রোমন্থন এবং ভালোবাসায় ১৫ আগস্ট

অনিন্দ্য বর্মন

দুই অর্ধ এবং অতিরিক্ত সময় মিলিয়ে খেলা গড়িয়েছে ৫৫ মিনিট। ফলাফল ০-০। সেন্টার লাইনের দু’দিকে দুই দল। টাইব্রেকারের প্রস্তুতি চলছে। এক দলের অধিনায়ক এক খেলোয়াড়কে বোঝাতে ব্যস্ত। ছেলেটি তৃতীয় শটটি নিতে মরিয়া। আগের ম্যাচে পায়ে চোট পেয়েছিল। ডান-পা ফুলে আছে। তবুও সে শট নেবেই।

টাইব্রেকারের ফলাফল আপাতত ২-১। লাল-সাদা আর্সেনাল-এর জার্সি পরা ছেলেটি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বক্সের সামনে। পিঠে নামের নিচে লেখা ৩নং সংখ্যা। ডিফেন্সে খেলে পায়ে চোট নিয়েও ৫৫ মিনিট লড়েছে। নিজেদের গোলে বল ঢুকতে দেয়নি। আপাতত লক্ষ্য, দলকে ৩-১ এগিয়ে দেওয়া।

বলটা বসিয়ে ছেলেটি দু’কদম পিছিয়ে গেল। নিজস্ব স্টাইলে স্পট জাম্প করে শট মারবে। জাম্পের সময় মুখটা এক মুহূর্তের জন্য ব্যথায় কুঁকড়ে উঠল। লক্ষ্য, সামনের গোলকিপারকে টপকে জালে বল জড়িয়ে দেওয়া। ফুলে ওঠা পায়েই জোড়ালো শট নিল ছেলেটি। সবাইকে অবাক করে বল মাটি ঘেষে গোলকিপারের দুই পায়ের ফাঁক দিয়ে জড়িয়ে গেল জালে।

বর্তমানে দাঁড়িয়ে অবাক লাগে, কীভাবে পালটে যাচ্ছে আমার পৃথিবী। এই করোনা অতিমারি বদলে দিচ্ছে জীবনের সূত্র। উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের খেলা হচ্ছে দর্শকশূন্য মাঠে। আমাদের পয়লা বৈশাখ, ঈদ— পালিত হচ্ছে অন্তর্জালিক মাধ্যমে। যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে শুধুই সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং। বাড়ি থেকেই 24X7 অফিসের কাজ। আশা করাই যায়, আমাদের ৭৪তম স্বাধীনতা দিবসও এবার পালিত হবে অন্তর্জালের মাধ্যমে। সমস্ত স্কুল-কলেজ বন্ধ, জনসমাবেশ করায় নিষেধাজ্ঞার কারণে অন্যান্যবারের তুলনায় জাঁকজমক এই বছর খুবই সামান্য। আর এই থেকেই মন চলে যায় ছোটবেলার দিনগুলিতে।

বাল্যকালে স্বাধীনতা দিবস কেটেছে অনেক রকমেই। যখন ছোট ছিলাম, স্কুলে যেতাম। ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পতাকা উত্তোলনের পর প্যারেডে পা মিলিয়ে হাঁটা বেশ আকর্ষণীয় ছিল। স্কুলফেরত যে বিষয়টি খুব টানত, তা হল পাড়ার ফুটবল প্রতিযোগিতা। আমাদের সিআইটি বার্ষিক ফুটবল টুর্নামেন্ট তখন ভীষণ জনপ্রিয় ছিল। পাশের পাড়া থেকেও অনেকেই নাম দিত। কোনও প্রবেশমূল্য ছিল না। সামান্য ২-৫ টাকার চাঁদা দিয়ে নাম লেখাতে হত। স্কুল থেকে ফিরেই ছুটতাম মাঠে। অবাক হয়ে দেখতাম সেই ফুটবল খেলা।

শ্রাবণের অঝোর ধারার সুবাদে, আমাদের মাঠ তখন কাদামাখা পুকুর। ফুটবলও কালো হয়ে যেত। সেভেন সাইডেড টিম, মানে প্রত্যেক দলে ৭ জন খেলোয়াড়। আরেকটি আকর্ষণ ছিল জার্সি। একই দলের সাত খেলোয়াড় সাত রকম জার্সি পরে খেলছে। বাংলার ক্লাবের মধ্যে খুবই জনপ্রিয় ছিল মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল, মহামেডান এবং টালিগঞ্জ অগ্রগামীর জার্সি। বিদেশি ক্লাবের মধ্যে রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড, চেলসি, এসি মিলান ছিল ফেভারিট। বিদেশি জার্সির মধ্যে থাকত আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, ফ্রান্স এবং ইতালি।

খেলা হত নকআউট প্যাটার্নে। আগে শুধুই বড়দের টিম হত। আনুমানিক ২০০২ থেকে জুনিয়র (অনূর্ধ্ব-১৬) এবং সিনিয়র টিম করা শুরু হয়। খেলা শুরুর আগে পতাকা উত্তোলন। আমাদের লজেন্স দেওয়া হত। ৮টা দল দিয়ে শুরু, সেমিফাইনালে উঠত চারটে দল। সেখান থেকে দু’টো দল ফাইনাল খেলত। ফাইনালের আগে একটা প্রদর্শনী ম্যাচ হত। তাতে পাড়ার কাকা-জ্যাঠারা খেলতেন। ১০ মিনিট করে দুই অর্ধ। বাকি সব খেলা হত ৩০ মিনিটের। আর ফাইনাল হত ৪০ মিনিট এবং প্রয়োজনে ১৫ মিনিট অতিরিক্ত সময়। খেলা শেষে পুরস্কার বিতরণী। পুরস্কার বিতরণের মঞ্চে কোনও সেলিব্রেটি থাকত না। পাড়ার বয়োজ্যেষ্ঠ অথবা পরিচিত ব্যক্তিরাই বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দিতেন।

প্রত্যেক বছরই বাবা প্রাক্তনীদের প্রদর্শনী ম্যাচে খেলতেন। শেষবার সম্ভবত খেলেছিলেন ২০০৬-এ। একবার দেখেছিলাম যে, পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে দাঁড়িয়ে বাবা হাসিমুখে পুরস্কার তুলে দিচ্ছেন। সেইদিন মনে মনে ঠিক করেছিলাম, একদিন আমিও ফাইনাল জিতব। বাবার হাত থেকে পুরস্কার নেব।

আসলে আমাদের কাছে সেই প্রতিযোগিতা ছিল একদিনের জন্য নিজের স্বপ্নের মহাতারকার মতো করে নিজেকে দেখা। একদিনের জন্য রোনাল্ডো, বাতিস্তুতা, বেকহ্যাম, জিদান, ফিগো অথবা বাইচুং, চিমা, ব্যারেটো, ইয়াকুবু হয়ে ওঠা।

ডিফেন্সে খেলতাম। লাল-সাদা আর্সেনাল-এর জার্সির পেছনে নামের তলায় লিখতাম ৩। আমার ফুটবলের ভগবান এবং গুরুদেব— পাওলো মালদিনির নং। আর আমার বন্ধুদের তখন চোখের মণি ছিল রোনাল্ডিনহো, বেকহ্যাম, জিদানের মতো তারকারা। তখনও মেসি-রোনাল্ডো যুগ শুরু হয়নি।

১৫ আগস্ট ২০০৫। টেন পাশ করে ইলেভেনে পড়ছি। সেমিফাইনালের পর যখন বাড়ি ঢুকলাম, ফোলা পা দেখে মা-ঠাকুমা আঁতকে উঠেছিল। কিছুতেই ফাইনাল খেলতে দেবে না। তবুও মাঠে নেমেছিলাম, ৫৫ মিনিট লড়েছিলাম, চোট লাগা পা নিয়েই গোল করেছিলাম টাইব্রেকারে। আমাদের দল চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ৫-২ গোলে। মঞ্চে পুরস্কার নেওয়ার সময় দেখেছিলাম, সামান্য দূরে দাঁড়িয়ে বাবা গর্বিত হয়ে দেখছেন। যদিও পায়ের ব্যথায় কয়েকদিন স্কুল কামাই করতে হয়েছিল।

আমাদের আরেকটা শখও ছিল। প্রথম ম্যাচে হেরে গেলে আমরা আর পাড়ায় থাকতাম না। সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম অন্যান্য পাড়ার টুর্নামেন্ট দেখতে। সিআইটি বার্ষিক ফুটবল টুর্নামেন্ট ছাড়াও উত্তর কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় টুর্নামেন্টগুলো ১৫ আগস্ট খেলা হত। তার মধ্যে জনপ্রিয়তম ছিল বরাহনগর কালীতলা মাঠ, টবিন রোড প্রগতি সংঘ, সিঁথি কোরাস মাঠ, টালা পার্ক, শ্যাম পার্ক, দেশবন্ধু পার্ক ইত্যাদি। আশপাশের জেলা থেকে প্রচুর খেপ খেলা খেলোয়াড়রা আসত। মুগ্ধ হয়ে দেখতাম তাদের পায়ের কাজ।

১৫ আগস্ট আরেকটি বিষয় যেটা আমায় টানত, তা হল ঘুড়ি প্রতিযোগিতা। এটা অবশ্য কোনও বাঁধাধরা প্রতিযোগিতা ছিল না। বাড়ির ছাদ থেকে ঘুড়ি উড়িয়ে খেলা হত মাঞ্জার প্যাঁচ। পাশের বাড়ির সঙ্গে পাশের বাড়ির, অথবা পাশের পাড়ার সঙ্গে পাশের পাড়ার। আমি অবশ্য কোনওকালেই ঘুড়ি ওড়াতে পারতাম না। তখন প্রচুর ঘুড়ি উড়ত, যা এখন প্রায় দেখাই যায় না। ১৯১১ সালে যখন মোহনবাগান ইস্ট ইয়র্কশায়ারের বিরুদ্ধে আইএফএ শিল্ড ফাইনাল খেলছে, তখন আমজনতাকে স্কোর জানানোর জন্য ব্যবহার হয়েছিল ঘুড়ি।

মোহন-ইস্ট কথা উঠলেই প্রাসঙ্গিকভাবে ডার্বির কথা এসে পড়ে। তবে ১৫ আগস্ট কোনও ডার্বি হয়েছে বলে আমার জানা নেই। আগস্ট মাসের নিরিখে ২টি ডার্বি উল্লেখযোগ্য। প্রথমটি ১৯৮০ সালের ১৬ আগস্ট ইডেন গার্ডেন্সে হওয়া কলঙ্কিত ডার্বি যাতে ১৬ জন সমর্থক পদপিষ্ট হয়ে মারা যান। দ্বিতীয়টি ২০০৫ সালের ১৮ আগস্ট কলকাতা লিগ ডার্বি। সেই ডার্বিতেই প্রথমবার ডার্বি খেলানোর জন্য কোনও বিদেশি রেফারিকে নিযুক্ত করা হয়। ব্রিটিশ রেফারি ডেভ রবার্টস সেই খেলাটি পরিচালনা করেছিলেন।

কথিত আছে যে, ১৯১১-র সেই ঐতিহাসিক ম্যাচের পর প্রশ্ন করা হলে এক মোহনবাগান খেলোয়াড় বলেছিলেন— পরেরবার যখন মোহনবাগান শিল্ড জিতবে, তখন ভারতের মাটিতে ব্রিটিশ পতাকা আর থাকবে না। কাকতালীয়ভাবে তাঁর সেই কথা ফলে যায়, যখন মোহনবাগান সত্যিই ১৯৪৭ সালে ইস্টবেঙ্গলকে হারিয়ে দ্বিতীয়বার শিল্ড জেতে, তখন ব্রিটিশরা এই দেশ ছেড়ে চলে গেছে। আর হ্যাঁ, যে দলকে নিয়ে এত কথা, সেই মোহনবাগান ক্লাবের প্রতিষ্ঠাও কিন্তু ১৮৮৯ সালের ১৫ আগস্ট।

ছবি মেরিনার্স ফরএভার গ্রুপ থকে নেওয়া…

আমাদের ছোটবেলায় স্বাধীনতা দিবস বলতে শুধুই একটা ছুটির দিন ছিল না। তার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল আরও অনেককিছুই, যা ছিল ভীষণ প্রিয়। ফুটবল আর ঘুড়িতেই কেটে যেত আমার সারাদিন। অথচ, একে একে হারিয়ে যাচ্ছে রোম্যান্টিসিজম, ছেলেবেলা। ক্রিকেটের চাহিদায় একে একে হারিয়ে গেছে অনেক পাড়া ফুটবল প্রতিযোগিতা, মোবাইল এবং ব্যাস্ততা থাবা বসিয়েছে ঘুড়ির লড়াইয়ে। বর্তমান অতিমারি আমাদের পরস্পরের থেকে ঠেলে দিয়েছে আরও দূরে। হয়তো একদিন আবার পাড়ায় পাড়ায় জমে উঠবে কাদা মাঠে ফুটবলের লড়াই অথবা খোলা আকাশে ঘুড়ির লড়াই। আমাদেরই মতো একদিনের জন্য, কোনও তরুণ মেতে উঠবে জয়ের আনন্দে। হয়ে উঠবে মহাতারকা। আশা করি, কোনও এক সুদূর স্বাধীনতায়…

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

  • Subhransu Roy

    অনবদ্য লেখা। ফেলে কৈশোরকে মনে করিয়ে দেয় এমন লেখা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *