চল্লিশ বছর পরে আবার কি কলকাতা লিগের খেতাব জিততে চলেছে মহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব?

শুভ্রাংশু রায়

এই বছরের শুরুতেই ঠিক চার দশক আগে কলকাতা লিগ খেতাব জয়ী মহামেডান স্পোর্টিং দলের সদস্যদের বেশ ঘটা করে সংবর্ধনা দিয়েছিল ক্লাব কর্তৃপক্ষ। কারণটা আর কিছুই নয়, সেবারই শেষবারের মতো মোহনবাগান অ্যাথলেটিক ক্লাবকে পিছনে ফেলে কলকাতা লিগের শিরোপা ঢুকেছিল মহামেডান তাঁবুতে। সে-বছর মহামেডান টিম ছিল তারকাখচিত। আগের বছরই ইস্টবেঙ্গল ক্লাব থেকে সুরজিৎ সেনগুপ্ত-সহ আট প্রথম সারির খেলোয়াড় যোগ দিয়েছিলেন মহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবে। ’৮১ সালে মহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবে সই করেছিলেন মোহনবাগানের তিন তারকা ফুটবলার— মানস ভট্টাচার্য, বিদেশ বসু এবং প্রসূন ব্যানার্জি। অবশ্য ’৮০-তে ১৬ আগস্টের ট্র্যাজেডির জন্য সে-বছর কলকাতা লিগ সম্পূর্ণ না হওয়ায় কলকাতায় মহামেডানের পক্ষে কোনও বড় সাফল্য আসেনি। অনুষ্ঠিত হয়নি আইএফএ শিল্ডও। ’৮০ সালে অবশ্য ফেডারেশন কাপ কলকাতায় অনুষ্ঠিত হলেও তাতে সাফল্য পায়নি মহামেডান স্পোর্টিং।

আরও পড়ুন: এক বাঙালি ফুটবলপ্রেমীর শহিদের মৃত্যু: চল্লিশ বছর পরে কিছু কথা

এমনিতে একদা কলকাতা ময়দানের তিন প্রধানের এক প্রধান মহামেডান স্পোর্টিংয়ের চূড়ান্ত সাফল্যের নিরিখে সাফল্য অন্য দুই প্রধানের তুলনায় বেশ কিছুটা কম। স্বাধীনতার পরে ’৮১ বাদে কলকাতা লিগে সাফল্য এসেছে মাত্র তিনবার (১৯৪৮, ’৫৭ এবং ’৬৭)। তবে নব্বইয়ের দশকের আগে অবধি অধিকাংশ বছরে প্রায় শেষপর্যন্ত লিগের খেতাব জয় বা রানার্সের দৌড়ে সাদা-কালো জার্সিধারীদের দেখা যেত। নব্বইয়ের শুরু থেকে সেই কৌলীন্য হারিয়ে ক্রমশ হারিয়ে যেতে থাকে মহামেডানের। তবে কলকাতা লিগ বা শিল্ডের খেতাব দীর্ঘদিন অধরা থাকলেও মহমেডান ক্লাবকে কিন্তু ছেড়ে যাননি সাদা-কালো সমর্থকরা। ঠিক সেই কারণেই সাফল্য ছাড়াও ময়দানে একদল মানুষ নিছক ভালোবাসার তাগিদে সাদা-কালো পতাকা নিয়ে হাজির হয়েছেন গ্যালারিতে।

আরও পড়ুন: ১৯৬২-র ৪ সেপ্টেম্বর: এশিয়ান গেমস ফুটবলে সোনা জয়ের রূপকথা পা দিল হীরক জয়ন্তীতে

ছবি ফেসবুক

অবশ্য নব্বই দশক পরবর্তী কালে চারবার মহামেডান স্পোর্টিং কলকাতা ফুটবল লিগের রানার্স হওয়ার সন্মান অর্জন করে (১৯৯২, ২০০২, ২০০৮ এবং ২০১৬-১৭)। ২০১৪-তে মহামেডান ৪৩ বছর পরে আইএফএ শিল্ড খেতাব জিততে সমর্থ হয়েছিল বাংলাদেশের ক্লাব শেখ জামাল ধানমন্ডিকে পরাজিত করে। ২০১৩-তেও ডুরান্ডে সাফল্য এসেছিল বটে মহামেডান স্পোর্টিংয়ের, কিন্তু মূল ঘটনাটি স্বীকার করে নিতে দ্বিধা নেই বাকি দুই প্রধানের তুলনায় অবশ্যই সাফল্যে বেশ পিছিয়ে পড়েছে মহামেডান। নিজস্ব সাংগঠনিক সমস্যার পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে মাঠে রেফারির দুর্ভাগ্যজনক সিদ্ধান্ত অনেকটাই পিছনে ফেলে দিয়েছে ১৩০ বছরের এই ক্লাবকে।

আরও পড়ুন: মান্নাদা ৯৭: এক ফুটবল আত্মার জন্মদিনে কিছু স্মৃতিচারণ

ছবি টুইটার

তবে এবারের কলকাতা লিগে মহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব খেতাব জয়ের এক প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আজ কল্যাণী স্টেডিয়ামে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই শেষে ইউনাইটেড স্পোর্টসকে ১-০ গোলে হারিয়ে মহামেডান লিগ খেতাবের চূড়ান্ত লড়াইয়ে আগামী ১৮ অক্টোবর রেলওয়ে এফসি-র মুখোমুখি। এমনিতে করোনার কারণে স্বাধীনতার পরে দ্বিতীয়বারের জন্য কলকাতা ফুটবল লিগের কোনও ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়নি। এবারে কলকাতা লিগে এটিকে মোহনবাগান এবং শ্রী সিমেন্ট ইস্টবেঙ্গল অংশগ্রহণ না করায় প্রথম দিকে ধরে নেওয়া গিয়েছিল যে, লিগ তেমন জমজমাট হবে না।

আরও পড়ুন: কলকাতায় প্রায় বিস্মৃত একটি খেলা এবং কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন

ছবি ফেসবুক

কিন্তু প্রায় দর্শকশূন্য মাঠে এবারের লিগের ম্যাচগুলো বেশ ভালোই প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হওয়ায় ক্রমশ ওয়েব দুনিয়ার দর্শকদের মধ্যে আগ্রহ বৃদ্ধি হয়েছে। আজকের মহামেডান স্পোর্টিং এবং ইউনাইটেড স্পোর্টস ক্লাবের মধ্যে ম্যাচটি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। ইতিমধ্যে এ বছরের ডুরান্ড কাপের ফাইনালে দর্শক প্রবেশের অনুমতি থাকায় এবং মহামেডান স্পোর্টিং ফাইনালে ওঠায় প্রিয় দলের জয় দেখতে বিবেকানন্দ যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে কাতারে কাতারে সাদা কালো সমর্থক উপস্থিত হয়েছিলেন। এক্ষেত্রে, আগামী দিনের লিগ খেতাবের চূড়ান্ত নির্ণায়ক ম্যাচের সময় ইউটিউব বা সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইভ স্ট্রিমিংয়ের দিকে নজর রাখতে চলেছেন।

একাশির লিগ জয়ী মহামেডান স্পোর্টিং দল। ছবি সৌজন্য মুস্তাফিজুর রহমান

প্রতিদ্বন্দ্বী দল রেলওয়ে এফসির সামনেও অবশ্য রেকর্ড গড়ার সুযোগ রয়েছে। সেই ’৫৮-র পরে দ্বিতীয় রেল ক্লাব হিসেবে কলকাতা ফুটবল লিগ জয় করার। কোন দল জয়ী হবে বা কার সম্ভাবনা কতখানি, তা নিয়ে বিশ্লেষণের লক্ষ্যে এই লেখা নয়। কিন্তু যদি সামগ্রিক বাংলা এবং ভারতীয় ফুটবলের ইতিবাচক প্রভাবের কথা বলতেই হয়, তাহলে মহামেডান স্পোর্টিং দিকেই পাল্লা ভারী থাকা উচিত। এর প্রধান কারণ অবশ্যই মহামেডান স্পোর্টিংয়ের সর্বভারতীয় ফ্যান বেস। কলকাতা লিগে সাফল্য মহামেডান স্পোর্টিং গ্যালারিতে নতুন জনজোয়ার বয়ে আনতে পারে, যা আখেরে ভারতীয় ফুটবলকেই পুষ্ট করবে তাতে কোনও সন্দেহ প্রকাশ করার অবকাশ নেই।

লেখক সোনারপুর মহাবিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হিসেবে কর্মরত

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *