স্ট্যান স্বামী নিজের সাক্ষাৎকারে যে সমস্ত কথাবার্তা বলেছেন, তা দেখলে মন একেবারে কষ্টে ভরে যায়: সমর বাগচী

স্ট্যান স্বামীর কথা এবং প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয়ে বললেন বিড়লা ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড টেকনলজিকাল মিউজিয়ামের প্রাক্তন অধিকর্তা এবং পরিবেশ আন্দোলনের একজন চিন্তক ও নেতৃস্থানীয় কর্মী সমর বাগচী। শুনলেন মঞ্জিস রায়

স্যার, আপনি শুধুমাত্র বিড়লা ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড টেকনলজিকাল মিউজিয়ামের প্রাক্তন অধিকর্তাই নন, পরিবেশ আন্দোলনের একজন চিন্তক ও নেতৃস্থানীয় কর্মী হিসেবেও সমানভাবে সমাদৃত। স্ট্যান স্বামীও ছিলেন একজন সমাজকর্মী, যিনি সমাজে আদিবাসী ও দরিদ্র মানুষদের জন্য কাজ করতেন। তাঁর মৃত্যু আমাদের অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এ বিষয়ে আপনি যদি কিছু বলেন…  

সমর বাগচী: আসলে বিষয়টা হচ্ছে এই যে, আজকাল যাঁরাই সরকারের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন, তাঁদেরকে জেলে পুরে দেওয়া হচ্ছে, যেখানে সংবিধানই আমাদের মত প্রকাশ করার অধিকার দিয়েছে। এভাবেই ১৪-১৫ জন গুরুত্বপূর্ণ মানুষকে এবং আরও অনেককে জেলে পুরে রাখা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে আরেকজন প্রবীণ ব্যক্তি ভারভারা রাও বেল পেয়েছেন বাকিদের ক্ষেত্রে কিন্তু হয়নি। স্ট্যান স্বামী নিজের সাক্ষাৎকারে যে সমস্ত কথাবার্তা বলেছেন, তা দেখলে মন একেবারে কষ্টে ভরে যায়। আমিও নানান সময়ে যেখানেই অন্যায় হয়েছে, তার বিরুদ্ধেই কথা বলেছি। আমি ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স ফর পিপ্‌সস মুভমেন্টের সঙ্গে যুক্ত, যা মেধা পাটকর ও অন্যান্য অনেকে মিলে শুরু করেছেন।

আরও পড়ুন: স্ট্যান স্বামী, জেসুইট পাদ্রি, লিবারেশন থিয়োলজিস্ট ও বাগাইচা বিষয়ক দু-চার কথা

এখন প্রতিবাদ করলেই বিভিন্ন চার্জ এনে জেলে অন্যায়ভাবে পুরে রাখা হচ্ছে। সেসব চার্জ প্রমাণ হচ্ছে না আর বছরের পর বছর মানুষগুলি জেলে পড়ে থাকছেন। জেল থেকে স্ট্যান স্বামী যে স্টেটমেন্ট দিয়েছেন, তা পড়বার মতো। এর থেকেই বোঝা যায় যে, তাঁর মনের জোর কতখানি। আসলে এনারা খ্রিস্টান এথিক্সে বিশ্বাসী। যেমন ওড়িশায় যখন এক খ্রিস্টান পাদ্রিকে এবং তাঁর শিশুকে জ্বালিয়ে মারা হয়েছিল, তাঁর স্ত্রী কিন্তু বলেছিলেন, “ক্ষমা করে দাও।” এই হল খ্রিস্টান এথিক্স। এই ধরনের যাঁদের চিন্তাধারা, যাঁরা মানুষের দুঃখ-কষ্টের কথা ভাবেন, তাঁদেরই মাওবাদী বলে জেলে পুড়ে দেওয়া হয় কোনও প্রমাণ ছাড়াই। এর বিরুদ্ধে কথা বলা উচিত।

এই মৃত্যু কি আমাদের আজকের এই সিস্টেম ও রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতি একটা বড় প্রশ্নচিহ্ন রেখে দিয়ে গেল না?

সমর বাগচী: হ্যাঁ। খুবই বড়। আর এসব তো আজকের থেকে হচ্ছে না। আমার মনে পড়ছে এস সাইবাবা নামে একজনের কথা। তিনি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। তাঁকে চার বছরের ওপর জেলে ধরে রাখা হয়েছে মাওবাদীদের সমর্থন করেন বলে। তিনি শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার একজন মানুষ। হুইলচেয়ারের সাহায্যে চলাফেরা করতে হয় তাঁকে। মানুষটির এখন এমন অবস্থা যে, তিনি রাতের বেলা বা দিনের বেলা শোবার সময়েও হুইলচেয়ার ছেড়ে উঠতে পারেন না। কিন্তু তাঁকে কেউ কোনও সাহায্য করে না, যাতে তিনি নড়াচড়া করতে পারেন। মানে, অমানবিকতার কোনও সীমা নেই।  

আরও পড়ুন: স্মৃতিতে সুন্দরলাল

একজন সমাজকর্মী হিসেবে আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে কী কী বাধার সম্মুখীন হতে হয় আপনাদের?

সমর বাগচী: আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে, জঙ্গল নিয়ে যথেচ্ছাচার করা হচ্ছে। যেমন, আজকেই আমি খবর পেয়েছি একটা ডায়মন্ড মাইন প্রোজেক্টের ব্যাপারে। সেখানকার স্থানীয় মানুষ সোচ্চার হয়েছেন। আসলে আমাদের সমাজে প্রত্যেকদিন ভোগবাদ বেড়ে যাচ্ছে। আমাদের লড়াই হচ্ছে সিস্টেম চেঞ্জ করার জন্য। গ্রেটা থানবার্গও একথাই বলছেন। বলছেন, “Not climate, but system change। মানে ক্লাইমেট চেঞ্জটাও তো সিস্টেমের জন্যই হচ্ছে। শুধুমাত্র পুঁজিবাদ নয়, ভোগবাদকে যদি আটকাতে না পারি, তাহলে সোশ্যালিজম, কমিউনিজম, যাই থাক না কেন, পৃথিবী ধ্বংসের মুখে। বলছে, আর মাত্র নয় বছরের মধ্যে আমরা যদি কোনও পদক্ষেপ না নিই, তাহলে তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড ছাড়িয়ে যাবে। এই তো ২১ জুন আমি খবর পেলাম যে, উত্তর মেরুর তাপমাত্রা বেড়ে ৩.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস হয়ে গেছে। তখন বিজ্ঞানীরা ঠিক করেছেন যে, তাঁরা সল্ট সলিউশন করবেন। নুনের সলিউশন করে সেটা নদীতে বোট থেকে ফেলবেন। সেগুলো সূর্যরশ্মিকে রিফ্লেক্ট করবে। আসলে টেকনলজি দিয়ে সবকিছু হবে না। যদি আমাদের সমাজটাকে আমূলভাবে পাল্টাতে না পারি, তাহলে পৃথিবী ধ্বংসের মুখে যাবে। আসলে মানুষের মতো নির্বোধ প্রজাতি প্রকৃতি আর জন্ম দেয়নি। মানুষ যবে থেকে এলো, তারপর যখন তথাকথিত সভ্য হতে শুরু করল, তখন থেকে মানুষ মানুষকে মারছে। কোটি কোটি মানুষ নিজের প্রজাতিকে মেরেছে। কখনও কি কেউ শুনেছে যে একটা বাঘ কুড়িটা বাঘকে মেরেছে?

আরও পড়ুন: ‘উন্নয়নবিরোধী’ এক প্রকৃতিপ্রেমিক মানবদরদি সুন্দরলাল বহুগুনা

আপনাদের বা আপনাদের সহকর্মীদের কি স্রোতের বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য কোনওরকম আক্রমণের সম্মুখীন হতে হয়েছে?

সমর বাগচী: সে তো সারা ভারতবর্ষেই হচ্ছে। কিন্তু আমাদের এখানে ভাঙড়ে, স্থানীয় লোকেরা যা বলছিল আর কী, একটা হাই টেনশন লাইন যাবার কথা, যার ফলে পরিবেশের, অনেক মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষতি হবে। সেখানে যখন প্রতিবাদ করা হয়, তখন তাদের নেতাকে জেলে নিয়ে যাওয়া হয়। আমি জানি না সে এখন ছাড়া পেয়েছে কিনা। এরকম ঘটনা এখানেই, এই আমলেই ঘটেছে। আবার বেহালার জেমস লং সরণিতে যে সমস্ত বড় বড় গাছ ছিল, রাস্তা চওড়া করার নামে সেসব বহু পুরনো গাছগুলোকে কাটা হচ্ছিল। একজন মিলিটারি ভদ্রলোক একক প্রতিবাদ শুরু করেন এবং চিপকো আন্দোলনের পদ্ধতিতে গাছেদের জড়িয়ে ধরেন। কিন্তু স্থানীয় কিছু লোক এসে তাঁকে মারধর করে।

আরও পড়ুন: সেইসব স্মৃতিধর

স্ট্যান স্বামীর এই মর্মান্তিক পরিণতির প্রসঙ্গে ফিরে এসে জিজ্ঞাসা করছি যে, লোকজনের যেভাবে সোচ্চার হওয়া উচিত, গর্জে ওঠা উচিত, সেভাবে কি মানুষ প্রতিবাদ করছেন?

সমর বাগচী: আমি সবেমাত্র শুনলাম যে, মৌলালি মোড় থেকে একটা মিছিল হবে। আজকে খবরের কাগজেও অনেক কিছু রয়েছে। ওনার ইন্টারভিউ আমার কাছে এসেছে। উনি বুঝতে পারতেন যে, ওঁকে চলে যেতে হবে।  

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *