কোন্ সুরে আজ বাঁধিবে যন্ত্র…

প্রণব বিশ্বাস

মাঝখানে মলমাসের গেরো না পড়লে অনেকদিন আগেই শারদ উৎসবে ইতি পড়ত। পদ্মহারানো লক্ষ্মীকে একটু ঠাঁই করে দিতে প‍্যান্ডেলের কোনও এক কোণে কোনও মতে একটা ব‍্যবস্থা করে দিতেই হত প‍্যান্ডেল তৈরির দায়িত্ব যে ডেকরেটরের তাঁকে। কোজাগরীর নিয়ম রাখতে লক্ষ্মীকে তো আসতেই হবে মর্ত‍্যের কাছে স্বর্গের চাওয়া মাধুরীর ছিটেফোঁটা পাবেন না জেনেও। সাবেক রেওয়াজে দেখা যেত, যে-মণ্ডপে দুর্গাপূজা হয় সে-মণ্ডপে শুধু লক্ষ্মী নয়, কালী আর জগদ্ধাত্রী পূজারও আয়োজন অবধারিত থাকত, অন্তত পারিবারিক পূজায়। সে রীতি পুরোপুরি লোপ পেয়েছে তাও নয়, তবে সর্বজনীনে কালী ও জগদ্ধাত্রী পূজার আয়োজক আলাদা আলাদা। আবার কোনও কোনও বিশেষ অঞ্চল বিশেষ বিশেষ পুজোর জন‍্য খ‍্যাত। যেমন চুঁচুড়ার কার্তিক, বারাসতের কালী, শান্তিপুরের রাস আর চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী। সেসব জায়গায় এঁরা অনেকটাই দুর্গাপূজার বিকল্প। ইদানীং অবশ্য সর্বজনীনে বিনায়ক গণেশ, কার্তিক, শিব, শীতলা ইস্তক দেবদেবীরা ক্রমেই প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছেন। ‘ভারতমাতা’ নামের নবাবিষ্কৃত এক দেবীকে দেখছি কলকাতার আনাচে-কানাচে। সর্বজনীন হই-হট্টগোলের অন্তরালের উৎস খুঁজতে সমাজবিজ্ঞানের স্বীকৃত ডিগ্রি নিতান্ত বাহুল‍্য বৈ কিছু নয়।

আরও পড়ুন: ৭৭ বছর পরেও আলোচনার বৃত্তে নেই রানি অফ ঝাঁসি ব্রিগেড

ইউরোপীয়দের দুর্গাপূজার সময় (১৮৩০-১৮৪০) কলকাতায় একটি দুর্দান্ত বাড়িতে নৃত্যশিল্পী এবং সংগীতজ্ঞদের দ্বারা আপ্যায়ন করা হয়। উইলিয়াম প্রিন্সেপ

যাই হোক, মলমাসের জন‍্য মহালয়ার পর এবার বেশ অনেকটা দিন অপেক্ষায় থাকতে হল আনন্দময়ীর আগমনের জন‍্য। করোনা-কবলিত রাজ‍্যে সংক্রমণের সমূহ সম্ভাবনার সতর্কবার্তা থাকলেও শারদীয় হুল্লোড়ে কিছু টান পড়বে এমন মনে হচ্ছিল না কয়েকদিন আগে পর্যন্তও, শেষপর্যন্ত ন‍্যায়ালয় রাশ টেনে ধরার পর জনসাধারণের বিরাট অংশ আশ্বস্ত বোধ করছেন। এখন দেখা যাক শেষরক্ষা হয় কিনা।   

সুচরিতা বিশ্বাসের কণ্ঠে

মলমাসের ব‍্যাপারটা বোঝা আর বোঝানো দুই-ই বেশ কষ্টকর। সাধারণভাবে আমাদের দৈনন্দিন যোগ শুধুমাত্র গ্রেগরীয় (যাকে ভুলবশত আমরা ইংরেজি ক‍্যালেন্ডার বলে থাকি) ক‍্যালেন্ডার আর বাংলা ক‍্যালেন্ডারের সঙ্গেই। দু’টিই সৌর ক‍্যালেন্ডার। সূর্যের গতিবিধির ওপর নির্ভর করে এই ক‍্যালেন্ডারের দিনক্ষণ স্থির হয়। কিন্তু হিন্দুদের পুজো আচার অনুষ্ঠানের দিনক্ষণ ঠিক হয় উত্তর ও পশ্চিম ভারতের চান্দ্র-সৌর ক‍্যালেন্ডার অনুযায়ী। এই ক‍্যালেন্ডারে মাসের নাম বাংলা ক‍্যালেন্ডারেরই মতো, কিন্তু মাসগুলো মোটেও বাংলা ক‍্যালেন্ডারের মতো নয়, বৎসরের হিসেবেও গরমিল হয়। চান্দ্র-সৌর ক‍্যালেন্ডার অনুসারে এবারের ভাদ্রমাস শেষ হল ১৭  সেপ্টেম্বরে। সেদিন অমাবস্যা তিথি। এরপর শুরু হল অধিক মাস বা অধিক আশ্বিন। লক্ষ করার বিষয়, চান্দ্র-সৌর ক‍্যালেন্ডারে মাস শেষ হয় অমাবস্যায়। অধিক মাস বা অধিক আশ্বিন শেষ হল পরবর্তী অমাবস্যায়, গ্রেগরীয় ক‍্যালেন্ডার অনুসারে তারিখটি ১৬ অক্টোবর। এরপর শুরু হল আসল আশ্বিন। এই আশ্বিনের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে দুর্গাপূজার বোধন বা পূজার শুরু। সহজ কথায় বলতে গেলে এই অধিক মাসই মল মাস। এ-মাসে শুভ কাজ অসিদ্ধ। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এই অধিক মাস যে কেবল আশ্বিনেই হবে তার কোনও ধরাবাঁধা নিয়ম নেই, অন‍্য যেকোনও সময়েও মল মাস হতে পারে, হয়ও। আমরা খুব নজর করি না, উৎসবের মাস হলে অন‍্য কথা।

ধানভানতে সেই শিবের গাজনই হয়ে যাচ্ছে হয়তো। লিখতে বসেছিলুম আগমনী গানের কথা, কিন্তু পথহারা পথিকের অদৃষ্টই তো বেমালুম পথ হারানো। কোথা পড়ে আছে তব উদাস হৃদয়, কোথা পড়ে, আছে ধরণী। মায়ার তরণী নাগালে না-থাকলে মায়াপুরীর পথ তো আর খুঁজে পাওয়া যায় না। যখন একটু একটু করে বড় হচ্ছি, তখন কিন্তু বৎসরের ধরন-ধারণ  মোটেও ‘ছোট্ দাদু’র মতো ছিল না। রয়েসয়ে চলতেই সে তখন অভ‍্যস্ত। পুজোর প্রতীক্ষার যেন শেষ থাকত না। আর ছিল চৈত্র মাসের গাজন। শিবের মাথায় জল দেবার উন্মত্ত অসভ‍্যতা তখন দেখেছি বলে তো মনে পড়ে না। ক‍্যালেন্ডারে দিন গোনার ব‍্যক্তিগত অভ‍্যেস যার যেমনই থাকুক না কেন পুজো বা চৈত্র সংক্রান্তির খবর আসত ভিন্ন পথে।

আরও পড়ুন: মেয়েটি আমার হৃদয়জুড়ে শিউলি ফুটিয়েছে

ভিক্ষাজীবী মানুষ পুজোর মাসাধিক কাল আগে থেকেই গলায় আগমনীর সুর নিয়ে ভিক্ষায় বেরোতেন। তাঁদের সবার গলায় যে সুর খেলত এমনও নয়, আবার দু-এক জনের গলায় যেন সুরের ঝরনা ঝরত। জীবনানন্দের সেই মোক্ষম উচ্চারণ গানের বেলাতেও একশোভাগ সত্যি; হয়তো সব শিল্পকলার ক্ষেত্রেই তাই। সেই প্রথম বয়সে শোনা সেইসব গানের টুকরো টুকরো পদ এখনও আমার মতো বেসুরোর মনেও সুরের অনুরণন তোলে। হারানো সেই টুকরো পদ মাঝেমাঝে এসে স্মৃতির দুয়োরে টোকা দিয়ে যায়। ‘কী আছে বলো তোমার অন্তরে, নারীর জনম কেবল ব‍্যথা সহিতে’ বা ‘কবে যাবে বলো গিরিরাজ আনিতে গৌরীরে’র মতো গানের কলি। এসব গানে ভেসে আসত পুজোর বার্তা। দুপুরে মায়ের কাছে শোনা হয়ে যেত শিব-দুর্গার গল্প। গিরিরাজ হলেন হিমালয়, গৌরী তাঁর মেয়ে। বিয়ে করে এখন কৈলাসে শিবের ঘর করেন। বাঘছাল পরা শিব গায়ে  ভস্ম মেখে শ্মশানে-মশানে ঘুরে বেড়ান। গৌরীর সংসারে সুখ নেই। তাই মা মেনকা গৌরীকে ফিরিয়ে আনতে ব‍্যাকুল। বলছেন, ‘এবার আমার উমা এলে আর উমায় পাঠাব না, আমায় বলে বলুক লোকে মন্দ, কারো কথা শুনব না।’ তখন কি আর এও বুঝি যে এও এক নিটোল প্রেমেরই গল্প। আর এভাবেই আমরা দেবতাকে প্রিয় করেছি, প্রিয়কে দেবতা। মেঝেয় মায়ের পাশে শুয়ে শোনা হয়ে যায় এরকম কত যে গল্প। বারবার শুনতে চাইতুম গণেশের শ্রুতিলিখন আর কার্তিককে টেক্কা দিয়ে গণেশের  বিশ্বপরিক্রমায় জয়ের গল্প। রেডিয়োতে তখন আগমনী গান হত, মা শুনতেন, সেই সুবাদে আমিও। ভারী ভালো লাগত এইসব গান। অনন্তবালা বৈষ্ণবী, আলপনা গুপ্তরা কি গাইতেন? গাইতেন অনেকে, নাম মনে আসছে না। অমর পাল গাইতেন, তবে সেটা একটু অন‍্য ঢংয়ে গাওয়া হলেও খারাপ যে লাগত তা নয়। কবে কখন যে শুনেছি সেটা আর স্পষ্ট করে মনে করতে না পারলেও রেডিয়োতে শোনা কমলাকান্তের পদের একটি আগমনী গান ‘আমি কী হেরিলাম নিশি স্বপনে’ মনের গভীর গহনে চির আবাস নিয়ে বসে আছে।  গানটি গেয়েছিলেন উৎপলা সেন। তাঁর গাওয়া ‘হরিনাম লিখে দিও অঙ্গে’ বা ‘হৃদি বৃন্দাবনে বাসে’র মতো এ-গানেরও অনন্ত আকুলতা কোনওদিন মুছে যাবার নয়। কাছাকাছি সময়ে কোনও একদিন রাতের শেষ অনুষ্ঠানে রেডিয়োতে শুনেছিলাম সুচিত্রা মিত্রের গায়নে ‘প্রতিমা দিয়ে কি পূজিব তোমারে এ-বিশ্ব নিখিল তোমার প্রতিমা’, এরকম গাওয়া বোধহয় সুচিত্রা মিত্রের গলাতেও এক-আধবারই হয়। কথাটা পেড়েছিলাম একবার সুচিত্রাদির কাছে। কোনও উত্তর করেননি, নীরব হয়ে বসেছিলেন। পরে একদিন বলেছিলেন, এ-গান আর গাওয়া হবে না। পুজোয় সুচিত্রা মিত্র সাধারণত কলকাতায় থাকতে চাইতেন না; ওঁর কথায় ‘নিভৃতবাসে’ চলে যেতেন। কলকাতার পুজো ওঁর অসহ্য লাগত। একবার পুজোর আগে একদিন দেখা করতে গেছি, বাড়িতে তিনি একা, এলোমেলো কথা হচ্ছে, হঠাৎ গান ধরলেন, আগমনী গান। সেও এক আশ্চর্য প্রাপ্তি।

রেডিয়ো বিনোদনের সঙ্গী অবশ‍্যই, কিন্তু কত বড়ো যে শিক্ষক বেতারের গরিমা পশ্চিমে ঢলে পড়ার দিনে তা বেশ টের পাই। এখন বিনোদনের অজস্র আয়োজন। কিন্তু সংস্কৃতির শিকড়ের সঙ্গে যোগসূত্র খোঁজার ন‍্যুনতম প্রয়াস কোথাও নেই। সমাজ-সংস্কৃতি, রাজনীতি-অর্থনীতি, যাপনের ধরন সবেতেই এখন পরিবর্তনের উথাল-পাথাল ঢেউ। উজানে চলেছি না ভাটির টানে তা অজানা। ভিক্ষাজীবীরা এখন আর আগমনীর সুর বয়ে আনেন না। বিনোদনের বিভিন্ন চ‍্যানেলে আগমনীর নামে যা পরিবেশিত হয় তার সামান‍্যটুকু দেখলে বা শুনলে সাবেক উমা অবশ‍্যই দোলা, নৌকা, হাতি বা ঘোড়া ঘুরিয়ে কৈলাসের পথ ধরতেন। সর্বজনীন পুজো কর্পোরেটে রূপান্তরিত। পল্লিবাসীর পুজোয় অংশগ্রহণের কোনও সুযোগ নেই। উপরন্তু পাড়ার পুজো যদি তেমন তেমন হয়, তবে নিজের বাসস্থানে আসতে যেতেও অনুমতিপত্রের দরকার হবে। নইলে রইলে ঘরে না ঢুকে। হঠাৎ ‘প্রাইমটাইমে’ কেউ যদি বে-আক্কেলের মতো গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন তবে পুলিশেরও অসাধ‍্য তাঁকে সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া। এরকম ঘটনা এ শহরে গত কয়েক বছরে বারেবারেই ঘটেছে, কিন্তু উৎসবের আড়ম্বর-মত্ততায় খবরগুলো প্রকাশ‍্যে তেমনভাবে আসেনি। কর্পোরেট ধাঁচা উৎসবকে গিলে নিলে পাড়ার পুজোয় পাড়ার লোকের অংশগ্রহণের আর সুযোগ থাকে না। সর্বজনীন এখন আর কোনও অর্থেই সর্বজনের নয়, সর্বজনের ভূমিকা এখন শুধুমাত্র দর্শনার্থীর আর অহেতুক আমোদমত্ততায় বিভোর থাকায়। শেষ অবধি সর্বজন নিতান্তই সংখ্যা। বৃহৎ সংবাদপত্র আর জনপ্রিয় মাধ্যম প্রতি ঘণ্টায় কোনও বড় আয়োজনে ঠিক কত সংখ্যক লোক হয়েছেন তার অনুপুঙ্খ হিসেব দিতে থাকবেন। আর মাস আড়াই আগে থেকেই বিপননের কৌশলে আমার-আপনার চাহিদাকে গগনচুম্বী করে তুলবেন। চাঁদা এখন আর স্বেচ্ছাদান নয়, ধার্য অঙ্ক। পুজো পরিচালন সমিতির নির্ধারিত দিন ও সময়ে লাইন দিয়ে চাঁদা জমা করে আসতে হবে। নাগরিকের সামাজিক দায়িত্বই  বটে। নাগরিক আরও দশটা দায়িত্ব পালনে উদাসীন হলেও মনে রাগ আর মুখে হাসি নিয়ে চাঁদার লাইনে দাঁড়াতে ভুল করেন না। অথচ সর্বজনীনের শুরুই হয়েছিল কিন্তু সাধারণ মানুষের সম্মান অর্জনের তাগিদ থেকে।

আরও পড়ুন: প্রাচীন পুজোর রানাঘাট

ইংরেজ রাজত্ব যখন বেশ শক্তপোক্ত এ-দেশে তখন দেশীয় রাজা আর সম্পন্ন জমিদারেরা বাড়ির দুর্গাপূজায় ইংরেজ প্রভুদের আমন্ত্রণ জানিয়ে বেলাগাম হুল্লোড়ের আয়োজন করতেন। সেইসব আয়োজনে পশুবলি থেকে বাঈনাচ, যাত্রাপালা, কবিগান-সহ সবরকম প্রমোদেরই পর্যাপ্ত ব‍্যবস্থা থাকত, সেইসব আয়োজনে প্রভুরা যারপরনাই পুলকিত হতেন। দোল-দুর্গোৎসবের এইসব আয়োজনের নিরিখেই অনেকসময় স্থির হয়ে যেত খেতাবের ভাগবাঁটোয়ারা ও সুযোগ সুবিধের হিসেবনিকেশ। এইসব অনুষ্ঠানে প্রজা-প্রতিবেশী-গ্রামীণ মানুষের পা যে পড়ত না তা নয়, কিন্তু সেক্ষেত্রে সাধারণত সম্মানের ছিটেফোঁটাও থাকত না। এইসব মানুষের পুঞ্জীভূত অভিমানেই পরবর্তী সময়ে বারোয়ারি পুজোর সূত্রপাত। বারোজনের উদ্যোগ আসলে হয়তো বা বহুজন। এই বারোয়ারিরই রূপান্তর ঘটল সর্বজনীনে। বাগবাজার সর্বজনীন বা সিমলা ব‍্যায়াম সমিতির সর্বজনীন শতবর্ষ উত্তীর্ণ বা তার কাছাকাছি। যেমন ফুটবল আর ব‍্যায়াম সমিতির সঙ্গে পরোক্ষে যোগ ছিল জাতীয় আন্দোলনের, তেমনি প্রথম দিকের সর্বজনীনেরও। সুভাষচন্দ্রের মতো বড়মাপের জাতীয় নেতাদেরও নিবিড় যোগ ছিল সর্বজনীন পুজোর সঙ্গে। কারাগারেও এভাবেই পুজোর প্রচলন ঘটে। বিশেষ সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসবের জাতীয় আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়া ঠিক না ভুল সে নিয়ে তর্কের অবকাশ থাকলেও আপাতত সে তর্কে আমি নেই। জনসংখ্যার ক্রমবৃদ্ধি, দেশভাগের ফলে বাস্তুচ্যুত মানুষের সীমাহীন দুর্ভোগের মধ‍্যেও পায়ের নীচে মাটি খোঁজার মরণান্তিক প্রয়াস ও আত্মপ্রতিষ্ঠার দুর্জয় লড়াইয়ের সঙ্গেও অবলম্বন হিসেবে জড়িয়ে গেল সর্বজনীন দুর্গা ও কালীপুজো। উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিমে শহর বিস্তারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ল পুজোর সংখ‍্যাও। মাঠ-ময়দান-ফাঁকা জমি ছাড়িয়ে রাজপথ-গলিপথ সর্বত্রই পুজোর আয়োজন। একসময় লোকসংখ‍্যার ঘনত্ব অনেকটা কম থাকায় সাধারণ নাগরিকের দুর্ভোগ আজকের তুলনায় কম হলেও ভবিষ্যৎ ভয়াবহতার কথা ভেবে রাজপথ, জনপথ জুড়ে, গলিপথ বন্ধ করে পুজো আয়োজনে প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা একান্ত জরুরি ছিল। কিন্তু সরকার যাঁরা চালান তাঁদের ভোটে লড়তে হয়। তাই ধর্মীয় উদ্‌যাপনে রাশ টানার সাহস তাঁরা দেখাতে পারেন না। তুলনায় জনসাধারণের সীমাহীন দুর্ভোগ, তাঁরা জানেন কখনও ভোটের ইস‍্যু হবে না।

পুজোর গন্ধ এসেছে বা পুজো পুজো ভাবের কথা যখন বলি, তখন তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আবহমানকালের সংস্কার‌। তার অনেকটাই প্রকৃতিপ্রদত্ত আর কিছুটা সামাজিক। মেঘের কোলে রৌদ্রের হাসি, নীল আকাশে ভেসে বেড়ানো সাদা মেঘের ভেলা, শেফালি সুরভি, শিশিরভেজা সকালেই থাকে উৎসবের আগমনী বার্তা। পুজোর অন‍্য একটা দিক, হয়তো সবচেয়ে জোরালো দিক, সম্প্রদায় নির্বিশেষে শতসহস্র মানুষের সম্বৎসরের উপার্জন। কতরকম কাজে কত মানুষ যে জড়িয়ে থাকেন সহজ অঙ্কে তার হিসেব মেলা ভার। পুজোর সবথেকে বড় সার্থকতা এখানেই। ‘শুদ্ধশুচি সুস্থরুচি’ সন্ধানের দিন পেরিয়ে এখন আমরা আইপিএল যুগে। বিনোদনের বাইরে ভাবনার আর কোনও অবকাশ আমাদের বরাদ্দে   নেই। এ-পর্যন্ত এসে হঠাৎ বঙ্কিমচন্দ্রের একটি লেখায় মন ফিরল। ‘ভ্রমর’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি লেখার শাণিত সমালোচনায় ঋষি বঙ্কিম যা লিখেছিলেন তার সামান্য অংশ এখানে উদ্ধৃত করি,  “…চতুর্থ উপকার, উৎসব, যথা দুর্গোৎসবাদি। জিজ্ঞাসা করি এই হতভাগ্য অন্নক্লিষ্ট, হট্টগোলে ব‍্যতিব‍্যস্ত বঙ্গসমাজে এতটা উৎসবের কি প্রয়োজন আছে? এখন কতকগুলি কঠিন হৃদয়, ভোগপরাঙ্মুখ, উৎসববিরত সম্প্রদায়ের অভ‍্যুদয় না হইলে, ভারতবর্ষের কি উদ্ধার হইবে?”   আমরা বলি বাঙালির দুর্গাপূজা। এই বলাটা নেড়েচেড়ে দেখলে হয়তো বুঝতে পারব, হিন্দু বাঙালির পুজো বললেও একটা ফাঁক থেকেই যায়। কে না জানে নিম্নবর্গীয় হিন্দুরা লৌকিক দেবদেবীর ডাকে কিংবা ব্রতপালনে ঢের বেশি সাড়া দেন। এরপরেও কথা থাকে, বাংলাভাষী মাত্রই যদি বাঙালি হয় তবে মনে রাখতে হবে তার বৃহদাংশই মুসলমান। এরপরে আর বাঙালিত্বর সঙ্গে দুর্গাপুজোকে মিলিয়ে দেওয়া যায় না। বঙ্কিম স্পষ্ট করেই বলেছেন পুজো কখনও বাঙালি সমাজের ভিত্তি হতে পারে না। তবে ঈদ বা বড়দিন কি সেই ভিত্তি? না, তা কখনোই নয়। রবীন্দ্রনাথের আজীবনের প্রয়াস ছিল ধর্মসম্পর্কহীন সামাজিক উৎসব প্রচলনের। শান্তিনিকেতনের বাইরে সে-ভাবনা উপেক্ষিতই থেকেছে। ইসলামি রাষ্ট্র হয়েও বাংলাদেশ পয়লা ফাল্গুনে বসন্ত উৎসব, একুশে স্মরণ আর বর্ষবরণের দিনটিকে জাতীয় উৎসবে পরিণত করতে পারলে পশ্চিমবঙ্গেও এমন ধর্মসম্পর্কহীন সামাজিক উৎসবের কথা ভাবা যায় না কেন? বাংলাদেশে ঈদের সমারোহ তো কিছুমাত্র কম নয়। আড়ম্বর একটু কমিয়ে, উৎসবকে নিছক বিনোদনের রূপান্তর না করে, সর্বসাধারণের সুযোগ-সুবিধেকে একটু অন্তত মান‍্যতা দিয়ে দুর্গাপূজার উৎসব চলতে থাকুক আপন মহিমায় উজ্জ্বল হয়ে। কত অনুষঙ্গে স্মৃতিতে আমাদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই শারদীয় উৎসব; নতুন জামা-জুতোর গন্ধে, পুজোবার্ষিকীর হারানো পৃষ্ঠায়, পুজোর গানে, শারদ অর্ঘ‍্যে আর নতুন সিনেমার মুক্তিতে, বাল‍্যশৈশবের স্মৃতিকণায়।

কথার টানে নানা কথা এসে পড়ে, প্রসঙ্গান্তরও ঘটে যায়। কথা হচ্ছিল আগমনী গান নিয়ে। ছোটবেলায় কেউ একজন আমায় বলেছিলেন নামগোত্রহীন গ্রামীণ কবিরাই এ গানের রচয়িতা। পরে জেনেছি রামপ্রসাদ, কমলাকান্তের মতো সাধক, আবার দাশরথি রায়, গিরিশচন্দ্র, নজরুল ইসলামের মতো কবিরাও আগমনী-বিজয়ার গান লিখেছেন। কবির কল্পনায় স্বর্গের দেবতা আর মর্ত‍্যের মানুষের দিনানুদৈনিক ঘরগেরস্থালি এখানে একাকার। আট এর দশকের মাঝামাঝি। তখন থাকি ঘোলসাহাপুরে। সকাল থেকে সন্ধে নানান ফেরিওয়ালার ডাক শোনা যেত, প্রত‍্যেকের ডাক আলাদা। আর প্রতিটি ডাকেই লেগে থাকত একটি করে সুর। কাঁসার বাসন, ছিটকাপড়, কেক লাও (আমার ভাগ্নে বলত হেল্লাস), মাটির বেহালা এরকম আরও কত কী! উন্নয়নের গুঁতোয় সেইসব ফেরির জিনিস বেশিটাই উধাও। ছিটকাপড় বিক্রি করতে আসতেন যাঁরা তাঁদের মধ্যে একজনের কথা খুব মনে পড়ে। প্রশস্ত টাক, হাফ শার্ট, খাটো ধুতির স্বাস্থ‍্যবান মানুষটির কাঁধে বড়জোর ৫-৬ পিস কাপড় থাকত আর হাতে সম্ভবত স্টিলের খুব লম্বা এক মাপকাঠি। গলায় যতটা জোর ততটাই উজাড় করে হাঁক দিতেন ছিটকাপড় বলে। তাঁর কাছে কেউ কোনওদিন কিছু কিনেছে বলে মনে হয় না। এই মানুষটিকেই দেখেছি অন‍্য চেহারায় পুজো আসে আসে  সময়ে। হাতে লম্বা মাপকাঠি, কাঁধে রাখা কয়েক টুকরো ছিটকাপড়, ছিটকাপড়ের কর্কশ ডাক থামিয়ে হঠাৎ তিনি বসে পড়তেন রাস্তায়, এরপর কিছুটা সময় কাটত মাপকাঠি নিয়ে খেলায় তারপর অকস্মাৎ খুলে যেত প্রস্রবণের উৎসমুখ। সুরের ধারায় গোটা অঞ্চলটা আচ্ছন্ন হয়ে যেত। দুপুরের সুপ্তি ভেঙে সবাই এসে জড়ো হচ্ছেন বারান্দায় বা জানালায়। এখনও কানে লেগে আছে সেই সুর। তিনি গাইছেন, ‘দ্বিজ রামপ্রসাদ কয় আমার এ-দুখ কী প্রাণে সয়’। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে যত তিনি গাইছেন, ততই আমাদের চোখ ভেসে যাচ্ছে। গানের আর্তিতে এমনভাবে ভেসে যাওয়া যে যায় সেই প্রথম জানলাম। কতদিন চলে গেছে এই ফাঁকে, আমাদের চেনা পৃথিবীতে এসেছে কত বদল, করোনার আড়ালে নিঃশব্দে কল‍্যাণমুখী রাষ্ট্রভাবনার খোলনলচে পালটে যাচ্ছে, বৃহৎ পুঁজির কাছে আত্মসমর্পণের পালা চলেছে সরকারি উদ্যোগে। ধর্মীয় একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা আর বিবিধের মধ্যে ঐক‍্যভাবনা গুঁড়ো হয়ে যাবার আশঙ্কা এই নিয়েই এখন আমাদের প্রতিদিনের যাপন। কয়েক কোটি মানুষ এখন জীবিকাচ‍্যুত, দেশের  আর্থিক অবস্থা চরম তলানিতে, তবু স্মৃতি থেকে সেদিনের সেই গান আজও হারিয়ে যায়নি। গানের সেই আর্তিতে আজও আমি বিচলিত হই।

প্রতিবারই পুজো আসার সময়ে মনে পড়ে যায় বাঁধনদাকে। শিল্পী বাঁধন দাস। দেশপ্রিয় পার্কের পেছনে ওঁদের বাড়িতে এক গামলা মুড়িমাখা আর অফুরন্ত চা নিয়ে তুমুল আড্ডা জমত। তখনও পুজো, থিম ও দল পীড়িত নয়। সে সময় কয়েক বছর কলকাতার অনেক নামি সর্বজনীনের প্রতিমা তৈরি করছিলেন খ‍্যাতিমান শিল্পীরা। এই নিয়ে কথা তুলতেই বাঁধনদা লাফিয়ে উঠে লুঙ্গিটুঙ্গি ছেড়ে বাইরে বেরোনোর জন্য তৈরি হয়ে আমাকে প্রায় হেঁচকা টানে নীচে নিয়ে এসে নিজের বাইকটা বের করলেন। বাঁধনদা যথেষ্ট লম্বা চওড়া মানুষ। তাঁর মাপের আন্দাজে  বাইকটা চোখে পড়ার মতোই ছোটখাটো। কিন্তু সেটাই তাঁর নিত‍্যনির্ভর। আমাকে সেই বাইকে তুলে সটান কুমোরটুলি। পুজোর কাছাকাছি সময়, সেখানে তোলপাড় ব‍্যস্ততা। ক্রেতার আনাগোনায় জমজমাট সময়। বাড়ি রং করার সময় যেমন ভারা বাঁধা হয়, তেমন ভারা সব ঘরে ঘরেই বাঁধা। টিমটিমে আলোয় ভারার ওপর দাঁড়িয়ে কাজ করছেন শিল্পী। সাত-আট বছরের বাচ্চা থেকে শুরু করে পুরো পরিবার জড়িয়ে আছে কাজে। কেউ রং গুলছে, কেউ আঠা; কেউ ছাঁচে আঙুল তৈরি করছে তো কেউ ভারায় প্রয়োজনীয় জিনিস জুগিয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে চলছে কথাবার্তা। দরদাম। সব ঘরের একই চেহারা। বাঁধনদার সঙ্গে সবারই কম-বেশি চেনাজানা। নিতান্ত ছেলেবয়স থেকে প্রতিমা নির্মাণে আমার অপার বিস্ময়। সেখানে নিভৃতি ছিল, আলোবাতাস ছিল, দু-তিনজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের হাত-পা ছড়িয়ে কাজের অবকাশ ছিল। এখানে সমবায়ী শ্রমে শিশুর অংশগ্রহণও আবশ্যিক। দারিদ্র্য চিহ্নে এখানে কোনও আড়াল নেই। আলোকিত পুজোর কলকাতায় নিষ্প্রভ থাকে প্রতিমা জোগানো কুমোরটুলি। সেখানে দাঁড়িয়ে বাঁধনদা বলেছিলেন কোনও শিল্পী বা ভাস্কর এভাবে কাজ করতে পারবেন না‌। তাঁরা স্কেচ করে দেন, আদলটা বুঝিয়ে দেন, মাঝেমাঝে এসে দেখে যান কিন্তু কাজটা করে কুমোরটুলি। এই পরিবেশে সূক্ষ্ম সৃজনের কথা ভাবতে পারো! এঁরা কিন্তু কাজ করে যাচ্ছেন বছরের পর বছর। পরে বাঁধনদা শান্তিনিকেতনে সাঁওতাল ছেলেমেয়েদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে ওদের আবদারে দুর্গাপূজা শুরু করেন। বলতেন নাস্তিকের দুর্গাপূজা, আসলে শিল্পমেলা। নিজের হাতে প্রতিমা গড়তেন, ছোট প্রতিমা। অনেকবার যেতে বলেছেন, কিন্তু যাব বলেও যাওয়া হয়নি। কথা কেউ রাখে না। বাঁধনদাও রাখেননি। চলে গেছেন অকালে, অসময়ে।

Facebook Twitter Email Whatsapp

2 comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *