যতীন দাস এবং ১৩ সেপ্টেম্বর, ১৯২৯

শুভ্রাংশু রায়

ভারতীয় স্বাধীনতার ইতিহাসে ১৩ সেপ্টেম্বর তারিখটি যে গুরুত্বের এবং মর্যাদা সহকারে পালনের দাবি রাখে বাস্তবে তার কোনও কিছুই যে হয়নি, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। যতীন দাস বা যতীন্দ্রনাথ দাস আজও সেই অর্থে স্বীকৃত নন। স্বীকৃতি নেই তাঁর আত্ম উৎসর্গের এই দিনটির। সমসাময়িক উচ্চ কংগ্রেস নেতৃত্ব একমাত্র সুভাষচন্দ্র বসু বাদে কেউ যতীন দাসের এই আত্মদানের মর্যাদা দেননি। যদি আমরা ইতিহাসের পাতা ফিরে দেখি, তাহলে দেখতে পাবো ১৯২৯ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে লাহোরের জেলে, অন্যান্য ভারতীয় কয়েদির সঙ্গে যতীন দাস অনশন শুরু করেন।

আরও পড়ুন: নবমী নিশি

ইউরোপীয় বন্দিদের মতোই ভারতীয় রাজনৈতিক বন্দিদেরও জেলে সম-অধিকার দিতে হবে– এই দাবিতেই অনশনের শুরু। ব্রিটিশ শাসনে জেলবন্দি ভারতীয়দের অবস্থা ছিল শোচনীয়। দিনের পর দিন তাঁদের জামাকাপড় পরিষ্কার করা হত না, রান্নাঘরে ইঁদুর আর আরশোলা ঘুরে বেড়াত এবং খাবার মুখে তোলার যোগ্য ছিল না। কোনও রকমের বইপত্র, খবরের কাগজ অথবা লেখার জন্য কাগজ-কলম তাঁদের সরবরাহ করা হত না। অথচ ব্রিটিশ বা অন্যান্য ইউরোপীয় বন্দিরা এই সমস্ত সুযোগ পেতেন।

১৩ জুলাই ১৯২৯ থেকে যতীন দাস লাগাতার ৬৩ দিন অনশন করেন। কারারক্ষী এবং জেল কর্তৃপক্ষ তাঁর এবং তাঁর সঙ্গীদের এই অনশন ভঙ্গ করার সমস্তরকম চেষ্টা করে। কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়। বাধ্য হয়ে জেল কর্তৃপক্ষ তাঁর বিনা শর্তে মুক্তির সুপারিশ করে, যা ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ নাকচ করে এবং যতীন দাসকে শর্ত সাপেক্ষ জামিনে মুক্ত করার প্রস্তাব দেয়।

আরও পড়ুন: ‘বেহালা জনপদের ইতিহাস’ গড়ার কারিগর: প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধার্ঘ্য

১৩ সেপ্টেম্বর ১৯২৯-এ যতীন দাস মারা যান। তাঁর অন্তিম যাত্রার নেতৃত্ব করেন বিশিষ্ট মহিলা বিপ্লবী নেত্রী দুর্গাবতি দেবী (ইনি দুর্গা ভাবী নামে বেশি পরিচিত)। লাহোর থেকে ট্রেনে যতীন দাসের মরদেহ কলকাতায় আনা হয়। বিপ্লবীকে শেষশ্রদ্ধা জানাতে হাজার হাজার মানুষ সেইদিন স্টেশনে ভিড় করেছিলেন। স্টেশন থেকেই প্রায় দু’মাইল লম্বা বিরাট মিছিল করে মরদেহ শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোসের নেতৃত্বে যতীন দাসের মরদেহ শ্মশানে পৌঁছয় এবং তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। প্রশ্ন জাগে, আমরা ভারতবাসী আত্মবলিদানের ৮৯ বছর পর যতীন দাসকে কতখানি স্মরণে রাখতে পেরেছি?

লেখক সোনারপুর মহাবিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক

Facebook Twitter Email Whatsapp

4 comments

  • Debashis Majumder

    Salute. Enlightening article.

  • Dr. Bratati Hore

    ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক অনন্য সাধারণ সংগ্রামীর আত্মবলিদান এর কাহিনী নতুন ক’রে উজ্জীবিত করুক আত্মবিস্মৃত এই জাতি কে । ধন্যবাদ লেখক শ্রী শুভ্রাংশু রায়কে ।

  • Sri Nabarun Chakraborty

    ভারতীয় ইতিহাসে যতীন দাস একমাত্র এত দীর্ঘ দিন অনশন করে মৃত্যু বরণ করেছিলেন।
    ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের বিপ্লবীদের আমরা ভুলব না যতই বলি কিন্তু কত জনকে মনে রাখতে পেরেছি ?

  • Prasenjit Pal

    খুব সুন্দর লেখা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *