জেরুসালেম

অনুপম মুখোপাধ্যায়

গল্পটা লিখলাম। এবার আপনি আমার পোয়েটিক্স নিয়ে ভাবুন।

এ সময় কুয়াশা তীক্ষ্ণ হয় না। পেলব হয় না। কেবল কোনো দূর সীমান্তে কুকুরের মৃত্যু হলে তার গন্ধ আরো গাঢ় হয়ে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। পায়ের তলায় রাস্তা থাক, বা ফুটপাথ, হাঁটতে হাঁটতে সেই ঘ্রাণ টের পাওয়া যায়। সেই ঘ্রাণকে অতিক্রম করার জন্য হাঁটার গতি বাড়িয়ে নেওয়া যায়, অথবা, একটু থেমে, সেই ঘ্রাণকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টাও করা চলে। কিন্তু করবেন কেন? জীবনে সবকিছু ব্যাখ্যা করতে নেই। করতে গেলে শান্তি থাকে না।

এই শহরে আলোর সংখ্যা বেশি। কিন্তু কোনো আলো তীব্র নয়। এক অদ্ভুত ম্যাচমেচে আলোছায়ার সৃষ্টি হয় শীতকালীন সন্ধ্যা সাতটায়। গলিগুলো আরো মোহময় হয়ে ওঠে। যদিও আপনি ভালোই জানেন সেগুলোর মধ্যে কিস্যু নেই, তবু, যেন, সেগুলোর মধ্যে ঢুকলে, খোলা নর্দমার গন্ধের মধ্যে, সান্ধ্য রান্নার ছা-পোষা শব্দের মধ্যে, একজন পরিচিত লোকের সঙ্গে দেখা হয়েই যাবে, আর তার সঙ্গে একমত হওয়া যাবে, ভিন্নমত হওয়া যাবে, সে অকারণে আপনাকে বাড়িতে ডাকতেও পারে এক কাপ চা খেয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু খাবেন কেন? কেউ ডাকলেই চা খেতে নেই। খেলে জীবনে সোয়াস্তি থাকে না।

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (৪র্থ অংশ)

এমনই সন্ধ্যা সাতটায় আপনি রাস্তায় দাঁড়িয়ে, একলা, অনেক অনেক কথা ভাবতে পারেন।

একজন দাড়িওয়ালা বাঙালি তরুণ আপনার সামনে। আপনি তার হাত চেপে ধরলেন। প্রতিদিনের শ্রমে তার হাতের চামড়া শক্ত হয়ে গেছে। সে হয়তো একজন কাঠ মিস্ত্রি। অথবা পাথরের কাজ করে এই শহরে। পাশের গ্রাম থেকে রোজ এই শহরে আসে। যদিও এই শহরের নাম সেফোরিস নয়।

“নাম কী তোমার?”

তরুণটি থুতু ফেলে উদাসীনভাবে বলল, “যিশু। যিশু মাহাতো।”

“বয়স কত?”

“৩৩।”

“খুব তরুণ তুমি তাহলে আজ আর নও।” আপনি সরু চোখ করে জানতে চাইলেন, “তা কী করছ এ সময় এই মৃতপ্রায় শহরে তুমি?”

তরুণ হাসল। অদ্ভুত হাসি। বিচিত্র হাসি। আপনার কোনোদিন না দেখা সেই হাসি। বলল, “আমি তোমার জন্যই তো অপেক্ষা করছি শালা! তুমি জানো না?”

তরুণ মুখ খারাপ করার ফলে আপনার আগ্রহ ধাক্কা খেল, আপনি একটু থতমত খেলেন, “আমার জন্য! কী চাও আমার কাছে?”

“তুমি! কী দেবে তুমি আমাকে! কী আছে তোমার আমাকে দেওয়ার জন্য? সাব-অল্টার্ন কাকে বলে এই নিয়ে বইপড়া একটা বক্তিমে হয়তো এখনই দিতে পারো। তার চেয়ে বেশি আর কী দেওয়ার আছে তোমার? শালা আঁতেল…”

“ভোট। ভোট তো দিতেই পারি। তুমি ভোটে দাঁড়ালে আমি তোমাকে ভোট দিতে পারি। যদি দেওয়ালে তোমার ছবি দেখে আমার ভালো লাগে, আর প্রতীকটাও আমার পছন্দসই হয়।”

“না। ভোট চাওয়ার পক্ষেও তুমি বড্ড গরিব আজকাল। তুমি আজ এতই ব্যক্তিগত যে, তোমার ভোট কাউকে জেতাতে পারবে না। নির্ঘাৎ তুমি NOTA-এ ভোট দাও। তার চেয়ে আমার ক্রুশ আমাকেই বইতে দাও। তুমি নাক গলিও না।”

“আমাকে তো পাত্তাই দাও না। তাহলে আমার জন্য অপেক্ষা কেন করছ?”

“কারণ আমার নাম যিশু মাহাতো। আমার বাপের নাম প্রফুল্ল মাহাতো। বাপ আমার নাম যিশু কেন রেখেছে, তুমি আমাকে বলে দাও।”

“এতটা নির্ভর কেন করবে আমার উপর? গরিব আমি।”

“গরিবরা আজকাল আর কিছু না পারুক, ভালো কথা বলতে পারে, কবিতা লিখতে পারে। বড়লোকরা কথা বলতে ভুলে গেছে। আরো ভালো হবে তুমি যদি অশিক্ষিত হও। অশিক্ষিত লোকেরা নিজেরা যে পথে হাঁটে না, অন্যকে সে পথ খুব ভালো দেখিয়ে দিতে পারে।”

“আমার আজকাল নিরক্ষর হতে ইচ্ছে করে। মঞ্চে উঠে লোক হাসাতে ইচ্ছে করে।”

“নাহ্‌!” তরুণ সবেগে মাথা নাড়ল, “সেটা আর হতে পারবে না। নিরক্ষর হয়ে ওঠা পৃথিবীর খুব কঠিন একটা কাজ। সেই কাজ তোমার দ্বারা হওয়ার নয়। তুমি বড্ড বেশি আঁতেল। প্রচুর বই পড়ে ফেলেছ। তোমার সর্বনাশ হয়ে গেছে।”

এই অবধি বলেই সেই তরুণ হঠাৎ হাঁটা লাগাল আপনাকে ছাড়িয়ে।

আপনি দাঁড়িয়েই রইলেন অবাক হয়ে।

কিন্তু অবাক হবেন কেন? আজকাল অবাক হওয়া স্বাস্থ্যকর নয়, আগের মতো।

আপনি জুডাসের কথা ভাবতে পারেন। সেই জুডাস একজন মধ্যবয়স্ক গোলগাল বাঙালি। সে সন্ধ্যার এই ভ্রমণে আপনার মুখোমুখি হল। আপনি তাকে কিছুটা সময় দিতেই পারেন। দেওয়ার জন্য আপনার হাতে তো কোনো অভাব নেই সময়ের।

সে ফিচেল হেসে আপনার সামনে ঈষৎ নত হল, হাতজোড় করে বলল, “নমস্কার!”

আপনি বিরক্ত মুখে বললেন, “সামনের লোকটাকে নমস্কার করলে নিজেকে সাফ মনে হয়? পরিষ্কার মনে হয়?”

“হ্যাঁ। এই তো দেখুন না গত দু’হাজার বছর একটা লোককে কী অপরিচ্ছন্নভাবে ভুল বোঝা হয়েছে। জুডাস যিশুকে কেন ধরিয়ে দিয়েছিল তার মুখ থেকে তার কোনো কৈফিয়ত কেউ চায়নি। বিশ্বাস কাকে বলে মানুষ আজও জানতে পারেনি। বিশ্বাসঘাতকতা কাকে বলে সেটা আজও মানুষের বুঝতে বাকি আছে। ইতিহাসে যত কুখ্যাত বিশ্বাসঘাতকতার কথা লেখা আছে, সেসব গল্প। বিশ্বাসঘাতকরা ইতিহাসের শিকার হয়েছে, ধর্মগ্রন্থের শিকার হয়েছে। বিভীষণ হোক, জুডাস বা মীরজাফর…”

আরও পড়ুন: লকডাউনে বাদাবনের বাঘ

এই লোকটার নাম আপনি দেওয়ালে অনেক দেখেছেন। খবরের কাগজে দেখেছেন। এতক্ষণে খেয়াল করলেন লোকটাকে আপনি টিভিতে দেখেছেন। মোবাইলে দেখেছেন।

আপনি সতর্ক গলায় বললেন, “দেখুন আমি ভোট কাউকেই দিই না। আপনাকেও দেব না। কিন্তু আপনি বিশ্বাসঘাতকতা নিয়ে ভাবছেন নাকি?”

লোকটা উদাসীনভাবে বলল, “কিছু একটা নিয়ে ভাবলেই হল। আপনি এই মুহূর্তে কী নিয়ে ভাবছেন? দেখুন না কেমন বিশ্রী থমথমে একটা সন্ধ্যা। মাথার উপর বিড়ালের হাসির মতো একটা চাঁদ।”

“অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড!” আপনি ঈষৎ বাঁকা সুরে বললেন, “ব্বাবা! আপনি বিখ্যাত পলিটিশিয়ান, সাহিত্যের খবর রাখেন, এ তো এই মৃত শহরে একটা মস্ত ঘটনা।”

“ঘটনার কোনো ছোট-বড় হয় না। শহরের ছোট-বড় হয়। আর হ্যাঁ, মানুষের ছোট-বড় হয়।”

“কী বলছেন! আমাকে কি… ছোটলোক বলছেন?”

“আমি যদি আপনার সামনে না আসতাম, আপনি নিশ্চয়ই যিশু মাহাতোকে নিয়ে আরো ভাবতেন? আপনার ভাবনার স্তর কি ওটাই নয়?”

“চৈতন্যদেবকে নিয়েও ভাবতে পারতাম। গঙ্গারিধি সংস্কৃতি, বাঙালির বিস্মৃত অতীত কিংবা সুভাষ বোসকে নিয়ে।”

“এরকম একটা মৃতপ্রায় শহরে সন্ধ্যায় বেড়াতে বেরিয়ে আপনি দুর্দান্ত সময় বা একজন বলশালী পুরুষকে নিয়ে কেন ভাববেন? চৈতন্য আর সুভাষ বোসের দিন চলে গেছে। বেশ কিছু কাল আর সেসব দিন ফিরবে না।”

“এটা কি অন্ধকার যুগ?”

“যেহেতু পৃথিবীতে স্বর্ণযুগ আজ অবধি আসেনি, পৃথিবীতে আজও কোনো যুগই পুরোপুরিভাবে অন্ধকার নয়। আসলে কী জানেন, অন্ধকার যুগ, স্বর্ণযুগ এগুলো খুবই ফিচেল ধারণা। আপনি বিশ্বাস রাখতে পারেন, ঠিক এই মুহূর্তেই পৃথিবীতে খুব ভালো কিছু ব্যাপারও ঘটছে। কিন্তু এই শহর অবধি তার আঁচ আসছে না।”

“তিরিশটা রৌপ্যমুদ্রা পেলে এই শহরকে বিক্রি করে চলে যাওয়া যায়, তাই না? তুমি তো তা অনায়াসে পারো, তাই না?”

“আপনি থেকে তুমিতে নেমে গেলেন! বেশ! বেশ!”

অপমানেরও ঠিক-ভুল হয়। ভুল হয়েছে সেটা স্বীকার করার আগেই লোকটা হনহনিয়ে চলে গেল।

কেউ কেউ কেন যে এত ‘আপনি’-তে থাকতে চায়!

অবিশ্যি আজকাল সকলকেই আপনি বলা মানসিক দিক থেকে স্বাস্থ্যকর।

মাথার উপরে ক্রমেই ক্ষয়ে যাওয়া চাঁদ আপনাকে জিজ্ঞাসা করতে পারে কোনো সময় জীবনে আপনি জেরুসালেমের কথা ভেবেছেন কি? ভেবেছেন কি হেরোদের কথা? সালোমে সেই যে নাচতে নাচতে তার লম্পট বিপিতার কাছে চেয়ে নিয়েছিল প্রফেটের কাটা মুণ্ডু, ওই চাঁদ কি যোহন দ্য ব্যাপ্তিস্তের মুখের সঙ্গে কোথাও মিলে যায়?

          ঠিক এমন সময় আপনার চোখে পড়বে দুর্বল ল্যাম্পপোস্টের তলায় ক্ষুদ্র ও নির্জন এক হারমোনিয়াম দোকান, সেখানে হারমোনিয়াম আর তৈরি হয় না, ভাঙাচোরাগুলোকে সারানো হয়। তার সামনে এক মলিন লাল নাইটি পরা উজ্জ্বল কিশোরী, গায়ে ম্লাণ লাল সোয়েটার, একটা ফোন নিয়ে চুপচাপ কথা বলছে সতর্ক চোখে। গায়ে হলদেটে আলো পড়েছে- মহাজগতের।

          ওর কাকার দোকান। তিনি ওকে একটু বসতে বলে রাতের খাবার কিনতে গেছেন।

          সবুজ ময়লা লুঙ্গি পরে। 

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *