ছাতাটাঁড়ের দুর্গাপুজোর পৌরোহিত্য করতে বাঁকুড়া থেকে এসেছিলেন ঝাড়খণ্ড, বাকিটা ইতিহাস

রিনা ভৌমিক

যে গল্প এই মুহূর্তে কিংবদন্তি। বলছিল বিশ্বম্ভর চক্রবর্তী। ভোজুডির বিখ্যাত ঠাকুরমশাইয়ের পৌত্র। আমার স্নেহের ভাই। কথা হচ্ছিল ওদের বসতবাড়ির লাগোয়া অপটিক্যাল ক্লিনিকে। ১৯২৪ সালে লাইনপারের দুর্গাপুজোর পৌরোহিত্য করতে ভোজুডি এসেছিলেন ঠাকুরমশাই। তখন তিনি ভরা যৌবনে। অকৃতদার ব্রহ্মচারী। শ্রীমন্মথনাথ চক্রবর্তী। বাঁকুড়ার খামারবেড়িয়া থেকে। ব্লক ওন্দা। ঠাকুরমশাইয়ের ভেতর ঐশী ঊর্জা দেখে বেঙ্গলিক্লাবের পুজোকমিটি তাঁকে ভোজুডিতে স্থায়ীভাবে রাখার সিদ্ধান্ত নেয়।

আরও পড়ুন: চালচিত্র এঁকে নিজেই যেন গ্রামের দুর্গা কৃষ্ণনগরের চিত্রকর রেবা পাল

শিবমন্দিরের ঠাকুরমশাই

ছাতাটাঁড়ে রেল সংলগ্ন পাবলিক জমি কিনে তাঁর পাকাপাকি থাকার বন্দোবস্তের ফল শিবমন্দির। ভোজুডির মানুষের শ্রদ্ধা ও আন্তরিক ভালোবাসায় তিনি আর বাড়ি ফিরলেন না। ভোজুডির হয়ে গেলেন। দিন যায়। পাবলিক এরিয়ায় তখন তথাকথিত মজদুর শ্রেণির বসবাস বেশি। কিছু দিন পর তারা ঠাকুর মশাইয়ের কাছে আবদার ‌জানাল, তাদের টোলায় তাদের দুর্গাঠাকুর চাই। অন্যপাড়ায় পুজো দিতে তাদের অসুবিধা হয়।

আরও পড়ুন: ঔষধি গাছে ঘেরা ঝাড়গ্রামের কনক দুর্গা

শিবমন্দির

শেষমেশ, ১৯৫৭ সালে ঠাকুরমশাইয়ের তত্ত্বাবধানে ছাতাটাঁড়ের শিবমন্দিরে সর্বজনীন দুর্গোৎসব শুরু হয়। ঠাকুরমশাই সে-সময় তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র শ্রীবাদল চক্রবর্তীকে (বিশ্বম্ভরের বাবা) লাইনপারের পুজোর ভার সমর্পন করেন। ছাতাটাঁড়ে বৈষ্ণব নিয়মেই পুজো হয়ে থাকে। খুব জাঁকজমকপূর্ণ অথচ সাত্ত্বিকভাবে পুজো হয় এখানেও।

আরও পড়ুন: শান্তিপুরের সাহাপাড়া বারোয়ারি তাঁত শ্রমিকদের ক্লান্তি দূর করে

বিশ্বম্ভর চক্রবর্তী। ছবি: রিঙ্কি মেহতা

বিশ্বম্ভরের কথা শুনতে শুনতে দু’চোখ স্মৃতিমেদুর হয়ে উঠল। এই সেই শিবমন্দির। যার কোনায় কোনায় ধুলোচাপা আছে আমাদের শৈশবের রামধনু। লাইনপার আর শিবমন্দিরের দূরত্ব সামান্য‌ই। ভোজুডির মানুষজনের মধ্যে সূক্ষ্ম আন্তরিক বন্ধন একটু খেয়াল করলেই বোঝা যায়। জাতি ধর্ম নির্বিশেষে ভালোবাসার বায়োস্কোপ! আর ঠাকুরমশাইয়ের নাম‌ই বৈতরণি। উনি অনেকের দীক্ষাগুরুও। তাঁর জন্মদিনে এখনও প্রচুর ভক্তসমাগম হয় মন্দিরে। ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছিলাম মন্দিরের ইট-কাঠ-মাটি। মন নস্টালজিয়ায় কাতর হচ্ছিল।

লক্ষ্মী রাজোয়ার। ছবি: রিঙ্কি মেহতা

এমন সময় চা হাতে এল মেয়েটি। লক্ষ্মী রাজোয়ার। তার মা শকুন্তলা বিশ্বম্ভরদের বাড়িতে কাজ করে। মেয়েটি ছোট থেকেই মায়ের সঙ্গে ওদের বাড়ি আসা-যাওয়া করে। মায়ের প্রেরণায় টুয়েলভ পাঠরত লক্ষ্মী আজ স্বপ্নের উড়াল-ডানায় আকাশ খুঁজছে। সে প্রয়োজনে বিশ্বম্ভরের দোকান ও সামলে দেয়। অনেকেই ওর ওড়ার স্বপ্নে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেয়। কিন্তু লক্ষ্মীর দু’চোখে চিকচিকে আত্মবিশ্বাসের ঝিলিক দেখে আমার মন বলে উঠল, এই তো আমার দুর্গা!

শিবমন্দিরের দুর্গাপুজো। ছবি: বিশ্বম্ভর
Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

  • সুবল দত্ত

    ঋদ্ধ হলাম ।এইসব অমূল্য তথ্য প্রকাশিত করার জন্য ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *