জেলার নাম বাঁকুড়া

রামামৃত সিংহ মহাপাত্র

সূচনা পর্ব

“রাঙা মাটি, রাঙা পলাশ, রাঙা কৃষ্ণচূড়া।

রাঙামনের প্রেম দেব বঁধু, এসো হে বাঁকুড়া”

পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম জেলা বাঁকুড়া। যার সীমানা নির্ধারিত হয়েছে উত্তর ও পূর্বে পূর্ব বর্ধমান এবং পশ্চিম বর্ধমান, দক্ষিণে পশ্চিমে মেদিনীপুর, দক্ষিণ-পূর্বে হুগলি এবং পশ্চিমে পুরুলিয়া জেলা নিয়ে। জেলা হিসাবে সীমানা নির্ধারণের বহু আগেই ভূখণ্ড হিসাবে অস্তিত্ব ছিল এই অঞ্চলের। এই অঞ্চলের প্রাচীনত্ব প্রমাণ করে প্রাপ্ত পুরাতত্ত্ব এবং প্রত্নতত্ত্বমূলক নিদর্শনগুলি। অঞ্চলটির আদি বাসিন্দা ছিল একাধিক প্রোটো-অস্ট্রালয়েড ও প্রোটো-দ্রাবিড়ীয় জনগোষ্ঠীর মানুষ। ‘মহাভারত’-এ এই অঞ্চলকে সূক্ষ্ম ভূমি হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। জৈন ধর্মগ্রন্থ ‘আচারঙ্গসূত্র’য় এই অঞ্চলকে সূক্ষ্ম ও লাড়া বা রাঢ় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ‘ঐতরেয় আরণ্যক’-এ এই অঞ্চলের অধিবাসীদের অসুর বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন: পুরুলিয়ার তেলকুপিতে জলের নীচে ইতিহাস

শুশুনিয়া পাহাড়ে রাজা চন্দ্রবর্মার লিপি

প্রাচীনকাল থেকেই এখানে একটি উন্নত সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল। এর প্রমাণ পাওয়া যায় শিলাবতী, কংসাবতী, দ্বারকেশ্বর, দামোদর, গন্ধেশ্বরী, শালি, আমজোড়া ভৈরববাঁকী ইত্যাদি নদী তীরবর্তী প্রস্তর স্তর বিশ্লেষণ ও প্রাপ্ত বিভিন্ন প্রস্তর আয়ুধ ও তৈজসপত্রগুলি থেকে। এই অঞ্চলের প্রাচীনত্ব সম্পর্কে কোনও লিখিত দলিল না থাকায় আমাদের নির্ভর করতে হয় প্রাপ্ত পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলির উপর। অঞ্চলটির নদী অববাহিকায় সঞ্চিত রয়েছে আর্কিয়ান যুগের ‘নাইস’ নামে এক রূপান্তরিত শিলার স্তর। এই শিলা সুস্পষ্ট দানা বিশিষ্ট এবং স্থানে স্থানে গ্রানাইট, গ্রানাইট-গ্রানাইট ও কোয়ার্টস দ্বারা খণ্ডিত। নদীগুলির দু’পাশে এই প্রাচীন নাইস শিলা এখনও অনাবৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে কোথাও গ্রানাইট পাথরের ফাটলে, কোথাও মাকড়া পাথরের আড়ালে। এই শিলার কৌণিক রেখাগুলি ধারালো এবং গঠনগত ভাবে মজবুত হওয়ার জন্য আদিম প্রস্তর আয়ুধের এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এ ছাড়াও রয়েছে অত্যন্ত বিরল ধাতু টাংস্টেন ও তার মূল আকর উলফ্রাম ও শিলাইট।প্রাচীন আয়ুধ তৈরির উপাদানের প্রাচুর্য লক্ষ করে পুরাতাত্ত্বিকরা অনুমান করেন এর টানেই একসময়ে এই অঞ্চলে দ্রাবিড় ও অস্ট্রিক জনজাতি তাদের সভ্যতা গড়ে তুলেছিল। খুব সম্প্রতি নিকটবর্তী শিলাবতী তীরস্থান খিঁচকা, কদমায় আবিষ্কৃত হয়েছে অতিকায় মানুষের কঙ্কাল। যা এই বক্তব্যকে প্রমাণ করে। আবার গড় রাইপুরের কাছে কংসাবতী নদী উপত্যকায় পাওয়া গেছে এক যুবকের চোয়ালের ফসিল। কোন কোন গবেষক এটিকে ভারতবর্ষের প্রাচীনতম মানবঅঙ্গের ফসিল বলে দাবি করেছেন। সেই হিসাবে বাঁকুড়ার মানব সভ্যতার ইতিহাস বহু প্রাচীন। কংসাবতী নদীর শাখানদী তারাফেনির অববাহিকায় পাওয়া গেছে প্রাচীন আয়াত ছেনী, বাটালী, বালাছা, হাতকুঠার ইত্যাদি।

আরও পড়ুন: বারোভুঁইয়ার অন্যতম ভুঁইয়া চাঁদ রায়ের শান্তিপুরের রথের কাহিনি

শিলাবতী নদীর শিলাস্তর

১৯৬৫-৬৬ খ্রিস্টাব্দে গবেষক পরেশ চন্দ্র দাশগুপ্ত বাঁকুড়া জেলার শুশুনিয়া পাহাড় এবং নিকটবর্তী অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান চালিয়ে প্রাগৈতিহাসিক যুগের বেশ কিছু জীবাশ্ম এবং প্রস্তর আয়ুধ খুঁজে বার করেছেন। এর মধ্যে অন্যতম হল হস্তকুঠার, লৈভ্যাল্লোসিয়ান কৌশলে তৈরি স্ফটিক পাথরের ডিম্বাকৃতি বিশেষ ধরনের অস্ত্র। চতুষ্কোণাকৃতির হাতল-সহ ভারী ছুরি এবং চাঁছনি জাতীয় ইংরেজি ‘ইউ’ আকৃতির অস্ত্র পাওয়া গেছে। এই অস্ত্র গুলি সম্ভবত শিকার এবং আত্মরক্ষার কাজে ব্যবহার করত। মেগালিথিক সভ্যতার নিদর্শন (গবেষণা সাপেক্ষ) বীরস্তম্ভ, সতীসম্ভ, স্মারক স্তম্ভ এই অঞ্চলে প্রাচীনকাল থেকেই মনুষ্য বসতির তথ্যকে সুদৃঢ় করে।

আরও পড়ুন: ধ্বংসের দোরগোড়ায় সুন্দরবন: ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব ও আজকের বিতর্ক

শিলাবতীর শিলা

বাংলা থেকে প্রাপ্ত সর্বপ্রাচীন লিপিটির অস্তিত্ব রয়েছে বর্তমান বাঁকুড়া জেলার শুশুনিয়া পাহাড়ে। লিপিটি সম্পর্কে সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, ‘দ্য ওল্ডেস্ট ব্রাহ্মি ইনসক্রিপশন ইন বেঙ্গল’। লিপিটি সংস্কৃতে উৎকীর্ণ ব্রাহ্মি লিপির অক্ষরে লিখিত। লিপিটি, “পুষ্করণাধিপতে মহারাজ শ্রী সিঙ্ঘবর্মনঃ পুত্রস্য/ মহারাজ শ্রী চন্দ্রবর্মন কৃতিঃ/ চক্রস্বামিন দাসাগ্রোনাতি সৃষ্টঃ।” অর্থাৎ পুষ্করণার অধিপতি মহারাজ শ্রীসিংহবর্মার পুত্র মহারাজ শ্রীচন্দ্রবর্মার কীর্তি। চক্রস্বামী বিষ্ণুর দাস অর্থাৎ সেবক দ্বারা সৃষ্ট।

আরও পড়ুন: আম চাষ: ইতিহাস-বৃক্ষ ঘেঁটে

মেগালিথিক সভ্যতার নিদর্শন বীরস্তম্ভ

প্রাচীন পুষ্করণা তথা বর্তমান পখন্না শুশুনিয়া থেকে চল্লিশ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত। এখানে চন্দ্র বর্মার রাজধানী ছিল। গবেষকদের মতে, চন্দ্র বর্মা রাজপুতনার পুষ্করণার রাজা ছিলেন। এখানে এসে তাই তাঁর জন্মভূমির নামে পুষ্করণা নামে রাজ্য স্থাপন করেন। চন্দ্র বর্মার কথা জানা যায় রামপ্রাণ গুপ্ত রচিত ‘প্রাচীন রাজমালা’ গ্রন্থে— “খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতকে রাজপুতনার মরুপ্রদেশের পুষ্করণা নগরের অধিপতি চন্দ্র বর্মা সপ্তসিন্ধুর মুখ বহ্লীক প্রদেশ হইতে বঙ্গদেশ পর্যন্ত সমগ্র আর্যাবর্ত জয় করিয়াছিলেন।” ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতে, চন্দ্র বর্মার সাম্রাজ্য বিস্তৃত হয়েছিল ঢাকা ও ফরিদপুর পর্যন্ত। চন্দ্র বর্মার রাজধানী পুষ্করণা যে এক সমৃদ্ধশালী নগর ছিল তা জানা যায় লোকছড়া থেকে— “লবড়ি ছবড়ি গাঙ সিনানে যাই/ গাঙের জলে বাঁধি বাড়ি পখুরের জল খাই/ চার মাস বর্ষা পখন্না যায়/ পখন্নাতে গিয়ে দেখি দুয়ারে মরাই/ ছোট মরাইয়ে পা দিয়ে/ বড় মরাইয়ে পা দিয়ে/ রাই এসো গো ঝলমলিয়ে।” অন্যদিকে, ‘এলাহাবাদ প্রশস্তিতে’ উল্লেখ আছে চন্দ্র বর্মাকে সমুদ্রগুপ্ত পরাজিত করেন। সুতরাং ঐতিহাসিক, পুরাতত্ব ও প্রত্নতত্ত্ব গত প্রমাণ থেকে বলা অত্যুক্তি হবে না ভূখণ্ড বাঁকুড়ার অস্তিত্ব ছিল বহু প্রাচীনকাল থেকেই।

ক্রমশ…

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *