জয়া মিত্রের ‘যাত্রাপুস্তক’

রাহুল দাশগুপ্ত

শৈব্যা ছিলেন মহাদানী রাজা হরিশ্চন্দ্রের স্ত্রী। তাঁদের পুত্রের নাম রোহিতাশ্ব। একবার হরিশ্চন্দ্র ভুল করে বিশ্বামিত্রের তপস্যায় বিঘ্ন ঘটান। বিশ্বামিত্রকে প্রসন্ন করতে রাজা হরিশ্চন্দ্র নিজের সমস্ত রাজ্য ও ধন দান করেন এবং দানের সঙ্গে নিজে উপযাচক হয়ে দক্ষিণা হিসাবে সাত সহস্র স্বর্ণমুদ্রা দিতেও প্রতিশ্রুত হন। প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করতেই তিনি স্ত্রী শৈব্যা ও শিশুপুত্র রোহিতাশ্বকে চার সহস্র স্বর্ণমুদ্রায় বিক্রি করে দেন কাশীর এক ব্রাহ্মণের কাছে। তারপর তিনি নিজেকে কাশীর শ্মশানপাল চণ্ডালের কাছে বিক্রি করে বাকি তিন সহস্র স্বর্ণমুদ্রা সংগ্রহ করেন। ওই চণ্ডাল রাজাকে শ্মশানের ডোমের কাজে নিযুক্ত করে। চণ্ডালের পালিত শূকরকুলের পরিচর্যাও করতে হত তাঁকে। রোহিতাশ্ব একদিন ব্রাহ্মণের পুজোর ফুল সংগ্রহ করতে গিয়ে সাপের কামড়ে মারা যায়। অসহায় শৈব্যা তাকে দাহ করার জন্য শ্মশানে নিয়ে গেলে হরিশ্চন্দ্র মৃতদেহের কর আদায় করতে তাঁর কাছে আসেন। শৈব্যা ও হরিশ্চন্দ্র একে অপরকে চিনতে পারেন এবং শোকের সেই চরম মুহূর্তেই তাদের দুঃখের অবসান ঘটে। রোহিতাশ্বও জীবন ফিরে পায়। এই মিথকে অবলম্বন করেই জয়া মিত্র লিখেছেন ‘যাত্রাপুস্তক’ উপন্যাসটি।

আরও পড়ুন: ভোজপুরি বিতর্ক: হিন্দি জাতীয়তাবাদ এবং আরও কিছু প্রাসঙ্গিক আলোচনা

গোটা কাহিনিটিকেই বলা হয়েছে শৈব্যার দৃষ্টিকোণ থেকে, চৈতন্যপ্রবাহ রীতিতে। দেশের রানি ছিলেন শৈব্যা। কোনওকিছুর অভাব ছিল না তার। পুরুষ-নারী নির্বিশেষে সবাই তখন তাঁর অনুগত প্রজা। আখ্যানের শুরুতে শৈব্যা রানি হিসাবে আবার নিজের প্রতিষ্ঠা ফিরে পেয়েছেন। কিন্তু অতীতের গ্লানিকে কিছুতেই ভুলতে পারছেন না তিনি। তার মনে হয়, অতীতের ওইসব ঘটনা তার জীবনে নয়, অন্য কারও জীবনে ঘটেছে। যাবতীয় রাজকীয়তার অসাড়তাকে বুঝতে পারেন তিনি। মনে হয়, “অকারণ বস্তুর ভার, আড়ম্বরের অর্থহীন বাহুল্য দিয়েই কি তাহলে ক্ষমতাশালীকে চিহ্নিত করা যায়? হৃদয়হীনতা দিয়ে? হঠাৎ করেই রানি থেকে নিছক এক নারীতে পরিণত হন তিনি। শিশুপুত্র সহ বিক্রি হয়ে যান চার সহস্র স্বর্ণমুদ্রায়। এক পুরুষের প্রতি অপর পুরুষের প্রতিজ্ঞা রক্ষার জেরে ‘দাসী’ বলে ঘোষিত হন তিনি। নিজের পুত্র রোহিতাশ্ব ছাড়া আর কেউ তখন সেই একা নারীর পাশে দাঁড়ায়নি। এই দুর্ভাগ্য শৈব্যার জীবনে সমান্তরাল দু’টি অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়। একদিকে এই পুরুষশাসিত সমাজের স্বরূপটিকে চিনতে পারেন তিনি। অন্যদিকে সেই সমাজ যখন তাঁকে অসম্মানে, গ্লানিতে, লজ্জায় পিষে দিতে চাইছে, তখন রোজ একটু একটু করে আরও বেশি করে মা হয়ে উঠতে থাকেন শৈব্যা। সন্তানের সঙ্গে এক নিবিড় বন্ধনে জড়িয়ে যান তিনি এবং এই বন্ধনই হয়ে ওঠে তাঁর কাছে আত্মরক্ষার একমাত্র উপায়।

অস্বাভাবিক উচ্চমূল্য দিয়ে শৈব্যাকে কিনে নেন এই ব্রাহ্মণ, পদ্মমাধব। শিশুটিকে তিনি সঙ্গে নিতে চাননি, অপ্রয়োজনীয় বলে বাতিল করে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শৈব্যার অনমনীয় মনোভাব শেষপর্যন্ত তাঁকে বাধ্য করে শিশুটিকে গ্রহণ করতে। এক অভিশপ্ত জীবন শুরু হয় শিশুটির। মা ও সন্তানকে দু’বেলা পেট ভরে খেতে দেওয়া হতো না ব্রাহ্মণের ঘরে। শৈব্যা নিজে না খেয়ে নিজের খাদ্যের তিন-চতুর্থাংশ তুলে দিতেন রোহিতাশ্বের মুখে। মনে মনে তিনি ভাবেন, দানবীর সত্যরক্ষাকারী মহারাজ হরিশ্চন্দ্রের গুণকীর্তনে সারা আর্যাবর্ত মুখর। কিন্তু সেই ধর্মাত্মা সত্যবাদী হরিশ্চন্দ্রের কোনও সত্য ধর্ম, কোনও দায়িত্ব কি ছিল না নিজ সন্তানের প্রতি? হরিশ্চন্দ্র তাঁর মহত্ব ও উদারতা দেখিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেয়েছেন ঠিকই। কিন্তু তার এই আচরণ এভাবেই প্রশ্নচিহ্ন রেখে গেছে। গোটা দেশের শিরোপা জুটলেও নিজের স্ত্রী ও সন্তানের চোখে কোথায় নেমে গেছেন তিনি, কতখানি দায়িত্বহীনের মতো আচরণ করেছেন তাঁদের সঙ্গে, এটাই যেন ফুটে উঠেছে শৈব্যার ভাবনায়। এভাবে নিজের মনুষ্যত্বকে খুইয়ে মহত্ব অর্জনের যে প্রয়াস, সেই মহত্বের অসাড়তা ও অন্তঃসারশূন্যতাই যেন তুলে ধরতে চেয়েছেন তিনি।

আরও পড়ুন: পঞ্চাশটি ঝুরোগল্পের ডালি ‘তরুণিমার কোনও অসুখ নেই’

শৈব্যা তাই প্রশ্ন তুলেছেন, ‘ধর্মসাক্ষী করে যার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণ করা হয়েছিল তাকে গৃহপালিত পশুর মতো সর্বসমক্ষে এনে মূল্য নির্ধারণ করে বিক্রয় করা হলে ধর্ম রক্ষিত হয়? সর্বার্থে পালনীয় যে নাবালক সন্তান তাকে অনাথের ন্যায় ত্যাগ করলে অধর্ম হয় না? নারী ও শিশু, দুর্বল ও অধিকারহীনকে পীড়ন করে দুই উচ্চবর্ণ, রাজা ও ব্রাহ্মণ নিজেদের মধ্যে জ্ঞান ও সত্য রক্ষার খেলা খেললে তাকেই কি তবে ধর্ম বলে?’ শৈব্যা দেখেন যে সকল কাজের জন্য শাস্তি প্রাপ্য বলে মনে হয়, সেই কাজগুলির জন্য উচ্চবর্ণের ক্ষমতাশালী ব্যক্তিরা কীভাবে পরস্পরের প্রভূত প্রশংসা করেন। দানবীর বলে যারা উচ্চ প্রশংসিত হন প্রকৃতপক্ষে কী দান করেন তাঁরা? নিজেদের ঔদার্যের অহমিকা পূরণের জন্য তাঁদের প্রতি নির্ভরশীল দুর্বলতর জনদের ঠেলে দেন সীমাহীন দুঃখে লাঞ্ছনায়। এবং অন্যদের পীড়ন করে আত্মত্যাগ করার গর্বে তাদের চিত্ত এমন পরিপূর্ণ থাকে যে সাধারণ মানবীয় গুণগুলি কখনও তাদের ভিতরে প্রবেশ করতে পারে না।

একদিকে ক্ষত্রিয় দানবীর রাজা, অন্যদিকে ধার্মিক ব্রাহ্মণের মুখোশ খুলে দিতে চেয়েছেন শৈব্যা। ব্রাহ্মণ পদমাধব প্রভু ও অন্নদাতা হিসাবে নিজের প্রভুত্ববোধকে উপভোগ করতেন। ধর্ম নয়, বিষয়বুদ্ধিই তাঁর কাছে সবসময় প্রাধান্য পেত। আপাতভাবে তিনি ছিলেন উদাসীন, কিন্তু ভেতরে ভেতরে আসক্ত। পুরুষের এই দ্বিচারিতাকে খুব কাছ থেকে সেইসময় দেখেছেন শৈব্যা। সকলের কাছে তিনি সম্মানিত হতেন, কিন্তু নিজগৃহে প্রচুর থাকা সত্ত্বেও একটি নারী ও একটি শিশুকে ইচ্ছা করেই অর্ধভুক্ত, ক্ষুধার্ত রাখতেন। এর জন্য কোনও ঋষি বা রাজা কখনও তাকে ভৎসনা করেননি। এই ব্রাহ্মণের জন্য উঁচু শাখা থেকে অছিন্ন ত্রিপত্র সংগ্রহ করে আনতে হয় রোহিতাশ্বকে, তখন তার কোমল চামড়ায় বিল্ববৃক্ষের দীর্ঘ কাঁটা বেঁধে। শৈব্যার মনে হয়, বারে বারে পুরুষের তপস্যা ও ধার্মিকতার মূল্য কেন নারী ও শিশুদেরই দিতে হয়? যেসব ভয়ংকর বিপদ আমাদের ঘটেছিল, যা প্রকৃতপক্ষে দুই উচ্চবর্ণ পুরুষের আত্ম-অহমিকাজাত বিরোধের ফল, তা স্বাভাবিক ছিল না। বরং নিম্নবর্ণের গোপালকের মধ্যে মায়াদয়া ছিল, গাভীগুলির সঙ্গে মৃদুস্বরে সে কথা বলত।

সেই লাঞ্ছিত, বিড়ম্বিত জীবনেরও বর্ণনা দিয়েছেন শৈব্যা। যেন এক বন্দিশিবিরে প্রবেশ করেছিলেন তিনি। ভুলতে চেষ্টা করছিলেন নিজের অতীতের পরিচয়। একজন পরিচারিকার কাছেও কৃপার প্রার্থী হয়ে উঠেছিলেন। আর দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরছিলেন রোহিতাশ্বকে। শৈশবেই বৃদ্ধ হয়ে গেছিল রোহিতাশ্ব, সবসময় তার মনের মধ্যে থাকত আতঙ্ক ও বিরাগ। মা ও সন্তানের জীবনে অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তার অভাব সর্বগ্রাসী হয়ে উঠেছিল। আর ছিল প্রচণ্ড ক্ষুধা। শৈব্যার ভাষায়, “ক্ষুধা যে মানুষকে কত অস্থির করে, চিন্তাশক্তিকে কীভাবে হরণ করে নেয়, কীভাবে মানুষকে তার আত্মসম্মান বিসর্জনে বাধ্য করে, এইসব আমি কখনও জানতাম না। সম্ভ্রান্ত, সম্পন্ন লোকেদের কাছে ক্ষুধা যেমন অশালীনতা, গোপন করার বস্তু, দরিদ্র মানুষদের কাছে তা নয়, ক্ষুধার প্রত্যক্ষ তাড়নাই তাদের জীবনযাত্রার মূল চালিকাশক্তি। সাত বছরের রোহিতাশ্ব প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে থাকত, কিন্তু মায়ের অবস্থা ভেবে ক্ষুধানিবৃত্তি হয়েছে দেখিয়ে মায়ের সঙ্গে ছলনা করত।

রোহিতাশ্ব যেদিন মারা যায়, সেদিনও পদ্মমাধবের হৃদয়হীনতাকে ভুলতে পারেন না শৈব্যা। রোহিতাশ্বের আসতে দেরি হয়, তার খোঁজে শৈব্যা যেতে চাইলে পদ্মাধবের কাছে তা মা-পুত্রের ছলচাতুরি বলেই মনে হয়। নিজের কপট মনের বিচার থেকেই তিনি বলে ওঠেন, তাঁকে প্রতারিত করতে চাইছে মা-পুত্র। মুক্তিপণ না দিয়ে শৈব্যা কোথাও যেতে পারবে না। শৈব্যা প্রথমে হরিশ্চন্দ্র, পরে পদ্মমাধবের মধ্য দিয়ে পুরুষতন্ত্রের স্বরূপকে চিনতে পারেন। কিন্তু মাতৃহৃদয়কে কেউ ঠেকাতে পারে না, তিনি পুত্রের খোঁজে বার হন এবং রোহিতাশ্বের প্রাণহীন দেহটি আবিষ্কার করেন। তাঁর জীবনের একমাত্র অবলম্বনটিও এভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। মায়ের মনে হয়, বারেবারে ওই শিশুসন্তানের কোমল করুণ মুখখানি তাকে অশেষ শক্তি দিয়েছে স্থির থাকার জন্য, ধৈর্য রাখার জন্য। নতুন জীবন ফিরে পাওয়ার পর শৈব্যার তাই মনে হয়, “জীবনকে বিশাল ব্যাপ্ত প্রবাহে, রুদ্ররূপে যে দেখেছে, সে জানে জীবনের অর্থ কত বড়।

আরও পড়ুন: ‘বন্ধুত্ব’, পোকেমন যাত্রার এক অনন্য শব্দ

জয়া মিত্রের ‘যাত্রাপুস্তক’ এমন এক প্রান্তিক নারীর কাহিনি পুরুষ যার ভাগ্য নিয়ে ইচ্ছামতো খেলা করেছে। কিন্তু এই নারীর ভেতরে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে, প্রতিবাদের জন্ম হয়েছে তাঁর হৃদয়ে, তিনি দাম্পত্য ও রাজপ্রসাদের আপসে প্রত্যাবর্তন করলেও, তাঁর অন্তর অভিজ্ঞতার আগুনে পুড়ে আমূল পরিবর্তিত হয়েছে, জন্ম হয়েছে এক নতুন সত্তার। মা ও সন্তানের সম্পর্ককে এই আখ্যানে তীব্র আবেগে, গভীর যত্নে এঁকেছেন লেখক। একদিকে দেখিয়েছেন ক্ষমতা-ব্যবস্থার হৃদয়হীন আচরণ, অন্যদিকে তার প্রতিস্পর্ধী হিসাবে দেখাতে চেয়েছেন মানবিক সম্পর্কের সম্ভাবনাগুলিকে। একজন নারী নিজের মাতৃত্বের মধ্য দিয়েই জীবনের সার্থকতাকে অনুভব করেছে, চরম বিপদেও নিজেকে রক্ষা করতে সমর্থ হয়েছে, বেঁচে থাকার প্রেরণা পেয়েছে। এই নারীর প্রতি যত অন্যায় হয়েছে, ততো তার ভেতরে নতুন নতুন প্রশ্নের জন্ম হয়েছে।

প্রশ্নহীন আনুগত্যের বদলে প্রশ্নময় অস্তিত্বে এই যে তার বদলে যাওয়া, এর মধ্য দিয়েই আধুনিকতা প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। ব্যবস্থার শ্বাসরুদ্ধকর কারাগারেও ব্যক্তি তার অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে চলে, তার ভেতরে ছোট ছোট রূপান্তরের মধ্য দিয়ে অস্তিত্বের গতিময়তা অব্যাহত থাকে এবং একসময় সেই বন্দিত্বকে অতিক্রম করে তার আত্মানুসন্ধানই জিতে যায়, এসবও যেন দেখাতে চেয়েছেন লেখক। আর রয়েছে অনবদ্য এক গদ্যভাষা, এক নিপুণ স্থপতির মতোই যাকে ব্যবহার করেছেন জয়া, গড়ে তুলেছেন এই আখ্যানের স্থাপত্য-শরীর। এই কাহিনির নাম দিয়েছেন ‘যাত্রাপুস্তক’, যা বাইবেলিয় অনুষঙ্গকে স্মরণ করায়। আসলে এক নারীর আত্মবিষ্কারের অন্তর্গত যাত্রারই বিবরণ দিতে চেয়েছেন তিনি, যা এই নামকরণের সার্থকতাকেই বুঝিয়ে দেয়।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *