জয় হো…

গৌতম দে

আজ ১৫ আগস্ট। ১৯৪৭ সালের এই দিনে আমাদের দেশ মানে অখণ্ড ভারতবর্ষ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। স্বাধীনতা সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাস আমরা কমবেশি সকলেই জানি। চরমপন্থী বিপ্লবীদের আত্মদান যেমন ছিল তেমন নরমপন্থীদের আন্দোলনের কথা আজও স্মরণ করি। শত-শত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমাদের দেশ যে নিজস্বতা অর্জন করতে পেরেছে, সেই কণ্টকাকীর্ণ পথে অনেক অনেক বিপ্লবী বীরযোদ্ধাকে হারিয়েছি আমরা। ক্ষুদিরাম বসু, প্রফুল্ল চাকী, বিনয়-বাদল-দীনেশ, প্রীতিলতা ওয়াদেদার, মাতঙ্গিনী হাজরা, সূর্য সেন… এমন কতশত অজানা স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নামও আমরা জানি না। তাঁরা হয়তো এখনও অনেকেই বেঁচে আছেন। এই দেশের কোথাও না কোথাও। আমরা তাঁদের খোঁজও রাখি না।

আজ ১৫ আগস্ট। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মিলিত আত্মবলিদান বৃথা যায়নি। সেইসব বীর শহিদকে আজ স্মরণ করার মধ্য দিয়ে আজকের নব্য নেতানেত্রীরা জাতীয় পতাকা উত্তোলন করবেন। ভালো ভালো কথা বলবেন। বিভিন্ন পাড়ায় পাড়ায়। মহল্লায় মহল্লায়। মুহুর্মুহু হাততালি কুড়িয়ে নেবেন। শুধু কি এইটুকু প্রাপ্য আম-নাগরিকের?

আরও পড়ুন: স্বাধীনতা আন্দোলনে মুর্শিদাবাদ

এইটুকুতে আমজনতা ধন্য ধন্য হবেন। সারাদিন মাইকে তারস্বরে দেশাত্মবোধক গান বাজবে। সারে জাহাঁ সে আচ্ছা হিন্দোসিতাঁ হমারা…।

তারপর বাড়িতে মাংসভাত। দুপুরে ভাতঘুম।

জাতীয় সংগীতের মূর্ছনায় জাতীয় পতাকা মেঘ রোদ্দুর বৃষ্টিতে জ্বলজ্বল করবে সারা দিনমান। মায়ের হাতে তালপাতা পাখার মতো পতপত করে বাতাসে আন্দোলিত হবে। গভীর অন্ধকার নেমে আসবে একসময়ে। তবুও আন্দোলিত হবে।

মায়েরা জেগে আছেন যেন সারারাত! সন্তানরা নিশ্চিন্তে ঘুম যায়।

সত্যি কথা বলতে কি, প্রকৃত অর্থে নিশ্চিন্তে ঘুম যাওয়ার দিন কি আছে আর? অনেক আগেই উবে গেছে জনজীবন থেকে। কেউ আর নিশ্চিন্ত জীবনযাপনের কথা ভাবতেই পারছেন না। অথচ স্বাধীন ভারতে আমরা বসবাস করি। স্বাধীন নাগরিক আমরা। বাক্‌-স্বাধীনতায় অদৃশ্য লাগামের শেকল মাথার ওপর ঝনাৎ ঝনাৎ শব্দে পাক মারছে।  চারিদিকে ‘গেল’ ‘গেল’ ‘নাই’ ‘নাই’ রবের বহিঃপ্রকাশ।

১২টার ঘণ্টি রাতে বাজলেই দেশের স্বাধীনতা ৭৫ বৎসরে পা দেবে। হয়তো দেশজুড়ে সারাবছর বর্ষপূর্তি উৎসব পালিত হবে। ঘোষণাও হয়ে যাবে। 

আজ ১৫ আগস্ট। আজকের কিশোর-কিশোরীরা পতাকা তুলতে মাঠে যাবে। বিভিন্ন ক্লাব বিপুল আয়োজন করবে। নেতা নেত্রী থেকে অঞ্চলের প্রবীণ নাগরিকরা বক্তব্য রাখবেন। ভালো ভালো কথা বলবেন। কেউ কেউ বলবেন, বীর বিপ্লবীদের বহু লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিল দেশের আকাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা। অনেক মানুষের ত্যাগ এবং শহিদের মিলিত প্রচেষ্টায় এই স্বাধীনতা আমরা পেয়েছি। তাঁদেরকে আমরা স্মরণ করব। আভূমি প্রণাম করব।  আমরা সমস্বরে গেয়ে উঠব জাতীয় সংগীত। 

তারপর জিলিপির আনন্দে হইহই করে উঠবে পাড়া। বিভিন্ন অঞ্চল। বিভিন্ন মহল্লা। এইদিন যেহেতু বিশেষ দিন সেহেতু মিষ্টির কারবারিরা জিলিপি বানায় বেশি বেশি করে। তাছাড়া কাকতালীয়ভাবে যত দিন যাচ্ছে, এই জিলিপির প্যাঁচপয়জারের মতো মানুষের জীবন খুব জটিল হয়ে যাচ্ছে। বেঁচে থাকায় জটিলতার দাগ ফেলেছে। জাত-পাত-ধর্ম সব যেন হামলে পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবনযাপনে। এ কথা আজ অকপটে বলা যেতে পারে।

তো যা বলছিলাম। ক্রমে ক্রমে সেই কিশোর এবং কিশোরীরা আধপেটা খেয়ে বড় হবে। মিড-ডে মিলের লোভে ইস্কুলে যাবে। পড়াশোনাতে তার বড় আগ্রহ। মা জানে। বাবাও জানে।

মা পাঁচবাড়ি কাজ করে। বাবা হয়তো রিকশা চালায়। নতুবা মুনিষ খাটে। নতুবা আনাজ বেচে। কিংবা হকারি করে।

সন্তানরা স্বপ্ন দেখে। পাহাড়ের মতো মাথা উঁচু করে বাঁচবে এই স্বাধীন দেশে। সে এই স্বাধীন দেশের নাগরিক। বাঁচতে চায়। সেই ভাবনায় পেয়ে বসে তাকে। সে একটু একটু করে বড় হয়। যুবক হয়। যুবতী হয়। ইস্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজে যায়। কলেজও একসময় পেরিয়ে যায়। তারপর? তারপর তার চোখের সামনে ভেসে ওঠা স্বপ্নগুলো ভাঙে। ভাঙতে থাকে। ভয়ংকর এক আঁধার নেমে আসে। চাকরি চাই। কর্মসংস্থান চাই।

আরও পড়ুন: গীতিকার টানে…

কোমর ঝুঁকে পড়া পাঁচবাড়ি কাজ করা মায়ের চোখে জল। সেই চোখের জল লুকাতে লুকাতে মা হয়তো নিজেকে চুপিচুপি বারবার প্রশ্ন করে, লেখাপড়া শিখিয়ে কী লাভ হল?

মা জানেন না লাভ লোকসানের গপ্পো। কেবলই তার মনে হয়, লোকসান আর লোকসান। আমজনতার কাছে লাভ বলতে দুই হাত পেতে বসে থাকা। দুয়ারে বিভিন্ন প্রকল্প নিয়ে ভাবিত জনপ্রতিনিধিরা। বিভিন্ন প্রকল্পের ‘খুঁড়োর কল’ ঝুলিয়ে রেখে আজ আমজনতাকে ভিক্ষুকে পরিণত করেছে। অথচ চাকরি আছে বহু শূন্যপদে। যাঁরা চাকরি পাচ্ছেন, তাঁরা ব্যাকডোর দিয়ে ঢুকছেন। রাশি রাশি টাকা ঘুস দিচ্ছেন। আজ দিনের আলোর মতো সেসব পরিষ্কার। সবাই জানেন সে কথা। জীবনের প্রথম পর্বে বেড়ে ওঠা সেইসব যুবক যুবতীরা দেখছেন। দেখছেন চিকিৎসা নেই। জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি আজ আকাশছোঁয়া। গৃহস্থের ঘরের চুল্লিগুলো আজ শ্মশানের চুল্লিতে পরিণত হয়েছে। সারাক্ষণ জ্বলছে। শরীর থেকে বেরিয়ে আসা রাগগুলো যেন সর্বক্ষণ দাউদাউ করছে। কেউ দেখতে পারছে না। দেখতে পেলেও কেউ কিছু বলতে পারছে না।

আজ ১৫ আগস্ট। বরং মাংসভাত খাওয়ার দিন। পেটে গামছা বেঁধে রাখার দিন। ৩৬৫ দিনের একটি দিন মাত্র। জয় হো…।

Facebook Twitter Email Whatsapp

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *