ইসরাইল-প্যালেস্তাইন সংঘাত, একপেশে মিডিয়া

আলেখ্য দাশ

দু’সপ্তাহ ধরে গাজা ভূখণ্ডে চলা অশান্তির অবসান! ইসরাইলের অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু মন্ত্রিসভার নিরাপত্তা বিষয়ক বৈঠকে সংঘর্ষবিরতির সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। এমনই দাবি করেছে ইসরাইলের সংবাদমাধ্যমগুলি।

প্যালেস্তাইনের সঙ্গে সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে নেতানিয়াহু সরকারের উপরে আমেরিকার চাপ প্রবলভাবে বাড়ছিল। চাপ আসছিল গোটা দুনিয়া থেকেই। গাজায় অশান্তি থামানোর আবেদন জানিয়েছিলেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র জানিয়েছিলেন, যেকোনো উপায়ে গাজা ভূখণ্ডে হিংসা বন্ধ করাই আমেরিকার লক্ষ্য। পশ্চিম এশিয়ার বেশিরভাগ দেশও সংঘর্ষবিরতির পক্ষে সওয়াল করেছে। ফলে ১১ দিন পর যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছে ইসরাইল ও গাজা নিয়ন্ত্রণকারী গোষ্ঠী হামাস।

আরও পড়ুন: তিরিশ বছর পরে: সেদিনের সেই অভিশপ্ত রাত

গাজার স্বাস্থ্যমন্ত্রকের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ১০ মে থেকে ইসরাইলি হামলায় ৬৫ জন শিশু-সহ ২৩২ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১ হাজার ৯০০ জন। হামাস দাবি করেছে, বিস্তীর্ণ অঞ্চল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। পাল্টা ইসরাইল সেনা দাবি করেছে, হামাস ও অন্যান্য ইসলামপন্থী সশস্ত্র দলগুলি ইসরাইলের দিকে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার রকেট ছুড়েছে। তবে এর বেশিরভাগকেই ‘ডোম এয়ার ডিফেন্স’ দিয়ে আটকানো গিয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, রকেট হামলায় ইসরাইলে ২ শিশু, ১ সেনা-সহ ১২ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একজন ভারতীয় ও ২ জন থাইল্যান্ডের নাগরিক।

দুই দেশের সম্মতিতে বন্ধ হল সেই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। থেমেছে রকেট বর্ষণ। তবে সত্যিই কি শান্তি ফিরবে? চিন্তায় রাজনৈতিক মহল।

আরও পড়ুন: বন্যালাগা গাঁয়ে…

‘প্যালেস্তিনীয়দের কোনো কিছু বলার অধিকার নেই।’

১৯৮৪ সালে এই বিখ্যাত উক্তি করেছিলেন প্যালেস্তিনীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকান বুদ্ধিজীবী ও কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এডওয়ার্ড সঈদ। তাঁর এই উক্তির ৩৬ বছর পর ইউনিভার্সিটি অফ অ্যারিজোনার অধ্যাপক এবং প্যালেস্তিনীয় বংশোদ্ভূত লেখক মাহা নাসের দু’টি দৈনিক— ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ ও ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’ এবং দু’টি সাপ্তাহিক— ‘দ্য নিউ রিপাবলিক’ ও ‘দ্য নেশন’-এর ১৯৭০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ছাপা হওয়া সব মন্তব্য প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করেছেন। দীর্ঘদিন গবেষণার পর মাহা নাসেরের মন্তব্য, এসব পত্রিকার সম্পাদকীয় পর্ষদ ও কলামিস্টরা সম্ভবত আগে থেকেই নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছেন, প্যালেস্তিনীয়দের সমস্যা নিয়ে তাঁরা কিছু লিখবেন না। এই কাগজগুলোর এত বছরের সম্পাদকীয় ও উপসম্পাদকীয় ঘেঁটে তাঁর মনে হয়েছে, এই সাংবাদিকরা প্যালেস্তিনীয়দের কোনো কথা শোনারই প্রয়োজনবোধ করেননি।

আজ সেই একচোখা নীতির প্রতিফলন প্রায় সব পশ্চিমি সংবাদমাধ্যমে প্রতিফলিত হচ্ছে। শুধু প্যালেস্তিনীয়দের কথা না শোনার নীতি অনুসরণেই তারা থেমে থাকেনি, বরং সমন্বিতভাবে তারা এই ‘উন্মুক্ত জেলখানার বাসিন্দাদের’ বিরুদ্ধে তথ্যসন্ত্রাস চালিয়ে যাচ্ছে। সর্বশেষ ঘটনায় সেই বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। সর্বশেষ ঘটনায় আমরা কী দেখলাম?

আরও পড়ুন: রাজ্যের প্রথম গ্রন্থমেলাও হয় এই মুর্শিদাবাদ জেলায়

দেখলাম, আল-আকসা মসজিদে নামায পড়ছিলেন প্যালেস্তিনীয় মুসলিমরা। অতর্কিতে হানাদার ইসরাইলি বাহিনী ঢুকে পড়ল। নির্বিচারে রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড ফাটাতে লাগল তারা। প্রচুর মুসল্লি হতাহত হলেন। পরদিন আবার তাঁদের ওপর হামলা। প্যালেস্তাইনের রেড ক্রিসেন্টের সূত্রে এএফপি তাদের খবরের শিরোনাম করল, ‘জেরুসালেমে নতুন সংঘাতে শত শত হতাহত: জরুরি পরিষেবাদাতা সংস্থা’, এই শিরোনাম পড়ে প্রথমে আপনি বুঝতে পারবেন না, কোন পক্ষ হামলা করেছে আর কোন পক্ষের লোক হতাহত হয়েছে। এই খবরের বিস্তারিত বর্ণনায় গেলে তখন আপনি জানতে পারবেন, জেরুসালেমের ওই সংঘাতে হতাহত মানুষের শতকরা ৯৮ থেকে ৯৯ জনই ছিল প্যালেস্তিনীয়। এটি এএফপি ভালো করেই জানে। তারপরও এই ‘নিরপেক্ষ’ সংবাদমাধ্যমটি শিরোনামে সে বিষয়টি পরিষ্কার করেনি। শিরোনাম পড়ে প্রথমেই যে ধারণা তৈরি হয়, তা তারা পাঠকের অনুমান শক্তির উপর ছেড়ে দিয়েছে। গবেষণা বলছে, প্রতি ১০ জন পাঠকের ৮ জনই খবরের শুধু শিরোনামের উপর চোখ বুলিয়ে খবর সম্পর্কে একটা ভাসা-ভাসা ধারণা করে নেন। বাকি ২ জন খবরের টেক্সটে ঢোকেন। তার মানে, এই শিরোনাম দিয়ে যারা হামলা চালিয়েছে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষকে হত্যা করেছে তাদের দায়মুক্তির ‘ফ্রি পাস’ দিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্যালেস্তাইন ইস্যুতে সংবাদমাধ্যমগুলোর এই ধূর্তামি বহু পুরনো। এরা সম্পাদনার মারপ্যাঁচে আক্রমণকারী আর ভুক্তভোগীকে এক পাল্লায় মেপে দেয়।

আরও পড়ুন: প্রসঙ্গ আল-আকসা: বিশ্বজুড়ে ছি-ছিক্কার আর অভিশাপ কুড়াচ্ছে ইসরাইল

‘প্রথম আলো’র সহ-সম্পাদক, সাংবাদিক সারফুদ্দিন আহমেদ বলছেন, এসব মিডিয়া আউটলেটের নীতি এতটাই একপেশে যে, তারা যদ্দুর সম্ভব ‘প্যালেস্তাইন’ কথাটাই এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। কোনো প্যালেস্তিনীয়কে তাঁর জমি থেকে তাড়িয়ে দিয়ে কোনো ইহুদিকে বসিয়ে দেওয়ার প্রসঙ্গ বর্ণনার সময় তারা ওই দখলদার ইহুদিকে বারবার ‘শেটলার’ হিসেবে উল্লেখ করতে থাকে। এই ‘শেটলার’ শব্দের মধ্য দিয়ে পাঠকের মনস্তত্ত্বে এমন একটি দ্যোতনা তৈরি করার চেষ্টা করা হয়, পাঠকের মনে হবে এই ইহুদি কোনো বিরান ভূমিতে বসতি স্থাপন করেছেন। তিনি বিরান ভূমিতে ‘প্রাণের ছোঁয়া’ দিয়েছেন।

আল-আকসা মসজিদ ও তার আশপাশে বহু শিশু, মহিলাসহ অসামরিক মানুষকে ইসরাইলের সেনারা মেরে ফেলার পর গাজা থেকে হামাসের যোদ্ধারা যখন ইসরাইলের দিকে রকেট ছুড়লেন, তখন সেই ছবি প্রথমে যতটা সম্ভব ভয়াবহভাবে প্রচার করা হল। এমন একটি বয়ান প্রতিষ্ঠা করা হল যেন প্যালেস্তিনীয়রা সন্ত্রাসবাদী। তাদের আত্মরক্ষা বা প্রতিরোধব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার নেই। এরপরই ইসরাইলের বিমান থেকে শুরু হল বোমা বর্ষণ। স্থলপথে ট্যাঙ্ক নিয়ে হামলা। একের পর এক গাজার বাড়িঘর ধসিয়ে দেওয়া হল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন হামাসের রকেট ছোড়াকে সাংঘাতিক খারাপ কাজ বলে প্রথমে খানিক নিন্দা করলেন এবং পরে বললেন, ‘ইসরাইলের আত্মরক্ষার অধিকার আছে।’ মানে ইসরাইল যদি মনে করে তার নিরাপত্তা বিপদে, তাহলে তারা লাগাতার বোমা মেরে নিষ্পাপ শিশুদেরও হত্যা করতে পারে, তাতে আমেরিকার সায় থাকবে।

আরও পড়ুন: নোটস ফ্রম দ্য ডেড হাউস (২য় অংশ)

পশ্চিম দুনিয়ার সংবাদমাধ্যমগুলো কীভাবে ইসরাইলকে নির্বিচারে মানুষ মারার নৈতিক সমর্থন দিয়ে রেখেছে, তা ‘মিডল ইস্ট আই’ নামে একটি অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত ফয়সাল হানিফ নামে একজন লেখকের ‘আল-আকসা অ্যাটাকস: হাউ দ্য মিডিয়া গিভস ইসরাইল আ ফ্রি পাস’ শিরোনামের একটি লেখা পড়লে কিছুটা আন্দাজ করা যাবে। সেখানে ফয়সাল সেন্টার ফর মিডিয়া মনিটরিং নামের একটি সংগঠনের জোগাড় করা তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করেছেন। তাতে তিনি দেখেছেন, ২০১৮ থেকে ২০১৯ সাল— এই এক বছরে গাজায় প্যালেস্তিনীয়দের নির্যাতন-নিপীড়নের পিছনে ইসরাইলের হাত থাকার যতগুলো ঘটনা ঘটেছে, তার মধ্যে ১৮২টি ঘটনাই মূলধারার গণমাধ্যম চেপে গিয়েছে। এর মধ্যে ‘এএফপি’, ‘রয়টার্স’ ও ‘এপি’— এই তিনটি বিশ্বখ্যাত ‘নিরপেক্ষ’ সংবাদ সংস্থা চেপে গিয়েছে ১৪৩টি খবর। অথচ, গোটা গাজা ভূখণ্ড ‘উন্মুক্ত জেলখানা’ হয়ে আছে। ক্ষুধা ও অনাহারে মরতে বসা মানুষ যখনই অধিকার চেয়ে মুখ খোলে, তখনই গুলি চালানো হয়। শুধু ২০১৮ সালেই ইসরাইলি সেনাদের গুলিতে সেখানে আড়াইশো প্যালেস্তিনীয় নিহত ও ২৫ হাজার আহত হয়েছিল।

ফয়সাল হানিফ বলছেন, এই এক বছরে ইসরাইলি সেনাদের গুলিতে প্যালেস্তিনীয়দের নিহত হওয়ার যত ঘটনা ঘটেছে, তার মধ্যে অন্তত ২১টি ঘটনায় সংবাদ সংস্থাগুলো তাদের হেডলাইনে তথ্য আড়াল করেছে। অথবা ভুল বার্তা দেওয়া শিরোনাম দিয়েছে। যেমন— কোনো একজন কিশোরকে ইসরাইলি সেনা গুলি করে মারল, তখন তারা শিরোনাম করবে, ‘সংঘর্ষে বালক নিহত’। এখানে বালকটিকে ‘প্যালেস্তিনীয় বালক’ বলা হবে না। নিহত হওয়ার আগে যে ‘সংঘর্ষ’ হয়েছিল, তার প্রমাণ হিসেবে বলা হবে, ‘ওই বালক পাথর ছুড়ে ইসরাইলি বাহিনীর ওপর হামলা চালিয়েছিল’। অনেক সময় ‘কিলড’ শব্দটি ব্যবহার না করে সেটিকে আরও মোলায়েম ভাষায় বলা হয়, ‘ডাইজ ফ্রম উন্ডস ইন বর্ডার আনরেস্ট’ (সীমান্ত উত্তেজনার সময় মারা গিয়েছে)। কিন্তু যখন কোনো প্যালেস্তিনীয় ছুরি দিয়ে ইসরাইলের কাউকে আঘাত করে এবং সেই আঘাতে যদি সেই ইসরাইলি নিহত হয়, তাহলে এসব সংবাদ সংস্থার বর্ণনার ভাষা আমূল বদলে যাবে। সেই খবরের বারবার ‘স্ট্যাবস’, ‘কিলস’— এসব শব্দ ব্যবহৃত হতে থাকবে।

আরও পড়ুন: নোটস ফ্রম দ্য ডেড হাউস (১ম অংশ)

প্যালেস্তিনীয়দের যেকোনো প্রতিরোধ বা আন্দোলনকে সন্ত্রাসবাদের তকমা এঁটে দেওয়ার চলও বেশ পুরনো। তারা কোথাও কোনো মিটিং মিছিল করল, তো বলে দেওয়া হল, এটি সন্ত্রাসবাদ ছড়ানোর সম্মেলন। তাদের জমিতে কোনো ইসরাইলি দখলদার বিল্ডিং তৈরি করতে গেল এবং তারা বাধা দিল, তো সঙ্গে সঙ্গে তাদের জঙ্গি হিসেবে চিহ্নিত করে দেওয়া হল। এতে ইসরাইলিরা প্যালেস্তিনীয়দের হত্যার বিষয়ে দায়মুক্তি পেয়ে যাচ্ছে।

প্যালেস্তিনীয়দের হত্যার জন্য ইসরাইলের এখন আর কোনো অজুহাত লাগে না। প্রতিটি রোযার মাসে ইসরাইল রুটিন করেই প্যালেস্তিনীয়দের হত্যা করে। এটা যেন তাদের বছরওয়ারি উৎসব। যেমন বছরের পর বছর ধরে ইসরাইল তার অবৈধ বসতি বিস্তার এক মুহূর্তের জন্যও থামায়নি। ইসরাইল তার সীমান্তকে ওদিকে নীল নদ, এদিকে জর্ডন নদী, আরেক দিকে ফোরাত নদী পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার মহাপরিকল্পনাও কখনো লুকায়নি। ইরাক-মিশর-সৌদি আরব-জর্ডন ও সিরীয় ভূখণ্ড দখল করে বৃহত্তর ইসরাইল প্রতিষ্ঠা করাই তাদের একমাত্র এবং নিরুপায় পরিকল্পনা। নিরুপায়, কারণ আরব রাষ্ট্রগুলোকে ভেঙে না ফেললে ইসরাইল কখনও নিরাপদ হবে না। অস্তিত্ব টেকাতে ইসরাইলকে বর্বর হতেই হবে। তারা ভালো করেই জানে, আরবকে বিভক্ত করে শাসন করার চিরকালীন নিশ্চয়তা নেই। গত কয়েক মাসে সেই লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। চিন-রাশিয়া-ইরান-তুরস্কের মধ্যে ঐক্য গড়ে উঠেছে। তুরস্ক ও ইরানের সঙ্গে বিরোধ মিটিয়ে ফেলতে চাইছে সৌদি জোট ও মিশর।

আরও পড়ুন: এক আলোর পৃথিবী (২)

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটেন-আমেরিকা অটোমান সাম্রাজ্যের আরব অঞ্চল দখল করে নেয়। অধিকৃত অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ এবং সদ্য আবিষ্কৃত তেলের খনির বখরা এবং বিশ্ববাণিজ্যের ধমনি সুয়েজ খাল নিয়ন্ত্রণের জন্য দু’টি পাহারাদার নিযুক্ত করে তারা। প্রায় একইসঙ্গে জন্ম নেয় সৌদি আরব ও ইসরাইল। এই ঔপনিবেশিক যমজের জুটি ভাঙা মধ্যপ্রাচ্যের শান্তির প্রধান শর্ত। ইতিমধ্যে ফাটল দৃশ্যমান।

আমেরিকার ছাতা ফুটো হচ্ছে আর তেলনির্ভর সৌদি আরব তার অর্থনীতিকে বহুমুখী করার চেষ্টা করছে। বিনিয়োগ করছে বিভিন্ন দেশের শিল্প ও ব্যবসায়। জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়ে দুনিয়াও তেলনির্ভরতা থেকে বের হতে চাইছে। ইয়েমেনে আগ্রাসন আর কাতার অবরোধের ব্যর্থতা সামলাতে এখন তাদের শান্তি প্রয়োজন। আর শান্তি এলে মার্কিন-ইসরাইলি অস্ত্রের বাজার চুপসে যাবে। পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবে কাবু আমেরিকা ফি-বছর ইসরাইলকে ট্রিলিয়ন ডলারের সাহায্য দেবে কী করে? তা ছাড়া রুশ-চিন-তুর্কিরা ভাগ বসাচ্ছে ইসরাইলি সমরাস্ত্রের বাজারে। ইসরাইলের বিখ্যাত আয়রন ডোম প্রতিরক্ষার মধ্যেও যে ছিদ্র আছে, হামাসের ছোড়া রকেট তা দেখিয়ে দিচ্ছে। হামাস ৯০টি রকেট ছুড়ে আয়রন ডোমকে ব্যতিব্যস্ত করে দিচ্ছে, যাতে অন্তত ১০টি প্যালেস্তিনীয় মিসাইল লক্ষ্যে আঘাত হানতে পারে।

বিশ্ব জনমতও আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ইসরাইল-বিরোধী, তবু জায়নবাদ বেপরোয়া। এসব দুর্বলতার লক্ষণ। কারণ, তারা জানে, হাতে সময় কম। চিন-রাশিয়াকেন্দ্রিক বিশ্ব বা বিশ্বক্ষমতার ভরকেন্দ্রে যেকোনো ধরনের পরিবর্তনের আগে অন্তত সমগ্র জেরুসালেম প্যালেস্তিনীয়মুক্ত করা এবং স্বাধীন প্যালেস্তাইনের স্বপ্ন গুঁড়িয়ে দিতেই হবে তাদের। সুতরাং যাঁরা বলেন, হামাসের উসকানিতে ইসরাইল বেপরোয়া, তাঁরা খাদের তল মাপতে ভুল করছেন। জায়নবাদ তার পূর্বঘোষিত লক্ষ্য হাসিলে হিংসা চালাতে বাধ্য।

আরও পড়ুন: এক আলোর পৃথিবী

জায়নবাদীদের ভয় তাদের পেটের মধ্যেই। ইসরাইলের আরব ও মুসলিম জনসংখ্যা বর্তমানে ২০ শতাংশ। এরা ইসরাইলি সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে পারে না। ৪০ বছরের মধ্যে আরব, মুসলিম এবং জায়নবাদ-বিরোধী আলট্রা-অর্থোডক্স ইহুদিরা জনসংখ্যার অর্ধেকে পৌঁছবে। কোনো গণতান্ত্রিক উপায়ে জনসংখ্যার অর্ধেক কেন, ২০ শতাংশকেও অধিকারহারা করা যায় না। ইসরাইল তাই একইসঙ্গে জায়নবাদী ও গণতান্ত্রিক থাকতে পারে না। পারছেও না। দুই বছরে পর পর চারটি নির্বাচনে কোনো দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। টেকসই জোটও গড়ে উঠছে না। এই রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা ঢাকতেই তাদের যুদ্ধ দরকার, ঘৃণার রাজনীতি দরকার। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু রাজনৈতিক ভরাডুবি ঠেকাতে তাই হিংসা নামিয়ে আনছেন আল-আকসা মসজিদ ও তার পাহারাদার প্যালেস্তিনীয়দের উপর।

জায়নবাদীরা ১৯৪৮ সালে অটোমান সাম্রাজ্য ভেঙে গায়ের জোরে ইসরাইল কায়েম করার সময় বলেছিল, বৃদ্ধরা মরে যাবে আর তরুণরা ভুলে যাবে। কিন্তু তা হয়নি। প্যালেস্তিনীয়রা ৭০ বছর ধরে রক্ত দিয়ে জেরুসালেম ও আরব ভূমির সম্পূর্ণ বেহাত হওয়া ঠেকিয়ে যাচ্ছে। তাদের যে গণহত্যা করেও থামানো যাবে না, তা ২০১৪ সালের গাজা আর ২০০৬ সালের লেবানন দেখিয়ে দিয়েছে। কিন্তু প্রতিরোধী আরব একাও বিজয়ী হতে পারবে না। বিশ্বক্ষমতার ভরকেন্দ্র বদলের যে লক্ষণ ফুটে উঠেছে, তার মাঝখানের ফাঁকটাই তাদের দরকার।

Facebook Twitter Email Whatsapp

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *