নিশ্চুপ নির্বাক হয়ে পড়ে রইল― কারণ তখনই তার মনে হল, ওই ঠেলাগাড়িটি― চৌপায়াটি এবং কড়িবরগাটি বহুবছর ধরে এই অন্ধকারে পড়ে থেকে আজ তাদের জীবনের সার্থকতা পেয়েছে বলে মনে করছে শুধু মাত্র তার কারণেই…

― তাদের নিঃস্ব জীবনের এই একমাত্র প্রাপ্তিটিকে অন্ধকারে ছুড়ে ফেলে কোন্ সত্যের প্রতিষ্ঠা করা যাবে?

― তাঁর নিজের জীবনের ছবিটা তাঁর নিজের কাছে যতই অসত্য বলে মনে হোক না কেন, সেই অসত্যকে পেয়েই এরা এই মুহূর্তে এদের এই হীনজীবনের পরমপ্রাপ্তি বলে মনে করছে এর চেয়ে বড়া সত্য আর কি হতে পারে?…

ঠিক তখনই সেই আত্মাটি যেন আবার শুনতে পেল―

“ইনি যে মহামানব― তাই আমার মনে হয় ইনিই আমায় তরুণ বয়সে বিশাল আকার করে তৈরি করেছিলেন…”

আরও পড়ুন: গতকাল যেভাবে এইসব লিখেছিলাম

― প্রথম গাছটি কেটে করা ঠেলাগাড়িটির কণ্ঠস্বর।

“ইনি যে মহাকবি― তাই মনে হয় ইনিই আমায় যৌবনে অপরূপ সুন্দর করে সৃষ্টি করেছিলেন…”

― দ্বিতীয় গাছটি থেকে কেটে করা চৌপায়াটির কণ্ঠস্বর।

“ইনি যে মহাজ্ঞানী, তাই আমার ধারণা ইনিই আমায় অল্পবয়সেই আকাশছোঁয়া করে তুলেছিলেন…”

―তৃতীয় গাছটি কেটে করা কড়িবরগাটির কণ্ঠস্বর।

এবার ওই কবির বিদেহী বিচ্ছিন্ন আত্মা কোনো মহাতিমিরে মিলিয়ে যেতে যেতে বলে গেল―

― “মহামানব ― মহাকবি― মহাজ্ঞানীর আলখাল্লাটা খুলে রেখে― আলোর পথ থেকে সরে গিয়ে― এই ভয়ংকর অন্ধকার পথে এলাম বলেই তোমাদের সঙ্গে দেখা হল…”

― “এই বিপুল অন্ধকারে যেখানে একটিও ফুল কোনোদিন ঝরবে না তোমাদের জন্য…”

― “কিন্তু অন্ধকার ঝরবে অন্ধকারেই― অবিরত…”

― “তোমাদের সমস্ত আজীবন আকাঙ্ক্ষার মণিমাণিকগুলো এই অন্ধকারেই তো পড়ে আছে গো…”

― “সেগুলো দু’হাতে সাজিয়ে দিতেই তো আমি এসেছি এখানে…”

― “কারণ সেগুলো যে রেখে যেতে হবে ভবিষ্যতের কবির জন্য…”

― “যে লিখবে ওই মণিমাণিকগুলোর কবিতা…”

― “উপযুক্ত অন্ধকারের ভাষায়…”

গল্পটির প্রথম অংশটি বাইবেলের একটি কাহিনির দ্বারা আধারিত

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *