রাঢ়ের আর্যায়ণ প্রক্রিয়া

রামামৃত সিংহ মহাপাত্র 

গবেষকদের মতে, বর্তমান বাঁকুড়ার এই অংশে তথা দক্ষিণ-পশ্চিম রাঢ়ের আর্যায়ণ প্রক্রিয়া সম্পাদিত হয়েছিল জৈনদের দ্বারা। যদিও এই বিষয়ে ভিন্নমত রয়েছে। তবে একসময় যে এই অঞ্চলে জৈন ধর্মের ব্যাপক প্রচার ও প্রসার ঘটেছিল, তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে কোনও দ্বিমত নেই। এর প্রমাণ বহন করে চলেছে প্রাপ্ত জৈন পুরাতাত্ত্বিক নির্দশন, গ্রাম নাম, স্থান নাম, জলাশয় এবং গ্রামীণ সংস্কৃতিতে মিশে থাকা আচার আচরণ। জৈন ধর্মগ্রন্থ আচারঙ্গ সূত্র (1.8.3) অনুযায়ী, “Mahavira used this route for his journey and this region was called Ladha (i.e.Radha) comprising vajiabhumi (vajrabhumi) and subbhabhumi(sunmabhumi) [Jacobi 1884:84f]”. ওই ধর্মগ্রন্থ থেকে জানা যায়, মহাবীর রাঢ় দেশে দ্বাদশ বর্ষ অতিবাহিত করে ধর্মমত প্রচার করেছিলেন। ড. রামকৃষ্ণ ভাণ্ডারকর বলেছেন, “বুদ্ধ ও তাঁর শিষ্যরা ধর্ম প্রচারের ক্ষেত্রে নির্বাচন করেছিলেন বিহার ও কোশলকে, আর মহাবীর ও তাঁর শিষ্যরা নির্বাচন করেছিলেন রাঢ়ভূমিকে।” দক্ষিণ রাঢ়ের অংশ ছিল বাঁকুড়ার এই ভূখণ্ড। আচারঙ্গ সূত্রের সমসাময়িক জৈন ভগবতীসূত্রে (ভাষ্য প্রজাপতি উপাঙ্গ) বলা হয়েছে, জৈনধর্মগ্রন্থগুলিতে যেক’টি মহাজনপদের নাম পাওয়া যায় তার মধ্যে রাঢ় অঞ্চল শ্রেষ্ঠতম। এ থেকে বলা যেতে পারে, এই অঞ্চল একদা জৈন ধর্ম প্রচার ও প্রসারের উর্বর ক্ষেত্র ছিল। জৈন ধর্মগ্রন্থ ‘আচারঙ্গসূত্র’-এ রাঢ় অঞ্চলকে জনপদহীন জঙ্গলাকীর্ণ ভূখণ্ড হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। হাজারিবাগ জেলার পরেশনাথ পাহাড়ে একটি জৈনধর্মকেন্দ্র গড়ে উঠেছিল। এই পাহাড়কে জৈনরা বলেন, ‘সমেত শিখর’। এখানে নির্বাণ লাভ করেছিলেন ২০ জন জৈন তীর্থঙ্কর। এই অঞ্চলে জৈনধর্মের অভ্যুদয় সম্পর্কে ড. প্রবোধচন্দ্র বাগচী বলেছেন, “Parsha the immediate predecesser of Mahavira in the lineage of Tirthankara is associated with Champa, and in fact the most important jaina locality connected with the memory of parsha the Paroshnath hill, is in eastern India.” এই পরেশনাথ পাহাড়কে কেন্দ্র করে জৈনধর্ম প্রচারক দল রাঢ় অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় জৈনধর্ম প্রচার এবং বহুল পরিমানে জৈন তীর্থঙ্করদের মূর্তি ও মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। এদের প্রভাবেই খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতকের পর এই অঞ্চলে জৈনধর্মমত প্রচারিত হয়েছিল। যদিও মহাবীর এই অঞ্চল পরিভ্রমণের পূর্বেই পার্শ্বনাথের হাত ধরে এই অঞ্চল জৈনধর্মের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিল। তবে দক্ষিণ-পশ্চিম রাঢ়ে তথা রাঢ় অঞ্চলে জৈন ধর্মের ব্যাপক প্রসার ঘটেছিল বহুপরে। এই বিষয়ে আমরা যথাসময়ে আলোচনা করব।

আরও পড়ুন: জেলার নাম বাঁকুড়া

জৈন তীর্থঙ্কর মূর্তি

তবে একথা প্রথমেই বলে নেওয়া ভালো, রাঢ়ের সীমানা শুধুমাত্র বাঁকুড়ার ভূখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। রাঢ় নামের উল্লেখ পাওয়া যায় সিংহলি পালিগ্রন্থ দীপবংশ ও মহাবংশ, গঙ্গরাজ দেবেন্দ্রবর্মণের লিপি, রাজেন্দ্রচোলের তিরুময়লিপি,  বাকপতিমুঞ্জের লিপি, শ্রীধর আচার্যের ন্যায়কন্দলী ইত্যাদি গ্রন্থে। সীমানা নির্ধারণ করতে গিয়ে সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন, “উত্তরে মুর্শিদাবাদ থেকে দক্ষিণে মেদিনীপুর,  চব্বিশ পরগনা, পূর্বে হাওড়া কলকাতা থেকে পশ্চিমে পুরুলিয়া সাঁওতাল পরগণা।” আচার্য সুকুমার সেনের অভিমত, “রাঢ়দেশ বলতে গঙ্গার ওপারের কিছু অংশ এবং এপারে দামোদরের প্রাচীন খাত বাঁকা বল্লুকা (বেহুলা) পর্যন্ত বোঝাত।” তবে বেশিরভাগ গবেষকই অজয় ও দামোদরের উত্তরে উত্তর রাঢ়; অজয়ের পূর্বে ও দামোদরের দক্ষিণে ও পূর্বে, দু’পাশে দক্ষিণরাঢ়। বর্ধমানের দক্ষিণ মধ্য অঞ্চলকে মধ্যরাঢ় এবং বাঁকুড়ার বৃহত্তর অঞ্চলকে পশ্চিম রাঢ়ে বলে উল্লেখ করেছেন। প্রকৃতপক্ষে বলা যেতে পারে রাঢ় অঞ্চল গঠিত হয়েছে উত্তরে বীরভূমের ময়ূরাক্ষী সীমা, দক্ষিণ-পশ্চিম মেদিনীপুরের ঝাড়গ্রাম জেলা এবং পশ্চিমে পুরুলিয়া সীমান্ত নিয়ে।

এই অঞ্চলের আর্যায়ণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল অপেক্ষাকৃত পরে। এই অঞ্চলের বসতি সম্পর্কে চণ্ডীমঙ্গল কাব্য রচয়িতা মুকুন্দরাম লিখেছেন, “ব্যাধ গো-হিংসক রাঢ়/ চৌদিকে পশুর হাড়।” অর্থাৎ তখনও পর্যন্ত মূল জীবিকা পশুশিকার। পশুশিকারে গিয়ে হিংস্র পশুকে পরাজিতকারীকে বীরের মর্যাদা দেওয়া হত। পরবর্তীতে উচ্চবর্ণের মানুষেরা এই সময়ে প্রবেশ করলে তাদের সঙ্গে সংঘাত বাধে এই অঞ্চলের আদিম অধিবাসীদের। বীরস্তম্ভগুলি এই সংঘাতের চিহ্ন বহন করে চলেছে। তবে এই বীরস্তম্ভগুলি শুধুমাত্র সংঘাতের চিহ্ন ভাবলে ভুল হবে। কোনও ঘটনাকে বা দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করেও এই চিহ্নগুলির নির্মাণ করা হয়েছিল। যেমন বাঁকুড়া জেলার ইঁন্দপুর থানার বাঁশি গ্রামের বর-কণে পাথরের উল্লেখ করা যেতে পারে। কথিত, বিয়ে করে ফেরার পথে কোনও এক বর-কণে জলখাবার নিমিত্ত ওই পুকুরে নেমে আর উঠে আসেনি। এই দুর্ঘটনার সাক্ষ্য বহন করে চলেছে বর-কণে পাথর।

আরও পড়ুন: জগদর্শন কা মেলা (তৃতীয় পর্ব)

শিবথান

আবার কোনও বিজয় সূচক উৎসবকে কেন্দ্র করে এই স্মারকগুলি স্থাপন করা হত। দক্ষিণ ভারতের অনেক জায়গায় গোধন লুণ্ঠন শেষে বিজয়ীর চিহ্ন হিসাবে বেশ কিছু স্মারক পাওয়া গেছে। আবার জমির সীমানা চিহ্ন হিসাবে যে পাথরগুলি ব্যবহার করা হত, সেগুলি পরবর্তীকালে ক্ষেত্রপাল হিসাবে পূজিত হতে শুরু করে। বুধপুরে বেশ কিছু প্রস্তরস্তম্ভ পাওয়া গেছে, যেগুলোর গায়ে শূকরের যৌনমিলনের চিহ্ন রয়েছে। ঐতিহাসিকদের অভিমত, নিঃশুক্ল জমির সীমানা বোঝাতে তৎকালীন রাজারা এই স্তম্ভগুলির ব্যবহার করতেন। প্রকৃতপক্ষে প্রাপ্ত এই স্তম্ভগুলির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। তবে এগুলির মূল্যায়নের ক্ষেত্রে মনে কোনও ঐতিহাসিক সংকীর্ণতা রাখা উচিত হবে না। উদার মনে বিশ্লেষণ করলে এই স্তম্ভগুলির প্রকৃত স্বরূপ উদ্‌ঘাটন করা সম্ভব হবে। অনেক ঐতিহাসিকদের মতে, এই স্তম্ভগুলি রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের চিহ্ন বহন করে চলেছে। আবার কারও কারও মতে, প্রশাসনিক ঘোষণার চিহ্ন হিসাবে এগুলি প্রোথিত করা হয়েছিল। আবার অনেক ঐতিহাসিকের মত, মানুষের মনে যে রাজনৈতিক চেতনা জেগে উঠেছিল এবং যা থেকে আদিবাসী ক্ষমতায়নের সূত্রপাত, তার চিহ্ন হিসাবেও এগুলিকে গ্রহণ করা যেতে পারে।

আরও পড়ুন: বাংলা সাহিত্যে ‘হাতি’

লোকেশ্বর বিষ্ণু

যদি ধর্মসূত্রের সময়কাল খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ-পঞ্চম শতাব্দী ধরা হয়, তখনও পর্যন্ত বাংলা আর্যীকরণের আওতায় আসেনি। মনে করা হয়, গুপ্তযুগের উদার সময়ে ব্রাহ্মণেরা এসে পুণ্ড্র রাঢ় বঙ্গ প্রভৃতি জনপদে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেছিল। আর্যরা দেশে প্রবেশ করার পর বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে। এই ছড়িয়ে পড়াকালীন যে শুধু আদিবাসীদের সঙ্গে সংঘর্ষই হয়েছিল এমনটা নয়, নিজেদের প্রয়োজনে সখ্যতাও হয়েছিল। দুই সংস্কৃতির সঙ্গে সমন্বয় সাধনও হয়েছিল। প্রসঙ্গত, মহাদেব ছিলেন অনার্য দেবতা। তাঁকে আর্য সংস্কৃতির পরিমণ্ডলে এনে যেমন বিশেষ মর্যাদা দিয়ে অনার্যদের আপন করে নেওয়া হয়, তেমনি আর্য দেবতা বিষ্ণুর লোকায়তকরণ ঘটে। দক্ষিণ-পশ্চিম রাঢ়ের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাপ্ত লোকেশ্বর বিষ্ণুর মূর্তিগুলি এই তথ্যের সত্যতা প্রমাণ করে।

ক্রমশ…

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *