মরার আগে না মরার মন্ত্রে ম্যাচ বাঁচাল ভারত

Mysepik Webdesk: ‘মরার আগে মরব না, ভাই, মরব না…’ টিম ইন্ডিয়া যেন এমন পণ করেই আজ মাঠে নেমেছিল। অস্ট্রেলিয়ার দেওয়া ৪০৭ রানের বিশাল টার্গেটের জবাবে তৃতীয় দিন ভারত খেলা শেষ করেছিল ২/৯৮ অবস্থায়। জিততে গেলে তখনও দরকার ছিল ৩০৯, যা বেশ অসম্ভব মনে হচ্ছিল। তবুও জিততে পারত ভারত। যতক্ষণ ঋষভ পন্থ ব্যাটিং করছিলেন, জেতার আশা জিইয়ে রেখেছিল ভারত। এমনিতেও ঋষভ পন্থ এমন একজন উইকেটকিপার, যাঁর ব্যাট এর আগেও দ্বিতীয় ইনিংসে চওড়া হয়েছিল। ২০১৮ সালে ইংল্যান্ডের সঙ্গে দ্বিতীয় ইনিংসে ১১৪ রান করেছিলেন তিনি। আর এদিন করলেন মারমুখী ১১৮ বলে ৯৭ রান। অমন চাপের মুখে এমন মারমুখী ইনিংস দেখে এক ধারাভাষ্যকার বলে উঠলেন, পন্থের সেরা টেস্ট ইনিংস এটিই। তাঁর ইনিংসটি সাজানো ছিল ১২টি চার এবং ৩টি ছয় দিয়ে। যদিও নাথান লায়নকে স্টেপ আউট করে মারতে গিয়ে সেঞ্চুরি মিস করলেন। তবে সমালোচনার জবাব তিনি ব্যাট হাতেই দিলেন। তাহলে কি পরের টেস্টে টিম ম্যানেজমেন্ট দুই উইকেটকিপারকে প্রথম একাদশে রাখবেন? দস্তানা হাতে দায়িত্ব সামলাবেন ঋদ্ধিমান এবং বিশেষজ্ঞ ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলবেন পন্থ― এই কম্বিনেশনে কি যাবে দল? সময়ই সেই উত্তর দেবে। আসলে এই প্রশ্নটি উঠছে উইকেটের পিছনে পন্থের পারফরম্যান্স দেখেই।

পন্থ ফিরতেই ভারতের রানের গতি কমে যায়। পুজারাও বোল্ড হয়ে যান মধ্য সত্তরে। এরপর হনুমা বিহারি এবং রবিচন্দ্রন অশ্বিন কোনও ঝুঁকি নেননি। উইকেটে আঠার মতো আটকে থেকে ম্যাচটি ড্রয়ের দিকে নিয়ে যান তাঁরা। ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের এই লড়াই কিন্তু ইতিহাসেও জায়গা করে নিলো। আশ্বিন ও বিহারি ২৫৬ বলে ৬২ রানের জুটি গড়েন। এটি ষষ্ঠ উইকেটে সবচেয়ে বেশি বল ফেস করা ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম জুটি।

চতুর্থ ইনিংসে সর্বোচ্চ ওভার ব্যাট করে ৪০ বছর পর লক্ষ্য তাড়া করে টিম ইন্ডিয়া। এর আগে ১৯৭৯/৮০ সালে ভারত পাকিস্তানের বিপক্ষে ১৩১ ওভার ব্যাট করে ম্যাচ বাঁচিয়েছিল ভারত। সবমিলিয়ে পঞ্চমবারের মতো সর্বাধিক সময় ব্যাট করে ম্যাচ ড্র করেছে টিম ইন্ডিয়া। ১৯৭৯ সালে ওভালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১৫০.৫ ওভার ব্যাটিং করেছিল ভারত, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। আর সিডনি টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে ১৩১ ওভার ব্যাটিং করেছে ভারত।

  • ১৯৭৯ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওভালে ১৫০.৫ ওভার ব্যাটিং করেছিল ভারত।
  • ১৯৪৮/৪৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে কলকাতায় ভারত খেলেছিল ১৩৬ ওভার।
  • ১৯৫৮/৫৯ সালে বোম্বাই (মুম্বই)-এ ১৩২ ওভার ব্যাট করে ভারত।
  • দিল্লিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে ১৯৭৯/৮০ সালে ১৩১ ওভার ব্যাটিং করে ভারত।
  • সিডনিতে এই ম্যাচেও ভারত ১৩১ ওভার ব্যাটিং করেছে।

এশিয়ার কোনও দল হিসাবে অস্ট্রেলিয়ায় চতুর্থ ইনিংসে সবচেয়ে বেশি ওভারের ব্যাটিংয়ের রেকর্ড এটিই। এর আগে ভারত ২০১৪/১৫ সালে সিডনিতে ৮৯.৫ ওভার ব্যাট করেছিল।

অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক টিম পেইন আজ তিনটি ক্যাচ মিস করেছেন। ১২৩তম ওভারে মিশেল স্টার্কের পঞ্চম বলে বিহারির ক্যাচ মিস করেন পেইন। বিহারি তখন ১৫ রানে ব্যাট করছেন। ক্যাচটি ধরতে পারলে ম্যাচের ফলাফল অন্যরকম হতে পারত। এর আগেও ঋষভের দু’টি ক্যাচ ফেলেন এই অজি উইকেটরক্ষক।

হনুমা বিহারি প্রথম ৭ রান করতে নেন ১১২ বল। ৬.২৫ স্ট্রাইক রেটে তিনি এই রান করেছিলেন। এটি ভারতীয় ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে ধীরতম ইনিংস। এর আগে, যশপাল শর্মা ১৯৮০/৮১ সালে অ্যাডিলেডে ৮.২৮ স্ট্রাইক রেটে ১৫৭ বলে ১৩ রান করেছিলেন। তিনি প্রথম ৭ রান করেছিলেন ১১২ বলে। বিহারি শেষমেশ ১৬১ বলে ২৩ রানে অপরাজিত থাকেন।

অন্যদিকে, বিকল্প ফিল্ডার শন অ্যাবট ভারতীয় ইনিংসের ১০১তম ওভারে কামিন্সের বলে আশ্বিনের ক্যাচ ফেলেছিলেন। তিনি তখন ১৫ রানে। উইল পুকোভস্কির জায়গায় মাঠে নেমেছিলেন অ্যাবট। ফিল্ডিংয়ের সময় পুকোভস্কি কাঁধে চোট পেয়েছিলেন। তারপরে তাকে স্ক্যান করাতে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় বলে খবর।

মাটি কামড়ে পড়ে থেকে হনুমা বিহারি এবং রবিচন্দ্রন আশ্বিন দু’জনেই বুক চিতিয়ে লড়াই করলেন। উইকেটে এতক্ষণ থিতু হওয়া সহজ ছিল না। অজি বোলারদের বিষাক্ত ডেলিভারি আঘাত করল বিহারি, অশ্বিনকে। তার ওপর আবার রান নিতে গিয়ে হ্যামস্ট্রিংয়ে চোট পান বিহারি। বেশ যন্ত্রণা কাতর মনে হয় তাঁকে। ফিজিও স্প্রে করার পরে তিনি ব্যাটিং করেছিলেন। একইসঙ্গে, কামিন্সের একটি বল আশ্বিনের কোমরে আঘাত করে। লড়াই এরপরেও ছাড়েননি তিনি। এই অফস্পিনার ১২৮ বলে ৩৯ রানে অপরাজিত থাকেন। কেউ হয়তো বলবেন, হনুমা বিহারির এই অতিমন্থর ইনিংস ভারতের জেতার সম্ভাবনাটুকু ছিনিয়ে নিয়েছে। কিন্তু বাস্তবটা হল, রবীন্দ্র জাদেজা গুরুতর চোট পেয়ে ব্যাটিংয়ে নামবেন কিনা, সে-ব্যাপারে সত্যিই দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। শোনা যাচ্ছিল যে, ইঞ্জেকশন নিয়েই হয়তো ব্যাট হাতে নেমে পড়তে পারেন তিনি। যখন বিহারি-অশ্বিন ব্যাটিং করছেন, তখন ক্যামেরায় দেখা গেল ড্রেসিংরুমে গ্লাভস হাতে বসে আছেন তিনি। তা-বলে ঝুঁকি নেবেন কেন বিহারি? ধরুন, চালিয়ে খেলতে গিয়ে তিনি আউট হয়ে গেলেন, এরপর আঙুল ভেঙে যাওয়া জাদেজা সামলাতে পারতেন তো অস্ট্রেলিয়ার তেজি বোলারদের? যাই হোক, টি-২০’র যুগে সিডনি টেস্টে এভাবে ভারতীয় ক্রিকেটারদের লড়াই যে ক্রিকেট লিখিয়েদের কলমে রসদ জোগাবে, তা বলাই বাহুল্য। টেস্ট কেরিয়ারে ৬০০০ রান করা চেতেশ্বর পুজারা (৭৭), ঋষভ পন্থ (৯৭), হনুমা বিহারি (২৩) এবং অশ্বিন (৩৯) এই লড়াই বুঝিয়ে দিল ‘মরার আগে না মরা’র মন্ত্রেই আজ মাঠে নেমেছিলেন তাঁরা।

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

  • যথার্থ
    Well done unfit Vihari
    150 টি বল অর্থাৎ 25 টি ওভার একা সামলে দল কে বাঁচালেন (সাথে অশ্বিন)
    মনে রাখবে তো থিংক ট্যাংক!!!???

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *