জগদর্শন কা মেলা (পর্ব ২)

চিন্ময় মুখোপাধ্যায়

বেশিদিন আগের কথা নয়, বছর তিরিশ আগেও আমাদের ছেলেবেলার সীমান্ত অবধি ডাক্তারবাবুরা ডক্টর হয়ে ওঠেননি, পাড়ায় পাড়ায় ক্লিনিক নামের তেলকল গড়ে ওঠেনি, যেখানে অবাঙমানসগোচর একটি অসুখের পিছু ধাওয়া করতে করতে গুচ্ছখানেক গান্ধিমার্কা কাগজ ওড়ে, বাড়িসুদ্ধ লোকের রক্তচাপ বাড়ে। তখন ওষুধের দোকান ছিল হাতে গোনা। আর হ্যাঁ, আমাদের অসুখ-বিসুখগুলোও ছিল বড়ো আটপৌরে, নিরীহ সাদাসিধে গোছের— পাতি জ্বরজারি, হাঁচি-সর্দি-কাশি, দাঁত কনকন, পেটে ব্যথা বা পেটখারাপ… এছাড়া কাটা ছড়া তো ছিলই ভাতের পাতে নুন লেবুর মতো।

জুটমিলে কাজ করার সুবাদে বাবার ESI কার্ড ছিল, জ্বরজারি হলেই আমাদের জন্য আগে ছিল ঘরোয়া টোটকা, তার মেয়াদ ফুরোলে তারপর ডাক্তার… সেই দিনগুলোও কিউরিয়ো দোকানের মতো শ’খানেক বছর পিছিয়ে কোনও ধূসর স্মৃতির গলিতে হারিয়ে গেছে। মফস্‌সল শহরের অলিগলি পাকস্থলীর ভেতরে একটা মাঝারি মাপের হাড় জিরজিরে ঘর, বেশ পুরনো… জায়গায় জায়গায় পলেস্তারা খসে পড়ছে, কাঠের বেঞ্চিতে বসে অসাবধানে দেওয়ালে হেলান দিলেই পিঠে চুন-সুরকির গুঁড়ো লেগে যেত, তো সেই ঘরখানাই মোটা সবুজ পর্দা ঝুলিয়ে একটাকে দু’টো ভাগ করা হয়েছে, ঘরে গোটা কয়েক পুরনো আমলের কালো কাঠের আলমারি, ভেতরে ঘুমিয়ে আছে অজস্র এটা সেটা ওষুধের শিশি, বয়াম। ঘরময় একটা অদ্ভুত ওষুধ-ওষুধ গন্ধ, যেন একটা আলাদা ছায়াচ্ছন্ন জগতে ঢুকে পড়েছি। সেই জগতে পথচলতি সাইকেল রিকশা নেই, কচিৎ মোটরসাইকেল বা চারচাকার যান ও নেই, স্কুল নেই, কলেজ নেই, বাজার-হাট মুদিখানার দোকান নেই, শুধু আছে  জ্বর-জ্বর তিতকুটে স্বাদ, ভারী জিভ, ঝিমঝিম একটা মনকেমন করা মরা-রোদের সকাল, পাশের জানলা দিয়ে পেয়ারা গাছ, একটা ছোট্ট চড়াই… অনন্ত একটা অপেক্ষার ওপারে যখন গিয়ে পৌঁছনো যায়, তখন দেখা যায় একটা আধো আলো আধো অন্ধকার টেবিলে বসে আছেন একজন অশীতিপর ডাক্তারবাবু, সাদা সুতির শার্ট, গলায় ঝোলানো কালো রঙের স্টেথোস্কোপ, গোলমাল ডাক্তারবাবুর টকটকে গায়ের রং, পাতলা গোলাপি ঠোঁট, বাঁ-হাতে কালো বেল্টের হাতঘড়ি, ভুঁড়ির মাঝামাঝি অবধি টেনে তোলা কাল ঢিলে প্যান্ট, সেটা আবার কাঁধের দু’পাশ দিয়ে কাপড়ের বেল্ট দিয়ে টানা দেওয়া, আমরা বলতাম ‘বকলশ প্যান্ট’… এই হল ডাক্তারবাবুর বাহ্যিক বর্ণনা, আর তাঁর সামনে বসা মানে রীতিমতো একটা আতঙ্কের বিষয়, ওই সামনের চেয়ারটায় বসলেই মনে হয় দিব্যি তো সুস্থই আছি, বেশ ঝরঝরে লাগছে, জ্বরটাও যেন একটু কম কম লাগছে না? কেন যে সামান্য ব্যাপারেই বাড়ির লোকজন ডাক্তারখানায় টেনে নিয়ে আসে, বুঝিনা। জ্বরজারি হলে কী এমন ক্ষতি, দু-চারদিন স্কুলে ডুব মারা যায়, বাড়ির পড়াশোনাও বন্ধ দেওয়া যায়। এমনই ছিল স্থানমাহাত্ম্য বা ডাক্তারের হাতযশ। আজকালকার তাবৎ প্যাথোলজি লুকিয়ে ছিল ডাক্তারবাবুর কুঁচকানো ভুরু, সাঁড়াশির মতো দু’টো হাত এবং ওই স্টেথোস্কোপে… জিভ টেনে, নাড়ি ধরে, পেট টিপে এমন সব কাণ্ড বাঁধাতেন, মনে হোত এরচেয়ে স্কুলে গিয়ে স্যারেদের বেতের বাড়ি খেলে অনেক উপাদেয় হত। কিন্তু কষ্ট না করে কে আর কবে কেষ্ট পেয়েছে! অতএব এই কষ্টের সিজন অতিক্রম করলেই ছিল বসন্ত, হাসিমুখে দু-চার কথা বলে অনায়াসে অসুখের মূলে পৌঁছে যেতেন, এরজন্য  এক্স-রে, ব্লাড টেস্ট, সুগার টেস্টের রিপোর্ট লাগত না।

আরও পড়ুন: পুরুলিয়ার তেলকুপিতে জলের নীচে ইতিহাস

দ্বিতীয় ধাপে ছিল পাশের পর্দাটানা ঘরে নিরীহ গোছের কম্পাউন্ডারের ঘর, সেখানে সরুমোটা কালো কালো শিশি বোতল থেকে বিচিত্র সব ওষুধ মিশিয়ে তৈরি হত মিক্সচার ওষুধ, ওষুধের ছোট শিশির গায়ে যত্ন করে কাটা কাগজের দাগ, একেকবারে কতটা খেতে হবে, তার হিসেব। কখনও আর কিছু অতিরিক্ত দরকার পড়লে পাশের ওষুধের দোকানে কফসিরাপ বা দু-চারটে ট্যাবলেট-ক্যাপসুল। সেই সব মিক্সচার ওষুধ ছিল যেন বিশল্যকরণী, তার কাছে হার মানবে না এমন সাধ্য কী অসুখের! রোগবালাইয়ের এমন মোক্ষম দাওয়াই বগলদাবা করে ফেরার পথে মনটা বেশ ফুরফুরে লাগত, শরৎকালে দুর্গাপুজো আসার ঠিক আগটায় যেমন পেটের ভেতরটায় একটা চাপা আনন্দ গুড়গুড় করে উঠত থেকে থেকে, ঠিক তেমনি।

তারপর তেতো ওষুধ, গলা গলা সেদ্ধ ভাত, কাঁচকলা অতিক্রম করে আমরা আরোগ্য পেতাম, একদিন সকালে উঠে দেখতাম ‘ছাত্রবন্ধু’ জ্বরজারি ভোরের ট্রেনে বেপাত্তা, সুতরাং সেদিন থেকেই আবার স্কুল, পড়াশোনা, নিয়ম…

হায়, কোথায় গেল সেই সব নানারঙের দিন, কোন অলিগলি বেয়ে, ঘুলঘুলি অলিন্দের পাশ কাটিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে গেল সেইসব ধন্বন্তরি ডাক্তারবাবুরা, তাদের রহস্যময় আলো-আঁধারি চেম্বার, মিক্সচারের দাগ দেওয়া শিশি, স্টেথোস্কোপ আর আমাদের সোনালি ছেলেবেলা… সেই ডাক্তারখানা এখন ফ্ল্যাট বাড়ি হয়েছে, ডাক্তারবাবুও নেই বহুকাল। আজও কোনও জ্বরতপ্ত দুপুরে স্মৃতি নিয়ে যায় সেই ক্যালেইডোস্কোপের রঙিন ছেলেবেলায়, নস্টালজিক ডাক্তার বাবুর আস্তানায়, চোখ বুজে তিতকুটে জিভে স্বাদ নিই স্বপ্ন মিক্সচারের, নাকি ছেলেবেলার?

অলংকরণ লেখক

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *