এই প্রথম দুই খণ্ডে সম্পূর্ণ হর্ষবর্ধন-গোবর্ধন! আগামী সপ্তাহে শিবরাম ভক্তদের অনন্য উপহার ‘মন্তাজ’-এর

রসরাজ শিবরাম চক্রবর্তীর সৃষ্টি করা সমস্ত চরিত্রের মধ্যে ছোট-বড় নির্বিশেষে জনপ্রিয়তম চরিত্র নিঃসন্দেহে বর্ধন ভ্রাতৃদ্বয়— হর্ষবর্ধন আর গোবর্ধন। অসম থেকে কলকাতায় বেড়াতে এসে এখানেই স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়া কাঠ-ব্যবসায়ী এই দু-ভাইয়ের মজাদার কীর্তিকলাপের বৃত্তান্ত নিয়ে শিবরাম লিখেছেন একের পর এক গল্প। পাঠকরা কেউ তা পড়ে হেসে গড়াগড়ি খান, কেউ বা হাসেন গোঁফের ফাঁকে। ছোটরা আমোদ পায় মজার মজার ঘটনা ঘটতে দেখে, বড়রা মুগ্ধ হন ‘পান’ পরিবেশনের মুনশিয়ানায়। এ যেন নেহাতই হাসির গল্প নয়, বরং চার থেকে সাতের দশকের সমাজের বাস্তব ছবি গল্পগুলির মধ্যে দিয়ে লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন। লেখকের ভাষায়, রসরচনারই গল্পরূপ হল হাসির গল্প। গল্প হওয়ার প্রয়োজনে তাকে গল্পের নিয়মকানুন মানতে হয়। একাধারে গল্প এবং হাসির হলে তবেই হাসির গল্প হাসিল হয়। তিনি নিজেই বলেছেন— তাঁর সৃষ্ট চরিত্র হর্ষবর্ধন আর গোবর্ধন একেবারেই কাল্পনিক নন, আমাদের আশপাশেই রয়েছেন, দেখা যায় এঁদের এখনও। অথচ শিবরামের অন্যান্য অনেক লেখার মতো বহু হর্ষবর্ধনের কাহিনিও হয়ে গেছে দুষ্প্রাপ্য। আশার কথা, সেরকমই হারিয়ে যাওয়া গল্পগুলি খুঁজে বের করে, তাদের দুই-দুই চার-মলাটের মধ্যে নিয়ে আসার বহু-প্রতীক্ষিত কাজটি অবশেষে সম্পন্ন করেছে ‘মন্তাজ’ পাবলিকেশন।

আরও পড়ুন: নবানে কার্তিক ও কার্তিকের কৃষি সম্পৃক্ততা

আগামী সপ্তাহে প্রকাশিত হবে ‘মন্তাজ’-এর দু-খণ্ডে হর্ষবর্ধন-গোবর্ধন সমগ্র। দুই সমগ্রতে রয়েছে মোট ছ’টি উপন্যাস, একশো-একটি গল্প, একটি করে নাটিকা ও ছড়া, হর্ষবর্ধনকে নিয়ে লেখা শিবরামের একগুচ্ছ চুটকি। এ-ছাড়াও প্রেমেন্দ্র মিত্র, হিমানীশ গোস্বামী ও পরিচালক কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা একটি করে হর্ষবর্ধনের প্যাশটিশ এই সংকলন-গ্রন্থের অন্যতম আকর্ষণ। কাজটি কিন্তু মোটেও সহজ ছিল না। কারণ, শিবরাম চক্রবর্তীর বহু লেখা প্রকাশিত হয়েছে অনেক অনামি পত্রিকায়, যে-সব পুনরুদ্ধার করা প্রায় অসম্ভবই বলা চলে। অনেক গ্রন্থ প্রথম সংস্করণ শেষ হয়ে যাওয়ার পর আর পুনর্মুদ্রণ হয়নি। তাঁর লেখাগুলি যাতে না হারিয়ে যায়, নতুন প্রজন্মের পাঠকরা যাতে পড়তে পারেন, সেই কারণেই শিবরাম একই লেখা বিভিন্ন নামে বিভিন্ন ম্যাগাজিন বা গ্রন্থে প্রকাশ করতেন।

আরও পড়ুন: বঙ্গদেশে চ কালিকা

অনেক সময় হুবহু এক না হলেও খুব সামান্য পরিবর্তন লক্ষ করা যায় একাধিক গল্পে। হয়তো নাম বদলের সঙ্গে সঙ্গে একটা-দুটো রসিকতা বা কথার খেলা বা পান যুক্ত হয়েছে বা বাদ গেছে। আবার লেখক কোনও গল্পকে কখনও বেশ কিছুটা সংক্ষেপিত করেছেন, কখনও পরিমার্জনা বা পরিবর্ধিত করেছেন। এই কারণেই শিবরামের রচনা সংকলন করা বিশেষ ঝক্কির কাজ, গল্পের কোন পাঠ রাখা হবে, কোন পাঠ বর্জন করা হবে, গল্প সাজানোর ক্ষেত্রে কোন নিয়ম মানা হবে— এ সমস্তই সংকলককে মহা দ্বিধায় ফেলে দেয়। আর এই প্রতিটি দিকেই সতর্ক দৃষ্টি রেখে সামঞ্জস্য আনার দুরূহ কাজটি সম্পন্ন করেছেন এই সংকলনের সম্পাদক সুদীপ দেব।

আরও পড়ুন: ভূতেরা ফিরে আসে যে দিনগুলোয়

শুধুমাত্র হারিয়ে যাওয়া গল্প পুনরুদ্ধার করে সাজিয়ে দেওয়াই নয়, পরিশিষ্ট অংশে উল্লিখিত হয়েছে সেই গল্পের প্রথম প্রকাশ বা প্রথম প্রাপ্ত গ্রন্থের হদিশ, একই গল্পের নামান্তর ও পাঠান্তরের যাবতীয় সুলুকসন্ধান। অর্থাৎ কেবল সাধারণ পাঠকের জন্য নয়, এই গ্রন্থ গবেষকদের জন্যও একটি অত্যন্ত মূল্যবান দলিল। গ্রন্থের দীর্ঘ ভূমিকায় সম্পাদক-মহাশয় শিবরামের অন্যান্য রচনার সঙ্গে হর্ষবর্ধনের গল্পগুলির একটি বিশ্লেষণাত্মক আলোচনা করেছেন, যা এই গ্রন্থের উষ্ণীষে একটি উজ্জ্বল পালক সংযোজন করেছে। একান্ত শিব্রামীয় ‘পান’-অনুষঙ্গের বানান অপরিবর্তিত রেখে বাকি সমস্ত ক্ষেত্রে বানানের আধুনিকীকরণ করে সমতা আনা হয়েছে। আর, যে বিষয়ের কথা না-বললেই নয়, তা হল বইয়ের অলংকরণ। শিবরাম চক্রবর্তীর গল্পের সঙ্গে শৈল চক্রবর্তীর অলংকরণ ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। শিবরাম নিজে বলেছেন, ‘আমার বই যে লোকে পড়ে তা শৈলবাবুর ছবি সঙ্গে থাকে বলে, নইলে ও লেখার দাম যে কিছু নেই তা আমার চেয়ে ভালো কেউ জানে না।’ পাণ্ডুলিপি সম্পাদকের হাত ঘুরে শিল্পীর কাছে আসতে সময় বেশি লাগবে, তাই লেখক স্বয়ং সেটি নিয়ে উপস্থিত হয়ে যেতেন তাঁর বাড়িতে। এহেন এক চকর্‌বর্‌তির গল্পসংকলন হবে অপর চক্রবর্তীকে বাদ রেখে— সে যে অভাবনীয়।

আরও পড়ুন: ‘কোন আলোতে প্রাণের প্রদীপ’

সত্যিই শৈল চক্রবর্তীকৃত মূল ছবিগুলি না থাকলে এই বই কখনওই পূর্ণতা লাভ করত না। শুধুমাত্র হর্ষ-গোবরার ছবিগুলি খুঁজে পেতে ডিজিটালি রিমাস্টার করে সাজিয়ে দেওয়াই নয়, শৈল চক্রবর্তীর অলংকরণেরও একটি আর্কাইভাল কাজ রয়েছে বইটিতে। ম্যাগাজিনে বা বিভিন্ন গ্রন্থে মুদ্রিত হওয়ার ক্ষেত্রে অনেক সময় শৈল চক্রবর্তী একই গল্পের, এমনকী একই দৃশ্যেরও একাধিক ছবি এঁকেছেন। সেই সমস্ত ছবিই পুনরুদ্ধার করে পরিশিষ্টে সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে। দুটি খণ্ডেরই শুরুতে রাখা হয়েছে রঙিন ছবিগুলির কালার-প্লেট। দ্বিতীয় খণ্ডে শৈল চক্রবর্তীর কনিষ্ঠ পুত্র অমিতাভ চক্রবর্তীর স্মৃতিচারণামূলক নিবন্ধটি এক অনন্য প্রাপ্তি। শৈল চক্রবর্তীর আঁকা ছবি ব্যবহার করে শিল্পী পিনাকী দে অসাধারণ প্রচ্ছদ বানিয়েছেন, সুসঙ্গত করেছে রূপক নিয়োগীর ক্যালিগ্রাফি। সন্তু বাগের লে-আউট অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন। বইয়ের পাতা, বাঁধাই ও ছাপা খুবই উন্নতমানের। এই বইয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকের নিষ্ঠা, যত্ন ও ভালোবাসার ছাপ খুঁজে পাওয়া যায় বইটির পাতায় পাতায়। সবমিলিয়ে শিবরাম-অনুরাগী পাঠক ও গবেষকদের কাছে একটি অবশ্য সংগ্রহণযোগ্য বই হর্ষবর্ধন-গোবর্ধন সমগ্র।

গ্রন্থ পরিচয়
হর্ষবর্ধন-গোবর্ধন সমগ্র ১ ও ২
শিবরাম চক্রবর্তী
সম্পাদনা সুদীপ দেব
পাবলিশার্স মন্তাজ

মূল্য ৮৫০/- প্রতি খণ্ড

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *