ধর্ম বিশ্বাস

রামামৃত সিংহ মহাপাত্র

ডাল্টন, রিজলি-সহ একাধিক গবেষকদের মত আর্য ভাষাগোষ্ঠী মানুষের অনুপ্রবেশের পূর্বে দক্ষিণ-পশ্চিম রাঢ়ের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বসবাসকারী আদিম অধিবাসীদের মধ্যে অস্ট্রিক এবং দ্রাবিড়ীয় জনগোষ্ঠী ছিল প্রধান। এই অস্ট্রিক জনজাতির মধ্যে সাঁওতাল, মুণ্ডা, কোড়া, শবর-লোধা প্রমুখ প্রধান এবং দ্রাবিড়ীয় জনগোষ্ঠীর অন্যতম প্রতিনিধি হিসাবে বাউরি সম্প্রদায়কে মনে করা হয়। যদিও এদের উদ্ভব সম্পর্কে নৃতাত্ত্বিকদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে।

পূর্বেই আমরা আলোচনা করেছি এই অঞ্চলের নদী উপত্যকায় বিভিন্ন জনজাতির বসতি স্থাপনের কারণ। নৃতাত্ত্বিকদের মতে, এই অঞ্চলে প্রাপ্ত বেশিরভাগ প্রস্তর আয়ুধের স্রষ্টা ছিল অস্ট্রিক জনজাতিরা। ধর্মবিশ্বাসের ক্ষেত্রে তাঁরা বেশিরভাগই যে প্রকৃতির পূজারি ছিলেন, এ-কথা বলা যেতে পারে। বৃক্ষ পূজা বা প্রস্তর পূজা ছিল তাঁদের মূল বৈশিষ্ট্য। গবেষকদের মতে, প্রস্তর পূজা মেগালিথিক সভ্যতার নিদর্শন। এমনকী মৃত ব্যক্তির সমাধির উপরে এই প্রস্তর খণ্ড প্রোথিত করার ঘটনা দেখা গেছে। দক্ষিণ ভারতের বহু জনজাতির এই ধরনের সমাধিক্ষেত্র নিয়ে গবেষণা হলেও আমাদের এই অঞ্চলে অর্থাৎ ছোটনাগপুর সংলগ্ন বাঁকুড়া-পুরুলিয়ার সমাধিক্ষেত্র নিয়ে সেরূপ গবেষণা হয়নি। তাই নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না, এগুলি সবই মেগালিথিক সভ্যতার নিদর্শন।

আরও পড়ুন: জেলার নাম বাঁকুড়া

তবে দক্ষিণ ভারতের মতো এখানকার জনজাতিদের একাধিক সমাধিক্ষেত্রে দেখা গেছে কিছু কিছু সমাধিক্ষেত্রে লম্বভাবে প্রোথিত প্রস্তর খণ্ড দেখা গেছে, আবার কোনও কোনও ক্ষেত্রে প্রস্তর খণ্ডটি শায়িত অবস্থায় থাকে। গবেষকদের ধারণা লম্বভাবে প্রোথিত প্রস্তর খণ্ডটি পুরুষের সমাধি এবং লম্বাভাবে শায়িত প্রস্তর খণ্ড রাখা হত নারীদের ক্ষেত্রে। গবেষকদের অভিমত, এই ভাবনা থেকে শিবলিঙ্গ এবং গৌরীপট্টের ধারণা এসে থাকতে পারে। বাঁকুড়া জেলায় দ্বারকেশ্বর নদীর দক্ষিণ তীরে অনুরূপ একটি সমাধিস্থল পাওয়া গেছে। বাউরি সম্প্রদায়ের মানুষেরা এই সমাধিস্থলটিকে খুব পুণ্যের জায়গা বলে মনে করে। অনেক সময় প্রস্তরখণ্ডের উপরের অংশ মানুষের মুখের বা তাঁদের ব্যবহৃত বিভিন্ন অস্ত্রের রূপ দেওয়া হত। জনজাতিদের মৃতের সমাধিতে স্মৃতি ফলক দেবার রীতি পরবর্তীকালে উচ্চবর্ণের সমাজে প্রবেশ করে। আজও অনেক উচ্চবর্ণের লোকেরা মৃত মানুষের উদ্দেশ্যে প্রস্তর খণ্ড প্রোথিত করে একটি নির্দিষ্ট দিন পর্যন্ত তাতে জল দেয়।

প্রস্তরখণ্ড দেবার এই রীতিই পরবর্তীকালে দেবতাদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ হতে থাকে। পরবর্তীতে এটি পশু তথা হাতি-ঘোড়া উৎসর্গ তথা ‘ছলন’-এ রূপান্তরিত হয়। যা উচ্চবর্ণের মূর্তিপূজার নামান্তর। প্রসঙ্গত, একটা সময় পর্যন্ত অস্ট্রিক এবং দ্রাবিড়ীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রস্তর পূজা এবং বৃক্ষ পূজার প্রচলন থাকলেও পশুছলন পূজার প্রবর্তন ছিল না। শালুই থানগুলো দেখলেই এই তথ্যের সত্যতা বোঝা যায়। ছলন হিসাবে মাটির তৈরি হাতি ঘোড়ার উৎসর্গীকরণ প্রথা এই অঞ্চলে এসেছে অনেক পরে। সম্ভবত, অশোকের কলিঙ্গ বিজয়ের পর।

আরও পড়ুন: বাঁকুড়ার লোকদেবতা লোকেশ্বর

বীরস্তম্ভ

‘সারিধরম’ ধর্মাবলম্বী আদিবাসী সাঁওতালদের দেববিশ্বাস, পুজোপদ্ধতি, লোকাচার ও লোকভাবনা হিন্দু ধর্মাশ্রয়ীদের থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। এদের মূলদেবদেবী ছ’জন। জাহের বুড়ি (প্রতীক ডাল, ঝাঁটা, হার, সলম শাঁখম বা শাঁখা), জাহের হাড়াম (প্রতীক বার্ছিহাপা বা ত্রিশূল), মারাংবুরু (প্রতীক কাপি বা টাঙ্গি), মড়েক (পাঁচজন পুরুষ দেবতা একাসনে পূজা পান, প্রতীক কাঁড়-কাঁড়বাঁশ বা তিরধনুক), তুরুইক (ছ’জন স্ত্রী দেবী একাসনে পূজা পান, প্রতীক সাগুনচিলি বা পবিত্র কলস) এবং সীমাসাড়ে (প্রতীক শুকনো পাতা)।

আদিবাসী দেবদেবীর পূজার্চনার নির্দিষ্ট স্থানকে বলে জাহের থান। এই থানে উত্তর দক্ষিণে বিস্তৃত লাইন দিয়ে ছয় দেবদেবীর নামে খঁড় দেওয়া হয়। এই খঁড়গুলি আতপচালের গুঁড়ি দিয়ে গোল করে ঘিরে দেওয়া হয়। সর্ব উত্তরে জাহের বুড়ির খঁড়, তাঁর দক্ষিণে জাহের হাড়াম ও তাঁর দক্ষিণে মারাংবুরুর খঁড়। মারাংবুরুর দক্ষিণে একটি খঁড় লাগোয়া পাঁচটি ছোট ছোট বেদিতে থাকেন পাঁচপুরুষ দেবতা মড়েকড়া এবং তাঁদের দক্ষিণে আর একটি খঁড়ে ছ’টি লাগোয়া বেদিতে থাকেন ছয় স্ত্রী দেবী তুরুইকরা। এই খঁড়ে আরও দু’টি বৃত্তাকার স্থান তৈরি হয় কোনও দুই অজানা দেবের উদ্দেশ্যে। কোনও কোনও জাহের থানে এঁদের সকলের ডানদিকে থাকেন বাঘুৎ বা সীমাসাড়ে এবং তার পাশেই আর একটি খঁড় গ্রামস্রষ্টাদের উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়। খঁড়ে নির্দিষ্ট দেবতার প্রতীকগুলি রাখা হয়।

আরও পড়ুন: রাঢ়ের আর্যায়ণ প্রক্রিয়া

পূর্বপুরুষ পূজা, মৃতের সমাধিতে স্মৃতি রাখা এই জনজাতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। অনুরূপ একটি পূর্বপুরুষ পূজার উদাহরণ হলোমাঝিবুড়ার পূজা। দুবরাজপুর গ্রামের সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর দেবতা। গ্রামের মাঝখানের বড় রাস্তার পূর্বদিকে মহন্তদের বাড়ির পাশে নিম ও শেওড়াগাছের তলায় মাঝিবুড়ার সুপ্রাচীন থান। হাতিঘোড়া এর প্রতীক। হাতিঘোড়াগুলি তিনদিকে এমনভাবে জড়ো হয়ে আছে যে, দূর থেকে দেখতে অনেকটা ইংরেজির ইউ (U)-র মতো মনে হয়।

আরও পড়ুন: ধর্ম সমন্বয়

শিবলিঙ্গ হিসাবে পূজিত জৈনচৌমুখা

আদিবাসী সাঁওতাল দেবতা হলেও পূজা দেন গ্রামের সকল সম্প্রদায়ের মানুষ। তাঁর দিন পুজোর কোনও বিধি নেই। পূজার্থী এলেই পূজা হয়। তবে বছরের চারটি নির্দিষ্ট দিনে তাঁর পূজা হয়। অম্ববতী (অম্বুবাচী, সাতই আষাঢ়), এখ্যান (পয়লা মাঘ), শ্রীপঞ্চমী (স্বরসতী পূজার দিন) এবং শালুই পূজা (মাঘের শেষ বা ফাল্গুন)-র দিন। হাঁসদা পদবিধারী সাঁওতাল এর পূজারি। মাঝি বুড়ার প্রধান ভোগ দুধ। তবে বর্তমানে চিঁড়ে, গুড়, মিষ্টি, ফল ইত্যাদি নৈবেদ্য হিসাবে দেওয়া হয়। মানত থাকলে পাঁঠাবলি দেওয়া হয়। পূজার আরম্ভ হয় বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। পূজা শুরুর পূর্বে টির ছোড়া হয়। বর্তমান পূজারির নাম জানকী হাঁসদা। তাঁর দাবি, মাঝি বুড়া তাঁদের পূর্বপুরুষ। প্রাপ্ত বংশতালিকা— ১) মাঝিবুড়া- ২) ??- ৩)??- ৪) দুর্গাবুড়া- ৫) গাঙ্গুবুড়া- ৬) ক. রজন খ. মদন গ. টেটে ঘ. গুরুচরণ>মদন>জানকী (দ্বিতীয়)। ইনিই বর্তমান পূজারি।

কোন বিদ্যাবলে তিনি দেবতা হয়েছেন, তা বলা শক্ত তবে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস তাঁর থানে মানত করলে কলেরা, বসন্ত, মহামারির প্রশমন হয়, গরু-বাছুরের অসুখ সারে। তাই তিনি এই গ্রামে পূজা পেয়ে আসছেন বহুদিন ধরে।

পুস্তক ঋণ
১) বঙ্গ সংস্কৃতিতে প্রাক্‌বৈদিক প্রভাব – ধীরেন্দ্রনাথ বাস্কে
২) সীমান্ত বাংলার লোকযান – সুধীর কুমার করণ

ব্যক্তিঋণ
স্বপন কুমার মুর্মু (ঝাঁটি পাহাড়ী)
দুর্গাচরণ মুর্মু – দুবরাজপুর

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *