যে জীবন হরবোলা

পৌষালী চক্রবর্তী

গুহাজীবনের পর এ প্রথম শুনি
পাখিডাক ফিরি হয় অরণ্য পাহাড়ে নামা
হাড়গিলে জ্যোৎস্নার লাউফুল ভিজে যাওয়া পাড়া বেপাড়ায়

নাবাল জমির পাশে পড়ে আছে সাপেদের পথ
তামস দেউলে যার ছেড়ে গেছে দেহের খোলস
হিসহিসে ষড়ধ্বনি
ওঠে ওই হরবোলা নাভিপদ্মে প্রসবের ব্যথা

যেন কী গূঢ়ার্থ আজ ভেসে আসে কূজনে কেকায়
রাগ, ক্ষোভ, শস্য শোক
একটি অখণ্ড নাদে ব্রীড়া বিভঙ্গ রাখে
জন্ম ঢেলে ময়ূর পালকে

ভল্লমুখে গেঁথে আনি পিতার রক্ষিতা
এ আমার মাতৃঋণ
কিরাত জন্মে কেন কোঁচবক মিথুনে মেরেছি!

আরও পড়ুন: মেধাকাল

পক্ষীধ্বনি শুনে শুনে ফিরে আসি প্রাচীন রাখাল
পালের এক নির্জন গোধন
খোয়া গেছে উপত্যকার ব্যঘ্রবাথানে
এখানে বেভুল পথে এই ডাক কত অপ্রাকৃত?

আর্তনাদে পেরিয়ে যায় এইটুকু দেউলের পথে
অবিদ্যারূপিণী দেবী পুজো পায় নৃমুণ্ডে
দেহমোচনের শেষ; মৎস্যগর্ভ ঘিরে ঘিরে মেঘের সঙ্গম
অস্ত্যার্থে হরবোলা তুঙ্গ ভৃঙ্গে বলে গেল
আমার কিরাত শিশু জন্ম নেবে
কররেখা জুড়ে যার পিতৃঘাতী শ্লোক।

আমাদের দেশে এক হরবোলা আছে
সে অতি ইমানদার, বিড়ি ছাড়া খাদ্য জোটে না
অধিকন্তু গাছতলা
তার মধ্যে জন্ম দেয় বাঞ্ছাকল্পতরু

প্রতিটা শিশুর জন্মে
হাঁসিলের মতো সে ভেসে ভেসে আসে
ঘরের দাওয়ায় বসে পাখিডাক ডেকে তার স্বস্তিবাচন
ধানমাঠে উড়ে যায়

তানসেন! এ ঘোর শ্রাবণ মাসে
কুহুটির অকালবোধন?

তুমি সে ধ্বনিটি বোঝ?

‘ভাত দাও গো মা জননী’
এমন বৃষ্টিদিন
এ অতি সুফলা দেশ, কেন ওকে অন্নচিন্তা দিলে!

আরও পড়ুন: দাম্পত্য বিষয়ক খত

সে এক প্রাচীন দিন
অবধ্য কবুতর, পায়ে চিঠি, উড়ে চলে শত্রুসকাশে
পাখিডাক শোনা গেলে যুদ্ধ শিবিরে ওড়ে সফেদ নিশান
রাতচরা উড়ে গেলে নগর বধূটি চলে
মাটির প্রদীপ হাতে প্রণয়ী গুহায়।

কালপেঁচা ডেকে গেল…

সে অতি আয়াসসাধ্য কুহক সংকেতে
শেল্টারে মন্থর যত মাওতরুণীরা
ঝটপট ক্যামোফ্লেজ
গমবনে লুঠ হবে সরকারি বুলেট

এত কাছে পেঁচাডাক!
নির্ঘাত এ শিবিরে হুড়াল ঢুকেছে
কে কাকে আস্থা রাখে?
হরবোলা ভেবে নেত্রী
আমূল উড়িয়ে দেয়
তার ওই ক্যাসানোভা স্বামীর করোটি


কেন যে এমনতরো ঘটে!

হরবোলা ভেবে মেয়ে উঠে পড়ে সময়ের অশুভ শকটে

দখিনে অশ্বত্থসীমা
তার নীচে পোঁতা আছে ছিঁড়ে নেওয়া জিভ
পুরুষ্টু ধানের নীচে পড়ে থাকে বিসদৃশ খোবলানো স্তন
ছিন্নভিন্ন যোনি

প্রমাণের রড চাই?

পার্টিঅফিস আর সুরক্ষা সমিতি!

কণ্ঠ ছল ভাবো নাকি?

সে আসলে খোড়ো চালে ডেকে যাওয়া ধূমাবতীর কাক

আরও পড়ুন: প্রাচীন ইটের ডাকবাক্স

যে জন্মে আমি এক ক্ষেত্রসন্ধানী

মাটির অনেক নীচে অবিকৃত পোঁতা আছে তৈজসের দেহ
প্রত্নবিদ তুলে আনলে বর্ণে গন্ধে দ্যাখো তার গল্পকথা খুঁজি

যে কাঁকালে শোভা পেত মৃৎকলসী খানি
সেদিনও কি মধুতুলসী ঝোপে নাচ দুর্গাটুনটুনির?

তারা তো একত্রে আজ প্রত্ন সিন্ধুশীলে
অবোধ্য লিপি আর ভঙ্গি আত্মভোলা
অভিমান অর্থ ভুলে ক্রোধ রূপ নিলে
সে তর্জমা কণ্ঠে তোলো
দু-শালিখের দিব্যি, ওগো, সুজন হরবোলা

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *