জগদর্শন কা মেলা (পর্ব ১)

চিন্ময় মুখোপাধ্যায়

মানিকবাবুর সঙ্গে প্রথম দেখা হয়েছিল সম্ভবত শিয়ালদহ লাইনের কোনও ট্রেনের কামরায়। অফিসের কাজে কোথাও একটা যাচ্ছিলাম, ট্রেনে তেমন ভিড় নেই, শীতের মন্থর রোদ্দুরের মতো হালকা চালে চলেছে ট্রেন, আশপাশের গাছগাছালি থেকে সবুজ পাতা যেন হঠাৎ হঠাৎ হলুদ মায়াবী রোদের সঙ্গে ঝিলিক দিয়ে যাচ্ছে ট্রেনের কামরার গাঢ় খয়ের রঙা বরফিকাটা মেঝেতে। কামরার ভিতরে ইতস্তত লোকজন বসে গুলতানি করছে। একটা হালকা গুনগুন উঠছে। ঝিনঝিন করে চুরি বেজে উঠছে। হঠাৎ হঠাৎ হাসির শব্দ উপচে উঠছে এ-কোণ থেকে ও-কোণে। বাচ্চাদের কচি গলার বায়না উঠছে। ফেরিওয়ালারা আসছে-যাচ্ছে। জোয়ানের আরক আর ঝালমুড়ির মধ্যে সাংসারিক আলাপ হচ্ছে আসা-যাওয়ার পথে। আজকের বাজারদর-বিক্রিবাটার হিসেব সরুমোটা গলায় গল্প জমিয়ে তুলছে প্যাসেঞ্জার ট্রেন। স্টেশনে ট্রেন থামছে। দু-চারজন নামছে। কচিৎ দু-একজন উঠছেও। একটা মন্থর সুখী দৃশ্যপট।

এরকম একটা দৃশ্যপটকে দেখলাম স্থির ছবির ফ্রেম হয়ে যেতে… হঠাৎ নয়, ধীরে ধীরে যেন বাকি সব শব্দ-কোলাহল নিভে এলো কম পাওয়ারের বাল্বের আলোর মতো। বদলে একটা উজ্জ্বল সুরেলা আলো ছড়িয়ে গেল একটা বিন্দু থেকে বৃত্তাকারে গোটা কামরাময়। একটা মনকেমন করা সুর যে সত্যিই মন্ত্রমুগ্ধ করে দিতে পারে তাবৎ জনতাকে, সেরকম একটা দৃশ্য রচনা হল আলো ঝলমলে দিনমানে।

আরও পড়ুন: মানভূমের মনসা পরব

এক ভদ্রলোক কামরার দুসারি সিটের মাঝখানে কোনও রকমে জায়গা করে নিয়ে ঈষৎ হেলে দাঁড়িয়ে বাঁশি বাজাচ্ছেন। শরীরটা কোমর থেকে হেলান দিয়ে রাখা সিটে। দু-চোখ বোজা। কাঁধে একটা ঝোলা ব্যাগ। আর ঠোঁটের শ্বাস রচনা করছে অপার্থিব হাওয়ার সংগীত… পুরনো বাংলা হিন্দি গানের সুর, মনকেমন করে দিচ্ছে তার সহজ আবেদনে। মেলোডি ভেসে বেড়াচ্ছে সকালের জাদু-রোদ্দুরে, হাওয়ার রূপকথায়। এরকম দৃশ্য হয়তো ট্রেনের কামরায় খুব বিরল নয়। তবে এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম বোঝা গেল ভদ্রলোক যখন থামলেন তখন, তার সর্বাঙ্গ তখন কাঁপছে, মাথা-সহ… এটাই ওনার অসুখ। স্নায়ুঘটিত এই অসুখ স্থির হতে দেয় না দেহ। কিন্তু অদ্ভুত… বাঁশি ঠোঁটে স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গেই স্থির হয়ে যায় দেহ। কী বলব একে? সুরের জাদু? সংগীতের অলৌকিকত্ব? দুনিয়ার সবকিছু তো যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা হয়নি, হয় নাও। ভালোলাগার রেশ এমন হতবাক করে দেয় মাঝেমধ্যে, আমাদের শব্দ স্থির হয়ে যায়, কথা চুপ করে যায়।

তারপর প্রাথমিক মুগ্ধতা কাটিয়ে মানিকবাবুর সঙ্গে সামান্য আলাপ হয়, দু-একটি কথা, যোগাযোগের নম্বর নিয়ে রাখি। পরবর্তীকালে একটি ছোট অনুষ্ঠানে ডাকি, যেখানে আমরা কয়েকজন ছবি আঁকছিলাম, এসেছিলেন উনি, বেশ কিছুক্ষণ বাজিয়েছিলেন তার জাদুবাঁশি… ছবির সঙ্গে মনকেমন করা আড়বাঁশি ভালোও লেগেছিল অনেকের। নিতান্তই শহুরে একটি অনুষ্ঠান, কিইবা দিতে পারে একজন জাতশিল্পীকে, সামান্য কিছু অর্থ ছাড়া। সেটুকু নিয়েই খুশিমনে মঞ্চ ছেড়েছিলেন তিনি। হাত ধরে যখন ফিরতি বাসে তুলে দিই, বলেছিলাম, আবার দেখা হবে।

বহুকাল কেটে গেছে, মানিকবাবুর সঙ্গে আর আমার দেখা হয়নি। যোগাযোগের সূত্র হারিয়ে গেছে। কত কী ঘটনার স্রোত বয়ে গেছে মাঝের সময় দিয়ে। পৃথিবীর দুর্দিন এসেছে। মহামারির আতঙ্ক এসেছে… ট্রেন চলে না বহুকাল। মানুষ সড়গড় হয়নি নিত্যদিনের জীবনে। এমনি করেই কত কী হারিয়ে যায় আমাদের জীবন থেকে।

কেমন আছেন মানিকবাবু? সুস্থ আছেন তো? আপনার আড়বাঁশিতে সুর ওঠে এখনও? নাকি বিষাদ আর অভাব এসে বুজিয়ে দিয়েছে বাঁশির গলা, একটি প্রতিভার গলা। 

কী জানি কেন আজকাল শ্রাবণের বৃষ্টিভেজা সকালে অঝোর ধারার মাঝে মনে পড়ে মানিকবাবুর বাঁশি, লোকাল ট্রেনের কামরা, একজন শিল্পীর ঘামেভেজা মুখ আর রান্নাঘর থেকে ভেসে আসে একমুঠো ভাতের গন্ধ।

ক্রমশ…

অলংকরণ­: লেখক

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *