জগদর্শন কা মেলা (তৃতীয় পর্ব)

চিন্ময় মুখোপাধ্যায়

ভোরের দিকে হাওয়ায় সত্যি মিশে থাকে, তখন আপনি হাজার চেষ্টা করলেও মিথ্যে বলতে পারবেন না, ভোর আপনাকে মিথ্যে বলতে দেবে না, মুখ ফসকে সত্যিটা ঠিক বেরিয়ে যাবে, কাউকে ঠকাতে গেলে মনে হবে কী হবে দু-চার পয়সা কম দিয়ে, এইটুকুই তো জীবন, দু-পয়সার মনোরঞ্জনী খেলা, আড়াল থেকে সুতোয় টান পড়লেই মঞ্চ থেকে বিদায় নিতে হবে, প্রণামটুকু রাখবার অবধি অবকাশ পাওয়া যাবে না… এই হচ্ছে ভোরের ইন্দ্রজাল, পরশপাথরের স্পর্শ। ভোর আমাদের মনকে শান্ত, আত্মমগ্ন করে, খুব গভীরের দিকে নিয়ে যায়, আত্মদর্শন হয় মনের মুকুরে, সেই যেখানে হৃদি-বৃন্দাবনে ঘন কৃষ্ণ যমুনার তীরে কদম্ব বটের ছায়ায় শ্যামকিশোরের মোহন মুরলী বাজে, শ্বেত-শতদলের মাঝে শ্বেত হংস-পুষ্প সমন্বিতা স্মিত হাসেন বীণা বাদিনী বরদে দেবী। সেখানে মিথ্যে চলে না, প্রবঞ্চনা চলে না, শঠতা চলে না।

যদি কোনওদিন খুব ভোরবেলা আধো আলো আধো অন্ধকারের মধ্যে হাঁটতে বেরোন দুনিয়ার পথে পথে, দেখবেন মনের সব গ্লানি ভেসে যাচ্ছে মৃদুমন্দ বৈরাগী হাওয়ায়, আপনি হালকা বোধ করছেন। জানা-অজানা কত গাছের পাতায় অল্প শিশির জমেছে, শরতের শিশির, দু-একটি শিউলি ধরেছে গাছে গাছে, একগাছ ছাতিম ফুলের মায়াময় গন্ধ ঘিরে আছে ঝুপসি অন্ধকার গাছের তলায়, সূর্যের প্রথম আলোর চরণধ্বনি মৃদু মৃদু এসে পড়ছে পথের পাশের অকিঞ্চিৎকর ঘাস-লতা-পাতায়, বুনো ফুলে। যে জীবনকে দেখিনি, যাপন করিনি, সেইসব ধুলোমাটির জীবনের জন্য মনকেমন করে, কত কিছুই তো বয়ে গেল দৃষ্টির সামনে দিয়ে, কত ক্ষণিক সম্পর্ক চেনা থেকে অচেনা হয়ে গেল, আমি পান্থজন দাঁড়িয়ে রইলাম পথের বাঁকটিতে, জানি না যে দু-পা এগিয়ে বাঁক ঘুরলে কোন চমক অপেক্ষা করে আছে, এ দৃশ্যকাব্য মিলনান্তক না বিয়োগান্তক… প্রতিক্ষণের যাপনটুকু অনুভব করতে করতে যেমন শৈবালদাম ভেসে চলেছে অনন্তের দিকে, তেমনই নিয়ত দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে যাচ্ছি আমরাও।

আরও পড়ুন: বাংলা সাহিত্যে ‘হাতি’

বেশিরভাগ দিনই হাঁটতে হাঁটতে চলে যাই দূরে নদীর কাছে, গঙ্গার ঘাটে গিয়ে বসি কিছুক্ষণ, আসা-যাওয়ার মাঝে এই পড়ে পাওয়া দুচার মুহূর্ত কুড়িয়ে ধুলো ঝেড়ে যত্ন করে তুলে রাখি বুক পকেটে, অনর্গল স্রোতের যাওয়া আসা দেখি, নানা বয়সের মানুষ স্নান করতে আসে তাদের বিচিত্র জীবন ট্যাঁকে গুঁজে, চেয়ে চেয়ে দেখি, ধর্ম-অধর্ম পাপ-পুণ্য নিয়ে তারা একবুক জলে নামে, ডুব দেয়, সাঁতার কাটে গহীন জলে, জলের কণা ছিটিয়ে ভেসে থাকার চেষ্টা করে জীবনসমুদ্রে, আমি ঘাটের কালো হয়ে আসা প্রাচীন শ্যাওলা ধরা ঠান্ডা সোপানে বসে দেখি তাদের অবগাহন, তারা মন জড়ো করে গঙ্গামাটি তুলে পিতলের ঘটিটি মাজে, চকচকে করে তোলে… আমি মনে মনে ভাবি, আহা অমনটি যদি নিজের মনকে চকচকে করতে পারতাম, নিজের তাবৎ গ্লানি-অসূয়াগুলি যদি ধুয়ে নিতে পারতাম ভোরের আলোর স্রোতে… দূর থেকে মৃদুমন্দ স্বরে গত জন্মের স্মৃতির মতো হরিনাম ভেসে আসে, নগর সংকীর্তনের দল বেড়িয়েছে, মন্দিরের দিক থেকে শোনা যাচ্ছে ঘণ্টাধ্বনি, এসবের মধ্যেই কখনও স্নানার্থীদের  আটপৌরে জীবনের টুকরো টুকরো গল্প শুনি কান পেতে, সবটাই আমার কাছে এক বিচিত্র জীবনের কাহিনি মনে হয়, সবাই মিলে কি এক মহাকাব্যের আদল গড়ে তুলছে মহাবিশ্বে… অবাক বিস্ময়ে শুধু শুনি আর দেখি। স্রোত বয়ে চলে ধ্যানী যোগীর মগ্নতায়, অনন্ত জীবনের মতো শুধু যাওয়া আসা চলতে থাকে আর চলার টুকরো টুকরো ছাপ পড়ে থাকে ঘাটের সিঁড়িতে, আমাদের ক্লেদ-কাদামাখা পদচিহ্ন, যে জীবন আমরা কাটাতে আকাঙ্ক্ষা করেছিলাম, যে জীবন আমরা কখনোই কাটাতে পারলাম না, সেই মহাজীবনের প্রত্যাশায় এই প্রাত্যহিক শুধু স্রোতে ভাসা বিরামহীন, শ্যাওলা জলজ দামের মতো জীবন, যে জীবন মহাকালের নিয়ন্ত্রণাধীন, আমরা ভাবি এ আমাদেরই অক্ষয় কীর্তি, মহাকাল ভেজা কাপড় দিয়ে স্লেটের খড়িমাটি মুছতে মুছতে বলে, কোথায় তোমার অক্ষয় কীর্তি? ‘হরতি নিমেষাত-কালঃ সর্বম’… 

ক্রমে সকাল হয়ে আসে, প্রাগৈতিহাসিক পৃথিবী-যন্ত্রের কলকব্জা নড়াচড়া শুরু করে একটু একটু করে, কীট-কোলাহলে ডুবে যায় এক অলৌকিক আত্মমগ্ন ভোরবেলা, আত্মশুদ্ধির আরেকটি সুযোগ, আমাদের সত্যিকথার আলোচালের জীবন, ঘাসফুল-দূর্বার নত জীবন, আজন্ম যত্নের আহা জীবন, আলো-ছায়ার পুণ্য-কলুষের পৌষ ফাগুনের পালা।

ক্রমশ…

অলংকরণ লেখক

নিবন্ধটির বাকি অংশ পড়তে ক্লিক করুন…
জগদর্শন কা মেলা (পর্ব ১)
জগদর্শন কা মেলা (পর্ব ২)

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *