ঈষৎ রঙিন, ততোধিক উজ্জ্বল

সুমিত নাগ

ক্ষীণতনু একটি কবিতার বই: রেনেসাঁ, ঈষৎ রঙিন, একগুচ্ছ ভিলানেল, ড্র্যাগন ব্রিজ, প্রার্থিত পুনর্জন্ম এবং তমার গানগুলি— এই পাঁচটি ভাগে বিভক্ত। শেষ অংশ বাদে, কবিতার সংখ্যা কোনোটিতে তিনটি, কোনোটিতে চারটি, সর্বাধিক পাঁচটি ড্র্যাগন ব্রিজ অংশে। প্রার্থিত পুনর্জন্ম, বিশ্ববিশ্রুত জ্যোতির্বিজ্ঞানী কেপলারের এপিটাফ অনুবাদ, তাও দু’টি পঙ্‌ক্তি এবং বিখ্যাত ভিক্টোরীয় কবি রসেটির একটি কবিতা। তমার গানগুলি ফিনশীয় কবি সিরক্কা সেলিয়ার একগুচ্ছ কবিতা-অনুবাদ।

কবিতার বইটি পড়তে পড়তে মনে হল, কয়েকটি মাত্র কবিতা, পড়ছি, ভালো লাগছে, অন্যরকম ভালো; কেন, কী আছে এর মধ্যে? ভাবতে ভাবতে শেষ পাতায় কবি পরিচিতি অংশে পৌঁছে মনে পড়ল, পুনরায়, যা সম্পর্কে আমি ইতিমধ্যেই অবগত— কবি শিক্ষা ও কর্মসূত্রে, একপ্রকারে, বিশ্বভ্রমণ করেছেন। তখন আবারও কবিতা বইয়ের প্রথম পাতায় ফিরে আসতে হল।

আরও পড়ুন: বদ্যিনাথের সংসার: মতি নন্দীর একটি অগ্রন্থিত গল্প

পাঁচটি অংশে ভালো করে লক্ষ করলে দেখা যাবে, কবি কী বিবিধ ও বিচিত্র বিষয়ই-না এনেছেন কবিতায়। তাঁর ভাষা সাধু ক্রিয়াপদ থেকে ধ্রুপদি শব্দে পৌঁছে গ্রাম্যোচ্চারণ ছুঁয়ে খেউড়ের কাছাকাছি চলে এসে লুকোচুরি খেলেছে। একদিকে তিনি ব্যবহার করছেন,  ‘কালচক্র’ কিংবা ‘সন্তরণপটু’ পাশাপাশি ‘স্টিগমাটিক’, ‘এডিফিস’ আর আমাকে বিস্মিত করে ‘লুঙ্গিড্যান্স’! লিখেছেন, একইসঙ্গে ‘তথাপি এমন স্বপ্নে সকলেই পরিতৃপ্ত, আনন্দে অটুট’ থেকে ‘বাবুরা হেসেছে খুব, আমাদের ওইটুকু পাওয়া’ হয়ে একেবারে প্রথম কবিতায় ‘টিপেছে গালখানি তার স্টার থেটারে পার্ট করেছে বিনোদিনী/কেঁদেছে ডিরোজিও…’! একইভাবে বদলেছে কবিতার মেজাজও। কখনও ইতিহাসে, কখনও বিভিন্ন ভৌগোলিক স্থানবিন্দুতে তাঁর কবিতার পরিক্রমণ। প্রথমাংশে, কালী সিঙ্গি, রূপচাঁদ পক্ষীয় স্যাটায়ার মধ্যভাগে ‘বিষণ্ণ কামানগুলি এতক্ষণে সারিবদ্ধ বিশ্রামের আলস্যে মজেছে’— অপরূপ চিত্রকল্প ও যুদ্ধ আভাসের ভীরু প্রতিচ্ছবি। তেমনি ‘তমার গানগুলি’ অনুবাদে ‘শুধু সমুদ্র শুনেছে তমার বিদায়বাণী: তবু মনে রেখো’— ক্লান্ত উচ্চারণ কিংবা হতশ্বাস। বিশেষ করে, শেষের উদাহরণটি উল্লেখযোগ্য এই কারণে যে, কী অনায়াস দক্ষতায় ফিনশীয় কবির কলমের মধ্যে দিয়ে, তাঁর অনুবাদে রবীন্দ্রনাথ ঝরে পড়েন এবং বাঙালি পাঠক সহজে ঢুকে যেতে পারেন, সম্পূর্ণ অপরিচিত পৃথিবীর এক অজানা প্রান্তের, অজানা কবির কবিতার গহনে। রূপচাঁদ পক্ষী, ডিরোজিও, পিকাসো, জীবনানন্দ; কলকাতা, ভুটান, ফিনল্যান্ড, অসউইৎস, সান ডিয়েগো; ষোড়শ, অষ্টাদশ, ঊনবিংশ, বিংশ ও একবিংশ শতক; সামান্য কয়েকটি কবিতায় এই সুদীর্ঘ যাত্রা— কাল ও পরিসরের নিরিখে।

এবং এত কিছু উদ্গীরণ করেও, আমার বিশ্বাসে, লেখাগুলি— মৌলিক ও অনুবাদ নির্বিশেষে— কবিতা হয়ে উঠেছে। এবং একটি কথা আমার বারবার মনে হয়েছে, বাংলায় বর্তমানে কী কবিতা লেখা হয়, কী লেখা হচ্ছে— সে-পথে হেঁটে কোনওভাবে, সমসাময়িক বা জনপ্রিয় হবার ভান বা চেষ্টাটুকু করেননি। যে-কবি সময়কে অস্বীকার করে, নিজের বিশ্বাস ও শিল্পভাবনা অনুযায়ী কাব্য সৃষ্টি করে পারেন—এই ভাইরাল হওয়া, পনেরো মিনিটের বিখ্যাতির দুনিয়ায়— তাঁকে অভিনন্দন জানাবার কোনও যথেষ্ট ভাষা আমার জানা নেই।

আরও পড়ুন: চিন্তা ও দুই কবি

আবার এই নিবন্ধের প্রথম দিকে ফিরে যাই। কবি পরিচিতি অংশ প্রসঙ্গে। কবির বিশ্বভ্রমণ সম্পর্কে অবগত থাকায় দীর্ঘদিন আগে আমি তাঁকে জানিয়েছিলাম, তাঁর কবিতায় সারা বিশ্ব রঙে-রসে-গন্ধে উঠে আসতে দেখলে ভালো লাগবে। কবির সেকথা মনে থাকার কথা নয়। না থাকুক। কবিতার বইটি আমার সেই ইচ্ছা কিছুটা হলেও পূর্ণ করেছে। কবির পরিভ্রমণের অভিজ্ঞতা ছাড়া এই বইটির বেশ অনেকগুলি কবিতা সৃষ্টি হত মনে করি না। এছাড়া, প্রথম পাঠের মধ্যভাগে আমি অনিশ্চিত ছিলাম, মাত্র কয়েকটি কবিতা— একেকটি অংশে— কীভাবেই বা সেই একেকটি অংশকে পূর্ণতা দেবে। সর্বাংশে পূর্ণতা পেয়েছে বলছি না, আরও একাধিক কবিতা কোনও কোনও অংশে থাকলে পূর্ণতর রূপ পেত অংশগুলি; কিন্তু বইটি পড়ার পর পাঠক যা অর্জন করবেন, তার থেকে সেসব অসম্পূর্ণতা দূর হয়ে যাবে বলেই বিশ্বাস, এবং একক কবিতা বই হিসেবে সার্থকতা পাবে।

পপস্টার ব্রুস প্রিংস্টিন লেখক ফিলিপ রথ সম্পর্কে একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, যেভাবে ষাটোর্ধ্ব রথ নিজেকে ভাঙছেন, সৃজনশীলতার তুঙ্গে অবস্থান করছেন— সেটা তিনিও বেশি বয়সে নিজের মধ্যে দেখতে চান। কবির কবিতা রচনা একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। সৃজনশীলতার ‘পিক আওয়ার’ বলে যদি কিছু থাকে, তা কখন— নির্দিষ্ট করে বলা যায় না। পূর্ববর্তী বই ‘নিজস্ব বাতাস বয়ে যায়’, ‘বেস্কিড পাহাড়ের ভার্জিন মেরি’ আমার ভালো লেগেছিল। কিন্তু বর্ষীয়ান কবি নিরুপম চক্রবর্তী ‘ঈষৎ রঙিন’ গ্রন্থে এসে যে-কবিতা বিশ্বে প্রবেশ করলেন, তাতে চমৎকৃত হলাম। অবশ্য অবাক হবার কিছুই নেই, তিনি নিজেই বলছেন— ‘আমার প্রতিটি কবিতা পুস্তকের নামই’!’, যেহেতু বিস্ময়েই কবিতার জন্ম ও পরিব্যাপ্তি’— যতদিন এই বিস্ময় বোধ, ততদিন কবিতার ঐশ্বর্যের শ্রীবৃদ্ধি ঘটবে আশা করাই যায়।

ঈষৎ রঙিন!
নিরুপম চক্রবর্তী
সৃষ্টিসুখ

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *