আদিবাসীরা নাচবে না

নিবেদিতা ঘোষ রায়

হাঁসদা সৌভেন্দ্র শেখরের ‘দ্য আদিবাসী উইল নট ডান্স’ বইটি অনুবাদ না হলে হয়তো বাঙালি সমাজ জানত না, সাঁওতাল উপজাতি ধামসা মাদল বাজিয়ে, টুরিস্ট লজে আগুন ঘিরে নাচা আর ইঁদুর ধরে পুড়িয়ে খাওয়া ছাড়া অন্য অভিঘাতে নাড়া খায়। আমি ছোটবেলায় দেখেছিলাম আমার মামার বাড়িতে এক সাঁওতাল পরিবারের মধু ও কালী দুই ভাইবোন তারা মাঠ খুঁড়ে ধেড়ে ইঁদুর পেলে খুশি হত। তারা শহরে ছিটকে আসা মজুর পরিবার ছিল। লেখক সৌভেন্দ্র ঝাড়খণ্ডের সরকারি মেডিক্যাল অফিসার। ওঁর এই দশটি গল্পের সংকলনের বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করেছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন: তুৎ পাখি উড়া দিলে…

মঙ্গল মুর্ম ঠিক করে তার দল কাছা আর পাঞ্ছি পড়ে রাষ্ট্রপতির সামনে নাচবে না, এটা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পের ফিতে কাটার অনুষ্ঠান। যে উন্নয়ন তাদের জমি ছাড়া করবে। মঙ্গল মুর্ম তাই বাঙালি রাষ্ট্রপতির চিন্তাশীলতার কাছে বলতে চেয়েছিল তারা নাচবে না, তাদের তমক, তিরিও বানামের তীক্ষ্ণ সুরে ঝাড়খণ্ড সংস্কৃতি জাহিরের দায় শুধু একা তাদের নয়। কারণ তাদের প্রাণে খুশি নেই। তিস্তা পারের বৃত্তান্তে শ্যাওড়াঝোড়ার মাদারির মা, বাঘারুর বাঁচা যেমন স্বাধীন স্বতন্ত্র, স্বার্বভৌম, কোনও উন্নয়নের অংশ নয় তারা, ব্যারেজ, জাতীয় সড়ক, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, এ সবই অবান্তর তাদের কাছে। “তাদের প্রতিটা দিনই একটা পুরো জীবন বাঁচা”। তেমনই সাঁওতালদের, তাদের নাচা, শিল্প নিয়ে গৌরব করার কিছু নেই, বর্ণ হিন্দুর বিয়ে বাড়িতে, আর কলকাতায় পুজো প্যান্ডেলেও তারা নাচতে আসে, ভালো খাবার ক’টা টাকায় আদিবাসী সংস্কৃতির মূল্যায়ন আমাদের মতো মিথ্যা অক্ষরজ্ঞান নিয়ে সম্ভব নয়। মাদারির মার জঙ্গলের গভীরে নিজস্ব পশু নিয়মের জীবন ছিল, দারিদ্র্যসীমা পশ্চাৎপদ এসব শব্দ তাকে ছোঁয় না, কিন্তু, মঙ্গল মুর্মদের বিচ্ছিন্নতার ভেতর থেকেও টেনে এনে নিঃস্ব করে দেওয়া হয়েছে, তাদের পিতৃভূমিটাই নেই। কয়লাচোর, হাড়িয়া খোর, শুয়োর মাংসের সংস্কৃতিটা সাফ করে হিন্দুত্বে পরিণত করে, তারপর, সান্তাল সংস্কৃতির গৌরবপতাকা উড্ডীন করতে ধরে এনে নাচানো অবান্তর বৈকি।

আরও পড়ুন: অবতারের মৃত্যু বনাম অবতারের মুক্তি

সিধু কানুর উত্তরপুরুষরা লড়াই করে। লড়াইও বিক্রি হয়, যাদের রিপোর্টার বন্ধুবান্ধব থাকে, তারা ভালো দাম পায়, ক’টা অচেনা সাঁওতাল ছেলে জমির অধিকারের লড়াই করছে, কিরিস্তান মিশনারিরা মদত দিচ্ছে, মিশনারি মেরে, খুনের দায় সাঁওতালদের ওপরেই চাপাও। এই নাটকের গোপন সংলাপ লিখিয়েরা কি এতই দুর্বোধ্য যে, মিডিয়া বোকা সেজে থাকে। তারা কি পেয়েছে? বোঙাবুরুর বদলে যিশু মরিয়ম, হপনা সোম সিংরাই নামের বদলে ডেভিড, মিখাইল, জন। বড় জোর জাতে উঠেছে সাফা হোড় নাম পেয়ে। তার পরিবর্তে হারিয়েছে তাদের সারনা ধর্ম। তাদের আদি ধর্ম বিশ্বাস। তাই হাড়াম ষাট বছরের শিল্পী যে সরকারি অনুষ্ঠানে পারফর্ম করার জন্য মোটা, সাদা খামে সিলমোহর আঁটা চিঠি পায়, তাকেই পুলিশ মাটিতে ঠেসে ধরে। কালো কয়লা মাখা খরা বিধ্বস্ত তার শরীর আরও একটু বেশি ধুলো মাখে, এগারোটা গ্রামের চারটেকে বুলডোজার দিয়ে মাটিতে মিশিয়ে উদ্বোধনের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপনের, মঞ্চ বানানো হয়েছে, এত সহজে নাচ বন্ধ হয় কী করে!

আরও পড়ুন: স্মৃতিতে সুন্দরলাল

হাঁসদা সৌভেন্দ্র শেখর

শুধু সাঁওতাল না, ঘাসিয়া, মুন্ডা, কারওয়ারা, হরিজন জনসমাজ এগিয়ে যায় এক গল্প থেকে অন্য গল্পে। বিরাম কুমাং পানমুনি ঝি গুজরাতে চাকরি করতে গিয়ে লুকিয়ে ডিম ভাজা খেতে বাধ্য হয়, ডিমের খোলা পুঁতে ফেলে, সামান্য হাকু আর সিম জিল (মাংসের উপকরণ) খাওয়ার জন্য তাদের মাইল পেরোতে হয়। রাতের অন্ধকারে সেবক দল মহম্মদের ঘরে আগুন দেয়, মাংস খেলে এখানে কোনও জায়গা নেই জানিয়ে দেয়, বাড়িওয়ালারাও। সেই নিরীহ পবিত্র নিরামিষ বাসনপত্র, কড়া, খুন্তি হাঁড়ি হাতিয়ার হিসেবে উঠে আসে, অন্ধকার ছাদ থেকে বর্ষিত হয়, ট্রাক বোঝাই করে, যারা আসে মুসলিম মারতে পাড়ায়, কিছুদিন আগেই বন্ধ কামরায় জ্বলে যাওয়া তীর্থ যাত্রীদের জন্যই এদের পাল্টা জ্বালিয়ে দেওয়া দরকার। দু’টো ঠান্ডা পাউরুটির চপ আর পঞ্চাশ টাকার জন্য তালামাই কিস্কুকে পুলিশের সঙ্গে শুতে হয়, কারণ তাকে বর্ধমানে ধান কাটতে যেতে হবে, গাড়ি ভাড়া নেই, এই সংকলন যতই নিন্দা কুড়োক, পালক পড়া আদিবাসী নাচ দেখে আপ্লুত হবার পরও কিছু শক্ত প্রশ্নে গাল চড় চড় করে।

আরও পড়ুন: ব্রাজিলের সর্বশ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক মাচাদো দ্য আসিসের ‘ডম কাসমুরো’

এক কড়ক ছাপ, বেযুবান, রেচেড ভাষা শব্দ, গল্পে এসেছে, যা সভ্য সমাজের গায়ে লাগে। বন্যার ঘোলা অপ্রতিরোধ্য জলের মতো শব্দ ঢুকতে থাকে, আদিবাসী মেয়েদের প্রস্টিটিউড বানিয়ে তোলার অপরাধে, শব্দের শ্লীলতাহানি দেখে, নিরুপায় বইটি ব্যান করার অমোঘ ক্লিশে প্রসেসটিই অ্যাপ্লাই করা হয় এবং চায়ের সঙ্গে বিস্কুটের মতো লেখককে চাকরি থেকে সাসপেন্ড। কিন্তু তাতে কি হয়? তাদের আহত আত্মসম্মানবোধ, উপেক্ষিত মাতৃভাষা, সংস্কৃতির অধিকার, পাহাড় বন জঙ্গলের সবুজ অন্ধকারে ঢাকা তাদের মাটির অধিকার কালি কলমে ছাপা হলেও তো উপেক্ষিতই থাকবে, আর বই নিষিদ্ধ হলেও থাকবে। ফড়িংয়ের পেছনে সুতো বেঁধে ওড়ালে কতক্ষণই বা থাকবে তার ঘন ডানার কাঁপন। যেমন― বাসো ঝি তাড়া খাওয়া কুকুরের মতো, নিজের গ্রাম ছেড়ে সারজোমডিহি গ্রামে যায়, সেখানেও কোলাহল আছে, জীবন, উৎসব নদী পাড়ের জ্যোৎস্নার মতো মায়ায় মিশে আছে, হাত পা দেহের খাঁচাটা শক্ত পোক্ত করে বাঁধা গেলেই কি নিস্তার আসে? চোরাগোপ্তা মার যে অন্য পথে জাল বিছোয়, কেন সে কয়েকটা আস্ত কাচের চুড়ি, কাপড়, আর কোঁচকানো পুঁটলি সম্বল করে নিজের গ্রাম ছাড়ল? কেন-না নিজের নাতি মারা গেছে, তারই জন্য, ডাইন সে। তারপরেও সে ডাইনিই থেকে গেছে, কপার টাউনের রেল স্টেশনে নেমে ভীত, তাড়া খাওয়া স্বতস্ত্র কুকুরের মতো দু’দিন প্ল্যাটফর্মে কাটানো পর, সোরেনবাবুর বাড়ি আশ্র‍য় পেয়ে ভেবেছিল এই বোধহয় শেষ হল। তারপর কুদ গাছের নীচে মাইনুর সঙ্গে কথা বলা বন্ধ হল, মাইনুর নাতি যে মারা গেল। সে আসার পর দু’বছরে তিনটে মৃত্যু! ডাইনি প্রমাণ হতে এর চেয়ে বেশি সময় কি লাগবে? পড়ে রইল তার রবারের চটি, তাকে চলে যেতে হল। বাঙালি মহাশ্বেতা দেবীর কাছ থেকে পেয়েছিল লোধা, শবর জীবনের ইতিহাস, এখানে লেখক নিজেই সান্তাল ভূমিপুত্র।

আরও পড়ুন: অতিমারির একাকিত্বে প্রুফ্রকের সঙ্গলাভ

সৌভেন্দ্র শেখরের অন্য উপন্যাস ‘দ্য মিস্টিরিয়াস এলিমেন্ট অফ রুপি বাস্কে দ্য হিন্দু’। সংকলনের গল্পগুলো অনুবাদ করেছে, ঋতা, দময়ন্তী, সুজিত, শুচিস্মিতা, ইপ্সিতা। গল্পগুলোর মধ্যে আছে এক ফোটোগ্রাফিক ভিশান। আর প্রচলিত মার্জিত ভাষার সঙ্গে দূরদূরান্তের সম্পর্কও রাখেনি। ক্ষুধা দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তার মধ্যে ভাষা মার্জনা ঠোঙার তলায়া মিয়ানো মুড়ির মতোই লাগে। মাঝেমধ্যে ছুঁয়ে গেছে কিছু মায়া, বিশেষ কোনও উত্তুঙ্গ ইমেজারি নয়, জানুয়ারির রোদ্দুর মাখা বিকেল, ঘন সবুজ চাপড়ির মাঠ, রঙ্গিলা গান, ভোরের বাতাস। তা থাকবেই, জীবন তো বটে।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *