গোষ্ঠ পালের ইন্টারভিউ: স্মৃতিমেদুর রূপক সাহা

শুভ্রাংশু রায়

তবু তিনি রয়ে গেছেন। গত কয়েক মাস করোনার কারণে ময়দান চত্বরে প্রায় কাকস্য পরিবেদনা। তবু তিনি ময়দানে রয়েই গেছেন। খালি পায়ে বল সঙ্গে করে। স্থির ভঙ্গিতে। নাহ ঠিক তিনি নয়, তাঁর মূর্তি। পাথরের মূর্তি হলেও মূর্তির ভঙ্গিমাটি যেন তাঁর জীবন দর্শনকে আরেকবার সামনে এনে দেয়। সহজ এবং দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। অকুতোভয়। সমস্ত ধরনের বিপদের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে লড়াই করার ঐতিহ্যের প্রতীক। ২০ আগস্ট, ২০২০-তে তিনি সম্পূর্ণ করলেন ১২৪ বছর। পা দিলেন ১২৫ বছরে। বাঙালির ফুটবল প্রীতি রোমান্স, গৌরবগাথা সবকিছুর সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছেন তিনি। তিনিই বাঙালির শৌর্য-বীর্যের প্রতীক। ব্রিটিশ বিরোধী জাতীয়তাবাদের তিনিই একমাত্র ফুটবল পায়ে বিপ্লবী।

আরও পড়ুন: ১৬ আগস্ট: কলকাতা শহরের ইতিহাসে দু’টি মর্মান্তিক দিন

খেলা শুরু করেছিলেন সেই ১৯১৩ সালে। শেষ করেছিলেন ১৯৩৫-এ। বেঁচে ছিলেন ১৯৭৬ সাল অবধি। কিন্তু অদ্ভুতভাবে যে মানুষটির কলকাতা সহ রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে স্ট্যাচু রয়েছে, কথায় কথায় তাঁকে গোরাদের বিরুদ্ধে খালি পায়ের বাঙালির ফুটবল মাঠে যুদ্ধের কথা প্রসঙ্গে উদাহরণ হিসেবে টেনে আনা হয়, কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে সেই গোষ্ঠ বিহারী পালের তেমন কোনও ডকুমেন্টেশন নেই। নেই বহুল প্রচারিত কোনও প্রামাণ্য জীবনী গ্রন্থ। কেউ বানায়নি তাঁর ওপর কোনও তথ্যচিত্র। ফলে আজকের দিনে গোষ্ঠ পাল যত না ঐতিহাসিক চরিত্র তার চেয়ে অনেকটাই বেশি রূপকথা।

আরও পড়ুন: রবীন্দ্রনাথ, সুভাষচন্দ্র এবং মহাজাতি সদনের ৮২-তে পা

তবে এত নেইয়ের মধ্যে একটি বিষয় কিন্তু রয়েছে। প্রবীণ ক্রীড়া সাংবাদিক ও সাহিত্যিক রূপক সাহার গোষ্ঠ পালকে সামনে থেকে দেখে, কথা বলে তাঁর ওপর লেখা একটি সুবিশাল প্রবন্ধ। যেটি সত্তর দশকে প্রকাশিত হয়েছিল ‘দেশ’ পত্রিকার বিনোদন সংখ্যায়। এই লেখাটি প্রকাশিত হওয়ার অল্প কিছুদিন পরেই গোষ্ঠ পাল ইহলোক ত্যাগ করেন। পরবর্তী সময়ে সেই লেখার সঙ্গে আরেকটু কিছু সংযোজন ঘটিয়ে গোষ্ঠবাবুর ওপর একটি গ্রন্থ ‘চাইনিজ ওয়াল গোষ্ঠ পাল’ লিখেছিলেন রূপক সাহা। বর্তমানে অবশ্য বেশ কিছুদিন যাবৎ সেই গ্রন্থটি আর বাজারে সন্ধান মেলে না।

কেমন ছিল সেই লেখাটির অভিজ্ঞতা? কীভাবেই মাথায় এসেছিল গোষ্ঠবাবুকে ইন্টারভিউ নিয়ে এমন একটি লেখার কথা? জানতে চেয়ে প্রবীণ রূপকদাকে ফোনে যখন ধরা গেল, তখন তিনি পুজোর লেখা নিয়ে কিঞ্চিৎ ব্যস্ত। কুশল সংবাদ জানার পর বললেন পুজোর লেখাপত্তর প্রায় শেষ। তবে লকডাউনের কারণে প্রায় গৃহবন্দি অবস্থায় হাঁপিয়ে উঠেছেন তিনি।

প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখা ভালো, রূপকবাবুর সঙ্গে গোষ্ঠ পালের পরিচয় কিন্তু পারিবারিক সূত্র ধরে। রূপক সাহার পিতৃদেব হারান সাহা ছিলেন কলকাতা মাঠের গোষ্ঠ পালের ঠিক যাকে বলে পরের ব্যাচের খেলোয়াড়। যোগসূত্রের একটি মজার দিক মোবাইলের কথোপকথনের শুরুতেই রূপকদা ধরিয়ে দিলেন। “তখন গোষ্ঠদা ছিলেন ফরিদপুরের মানুষ। আমার বাবার আদি বাড়ি ছিল ফরিদপুর। আর দু’জনকেই ফরিদপুর থেকে স্পট করে এনেছিলেন একই ব্যক্তি। তিনি আর কেউ নন এগারোর অমর একাদশের খেলোয়াড় রাজেন সেনগুপ্ত। আসলে আগস্ট মাসে কলকাতায় প্রায় ফুটবল মরশুম শেষ হয়ে যেত। তখন মোহনবাগান প্রায়শই পুজোর আগে টিম নিয়ে পূর্ববঙ্গে খেলতে যেত। এরকমই এক সফরে গিয়ে ভাগ্যকুলের একটি স্থানীয় প্রতিযোগিতায় খেলতে দেখে এক বালক নজরে পড়ে যান রাজেন সেনগুপ্তের। সেই বালকই ছিলেন গোষ্ঠ পাল।”

পরের কাহিনি অনেকেরই জানা। কিন্তু সেই সত্তরের দশকের মাঝামাঝি গোষ্ঠ পালের ইন্টারভিউ নিয়ে লেখা করার কথা মাথায় এল কীভাবে? প্রশ্নটি শুনে সত্তর পেরিয়ে আসা ‘যুবক’ রূপক সাহার সোজা উত্তর— আমি নিজে নয় বিষয়টি প্রথম আমায় বলেছিলেন সাগরদা (শ্রদ্ধেয় সাগরময় ঘোষ)। সাগরদারা নিয়মিত মাঠে যেতেন। গোষ্ঠবাবুকে উনি অপরিসীম শ্রদ্ধা করতেন। আমি তখন ক্রীড়া সাংবাদিকতায় একদম নতুন। থাকতাম উত্তর কলকাতার সিঁথিতে। আমার থেকে সামান্য দূরে পাইকপাড়ায় থাকতেন গোষ্ঠ পাল। মনে পড়ে ইন্টারভিউ নিতে প্রথম দিন সাইকেল চালিয়ে পাইকপাড়ায় গোষ্ঠদার বাড়িতে হাজির হয়েছিলাম। তখন কিন্তু গোষ্ঠ পালের তৃতীয় হার্ট অ্যাটাক হয়ে গেছে। বাড়িতে গিয়ে শুনলাম অসুস্থ গোষ্ঠ পাল তখন বিশ্রাম নিচ্ছেন। বউদি অর্থাৎ গোষ্ঠ পালের স্ত্রী বললেন উনি আজ বিশ্রাম নিচ্ছেন। কী মনে হল বউদিকে বললাম, আমি ওনাকে বিরক্ত করব না কেবলমাত্র একবার দূর থেকে দেখতে চাই। বউদি আমাকে ওনাদের দোতলার ঘরে নিয়ে গেলেন। দেখলাম উনি ঘুমোচ্ছেন। কিন্তু অসুস্থ ঘুমন্ত গোষ্ঠ পালের বিশাল বুক বলিষ্ঠ পায়ের কাফ ম্যাসল দেখে চমকে উঠলাম। আজ স্বীকার করতে দ্বিধা নেই ওইরকম বিশালাকার বলিষ্ঠ চেহারার মানুষ আমি ওই দিনের আগে কখনও দেখেনি।”

রূপকদা বলেই চললেন, “গোষ্ঠদা আমার বাবাকে চিনতেন, ফলে পরের দিন থেকে যখনই উনি কথা বলতে শুরু করলেন পুরোটাই উনি পূর্ববঙ্গীয় অ্যাকসেন্টে মানে সোজাভাবে বলতে বাঙাল ভাষায় কথা বলতে শুরু করেন। কী বলব অত বড় ব্যক্তিত্ব! কিন্তু একদম শিশুর মতন সরল।” কিছুটা আবেগতাড়িত হয়ে আসে রূপক সাহার গলা।” একবার মায়ের কথা বলতে বলতে হাউহাউ করে কেঁদে ফেললেন উনি। ওনার ডুকরে ওঠা কান্না দেখে তো আমি কিছুটা হকচকিয়ে গেছি। অসুস্থ মানুষ। ওনার স্ত্রী পাশের ঘর থেকে গোষ্ঠদার মাথায় বুকে হাত বিলিয়ে দিতে দিতে বললেন, “আসলে বাবার মুখ দেখার সুযোগ তো ওনার হয়নি। মা-ই মানুষ করেছেন ওনাকে। তাই মায়ের কথা মনে পড়লে ওনার চোখে জল চলে আসে। সেদিন অন্য গোষ্ঠ পালকে চিনে ছিলাম আমি।”

মোবাইল ফোনের কল ড্রপ হয়। লাইন কেটে যায়। আবার নতুন করে কল করে কথা শুরু হয়। সেই লেখার জন্য গোষ্ঠ পালের মুখোমুখি হওয়ার অনেক গল্পই শোনান রূপকবাবু। সে গল্পের মধ্যে গোষ্ঠ পালের মোহনবাগান ক্লাবে থিতু হওয়া, ব্রিটিশ খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে খালি পায়ে মাঠে বিক্রম প্রদর্শন, পদ্মশ্রী প্রদান অনুষ্ঠানে ধুতি পাঞ্জাবি গায়ে দিয়েই রাষ্ট্রপতির হাত থেকে পদক গ্রহণ ইত্যাদি আরও অনেক গল্পই উঠে আসে। “তবে হ্যাঁ, একবারই গোষ্ঠ পাল আমার ওপর হঠাৎ খুব রেগে গিয়েছিলেন। আমি জানতে চেয়েছিলাম, উনি কোনওদিন ইস্টবেঙ্গল ক্লাবে খেলেছিলেন কিনা? উনি মেজাজ হারিয়ে বলেছিলেন, “পুরা মিথ্যা কথা। আমি ওগো ক্ল্যাবে কোনওদিন খেলি নাই।”

দীর্ঘ মোবাইল কথোপকথন শেষে রূপকদার কণ্ঠে কিছুটা আক্ষেপ। “আজ যদি গোষ্ঠ পালকে আবার ইন্টারভিউ করার সুযোগ পেতাম তাহলে অনেক কথাই জিজ্ঞেস করতে পারতাম। তখন একে অভিজ্ঞতা কম ছিল, সাহসও ছিল না ফলে অনেক প্রশ্নই জানতে চাইতে পারেনি। আজ যদি আরেকবার ইন্টারভিউটা নিতে পারতাম…”

রূপকদার গলায়  আপশোস ঝরে পড়ে। প্রত্যেক সৃষ্টিশীল মানুষই কখনও তাঁর সৃষ্টি বা কাজ নিয়ে সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট হতে পারেন না। রূপক সাহাও তার ব্যতিক্রম নন। তবে আমরা বলতে পারি ভাগ্যিস সাগরময় ঘোষ এই অ্যাসাইনমেন্ট দিয়েছিলেন আর তরুণ সাংবাদিক রূপক সাহা ইন্টারভিউটা নিয়েছিলেন। অন্তত একটা বড় ইন্টারভিউ-ভিত্তিক লেখা গোষ্ঠ পালের ওপর রয়ে গেল। গোষ্ঠ পালের প্রসঙ্গে আত্মবিস্মৃতির বড় অপবাদ থেকে বাঙালি জাতিকে তা কিন্তু বাঁচিয়ে দিল। তাই না?

লেখক সোনারপুর মহাবিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক

Facebook Twitter Email Whatsapp

9 comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *